দেশের সার্বিক ঋণপ্রবাহ ভয়ানকভাবে কমে গেছে - Alokitobarta
আজ : বৃহস্পতিবার, ১৮ই জুন, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ৪ঠা আষাঢ়, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

দেশের সার্বিক ঋণপ্রবাহ ভয়ানকভাবে কমে গেছে


মোহাম্মাদ আবুবকর সিদ্দীক ভুঁইয়া: দেশের সার্বিক ঋণপ্রবাহ ভয়ানকভাবে কমে গেছে। বেসরকারি খাতে কমে তা সর্বনিুে অবস্থান করছে।শুধু বরিশাল বিভাগে পল্লী এলাকায় ঋণপ্রবাহ অপরিবর্তিত রয়েছে। অন্য সব বিভাগেই পল্লী এলাকায় ঋণপ্রবাহ ঋণাত্মক পর্যায়ে চলে গেছে। ব্যাংক খাতের সার্বিক ঋণ ও আমানতের তথ্য-উপাত্ত নিয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রকাশিত প্রতিবেদনে এসব তথ্য বলা হয়েছে। এর ফলে বিশেষ করে উৎপাদন ও সেবা খাতে এর নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে। অক্টোবর-ডিসেম্বর প্রান্তিকের তুলনায় জানুয়ারি-মার্চ প্রান্তিকে অর্থনীতির মৌলিক সাতটি খাতের মধ্যে ৫টিতে ঋণপ্রবাহ ঋণাত্মক পর্যায়ে নেমে গেছে। শুধু শিল্প ও ভোক্তা খাতে ঋণপ্রবাহ সামান্য বেড়েছে। এছাড়া গ্রামে আমানত প্রবাহ বাড়লেও ঋণপ্রবাহ ঋণাত্মক পর্যায়ে চলে গেছে।

সংশ্লিষ্টরা বলেছেন, আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে লুটপাটের কারণে ব্যাংকগুলোর ঋণ বিতরণের সক্ষমতা ব্যাপকভাবে হ্রাস পেয়েছে। দেশীয় ও বিদ্যমান বৈশ্বিক পরিস্থিতিতে উদ্যোক্তারা বিনিয়োগমুখী হচ্ছে না। ফলে ঋণের চাহিদাও কমে গেছে। এছাড়া গ্যাস, বিদ্যুতের সংকট ও চড়া দাম। জ্বালানির মূল্য বৃদ্ধি, ঋণের সুদের হার বৃদ্ধি। এসব কারণে ঋণ প্রবাহে নিুমুখিতা অব্যাহত রয়েছে।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কর্মকর্তা জানান, কোনো প্রান্তিকে ঋণপ্রবাহ কমছে, কোনো প্রান্তিকে বেড়েছে। গড় হিসাবে এখনো ঋণপ্রবাহ ইতিবাচক ধারায় রয়েছে। তবে প্রবৃদ্ধির হার একেবারেই কম। বিদ্যমান পরিস্থিতিতে ঋণপ্রবাহ বাড়াতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের খুব বেশি কিছু করার নেই। তারপরও কম সুদে ঋণের জোগান দিতে বিভিন্ন তহবিল গঠন করা হচ্ছে। এখন সরকার থেকে সেবা ও অবকাঠামোগত উন্নয়ন ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি করতে হবে।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, অক্টোবর-ডিসেম্বর প্রান্তিকে দেশের মোট ঋণপ্রবাহ বেড়েছিল ২ দশমিক ০৪ শতাংশ। জানুয়ারি-মার্চ প্রান্তিকে বেড়েছে মাত্র দশমিক ৩৭ শতাংশ। আগের প্রান্তিকের তুলনায় গত প্রান্তিকে ঋণ প্রবাহে প্রবৃদ্ধির হার কমেছে ১ দশমিক ৬৭ শতাংশ।

অক্টোবর-ডিসেম্বর প্রান্তিকে সরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ বেড়েছিল ২০ দশমিক ৩৮ শতাংশ। জানুয়ারি-মার্চ প্রান্তিকে তা আরও কমেছে ৮ দশমিক ৩৫ শতাংশ। উন্নয়ন কর্মকাণ্ড ও জনগণের জন্য সরকারের বিনিয়োগ কমায় এ খাতে ঋণপ্রবাহও কমেছে। এছাড়া সরকারকে চাহিদামতো ঋণের জোগান দেওয়ার সক্ষমতাও ব্যাংকগুলোর নেই। একই সময়ের ব্যবধানে বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ ১ দশমিক ৫০ শতাংশ থেকে কমে দশমিক ৬৮ শতাংশে নেমেছে। দেশের মোট ঋণের প্রায় ৭৬ শতাংশই নিচ্ছে বেসরকারি খাত। বাকি ২৪ শতাংশ নিচ্ছে সরকারি খাত। বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ কমায় সার্বিকভাবে অভ্যন্তরীণ ঋণপ্রবাহেও নেতিবাচক পরিস্থিতি দেখা দিয়েছে।

প্রতিবেদন থেকে দেখা যায়, অর্থনীতির মৌলিক ৭টি খাতের মধ্যে জানুয়ারি-মার্চ প্রান্তিকে ৫টি খাতেই ঋণপ্রবাহ বাড়েনি। বরং ঋণাত্মক পর্যায়ে চলে গেছে। বাকি দুটি খাতে সামান্য বেড়েছে। তবে মোট ঋণের বড় অংশই যাচ্ছে শিল্প খাতে। এ খাতে ঋণের জোগান বেড়েছে। তবে এ প্রবৃদ্ধির নেপথ্যে রয়েছে ঋণের বিপরীতে আরোপিত সুদ যোগ করে মূল ঋণের পরিমাণ বেড়েছে। নতুন ঋণ ছাড় হয়েছে খুবই কম।

অক্টোবর-ডিসেম্বর প্রান্তিকে কৃষি, মৎস্য ও বনায়ন খাতে ঋণপ্রবাহ বেড়েছিল ৩ দশমিক ৮৮ শতাংশ। জানুয়ারি-মার্চ প্রান্তিকে তা ঋণাত্মক হয়েছে ২ দশমিক ৩৭ শতাংশ। নির্মাণ খাতে গত অক্টোবর-ডিসেম্বর প্রান্তিকে ঋণপ্রবাহ ঋণাত্মক ছিল ২ দশমিক ১৫ শতাংশ। জানুয়ারি-মার্চ প্রান্তিকেও এ খাতে ঋণপ্রবাহ ঋণাত্মক হয়েছে ১ দশমিক ৩০ শতাংশ। পরিবহণ খাতে অক্টোবর-ডিসেম্বর প্রান্তিকে ঋণপ্রবাহ বেড়েছিল ২ দশমিক ৬৫ শতাংশ। জানুয়ারি-মার্চ প্রান্তিকে তা ঋণাত্মক হয়েছে ৭ দশমিক ৬৪ শতাংশ। বাণিজ্যিক অর্থায়নের বড় খাত ট্রেড অ্যান্ড কমার্স খাতে অক্টোবর-ডিসেম্বর প্রান্তিকে ঋণপ্রবাহ বেড়েছিল ৩ দশমিক ৫৬ শতাশ। জানুয়ারি-মার্চ প্রান্তিকে তা ঋণাত্মক হয়েছে ৩ দশমিক ৯২ শতাংশ। অন্যান্য খাতে অক্টোবর-ডিসেম্বর প্রান্তিকে ঋণপ্রবাহ বেড়েছিল ৭ দশমিক ৮০ শতাংশ। জানুয়ারি-মার্চ প্রান্তিকে ঋণাত্মক হয়েছে ৩ দশমিক ৭৩ শতাংশ।

আলোচ্য সময়ে শিল্প ও ভোক্ত ঋণ বেড়েছে। শিল্প খাতে মেয়াদি ঋণ অক্টোবর-ডিসেম্বর প্রান্তিকে বেড়েছিল ৬ দশমিক ১০ শতাংশ। জানুয়ারি-মার্চে বেড়েছে ৬ দশমিক ০৬ শতাংশ। তবে ঋণপ্রবাহের প্রবৃদ্ধির হার সামান্য কমেছে। চলতি মূলধন খাতে ঋণপ্রবাহ অক্টোবর-ডিসেম্বর প্রান্তিকে কমেছিল ৪ দশমিক ১৪ শতাংশ। জানুয়ারি-মার্চে এসে বেড়েছে ১ দশমিক ১৪ শতাংশ। এ খাতেও প্রবৃদ্ধির হার কমেছে। ভোক্তা ঋণ অক্টোবর-ডিসেম্বর প্রান্তিকে বেড়েছিল দশমিক ৯৩ শতাংশ। জানুয়ারি-মার্চ প্রান্তিকে বেড়েছে ৪ দশমিক ৩৫ শতাংশ। এ খাতে প্রবৃদ্ধির হার বেড়েছে। অক্টোবর- ডিসেম্বর প্রান্তিকে সরকারি ব্যাংকগুলোর ঋণ বিতরণ বেড়েছিল ৩ দশমিক ০৪ শতাংশ। জানুয়ারি-মার্চ প্রান্তিকে তা না বেড়ে বরং ঋণাত্মক পর্যায়ে চলে গেছে দশমিক ৫১ শতাংশ। অন্যান্য ব্যাংকগুলোর ঋণ বিতরণ সামান্য বেড়েছে।

প্রতিবেদন থেকে দেখা যায়, গ্রামে ঋণপ্রবাহ কমে গেছে। গত পাঁচ প্রান্তিকের তথ্যে দেখা যায়, শুধু অক্টোবর-ডিসেম্বরে গ্রামে ঋণপ্রবাহ ৩ দশমিক ৬৫ শতাংশ বেড়েছে। বাকি ৪ প্রান্তিকেই ঋণপ্রবাহ কমেছে। এর মধ্যে ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বর এই তিন প্রান্তিকেই ঋণপ্রবাহ কমেছে। জানুয়ারি-মার্চ প্রান্তিকেও ১ দশমিক ৯৪ শতাংশ কমেছে। মূলত গ্রামীণ ছোট শিল্প ও কৃষি খাতে ঋণপ্রবাহ কমায় গ্রামে সার্বিকভাবে ঋণপ্রবাহ কমে গেছে। দেশের ৮টি বিভাগের মধ্যে শুধু বরিশাল বিভাগের পল্লী অঞ্চলে ঋণপ্রবাহ বাড়েওনি কমেওনি। বাকি সব বিভাগে পল্লী অঞ্চলে ঋণপ্রবাহ কমেছে। এর মধ্যে চট্টগ্রাম বিভাগে ঋণাত্মক দশমিক ৮৭ শতাংশ, ঢাকা বিভাগে ২ দশমিক ৬৪ শতাংশ ঋণাত্মক। খুলনা বিভাগে ২ দশমিক ০২ শতাংশ, রাজশাহী বিভাগে ২ দশমিক ৪১ শতাংশ, সিলেট বিভাগে ৪ দশমিক ৩৪ শতাংশ, রংপুর বিভাগে ১ দশমিক ৫৮ শতাংশ এবং ময়মনসিংহ বিভাগে ৩ দশমিক ৪৩ শতাংশ ঋণাত্মক।

Top