সংবিধান সংশোধনের ভাবনা আগামী অধিবেশনেই
মোহাম্মাদ মুরাদ হোসেন:সংবিধান সংশোধনের কাজটি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের চতুর্থ অধিবেশনেই শেষ করার চিন্তাভাবনা করছে এ-সংক্রান্ত গঠিত বিশেষ কমিটি।বৈঠক শেষে সংসদের মিডিয়া সেন্টারে গণমাধ্যমের সঙ্গে তিনি কথা বলেন। এ সময় আগামী ডিসেম্বর মাসের মধ্যে তিনি রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে আলোচনা শেষ করে জাতীয় সংসদে রিপোর্ট উপস্থাপনের আশা প্রকাশ করেন। সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, জুলাই সনদে স্বাক্ষরকারী রাজনৈতিক দলগুলোর অনেকেই কমিটিকে যত দ্রুত সম্ভব আলোচনা শেষ করে সংসদে রিপোর্ট দেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন। তারা বলেছেন, তাহলে জাতি বুঝতে পারবে যে জুলাই জাতীয় সনদ সঠিকভাবে বাস্তবায়ন হয়েছে। কমিটির সভাপতি বলেন, আন্দোলনের সঙ্গে জড়িত সংগঠনের প্রতিনিধি, শহীদ পরিবারের সদস্য, শিক্ষক-সাংবাদিকসহ বিভিন্ন শ্রেণিপেশার মানুষের সঙ্গে কথা বলে তাদের বক্তব্য ধারণ করে জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়নের জন্য কমিটি এগিয়ে যাবে। তিনি বলেন, জুলাই জাতীয় সনদের বাইরে এবং আরও কিছু পরিপূরক প্রস্তাব যদি আসে, যেগুলো জাতীয় জীবনে গুরুত্বপূর্ণ, সে সমস্ত বিষয়গুলো আমরা পরামর্শ আকারে নেব এবং তারপর আমাদের রিপোর্টটা মহান জাতীয় সংসদে উপস্থাপন করব।কমিটির সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ডিসেম্বরে সংসদের চতুর্থ অধিবেশন বসবে, ওই অধিবেশনেই তারা তাদের প্রতিবেদন উপস্থাপনের সর্বোচ্চ চেষ্টা করবে।এর আগে রোববার দুপুর আড়াইটায় জাতীয় সংসদের কেবিনেট কক্ষে ‘সংবিধান সংশোধন-সম্পর্কিত বিশেষ কমিটি’র দ্বিতীয় বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। কমিটির সভাপতি ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ এতে সভাপতিত্ব করেন।
জুলাই জাতীয় সনদে স্বাক্ষরকারী রাজনৈতিক দলগুলোর বিভিন্ন বিষয়ে নোট অব ডিসেন্ট থাকলেও ঐকমত্যে পৌঁছানো বিষয়গুলো বাস্তবায়নের অঙ্গীকার করা হয়েছে বলে জানান সালাহউদ্দিন আহমদ। তিনি বলেন, আমরা প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলাম, এই জুলাই জাতীয় সনদ যেভাবে স্বাক্ষরিত হয়েছে, আমরা ঠিক সেভাবেই বাস্তবায়ন করব।সনদের বিভিন্ন অংশ তুলে ধরে তিনি বলেন, বিদ্যমান শাসনব্যবস্থা তথা সংবিধান, নির্বাচনব্যবস্থা, বিচারব্যবস্থা, জনপ্রশাসন, পুলিশিব্যবস্থা ও দুর্নীতি দমন বিষয়ে কাঠামোগত, আইনি ও প্রাতিষ্ঠানিক পরিবর্তনের ব্যাপারে রাজনৈতিক দলগুলো ঐকমত্যে পৌঁছেছে। সনদে সংবিধান সংশোধনের মাধ্যমে বাস্তবায়নযোগ্য বিষয়গুলোর তালিকা রয়েছে। এর বাইরে বিভিন্ন আইন, অধ্যাদেশ, বিধি ও নির্বাহী আদেশের মাধ্যমে বাস্তবায়নযোগ্য বিষয়ও উল্লেখ রয়েছে। এসবের অধিকাংশ ইতোমধ্যে বাস্তবায়ন হয়েছে এবং কিছু বিষয় আইন প্রণয়নের মাধ্যমে বাস্তবায়ন করা বাকি রয়েছে।
জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়ন না করার জন্য বিএনপিকে দায়ী করে রাজনৈতিক প্রচারণা চালানো হচ্ছে বলে মন্তব্য করে সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, কিছু কিছু রাজনৈতিক দল মাঠের রাজনীতিতে প্রচারণা, বিভ্রান্তি সৃষ্টি করার চেষ্টা করছে; যে বিএনপি সংখ্যাধিক্যের কারণে জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়ন করতে চায় না। তিনি বলেন, আমরা জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়ন করব। যেভাবে স্বাক্ষরিত হয়েছে, সেভাবেই যত দ্রুত সম্ভব সংবিধান সংশোধন করে এটা নিয়ে আসার চেষ্টা করব। বিরোধী দল বিশেষ কমিটিতে অংশ না নেওয়ায় পুরো প্রক্রিয়া একপাক্ষিক হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা আছে কিনা; এমন প্রশ্নের জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, না, একপক্ষ হচ্ছে না। যারা জুলাই জাতীয় সনদে স্বাক্ষর করেননি, তারা আলোচনায় অংশ নিতে চাইলে তাদের জন্যও সুযোগ উন্মুক্ত থাকবে। নিবন্ধিত ও অনিবন্ধিত রাজনৈতিক দলগুলোর কেউ আলোচনায় অংশ নিতে চাইলে তাদের বক্তব্যও নেওয়া হবে। আজকে আমরা আহ্বান জানিয়েছি, যদি কারও কোনো রকমের বক্তব্য থাকে, লিখিতভাবে যদি কমিটির কাছে প্রদান করেন, সেটা আমরা বিবেচনা করব।
কমিটি সূত্রে জানা গেছে, বিএনপিসহ ১৫টি রাজনৈতিক দলের প্রতিনিধিরা কমিটির বৈঠকে অংশ নেন। বিএনপির প্রতিনিধিত্ব করেন ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী ও স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খান। এছাড়া বাংলাদেশের বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টি, গণফোরাম, গণসংহতি আন্দোলন, গণঅধিকার পরিষদ, নাগরিক ঐক্য, ভাসানী জনশক্তি পার্টি, জাতীয়তাবাদী গণতান্ত্রিক আন্দোলন (এনডিএম), আমজনতার দল, ইসলামী ঐক্যজোট, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ, জাতীয়তাবাদী সমমনা জোট ও জাতীয় গণতান্ত্রিক পার্টি-জাগপা, জাকের পার্টি এবং জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম বাংলাদেশের প্রতিনিধিরা বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন। তবে রাষ্ট্র সংস্কার আন্দোলনের দুজন প্রতিনিধি বৈঠকে যোগ দিয়েও মাঝপথে বেরিয়ে যান। জুলাই সনদে স্বাক্ষরকারী ২৬টি রাজনৈতিক দল ও জোটের প্রতিনিধিকে আমন্ত্রণ জানানো হয় এই বৈঠকে। তবে বিরোধী দল জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় ঐক্যের শরিকরা সংবিধান সংশোধনের এই প্রক্রিয়ায় অংশ হবে না বলে জানিয়ে দিয়েছে। এদিকে, মতবিনিময় সভার মাঝপথে বর্জন করা সম্পর্কে রাষ্ট্র সংস্কার আন্দোলনের সভাপতি হাসনাত কাইয়ুম গণমাধ্যম কর্মীদের বলেন, জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশ অনুযায়ী সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠন না করার প্রতিবাদ জানিয়ে তারা বের হয়ে এসেছেন। ৪ আগস্ট বিশেষ কমিটির প্রথম বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। ওই বৈঠকে রাজনৈতিক দল, সংবিধান বিশেষজ্ঞ, আইনজীবী ও গণমাধ্যমের সম্পাদকসহ অংশীজনদের সঙ্গে আলোচনা করার সিদ্ধান্ত হয়। এরই ধারাবাহিকতায় রোববারের মতবিনিময় সভায় দল ও জোটের প্রতিনিধিদের সংবিধান সংশোধন বিষয়ে মতামত উপস্থাপন করতে অনুরোধ করা হয়।