যে কারণে ঝরে যাচ্ছে হাজারো ক্ষুদ্র উদ্যোগ - Alokitobarta
আজ : মঙ্গলবার, ২৮শে জুলাই, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ১৩ই শ্রাবণ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

যে কারণে ঝরে যাচ্ছে হাজারো ক্ষুদ্র উদ্যোগ


বিশেষ প্রতিনিধি:স্থানীয় উৎপাদন,নতুন উদ্যোক্তা তৈরি,দারিদ্র্য বিমোচন থেকে শুরু করে রপ্তানি বহুমুখীকরণ সব ক্ষেত্রেই এই খাতের অবদান গুরুত্বপূর্ণ।বাংলাদেশের অর্থনীতির সবচেয়ে বড় কর্মসংস্থান সৃষ্টিকারী খাত ক্ষুদ্র,ছোট ও মাঝারি শিল্প(এসএমই)।অথচ দেশের লাখো ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা এখন টিকে থাকার লড়াইয়ে হিমশিম খাচ্ছেন।ব্যবসা শুরু করার কয়েক বছরের মধ্যেই অনেকে মূলধন হারিয়ে প্রতিষ্ঠান বন্ধ করতে বাধ্য হচ্ছেন।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন,সাম্প্রতিক অর্থনৈতিক মন্দা পরিস্থিতির সঙ্গে দীর্ঘদিনের কাঠামোগত দুর্বলতা মিলে এসএমই খাতকে চাপে ফেলেছে। উচ্চ মূল্যস্ফীতি,ঋণের সুদ বৃদ্ধি,টাকার অবমূল্যায়ন,আমদানিনির্ভর কাঁচামালের দাম বৃদ্ধি,কর ও প্রশাসনিক জটিলতা,বাজারে বড় প্রতিষ্ঠানের আধিপত্য এবং প্রযুক্তিগত সক্ষমতার ঘাটতি—সব মিলিয়ে ছোট উদ্যোক্তাদের জন্য ব্যবসা টিকিয়ে রাখা দিন দিন কঠিন হয়ে উঠছে।

এসএমই ফাউন্ডেশনের তথ্য অনুযায়ী,দেশের জিডিপিতে এ খাতের অবদান প্রায় ৩০ শতাংশ এবং মোট শ্রমশক্তির প্রায় ৮৫ শতাংশের কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়েছে এই খাতেই।যদিও প্রতিবেশী ও প্রতিযোগী দেশগুলোর তুলনায় বাংলাদেশের এসএমই খাতের অবদান এখনও অনেক কম।চীনের জিডিপিতে এসএমইর অবদান প্রায় ৬০ শতাংশ,শ্রীলঙ্কায় ৫২ শতাংশ,জাপানে ৫০ শতাংশ,ভিয়েতনামে ৪৫ শতাংশ,পাকিস্তানে ৪০ শতাংশ এবং ভারতে ৩৭ শতাংশ।

ঋণই সবচেয়ে বড় সংকট
উদ্যোক্তাদের অভিযোগ,ব্যবসা শুরু বা সম্প্রসারণের জন্য প্রয়োজনীয় অর্থায়ন পাওয়া সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।ব্যাংকগুলো অতিরিক্ত জামানত,দীর্ঘ কাগজপত্র এবং কঠোর শর্ত আরোপ করায় নতুন উদ্যোক্তারা সহজে ঋণ পান না।ফলে অনেকেই উচ্চ সুদে অনানুষ্ঠানিক উৎস থেকে টাকা ধার করতে বাধ্য হন।বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ ও বেসরকারি গবেষণাপ্রতিষ্ঠান পলিসি এক্সচেঞ্জ বাংলাদেশের চেয়ারম্যান এম মাসরুর রিয়াজ বলেন,ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের ঝরে পড়ার পেছনে সাম্প্রতিক অর্থনৈতিক সংকট এবং দীর্ঘদিনের কাঠামোগত এ দুই ধরনের সমস্যা কাজ করে। এছাড়া ২০২২-২৩ সাল থেকে চলমান উচ্চ মূল্যস্ফীতিতে মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমে গেছে। এতে বাজারে চাহিদা কমেছে এবং এর সবচেয়ে বড় আঘাত লেগেছে ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের ওপর। বড় প্রতিষ্ঠান কিছুদিন লোকসান সামাল দিতে পারলেও ছোট উদ্যোক্তারা তা পারেন না।তিনি বলেন, টাকার অবমূল্যায়নের কারণে আমদানিনির্ভর কাঁচামালের দাম বেড়েছে। পাশাপাশি উচ্চ সুদের কারণে অর্থায়নের ব্যয়ও বেড়েছে। ফলে ক্ষুদ্র উদ্যোক্তারা দ্বিমুখী চাপে পড়েছেন।

মাশরুর রিয়াজ বলেন, ট্রেড লাইসেন্স, নিবন্ধন, আমদানি-রপ্তানি, কাস্টমস ও কর-সংক্রান্ত জটিলতা ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের জন্য বড় বাধা। আবার ব্যাংকগুলো ক্ষুদ্র ব্যবসাকে ঝুঁকিপূর্ণ মনে করায় তারা সহজে অর্থায়নও পায় না। এজন্য মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে এনে বাজারের চাহিদা ফিরিয়ে আনতে হবে।একই সঙ্গে ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাকে আলাদা করে নীতি প্রণয়ন, সহজ নিবন্ধন, কর-অনুবর্তিতা, হয়রানিমুক্ত সেবা এবং বিশেষায়িত অর্থায়নের ব্যবস্থা করতে হবে।

কর ও প্রশাসনিক জটিলতায় বাড়ছে ব্যয়
ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের অভিযোগ, বড় প্রতিষ্ঠানের মতো একই ধরনের কর ও প্রশাসনিক নিয়ম ছোট ব্যবসার ওপরও প্রয়োগ করা হয়। ট্রেড লাইসেন্স, ভ্যাট নিবন্ধন, আয়কর রিটার্ন, কাস্টমস, আমদানি-‌রপ্তানির অনুমতি সব ক্ষেত্রেই দীর্ঘ প্রক্রিয়া ও হয়রানির অভিযোগ রয়েছে।

ভাইপার লেদার,ভাইপার এন্টারপ্রাইজ ও ওমরা জুয়েলার্সের মালিক এস এম মোস্তাফিজুর রহমান বলেন,নতুন উদ্যোক্তাদেরই শুরুতে অর্থের সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন হয়। ব্যবসা শুরু করতে বাধ্যতামূলক অফিস দেখিয়ে ট্রেড লাইসেন্স নিতে হয়। অথচ অনেক উদ্যোক্তা ছোট পরিসরে বা বাসা থেকেই ব্যবসা শুরু করেন। তিনি নতুন উদ্যোক্তাদের জন্য এক বা দুই বছরের অস্থায়ী ট্রেড লাইসেন্স চালুর প্রস্তাব দেন।তিনি বলেন, অনেক উদ্যোক্তা পর্যাপ্ত বাস্তব অভিজ্ঞতা ও দিকনির্দেশনার অভাবে ঝরে পড়েন। প্রশিক্ষণ থাকলেও বাস্তব ব্যবসার অভিজ্ঞতা অর্জনের সুযোগ খুবই সীমিত।গুটিপা’র প্রতিষ্ঠাতা তাসলিমা মিজি বলেন, ব্যবসার উৎপাদন, কাঁচামাল সংগ্রহ, বিপণন, বিতরণ প্রতিটি ধাপেই উদ্যোক্তাদের নানামুখী বাধার মুখে পড়তে হয়। অনেকেই এসব প্রতিবন্ধকতা সামলাতে না পেরে ব্যবসা ছেড়ে দেন। যেমন এক ট্রেড লাইসেন্স নবায়নে এখন ১৮ থেকে ২০ হাজার টাকা পর্যন্ত ব্যয় হয়। দ্রুত সেবা পেতে অনেক ক্ষেত্রে ঘুষও দিতে হয়।

এনবিআরের পুরোনো ফাইল দেখিয়ে হয়রানির অভিযোগও করেন তিনি।
তাসলিমা মিজি বলেন, দেশীয় উদ্যোক্তাদের জন্য এখনো কার্যকর উদ্যোক্তাবান্ধব পরিবেশ তৈরি হয়নি। স্থানীয় পণ্যের বাজার সম্প্রসারণে প্রণোদনা, ট্রেড ব্যারিয়ার এবং নীতিগত সহায়তা প্রয়োজন। একই বাজারে প্রকৃত উদ্যোক্তাদের এমন প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করতে হয়, যাদের ব্যবসার উদ্দেশ্যই ভিন্ন। এতে সমান প্রতিযোগিতার পরিবেশ নষ্ট হচ্ছে। এছাড়া একজন উদ্যোক্তা নিজের কর্মসংস্থানের পাশাপাশি অন্যদেরও কর্মসংস্থান তৈরি করেন। তাই রাষ্ট্রের উচিত উদ্যোক্তাদের বোঝা হিসেবে না দেখে অর্থনীতির চালিকাশক্তি হিসেবে মূল্যায়ন করা এবং প্রয়োজনীয় সহায়তা দেওয়া। উদ্যোক্তাবান্ধব পরিবেশ তৈরিকে সরকারি নীতির অগ্রাধিকার দিতে হবে।

বাজারে বড় প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে অসম প্রতিযোগিতা
দেশীয় বাজারে বড় কোম্পানির সঙ্গে প্রতিযোগিতায় টিকতে পারছেন না অনেক ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা। কাঁচামালের উচ্চ মূল্য, উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি, বিপণনে সীমাবদ্ধতা এবং সরকারি-বেসরকারি বড় ক্রয়াদেশে অংশগ্রহণের সুযোগ কম থাকায় তারা উৎপাদন বাড়িয়েও বাজার পাচ্ছেন না।

ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (ডিসিসিআই) সভাপতি তাসকীন আহমেদ বলেন, জ্বালানি সংকট, সরবরাহ ব্যবস্থার বিঘ্ন, অর্ডার কমে যাওয়া এবং বিদ্যুৎ-গ্যাসের অনিয়মিত সরবরাহে এসএমই খাত বড় চাপে রয়েছে। বড় শিল্প প্রতিষ্ঠানের অর্ডার কমে যাওয়ায় সাব-কন্ট্রাক্টিংও কমেছে, যার সরাসরি প্রভাব পড়ছে ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের ওপর।

তিনি বলেন, সরকারের উচিত এ খাতের জন্য সহজ শর্তে ঋণ প্রদান, ঋণ পরিশোধের সময় বাড়ানো ও প্রণোদনা তহবিলে সহজ প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করা। একই সঙ্গে প্রযুক্তিগত উন্নয়ন, উৎপাদন, বাজারজাতকরণে আধুনিক ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পারে। এছাড়া কাঁচামালের উৎস বহুমুখীকরণ, কৌশলগত মজুত গড়ে তোলা এবং নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করা জরুরি।

প্রযুক্তিতে পিছিয়ে ছোট শিল্প
চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের যুগে ডিজিটাল প্রযুক্তি, স্বয়ংক্রিয় উৎপাদন ব্যবস্থা এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) দ্রুত ব্যবসার অংশ হয়ে উঠলেও দেশের অধিকাংশ ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা এখনও এসব প্রযুক্তির বাইরে।

হাতবাক্সের প্রধান নির্বাহী মোহাম্মদ শাফাত কবির বলেন, নতুন উদ্যোক্তাদের সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো সঠিক দিকনির্দেশনার অভাব। ব্যবসা শুরু করতে কী কী আইনি কাগজপত্র লাগবে, কীভাবে নিবন্ধন করতে হবে এসব বিষয়ে নতুনদের পরিষ্কার ধারণা থাকে না।একটি ওয়ান-স্টপ সার্ভিস চালু করা গেলে, যেখানে ট্রেড লাইসেন্স, ব্যাংক হিসাব, নিবন্ধনসহ সব প্রক্রিয়া এক জায়গা থেকে সম্পন্ন করা যাবে, তাহলে উদ্যোক্তাদের ভোগান্তি অনেক কমবে।তিনি বলেন,নতুন উদ্যোক্তাদের জন্য ডিজিটাল মার্কেটিং, আর্থিক ব্যবস্থাপনা, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) এবং ব্যবসা পরিচালনার দক্ষতা নিয়ে বিশেষ প্রশিক্ষণ চালু করা দরকার। ব্যাংক ঋণ পেতে এসএমই উদ্যোক্তাদের অতিরিক্ত কাগজপত্র জমা দিতে হয়। ঋণ পাওয়ার প্রক্রিয়া সহজ করতে হবে এবং সুদের হার ১৪-১৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে এক অঙ্কে আনা উচিত।

নারী উদ্যোক্তাদের দ্বিগুণ চ্যালেঞ্জ
নারী উদ্যোক্তারা অর্থায়নের পাশাপাশি পারিবারিক সমর্থন ও সম্পদের মালিকানার ক্ষেত্রেও পিছিয়ে রয়েছেন।সোলসের স্বত্বাধিকারী সাইমা সুলতানা স্নিগ্ধা বলেন, পুরুষ উদ্যোক্তারা পরিবার থেকে সহজে অর্থসহায়তা পেলেও নারীরা সে সুযোগ কম পান।তিনি নিজের চাকরির সঞ্চয় দিয়ে ব্যবসা শুরু করেন জানিয়ে বলেন, পরে ব্যবসা প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর ব্যাংক ঋণ পেয়েছি। তার মতে, ভারতের মতো বাংলাদেশেও নারী ও স্টার্টআপ উদ্যোক্তাদের জন্য সহজ শর্তে ঋণের ব্যবস্থা করা প্রয়োজন।

সহায়তা হতে হবে লক্ষ্যভিত্তিক
বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডাইলগের (সিপিডি) সম্মাননীয় ফেলো ড. মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, দেশের অধিকাংশ ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা অনানুষ্ঠানিক খাতে কাজ করেন। বাজার অর্থনীতিতে উদ্যোক্তাদের মধ্যে প্রবেশ যেমন থাকবে, তেমনি ঝরে পড়াও স্বাভাবিক। সবাই উদ্যোক্তা হিসেবে সফল হবেন, এমনটি ধরে নেওয়া ঠিক নয়। তাই সরকারি সহায়তা দিতে হবে সম্ভাবনাময় ও টেকসই উদ্যোক্তাদের চিহ্নিত করে। অযাচিত ঋণ বিতরণ ব্যাংকিং খাতের ওপর চাপ বাড়াতে পারে।তিনি বলেন,যেসব ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা সত্যিকার অর্থে ব্যবসা বাড়াতে চান,তাদের জন্য সহজ ঋণ,কম শুল্কে কাঁচামাল আমদানির সুযোগ,বাজারজাতকরণ,প্রশিক্ষণ ও প্রাতিষ্ঠানিক সহায়তা নিশ্চিত করা জরুরি।তবে সহায়তা যেন লক্ষ্যভিত্তিক হয়, ঢালাও নয়।

কোটি উদ্যোক্তার বিপরীতে সীমিত সক্ষমতা
অর্থনৈতিক সমীক্ষা ২০২৪-এর প্রাথমিক তথ্য অনুযায়ী, দেশে সিএমএসএমই উদ্যোক্তার সংখ্যা ১ কোটি ১৭ লাখের বেশি এবং কর্মরত জনবল প্রায় ৩ কোটি ৬ লাখ। এর মধ্যে প্রায় ৭০ শতাংশ উদ্যোক্তা ঢাকার বাইরে অবস্থান করলেও এসএমই ফাউন্ডেশনের আঞ্চলিক কার্যালয় না থাকায় অনেকেই প্রয়োজনীয় সরকারি সেবা পান না।

এসএমই ফাউন্ডেশনের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আনোয়ার হোসেন চৌধুরী বলেন,দেশের ও বৈশ্বিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতির কারণে ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তারা (এসএমই) নানা ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হচ্ছেন। এ খাতের সবচেয়ে বড় সমস্যা অর্থায়নে প্রবেশাধিকার। এছাড়া সহজ শর্তে ঋণপ্রাপ্তি, প্রযুক্তি গ্রহণ, বাজারজাতকরণ, নীতিগত সহায়তার ঘাটতি, বড় প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে প্রতিযোগিতাও বড় চ্যালেঞ্জ।তবে প্রশিক্ষণ, প্রযুক্তি, বাজারসংযোগ ও দক্ষতা উন্নয়নে ফাউন্ডেশন কাজ করছে। এসএমই ফাউন্ডেশনের ইনকিউবেশন সেন্টারের মাধ্যমে তরুণ ও নতুন উদ্যোক্তাদের প্রশিক্ষণ, নীতিগত সহায়তা, প্রয়োজনীয় সার্টিফিকেশন ও লাইসেন্স পেতে সহযোগিতা এবং বিভিন্ন স্টেকহোল্ডারের সঙ্গে নেটওয়ার্কিংয়ের সুযোগ দেওয়া হয়। এসব সহায়তার মাধ্যমে তারা ব্যবসার প্রাথমিক বাধা অতিক্রম করে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার সুযোগ পান।

তিনি বলেন,সম্প্রতি সরকার এসএমই ফাউন্ডেশনকে জাতীয় এসএমই নিবন্ধনের দায়িত্ব দিয়েছে। নিবন্ধন প্রক্রিয়া সম্পন্ন হলে উদ্যোক্তাদের সরকারি প্রণোদনা ও বিভিন্ন সহায়তা দ্রুত ও সহজভাবে পৌঁছে দেওয়া সম্ভব হবে। এর ফলে তারা বিদ্যমান চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করে আরও এগিয়ে যেতে পারবেন।এসএমই ফাউন্ডেশনের ব্যবস্থাপনা পরিচালক বলেন,উদ্যোক্তাদের সুনির্দিষ্ট সংখ্যা বা কতজন ব্যবসা থেকে ঝরে পড়ছেন এ বিষয়ে বর্তমানে কোনো সমন্বিত তথ্যভান্ডার নেই। তবে নতুন অর্থবছর থেকে শুরু হওয়া জাতীয় এসএমই নিবন্ধন কর্মসূচির মাধ্যমে ভবিষ্যতে উদ্যোক্তাদের নির্ভুল পরিসংখ্যান পাওয়া যাবে। একই সঙ্গে তাদের ব্যবসার অগ্রগতি, টিকে থাকা বা ঝরে পড়ার হারও বিশ্লেষণ করা সম্ভব হবে।ফাউন্ডেশনের তথ্য অনুযায়ী, ২০০৬ সালে প্রতিষ্ঠার পর প্রায় ২২ লাখ উদ্যোক্তাকে বিভিন্নভাবে সহায়তা দেওয়া হয়েছে। প্রায় ১৩ হাজার উদ্যোক্তার মধ্যে ১ হাজার ৫০০ কোটির বেশি ঋণ বিতরণ করা হয়েছে, যার প্রায় এক-চতুর্থাংশ নারী উদ্যোক্তা। এছাড়া দেশে ১৭৭টি এসএমই ক্লাস্টার চিহ্নিত করে দক্ষতা উন্নয়ন, প্রযুক্তি হস্তান্তর, অনলাইন বিপণন এবং কমন ফ্যাসিলিটি সেন্টার গড়ে তোলার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

নীতিগত পরিবর্তনের তাগিদ
বিশেষজ্ঞদের অভিমত, শুধু ঋণ দিয়ে এসএমই খাতকে টেকসই করা সম্ভব নয়। মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, সুদের হার কমানো, সহজ নিবন্ধন ও করব্যবস্থা, প্রশাসনিক হয়রানি কমানো, প্রযুক্তি ও দক্ষতা উন্নয়ন, সরকারি ক্রয়ে অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা এবং রপ্তানিমুখী উদ্যোক্তা তৈরির জন্য সমন্বিত নীতি প্রয়োজন।

২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে প্রথমবারের মতো ইডকল ও বিআইএফএফএলের মাধ্যমে ২ হাজার কোটি টাকার অর্থায়নের উদ্যোগকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছে এসএমই ফাউন্ডেশন। তবে তাদের মতে, দেশের কোটি উদ্যোক্তার কাছে কার্যকর সেবা পৌঁছে দিতে নিয়মিত বাজেট বরাদ্দ বৃদ্ধি, প্রতিষ্ঠানটির সক্ষমতা সম্প্রসারণ এবং উদ্যোক্তাবান্ধব নীতিগত সংস্কার এখন সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি।অর্থনীতিবিদদের মতে, এসএমই খাত শক্তিশালী না হলে কর্মসংস্থান বৃদ্ধি, স্থানীয় শিল্পের বিকাশ, আমদানি নির্ভরতা হ্রাস এবং টেকসই অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য অর্জন কঠিন হবে। তাই সম্ভাবনাময় এই খাতকে টিকিয়ে রাখতে এখন প্রয়োজন কেবল অর্থায়ন নয়, বরং একটি সহজ, স্বচ্ছ ও উদ্যোক্তাবান্ধব ব্যবসায়িক পরিবেশ।

Top