বসে থাকাই ডেকে আনছে রোগ,ঝুঁকিতে ৫ কোটি মানুষ - Alokitobarta
আজ : শুক্রবার, ৩০শে অক্টোবর, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ১৪ই কার্তিক, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সর্বশেষ সংবাদঃ
গণতান্ত্রিক উত্তরণ সত্ত্বেও গণমাধ্যমকর্মীদের জন্য নিরাপদ কর্মপরিবেশ তৈরি না হওয়া একটি রাষ্ট্রের সামগ... গণতান্ত্রিক উত্তরণ সত্ত্বেও গণমাধ্যমকর্মীদের জন্য নিরাপদ কর্মপরিবেশ তৈরি না হওয়া একটি রাষ্ট্রের সামগ... গণতান্ত্রিক উত্তরণ সত্ত্বেও গণমাধ্যমকর্মীদের জন্য নিরাপদ কর্মপরিবেশ তৈরি না হওয়া একটি রাষ্ট্রের সামগ... যানজট নিরসনে ঢাকায় হবে ১৭টি মনোরেল তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠন নিয়ে রাজনৈতিক বিতর্ক এড়াতে সম্ভাব্য বিভিন্ন পদ্ধতি পর্যালোচনা করছে তড়িঘড়ি করে আবারও সংশোধনী এনে গেজেট প্রকাশের প্রক্রিয়া চলছে,তিন লাখ কপি ছাপার পর ধরা পড়ল গুরুতর ত্রুট... গ্রামে শিক্ষকের হাহাকার,ঢাকায় ৭শ অতিরিক্ত শিক্ষক, দিন কাটে আড্ডায়,ক্লাস নেই,সিনিয়র শিক্ষকরা সপ্তাহে ... গন্তব্য হতে হবে মেড ইন বাংলাদেশ,আড়াইহাজার থেকে মাতারবাড়ী বরিশালে হাফেজ শিক্ষার্থীদের স্পোকেন ইংলিশ কোর্স সম্পন্ন, সনদ ও বই বিতরণ এফডিআই গতি নেই, কমছে নতুন বিনিয়োগ,বিদেশি সহায়তায় নয়, নিজের পায়ে দাঁড়াতে চায় বাংলাদেশ!

বসে থাকাই ডেকে আনছে রোগ,ঝুঁকিতে ৫ কোটি মানুষ


ডা.মুন্সী মুবিনুল হক:কৃষিকাজ ছেড়ে বছর চারেক আগে মুদি দোকান দিয়েছিলেন ৩৬ বছরের আফতাব শেখ। ঘণ্টার পর ঘণ্টা দোকানে বসে থাকায় শরীরে বাসা বাঁধে ডায়াবেটিস আর উচ্চরক্তচাপ। চিকিৎসকের পরামর্শে কায়িক পরিশ্রম বাড়াতে ঢাকায় এসে অটোরিকশা চালানো শুরু করেন। কিন্তু প্যাডেলবিহীন রিকশায় শারীরিক শক্তির তেমন কোনো প্রয়োজন হতো না। উলটো দিনে ঘুম আর রাতে রিকশা চালানোর অনিয়ন্ত্রিত জীবনযাপনে হঠাৎ বুকে ব্যথা নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হতে হয় তাকে। ধরা পড়ে হার্টে দুটি ব্লক।

আধুনিক জীবনযাত্রায় কায়িক শ্রমের অভাবে এমন ভয়াবহ স্বাস্থ্যঝুঁকির মুখে পড়ছে দেশের বিপুলসংখ্যক মানুষ। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) তথ্য অনুযায়ী, শারীরিক নিষ্ক্রিয়তার কারণে দেশের ৫ কোটির বেশি মানুষ হৃদরোগ, ডায়াবেটিস, স্ট্রোক ও ক্যানসারের মতো অসংক্রামক রোগের চরম ঝুঁকিতে রয়েছেন। বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলছেন, প্রাপ্তবয়স্কদের প্রযুক্তিনির্ভর অলস জীবনযাপনের পাশাপাশি মাঠের অভাবে শিশু-কিশোরদের অতিরিক্ত স্ক্রিন আসক্তি পুরো জাতিকে এক ভয়ংকর স্বাস্থ্যঝুঁকির দিকে ঠেলে দিচ্ছে।

জনস্বাস্থ্যবিদ ডা. আবু জামিল ফয়সাল বলেন, কায়িক পরিশ্রম মানে শুধু জিমে গিয়ে ব্যায়াম করা নয়; এর মধ্যে হাঁটা, দৌড়ানো, কাজ করা, খেলাধুলা বা দৈনন্দিন শরীরচর্চাও অন্তর্ভুক্ত। আধুনিক যুগে প্রযুক্তিনির্ভর জীবনযাপন মানুষকে বসিয়ে রাখছে দীর্ঘসময়, ফলে কমে যাচ্ছে কায়িক পরিশ্রমের পরিমাণ। পরিশ্রম না করায় শরীর ও মনের ওপর মারাত্মক নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে।

শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ডায়াবেটিস, থাইরয়েড ও হরমোন রোগ বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ডা. এম হালিম বলেন, কায়িক পরিশ্রম রক্তনালিগুলোর স্থিতিস্থাপকতা বজায় ও রক্ত চলাচল স্বাভাবিক রাখে। পরিশ্রম না করলে প্ল্যাক জমে অ্যাথেরোস্কেলোরোসিস হয়। যারা নিয়মিত কায়িক পরিশ্রম করেন না, তাদের রক্তচাপ বেড়ে যায়, খারাপ কোলেস্টেরল (এলডিএল) বাড়ে এবং ভালো কোলেস্টেরল (এইচডিএল) কমে যায়। এ পরিবর্তনগুলো করোনারি আর্টারি ডিজিজ, মায়োকার্ডিয়াল ইনফেকশন ও স্ট্রোকের ঝুঁকি বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়।

তিনি বলেন,অলস জীবনযাপন ইনসুলিনের কার্যকারিতা কমিয়ে দেয়, ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্স হয়, যা টাইপ ২ ডায়াবেটিসের মূল কারণ। নিয়মিত কায়িক পরিশ্রম গ্লুকোজ গ্রহণে পেশির ক্ষমতা বাড়ায় এবং রক্তে শর্করার মাত্রা নিয়ন্ত্রণে রাখে। পরিশ্রম না করলে শরীরে অতিরিক্ত ক্যালরি জমে বডি ফ্যাট বাড়িয়ে দেয় এবং স্থূলতা তৈরি করে। শরীরের মেটাবলিজম ধীর হয়ে ক্যালরি পোড়ানো কম হয় এবং ওজন বাড়ে।

চলতি বছরের জুনে আইসিডিডিআর,বি প্রকাশিত এক গবেষণায় দেখা যায়, রাজধানীতে প্রতি ৫ শিশুর মধ্যে চারজন বা প্রায় ৮৩ শতাংশ শিশু প্রতিদিন দুই ঘণ্টার বেশি ডিজিটাল স্ক্রিন ব্যবহার করে। গড়ে প্রতিটি শিশু দিনে প্রায় ৪ দশমিক ৬ ঘণ্টা স্মার্টফোন, টেলিভিশন, ট্যাবলেট, কম্পিউটার ও গেমিং ডিভাইসে সময় কাটায়। গবেষণায় অংশ নেওয়া এক-তৃতীয়াংশের বেশি শিশু চোখের সমস্যায় ভুগছে এবং প্রায় ৮০ শতাংশ শিশু ঘনঘন মাথাব্যথার অভিযোগ করেছে। যারা দিনে দুই ঘণ্টার বেশি স্ক্রিন ব্যবহার করে, তাদের গড় ঘুমের সময় মাত্র ৭ দশমিক ৩ ঘণ্টা। প্রায় ১৪ শতাংশ শিশু অতিরিক্ত ওজন বা স্থূলতায় আক্রান্ত এবং অতিরিক্ত স্ক্রিন ব্যবহারকারীদের মধ্যে এ প্রবণতা তুলনামূলক বেশি। একই সঙ্গে প্রতি পাঁচ শিশুর মধ্যে প্রায় দুইজন দুশ্চিন্তা, অতিচঞ্চলতা কিংবা আচরণগত সমস্যাসহ এক বা একাধিক মানসিক স্বাস্থ্য জটিলতায় ভুগছে।

ডব্লিউএইচও ২০০০ থেকে ২০২২ সাল পর্যন্ত এক যুগে বাংলাদেশসহ ১৬৩টি দেশ ও এলাকার ৫০৭টি জনসংখ্যাভিত্তিক জরিপ করে। এতে ৫৭ লাখ মানুষের উপাত্ত ব্যবহার করে একটি গবেষণা করা হয়। ২০২৩ সালের ২৫ জুন বিশ্বখ্যাত চিকিৎসা সাময়িকী ‘ল্যানসেট’-এ গবেষণাটি প্রকাশ হয়। এতে দেখা যায়, বাংলাদেশে কায়িক শ্রমের অভাবে ৫ কোটি ২০ লাখ মানুষ অসংক্রামক রোগের ঝুঁকিতে রয়েছে, যা মোট জনসংখ্যার ২৯ শতাংশ। এসব অসংক্রামক রোগের মধ্যে রয়েছে হৃদ্রোগ, উচ্চরক্তচাপ, স্ট্রোক বা মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণ, ক্যানসার, মুটিয়ে যাওয়া ও ডায়াবেটিস।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, মাঠ ও উন্মুক্ত জায়গার সংকটে শিশু-কিশোরদের দৌড় প্রতিযোগিতা, গোল্লাছুট, ইচিং-বিচিং, দাঁড়িয়াবন্ধা ও বউচির মতো জনপ্রিয় খেলাধুলা হারিয়ে যাচ্ছে। নদী, পুকুর, জলাশয় ভরাট হওয়ায় সাঁতারও ভুলতে বসেছে তারা। বড়দের ঘাম ঝরানোর মতো শারীরিক কসরত যেমন : লাঠি খেলা, কাবাডি, কুস্তি (বলি), নৌকাবাইচ, ঘোড়দৌড়সহ ঐতিয্যবাহী খেলাধুলায় বিমুখতা বাড়ছে। বিপরীতে তারা টেলিভিশন, মোবাইল ফোন, ট্যাব, কম্পিউটারে অনলাইন গেমে আসক্ত হচ্ছে। অনলাইন গেমের নামে ভার্চুয়াল মাধ্যমে জুয়া, মাদকসংশ্লিষ্ট গ্রুপ ও ডার্ক ওয়েব সাইটে ঝুঁকছে। ফলে তারা নানা শারীরিক ও মানসিক সমস্যায় ভুগছে।

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ইসলামী ব্যাংক হাসপাতালের পরিচালক (মিরপুর) অধ্যাপক ড. খোরশেদ আলী মিয়া বলেন, ফিজিক্যাল অ্যাকটিভিটি মানুষের মস্তিষ্কে সেরোটোনিন, ডোপামিন ও এন্ডোরফিন নিঃসরণে সাহায্য করে, যা মন ভালো রাখতে সাহায্য করে। কায়িক পরিশ্রম না করলে বিষণ্নতা, উদ্বেগ, মানসিক চাপ এবং ঘুমের সমস্যা বেড়ে যেতে পারে। অসক্রিয়তা হাড়ের ঘনত্ব কমিয়ে অস্টিওপোরোসিস ও হাড় ভাঙার ঝুঁকি বাড়ায়। একই সঙ্গে পেশির শক্তি ও টোন কমে গিয়ে মাংসপেশি শুকিয়ে যেতে পারে।

তিনি আরও বলেন,শারীরিক নিষ্ক্রিয়তা কলোরেক্টাল, স্তন ও এন্ডোমেট্রিয়াল ক্যানসারের ঝুঁকি বাড়ায়। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে নিয়মিত কায়িক পরিশ্রম না করলে মস্তিষ্কের রক্তপ্রবাহ কমে যায়, যা স্মৃতিভ্রংশ, আলঝেইমারসসহ নানা নিউরোডিজেনারেটিভ রোগের আশঙ্কা তৈরি করে। পরিশ্রম না করলে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা হ্রাস, পরিপাকতন্ত্র ধীর হয়ে যায়। ফলে খাবার হজমে সময় নেয়, কোষ্ঠকাঠিন্য, পেট ফাঁপা, গ্যাস্ট্রিকের সমস্যা দেখা দেয়। এছাড়া প্রোস্টেট আকারে বড় হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা বেশি বিধায় প্রস্রাব নিঃসরণে বাধা সৃষ্টি করতে পারে।

অধ্যাপক ডা. এবিএম আব্দুল্লাহ বলেন,বর্তমানে বিশ্বের মোট মৃত্যুর ৭০ ভাগের জন্য দায়ী অসংক্রামক ব্যাধি। যার ৮০ ভাগ মৃত্যু হয় বাংলাদেশের মতো তৃতীয় বিশ্বের অনেক উন্নয়নশীল দেশে। খেলার মাঠ, বিদ্যালয়ে শরীরচর্চা বা খেলাধুলার সংস্কৃতি হারিয়ে যাচ্ছে।গাড়ি-লিফট-চলন্ত সিঁড়ি ব্যবহারের প্রবণতা বেশি দেখা যাচ্ছে। মোবাইল ফোন, ইউটিউব, টিকটক, ইন্টারনেট, টেলিভিশন,কম্পিউটার গেম ও ফেসবুকের অপব্যবহার হচ্ছে।এগুলো ব্যবহারে শিশুসহ যে কোনো বয়সের মানুষের অলস জীবনযাপনের প্রবণতা বাড়ছে। তিনি বলেন, সুস্থতার জন্য কায়িক শ্রম ও নিয়মিত ব্যায়ামের বিকল্প নেই।

Top