এলডিসি উত্তরণে ১৪ পরীক্ষায় বাংলাদেশ
মোহাম্মাদ আবুবকর সিদ্দীক ভুঁইয়া : স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) তালিকা থেকে উত্তরণে বাংলাদেশকে ১৪টি গুরুত্বপূর্ণ সূচকে নির্দিষ্ট লক্ষ্য অর্জন করতে হবে। শুধু অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বাড়ালেই হবে না; একই সঙ্গে কমাতে হবে মূল্যস্ফীতি ও খেলাপি ঋণ, বাড়াতে হবে কর ও রাজস্ব আদায়। তৈরি পোশাকের ওপর রপ্তানিনির্ভরতা কমিয়ে নতুন পণ্য ও বাজার তৈরি, বন্দরে পণ্য খালাসের সময় কমানো, দক্ষ জনশক্তি গড়ে তোলা এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়ানোর লক্ষ্যও রয়েছে। ২০২৯ সালের মধ্যে এসব লক্ষ্য অর্জন করতে হবে। অগ্রগতি পরিমাপ হবে প্রতি তিন মাসে। সরকারি প্রতিষ্ঠানের পাশাপাশি বেসরকারি খাতকেও দেওয়া হয়েছে নির্দিষ্ট দায়িত্ব। অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ (ইআরডি) প্রণীত ‘মসৃণ, টেকসই ও অপরিবর্তনীয় এলডিসি উত্তরণের জাতীয় কর্মপরিকল্পনা ২০২৬-২০২৯’-এ এসব লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। ২০২৯ সালের ২৪ নভেম্বরকে চূড়ান্ত উত্তরণের তারিখ ধরে এ সময়কে শুধু প্রস্তুতির সময় নয়, অর্থনীতির কাঠামোগত পরিবর্তনের সুযোগ হিসাবেও কাজে লাগানোর পরিকল্পনা করা হয়েছে।বাণিজ্য সচিব আতাউর রহমান খান বলেন, শুধু নীতিমালা বা গবেষণা প্রতিবেদন তৈরি নয়, সেগুলোর কার্যকর বাস্তবায়ন নিশ্চিত করাই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। সংস্কারের সুফল যাতে মন্ত্রণালয়, অধিদপ্তর ও মাঠপর্যায়ের প্রতিষ্ঠান পর্যন্ত পৌঁছায়, সেদিকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। বাণিজ্য সহজীকরণ, ব্যবসাবান্ধব আইন ও বিধিমালা প্রণয়ন এবং বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের সমন্বিত উদ্যোগের মাধ্যমে ব্যবসা পরিচালনার পরিবেশ আরও উন্নত করার পরিকল্পনাও রয়েছে।
একসঙ্গে ১৪ সূচকে লক্ষ্য : পথনকশা অনুযায়ী, ২০২৬ সালে ৪ দশমিক ১৪ শতাংশ থাকা প্রকৃত মোট দেশজ উৎপাদন (জিডিপি) প্রবৃদ্ধি ২০২৯ সালের মধ্যে ৭ শতাংশে নিতে হবে। একই সময়ে ৯ দশমিক ১৬ শতাংশ মূল্যস্ফীতি কমিয়ে ৬ শতাংশে নামানোর লক্ষ্য রয়েছে। ৭ শতাংশের নিচে থাকা কর-জিডিপি অনুপাত বাড়িয়ে অন্তত ৯ শতাংশ এবং ৯ দশমিক ৭৫ শতাংশের রাজস্ব-জিডিপি অনুপাত ১০ দশমিক ৭১ শতাংশে উন্নীত করতে হবে।বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ চার মাসের আমদানি ব্যয়ের সমপরিমাণ থেকে ছয় মাসে উন্নীত করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। ব্যাংক খাতের খেলাপি ঋণের অনুপাত ৩০ শতাংশ থেকে নামিয়ে ২০ শতাংশের নিচে আনতে হবে। একই সঙ্গে বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবৃদ্ধি ৪ দশমিক ৯৮ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ১০ শতাংশের বেশি করার লক্ষ্য রয়েছে।
রপ্তানি খাতেও বড় পরিবর্তনের লক্ষ্য রয়েছে। বর্তমানে প্রায় ১৯ শতাংশ থাকা তৈরি পোশাকবহির্ভূত রপ্তানির অংশ ২০২৯ সালের মধ্যে অন্তত ২৫ শতাংশে নিতে হবে। ওষুধ, তথ্যপ্রযুক্তি, কৃষিপ্রক্রিয়াজাত পণ্য, পাট, চামড়া ও প্রকৌশল খাতে লক্ষ্যভিত্তিক সহায়তার কথা বলা হয়েছে।বন্দরে কনটেইনারের অবস্থানকালও বড় বাধা হিসাবে চিহ্নিত করা হয়েছে। বর্তমানে গড়ে ৯ দশমিক ৪৪ দিন থাকা অবস্থানকাল কমিয়ে ১ থেকে ২ দিনে নামানোর লক্ষ্য রয়েছে। শুল্ক, বন্দর ও বাণিজ্যসংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোকে জাতীয় একক জানালা ব্যবস্থার সঙ্গে পুরোপুরি যুক্ত করার পরিকল্পনাও রয়েছে।এছাড়া ২০২৯ সালের মধ্যে ডিজিটাল সরকারি ব্যবসায়িক সেবা শতভাগ সমন্বিত করা, শিল্পসংশ্লিষ্ট সনদধারী কর্মীর সংখ্যা ৩০ লাখ বাড়ানো এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানির অংশ ২ দশমিক ৩ শতাংশ থেকে ১৫ শতাংশে উন্নীত করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
তিন ধাপে সংস্কার : লক্ষ্য অর্জনে সংস্কার কার্যক্রম তিন ধাপে শেষ করার পরিকল্পনা রয়েছে। ২০২৭ সালের জুনের মধ্যে দ্রুত ফলদায়ক সংস্কার, ২০২৮ সালের জুনের মধ্যে মধ্যমেয়াদি সংস্কার এবং ২০২৯ সালের জুনের মধ্যে উত্তরণ ও প্রতিযোগিতা সক্ষমতার সংস্কার শেষ করতে হবে। এরপর জুলাই থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত থাকবে চূড়ান্ত প্রস্তুতি পর্ব।
প্রথম ধাপে রাজস্ব ও মুদ্রানীতির সমন্বয়, মূল্যস্ফীতি কমানো, রিজার্ভ শক্তিশালী করা এবং ঋণের স্থায়িত্ব বজায় রাখার কথা বলা হয়েছে। ব্যাংক খাতে বিপদগ্রস্ত সম্পদ ব্যবস্থাপনা কাঠামো, প্রতি বছর ঝুঁকি-পরীক্ষা এবং নিয়ন্ত্রক সংস্থার প্রয়োগ জোরদারের পরিকল্পনাও রয়েছে।
ব্যবসার অনুমোদন প্রক্রিয়ায় সমন্বিত একক সেবা ও ডিজিটাল অনুমোদন চালুর পাশাপাশি সাত দিনের মধ্যে প্রাথমিক অনুমোদনের ব্যবস্থা করার কথা বলা হয়েছে। অপ্রয়োজনীয় লাইসেন্স বাদ দেওয়া, লাইসেন্সের মেয়াদ পাঁচ বছর করা এবং সব অনুমোদন ও নবায়নের জন্য অভিন্ন ডিজিটাল আবেদন ব্যবস্থা চালুর পরিকল্পনা রয়েছে।
২০২৭ সালের মধ্যে শুল্ক, বন্দর ও বাণিজ্য সংস্থাগুলোকে জাতীয় একক জানালা ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত করার পাশাপাশি জাতীয় পরিবেশ, সামাজিক ও সুশাসন পরিপালন কাঠামো, দায়িত্বশীল ব্যবসা পরিচালনার নির্দেশিকা এবং কার্বন বাজার নীতি গ্রহণের লক্ষ্য রয়েছে।
করব্যবস্থা ও শিল্প অবকাঠামো : ২০২৮ সালের জুনের মধ্যে করব্যবস্থায় শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থা চালু, করের আওতা বৃদ্ধি, ব্যাংক ও কেন্দ্রীয় আমানত ব্যবস্থার তথ্যের সঙ্গে করতথ্য সংযুক্ত করা, মূল্য সংযোজন কর পরিপালন বাড়ানো এবং কর অব্যাহতি যৌক্তিক করার পরিকল্পনা রয়েছে।
শিল্পের উৎপাদনশীলতা বাড়াতে প্রযুক্তি আধুনিকায়ন তহবিল, স্বয়ংক্রিয়ায়ন প্রণোদনা এবং ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের উৎপাদনশীলতা কর্মসূচি চালুর কথা বলা হয়েছে। ২০২৮ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে কেন্দ্রীয় বর্জ্য পানি পরিশোধনাগার সম্পন্ন, ওষুধ শিল্প পার্ক চালু এবং রপ্তানিমুখী শিল্পপার্ক সম্প্রসারণের লক্ষ্য রয়েছে।
শিল্প ও পণ্য পরিবহন করিডর তৈরি, বিশ্ববাণিজ্য সংস্থার বাণিজ্য সহজীকরণ চুক্তি বাস্তবায়ন এবং জাতীয় পণ্য পরিবহণনীতি ২০২৫ কার্যকর করার পরিকল্পনাও রয়েছে।
উত্তরণ-পরবর্তী ঝুঁকি মোকাবিলা : ২০২৯ সালের জুন পর্যন্ত রপ্তানি বহুমুখীকরণ, বাজারে প্রবেশাধিকার, মানবসম্পদ, জ্বালানি, অর্থায়ন ও বিনিয়োগ সক্ষমতা বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। কৌশলগত অংশীদারদের সঙ্গে অগ্রাধিকারমূলক বাণিজ্য চুক্তি, মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি ও ব্যাপক অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব চুক্তির উদ্যোগ নেওয়া হবে।
আন্তর্জাতিক মান পূরণে বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ডস অ্যান্ড টেস্টিং ইনস্টিটিউশনের ২৪ ঘণ্টা সেবা ও স্বীকৃত পরীক্ষাগারের সক্ষমতা বাড়ানোর কথা বলা হয়েছে। মেধাস্বত্ব আইন সংস্কার ও মেধাস্বত্ব আদালত গঠনের উদ্যোগও থাকবে।
দায় বেসরকারি খাতেরও : এলডিসি উত্তরণের দায় শুধু সরকারের ওপর রাখা হয়নি। বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোকে স্বয়ংক্রিয়ায়ন, ডিজিটাল উৎপাদন, চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের প্রযুক্তি, জ্বালানিসাশ্রয়ী যন্ত্রপাতি ও উৎপাদন প্রক্রিয়া আধুনিকায়নে বিনিয়োগ করতে বলা হয়েছে।
পরিবেশ, সামাজিক ও সুশাসনসংক্রান্ত পরিপালন, শ্রমমান, কর্মক্ষেত্রের নিরাপত্তা, নারী-পুরুষের সমতা, অভিযোগ নিষ্পত্তি ব্যবস্থা এবং দায়িত্বশীল সরবরাহব্যবস্থা নিশ্চিত করার দায়িত্বও তাদের দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে প্রশিক্ষণ, পুনর্দক্ষতা ও দক্ষতা উন্নয়ন কর্মসূচি চালাতে হবে।
রপ্তানি বাজার পূর্ব ইউরোপ, আফ্রিকা, মধ্য এশিয়া, লাতিন আমেরিকা, মধ্যপ্রাচ্য ও আঞ্চলিক বাজারে সম্প্রসারণের পরিকল্পনা রয়েছে। তৈরি পোশাকনির্ভরতার বাইরে উচ্চমূল্যের পণ্য, নিজস্ব ব্র্যান্ড, নকশা, মোড়কজাতকরণ ও বিশেষায়িত বাজারে যাওয়ার কথা বলা হয়েছে।
সরকারের নীতির পূর্বানুমেয়তা, সময়বদ্ধ অনুমোদন, শুল্কব্যবস্থা আধুনিকায়ন ও অবকাঠামো সরবরাহের প্রতিশ্রুতির বিপরীতে বেসরকারি খাত প্রযুক্তি উন্নয়ন, শ্রমদক্ষতা, রপ্তানি বহুমুখীকরণ ও উৎপাদনশীলতার তথ্য ভাগাভাগির প্রতিশ্রুতি দেবে। দুপক্ষের এসব প্রতিশ্রুতির ভিত্তিতে ‘সরকার-বেসরকারি খাতের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা চুক্তি’ করা হবে।
প্রতি তিন মাসে হবে পরীক্ষা : পথনকশা বাস্তবায়নের সমন্বয় ও পর্যবেক্ষণের দায়িত্ব থাকবে ইআরডির। অর্থমন্ত্রীকে চেয়ারম্যান করে জাতীয় এলডিসি পর্যবেক্ষণ ও সমন্বয় কমিটি বাস্তবায়ন তদারক করবে। ইআরডির অধীন টেকসই উত্তরণ সহায়তা প্রকল্প এ কাজে সমন্বয় ও পর্যবেক্ষণের ব্যবস্থা হিসাবে কাজ করবে। ত্রৈমাসিক পর্যবেক্ষণে ১৪টি সূচক পরিমাপ করা হবে।
অর্থায়ন হবে চার উৎসে : ২০২৬-২০২৯ সময়ে পথনকশা বাস্তবায়নে জাতীয় বাজেট ও বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি থেকে ৪০ শতাংশ, উন্নয়ন সহযোগীদের কাছ থেকে ৩০ শতাংশ, বেসরকারি বিনিয়োগ থেকে ২৫ শতাংশ এবং মিশ্র ও সবুজ অর্থায়ন থেকে ৫ শতাংশ অর্থায়নের কাঠামো প্রস্তাব করা হয়েছে।