‘হাসিনা কার্ড’ খেলবেন আবার বন্ধুত্ব চাইবেন
নুর নবী জনী :আপনারা হাসিনা কার্ড খেলবেন আর বাংলাদেশের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক চাইবেন,মনে রাখতে হবে, দুটো বিপরীত।আশা করি,ভারতের কর্তৃপক্ষ ও ভারত সরকার বিষয়টি বুঝবে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমদ বলেছেন, ভারত যদি গণ-অভ্যুত্থানের মুখে পালিয়ে যাওয়া সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে সেখানে বসে রাজনৈতিক তৎপরতা চালানোর সুযোগ দেয়, তাহলে বাংলাদেশের সঙ্গে দেশটির বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক নিয়ে ভারতকে নতুন করে ভাবতে হবে।জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের দুই বছর পূর্তি উপলক্ষ্যে শনিবার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নবাব নওয়াব আলী চৌধুরী সিনেট ভবনে আয়োজিত এক আলোচনা সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এ কথা বলেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সাদা দল ও ইউনিভার্সিটি টিচার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ-ইউট্যাব যৌথ উদ্যোগে ‘ফ্যাসিস্ট সরকার পতনে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের ভূমিকা’ শীর্ষক আলোচনা সভার আয়োজন করে।
সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, পত্রিকায় দেখলাম ভারতের মুখপাত্র বলছেন, বাংলাদেশের নতুন সরকারের বিরুদ্ধে শেখ হাসিনা যা বলেছেন, তা ভারত সমর্থন করে না। তো ভারত কি তাকে বারবার মিটিং করতে দেওয়াটা সমর্থন করে? এভাবে কূটনৈতিক সম্পর্ক থাকে না। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ভারত বাংলাদেশের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক চায়, আমরাও চাই। আমাদের দুই দেশের মধ্যে পারস্পরিক নির্ভরশীলতা আছে। আমরা আপনাদের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখতে চাই। তবে আমরা কখনো আওয়ামী লীগ হতে পারব না। বাংলাদেশের স্বার্থকে সমুন্নত রেখে, পারস্পরিক মর্যাদা ও সম্মানের ভিত্তিতে আমরা সম্পর্ক রাখতে চাই।
তিনি বলেন, এখন বলা হচ্ছে-তারেক রহমান লন্ডনে বসে এবং সালাহউদ্দিন সাহেব ভারতে বসে যদি রাজনীতি করতে পারে, হাসিনার দোষ কী? হ্যাঁ, হাসিনার দোষ আছে। আমরা কেউ ফ্যাসিবাদী ছিলাম না। গণতন্ত্রের জন্য সংগ্রাম করতে গিয়ে আমাদের জোরপূর্বক নির্বাসিত করা হয়েছে। এটা হচ্ছে হাসিনার সঙ্গে আমাদের ব্যবধান। শেখ হাসিনা ভারতে বসে বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক সংস্কৃতির বিরুদ্ধে, গণতন্ত্রের বিরুদ্ধে এবং এ দেশের মানুষের বিরুদ্ধে অস্থিরতা সৃষ্টির জন্য যে বয়ান দিয়ে যাচ্ছেন, সেটি আমাদের অভিযোগ। এই দায় ভারত এড়াতে পারে না।
তিনি বলেন, আমরা বলেছি, আওয়ামী লীগ এবং শেখ হাসিনার রাজনৈতিকভাবে দাফন হয়েছে। দিল্লিতে বসে যদি তিনি রাজনৈতিক তৎপরতা চালান, তাহলে সেটি বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক সংস্কৃতির বিরুদ্ধে। শেখ হাসিনা এবং তার কুশীলবদের বিচার চলমান। কিছু বিচার সমাপ্ত হয়েছে, আরও অনেকগুলো বিচার চলমান। কিন্তু শেখ হাসিনার কোনো অনুশোচনা নেই। তিনি বাংলাদেশের মানুষের সামনে দুঃখ প্রকাশ করেননি। বরং যারা গণতান্ত্রিক আন্দোলন করেছে, গণ-অভ্যুত্থান করেছে, তাদের ‘জঙ্গিবাদী’ তৎপরতার মধ্য দিয়ে ক্ষমতা থেকে তাকে অপসারণ করা হয়েছে-এমন বক্তব্য দিচ্ছেন।
তিনি বলেন, জাতিসংঘের রিপোর্ট অনুযায়ী ১ হাজার ৪০০-এর বেশি মানুষকে হত্যা করা হয়েছে। সেখানে নারী ও শিশুও ছিল। আকাশ থেকে, হেলিকপ্টার থেকে গুলি করে এ দেশের জনগণকে হত্যা করা হয়েছে। এরপরও কি তাকে গণতান্ত্রিক সংস্কৃতির কোনো নেতা হিসাবে ভারত স্বীকৃতি দিতে পারে? এটাই আমাদের প্রশ্ন।
সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, শেখ হাসিনা দিল্লিতে বসে তৎপরতা চালাচ্ছেন। তার বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগ রয়েছে, আইসিটি কোর্ট তাকে দণ্ডিত করেছে, তার বিরুদ্ধে ফাঁসির রায় আছে এবং আরও মামলা চলমান আছে। এরপরও তিনি ভারতে বসে বিশ্বমিডিয়ার সঙ্গে কথা বলার সুযোগ পাচ্ছেন। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে আমরা প্রতিবাদ করেছি। আমরা নিজেরাও প্রতিবাদ করছি। একজন ফ্যাসিস্ট, গণহত্যাকারী, দণ্ডিত অপরাধী যিনি গণতন্ত্রের বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধ করেছেন-তাকে ভারতে বসে বারবার বিশ্বমিডিয়ার সঙ্গে কথা বলার সুযোগ দেওয়া হবে, এটা আমরা সমর্থন করি না।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশে আমরা চেতনা বিক্রির রাজনীতি বহুবার দেখেছি। ১৯৭১-এর চেতনা বিক্রির রাজনীতি বাংলাদেশে মারাত্মকভাবে ফেল করেছে। আমরা ভবিষ্যতে চেতনা বিক্রির রাজনীতি করতে চাই না। যারা জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের কৃতিত্বকে বিচ্ছিন্ন করতে চায় এবং তার ওপর ভিত্তি করে রাজনৈতিক দল গঠন বা রাজনীতি করতে চায়, তাদের কাছে আমার বক্তব্য-বাংলাদেশে আর চেতনা বিক্রির রাজনীতি চলবে না।
বিশেষ অতিথির বক্তব্যে বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব ও প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা রুহুল কবির রিজভী বলেন, শেখ হাসিনার শাসনামল ছিল ফ্যাসিবাদী দুঃশাসনের সময়। জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে সেই শাসনের পরিণতি ঘটেছে। এখন কেউ যদি শেখ হাসিনার আমল ভালো ছিল, এমন কথা বলার চেষ্টা করেন, তা জুলাইয়ের আত্মদান ও গণ-আন্দোলনের ইতিহাসের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। শেখ হাসিনার শাসনামলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও বুদ্ধিজীবীদের একটি অংশ সরকারের পক্ষে অবস্থান নিয়েছিলেন বলেও মন্তব্য করেন রিজভী। তিনি আরও বলেন, শেখ হাসিনার আমলে বিরোধী মতের শিক্ষক ও বুদ্ধিজীবীদের বিভিন্নভাবে হয়রানি ও চাকরিচ্যুত করা হয়েছে। আন্দোলনের সময় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাদা দলের শিক্ষকসহ বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের ভূমিকার কথাও তুলে ধরেন তিনি।আলোচনা সভায় সভাপতিত্ব করেন ঢাবি সাদা দলের আহ্বায়ক ও ইউট্যাবের মহাসচিব অধ্যাপক ড. মোর্শেদ হাসান খান। অনুষ্ঠান উদ্যাপন কমিটির সদস্য সচিব অধ্যাপক ড. মহিউদ্দিনের সঞ্চালনায় বিশেষ অতিথির বক্তব্য দেন বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ও ইউট্যাবের প্রেসিডেন্ট অধ্যাপক ড. এবিএম ওবায়দুল ইসলাম। স্বাগত বক্তব্য দেন অনুষ্ঠান উদ্যাপন কমিটির আহ্বায়ক অধ্যাপক ড. নূরুল ইসলাম, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রোভিসি (শিক্ষা) অধ্যাপক ড. আবদুস সালাম, ইউট্যাবের যুগ্ম মহাসচিব ও জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রোভিসি অধ্যাপক লুৎফর রহমান, ইউট্যাবের সদস্য ও প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের এসডিজিবিষয়ক মুখ্য সমন্বয়ক অধ্যাপক ড. এসএম সোহাগ আওয়াল প্রমুখ।
অনুষ্ঠানে চব্বিশের জুলাই অভ্যুত্থানে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকদের ভূমিকা ও শহীদদের স্মরণে একটি ডকুমেন্টারি প্রদর্শন করা হয়। অনুষ্ঠানে আরও বক্তব্য রাখেন জুলাই অভ্যুত্থানের শহীদ আবু সাঈদের ভাই মো. আবু হোসেন, শহীদ ওয়াসিম আকরামের বাবা শফিউল আলম, মীর মাহফুজুর রহমান মুগ্ধর ভাই মীর মাহবুবুর রহমান স্নিগ্ধ ও ইকরামুল হক সাজিদের মা নাজমা খাতুন লিপি। অনুষ্ঠানে তাদের বিশেষ সম্মাননা দেওয়া হয়।