ইলিশের দেশ বরিশালে গুজরাটের ইলিশ,দেশি বলে বেশি দামে বিক্রি - Alokitobarta
আজ : শনিবার, ১৯শে সেপ্টেম্বর, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ৪ঠা আশ্বিন, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সর্বশেষ সংবাদঃ

ইলিশের দেশ বরিশালে গুজরাটের ইলিশ,দেশি বলে বেশি দামে বিক্রি


নিজস্ব প্রতিবেদক : দেশে উৎপাদিত ইলিশের শতকরা ৬৭ ভাগের জোগান দেওয়া বরিশালের বাজারে এখন বিক্রি হচ্ছে ভারতের গুজরাট থেকে আমদানি হওয়া ইলিশ। দেশি উল্লেখ করে আমদানি দরের তুলনায় ৬-৭ গুণ বেশি দামে বিক্রি করছে অসাধু ব্যবসায়ীরা। দেখতে প্রায় একইরকম হওয়ায় দেশি ভেবে এই ইলিশ কিনে ঠকছে নিরীহ ক্রেতারা। নগরীর পোর্ট রোডে থাকা ইলিশ মোকামের একাধিক ব্যবসায়ী বলেন,আমদানির এই ইলিশ কখনোই মোকামে আসে না। যারা আনেন তারা সরাসরি দিয়ে দেন খুচরা বিক্রেতাদের। তারা তা নিয়ে যান নগরীর বিভিন্ন বাজারে। ফলে এই ইলিশের কেনাবেচা কিংবা কোনো কিছুর ওপরই কোনো নিয়ন্ত্রণ থাকে না আমাদের।

স্থলবন্দর বেনাপোলের আমদানি বিভাগ সূত্রে পাওয়া তথ্যানুযায়ী, গত কয়েক মাসে ভারত থেকে বাংলাদেশে আমদানি করা হয়েছে সাড়ে ৩শ টনেরও বেশি ইলিশ। শুরুতে ভাবা হয়েছিল বেনাপোল থেকে সরাসরি ঢাকা-সিলেট-রাজশাহীসহ আশপাশে যাচ্ছে এগুলো। কিন্তু গত কয়েকদিন বাজার ঘুরে দেখা গেছে, বরিশালেও দেদার আসছে গুজরাটের ইলিশের বড় অংশ। ১৯টি আমদানিকারক প্রতিষ্ঠান ভারতের এই ইলিশ আমদানি করছে। তাদের একটি ‘সেভেন স্টার গ্রুপ’ বরিশালে আনছে। স্থানীয় মৎস্য ব্যবসায়ী জহির সিকদার বলেন, ‘প্রতিদিন গড়ে ৮০-১০০ মন গুজরাটের ইলিশ আসছে বরিশালে। সরাসরি দেওয়া হচ্ছে খুচরা বিক্রেতাদের হাতে। তারাই তা নিচ্ছে বিভিন্ন বাজারে।

নগরীর চৌমাথা বাজারে বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় চোখে পড়ে ভারত থেকে আমদানি হওয়া ইলিশ।কয়েকজন খুচরা বিক্রেতা ঝুড়িতে সাজিয়ে বিক্রি করছিলেন তা। দাম জিজ্ঞেস করলে প্রতিকেজি ২ হাজার টাকা বলে জানান। আমদানি করা ইলিশ এত বেশি দামে কেন বিক্রি করছেন জানতে চাইলে কোনো সদুত্তর দিতে পারেননি।বাজারে ইলিশ কিনতে আসা নগরীর কালুশাহ সড়কের বাসিন্দা আহসান কবির বলেন,দেশি ইলিশ বলে এগুলো বিক্রি করা হচ্ছিল। সূক্ষ্ম হলেও কিছু তারতম্য রয়েছে। তবে চেনা বেশ কঠিন। ফলে দেশি ভেবে ভারতীয় এই ইলিশই ৬-৭ গুণ বেশি দামে নিয়ে যাচ্ছিল ক্রেতা।’ কেবল চৌমাথাই নয়, নথুল্লাবাদসহ আরও কয়েকটি বাজারে এই ইলিশ দেশি বলে অনেক বেশি দামে বিক্রি করা হচ্ছিল।

বরিশাল ইলিশ মোকামের ব্যবসায়ী গোপাল চন্দ্র সাহা বলেন,প্রতিকেজি ২ ডলার (২৪৭ টাকা) দরে বাংলাদেশে আমদানি করা হচ্ছে এই ইলিশ। ভারতের গুজরাট থেকে আনছেন আমদানিকারকরা। গুজরাটের ভারুচ ও নর্মদা নদীর মোহনা ও সংশ্লিষ্ট সমুদ্রে এ বছর ধরা পড়ছে বিপুল পরিমাণ ইলিশ।সেই ইলিশই অনেক কম দামে এনে বেশি দামে বিক্রি করা হচ্ছে দেশে। দুই দেশের ইলিশের মধ্যে কিছু পার্থক্য থাকলেও সাধারণ মানুষের পক্ষে তা বোঝা কঠিন। দেশি ইলিশের পেট কিছুটা ভারী থাকে। গুজরাটের ইলিশের পেট সরু। তাছাড়া দেশি ইলিশের তুলনায় গুজরাটের ইলিশের মুখ সুচালু। আঁশ এবং রঙেও রয়েছে পার্থক্য। এগুলো না জানার কারণে দেশি ইলিশ ভেবে বেশি দামে কিনে প্রতারিত হচ্ছেন মানুষ। দেশি ইলিশ রান্নার সময় যেমন ঘ্রাণ ছড়ায় সেটা গুজরাটের ইলিশে মেলে না। তাছাড়া দেখতে ইলিশের মতো হলেও চিরচেনা সেই ইলিশের স্বাদও নেই ভারত থেকে আমদানি করা ইলিশে।

ক্ষুদ্র মৎস্যজীবী জেলে সমিতি বরিশালের সাবেক সভাপতি শহিদুল ইসলাম বলেন,গত কয়েক বছর ধরেই দেশে কমছে ইলিশের উৎপাদন। বরিশালের মোকামে এখন ভরা মৌসুমেও আর আগের মতো আসছে না ইলিশ। শুক্রবার এই মোকামে সবমিলিয়ে ইলিশ এসেছে ১শ মনের কিছু বেশি। অথচ এই সময়ে কম করে হলেও ২-৩ হাজার মন ইলিশ আসত আগে। সংকটের কারণে দেশি ইলিশের দামও এখন অনেক। শুক্রবার পাইকারি বাজারে কেজি সাইজের ইলিশ বিক্রি হয়েছে প্রায় আড়াই হাজার টাকা দরে। খুচরা বাজারে গিয়ে এই ইলিশই ২৮শ-৩ হাজার টাকায় বিক্রি হচ্ছে। ৩-৪শ গ্রাম ওজনের ইলিশও প্রতিকেজি ১৫-১৬শ টাকার নিচে মিলছে না। সংকট আর দাম বৃদ্ধির এই সুযোগটাই নিচ্ছে আমদানিকারকরা। ভারত থেকে স্বাদহীন ইলিশ এনে ছড়িয়ে দিচ্ছে দেশের বাজারে।’

ইলিশ মোকামের ব্যবসায়ী ইয়ার হোসেন বলেন,বিদেশ থেকে এভাবে ইলিশ এনে দেশি বলে চালানোর ঘটনা এটাই প্রথম নয়। এর আগে মিয়ানমার থেকে দেড়-দুই ডলার রেটে কিনে বাংলাদেশে এনে বেশি দামে বিক্রি করতেন চট্টগ্রামের কিছু আমদানিকারক। এবার তা আনা হচ্ছে গুজরাট থেকে। সবচেয়ে দুঃখজনক হলো, দেশে ইলিশের সংকট এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, ইলিশের শহর বরিশাল পর্যন্ত এসে পৌঁছেছে আমদানির ইলিশ। অথচ উৎপাদন বাড়াতে প্রায় বছরজুড়ে ইলিশ শিকারে নানা নিষেধাজ্ঞাসহ কত রকম ব্যবস্থা নেয় সরকার। হাজার কোটি টাকা খরচ করা হয় এ খাতে। তারপরও কেন এমন দুরবস্থা তা খতিয়ে দেখার সময় এসেছে। সরকারের উচিত এই বিষয়টির দিকে নজর দেওয়া। নইলে বিশ্বখ্যাত বাংলার ইলিশ হয়তো একসময় হারিয়ে যাবে ইতিহাসের অতল গর্ভে।

Top