প্রকৌশলী গোলাম মোত্তাকিনের ঢাকা জেলা সার্কেলে রহস্যজনক পদায়ন নিয়ে তোলপাড়
এবি সিদ্দীক ভূইঁয়া :
শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের (ইইডি) ঢাকা জেলা সার্কেলের নির্বাহী প্রকৌশলী হিসেবে বঙ্গবন্ধু প্রকৌশলী পরিষদের প্রভাবশালী নেতা গোলাম মোত্তাকিনের রহস্যজনক পদায়ন নিয়ে অধিদপ্তরের অভ্যন্তরে বইছে সমালোচনার ঝড়। দেশের রাজনৈতিক পটপরিবর্তন হলেও অধিদপ্তরের গুরুত্বপূর্ণ পদগুলো এখনো আওয়ামী পন্থী প্রকৌশলী ও তাদের দোসরদের দখলে থাকা নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন সাধারণ ও বিএনপি পন্থী প্রকৌশলীরা। অভিযোগ উঠেছে, প্রায় এক কোটি টাকার বড় অংকের লেনদেন এবং অধিদপ্তরের উচ্চপর্যায়ে বসে থাকা এক আওয়ামী পন্থী তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলীর আশীর্বাদে খুলনা থেকে অত্যন্ত প্রভাবশালী এই ঢাকা জেলা সার্কেলে নিজের আসন নিশ্চিত করেছেন মোত্তাকিন। একে অধিদপ্তরের ভেতর পুনরায় “আওয়ামী এজেন্ডা” বাস্তবায়নের একটি সুগভীর নীল নকশা হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা। গোলাম মোত্তাকিন বিগত আওয়ামী সরকারের আমলে বঙ্গবন্ধু প্রকৌশলী পরিষদের একনিষ্ঠ সদস্য হিসেবে নিজের ক্ষমতার দাপট দেখিয়ে এসেছেন। তার কর্মজীবনের দীর্ঘ সময় কেটেছে কুষ্টিয়া ও খুলনার মতো গুরুত্বপূর্ণ জেলাগুলোতে। অনুসন্ধানে জানা যায়, কুষ্টিয়া ও খুলনায় দায়িত্বরত থাকাকালীন সময়ে ঠিকাদারি কাজের বরাদ্দ প্রদান, টেন্ডার প্রক্রিয়া নিয়ন্ত্রণ এবং বিল পাসে ব্যাপক অনিয়মের অভিযোগ ওঠে তার বিরুদ্ধে। ভুক্তভোগী ঠিকাদারদের পক্ষ থেকে অধিদপ্তরের উচ্চপর্যায়ে একাধিক লিখিত অভিযোগ দেওয়া হলেও অদৃশ্য শক্তির ইশারায় সেসব ফাইল আলোর মুখ দেখেনি। বঙ্গবন্ধু প্রকৌশলী পরিষদের সদস্য হওয়ার সুবাদে এবং তৎকালীন রাজনৈতিক প্রভাবকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে তিনি ছিলেন ধরাছোঁয়ার বাইরে। সাধারণ ঠিকাদারদের ভাষ্যমতে, মোত্তাকিন তার পছন্দের নির্দিষ্ট গুটিকয়েক আওয়ামী পন্থী ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে কাজ পাইয়ে দিতে কর্মকর্তাদের বাধ্য করতেন এবং বিনিময়ে মোটা অংকের কমিশন নিতেন। বর্তমান প্রেক্ষাপটে আওয়ামী পন্থী হিসেবে পরিচিত মোত্তাকিনের ঢাকা জেলা সার্কেলের মতো অত্যন্ত স্পর্শকাতর ও গুরুত্বপূর্ণ স্থানে বদলি হওয়াকে অনেকেই মিরাকল হিসেবে দেখছেন। তবে এই মিরাকলের পেছনে রয়েছে বড় অংকের আর্থিক লেনদেনের গুঞ্জন। শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের কর্মকর্তাদের মধ্যে এখন প্রকাশ্য আলোচনা হচ্ছে যে, খুলনা থেকে ঢাকায় বদলি হয়ে আসতে প্রায় এক কোটি টাকা খরচ করেছেন গোলাম মোত্তাকিন। এই টাকার ভাগ পৌঁছেছে অধিদপ্তরের সেই প্রভাবশালী মহলের হাতে যারা এখনো আগের সরকারের এজেন্ডা বাস্তবায়ন করে যাচ্ছে। বিশেষ করে, বর্তমানে অধিদপ্তরে কর্মরত এক বিতর্কিত তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী, যিনি নিজেকে আওয়ামী পন্থী হিসেবে প্রকাশ্যেই পরিচয় দিতেন, তার অতি ঘনিষ্ঠ ব্যক্তি হওয়ার সুবিধাই পেয়েছেন মোত্তাকিন। এই তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী নিজের প্রভাব খাটিয়ে বর্তমান প্রশাসনের চোখ ফাঁকি দিয়ে তার বিশ্বস্ত অনুচরকে ঢাকার গুরুত্বপূর্ণ চেয়ারে বসাতে সক্ষম হয়েছেন। গোলাম মোত্তাকিনের এই পদায়নকে কেন্দ্র করে শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের বিএনপি পন্থী প্রকৌশলী ও কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে তীব্র অস্থিরতা ও অসন্তোষ বিরাজ করছে। তাদের মতে, যখন সারা দেশে বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের মধ্য দিয়ে নতুন বাংলাদেশ গড়ার প্রত্যয় নেওয়া হচ্ছে, তখন একজন চিহ্নিত বিতর্কিত ব্যক্তিকে ঢাকার নির্বাহী প্রকৌশলী করা কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না। সংশ্লিষ্টদের আশঙ্কা, মোত্তাকিনকে ঢাকা সার্কেলে পদায়ন করার মূল উদ্দেশ্য হলো এই গুরুত্বপূর্ণ জোনের অর্থ আত্মসাৎ করা এবং নেপথ্যে থেকে আওয়ামী লীগের হারানো শক্তি সঞ্চয়ে সহায়তা করা। বিএনপি পন্থী প্রকৌশলী ফোরামের একাধিক সদস্য জানান, এই ধরনের পদায়ন কেবল অধিদপ্তরের পরিবেশ নষ্ট করছে না, বরং বর্তমান সরকারের সংস্কার কার্যক্রমকেও প্রশ্নবিদ্ধ করছে। সাধারণত ঢাকা জেলা সার্কেলের নির্বাহী প্রকৌশলীর পদটি অত্যন্ত কাঙ্ক্ষিত এবং এখানে আসার জন্য দীর্ঘ প্রশাসনিক স্বচ্ছতার প্রয়োজন হয়। কিন্তু মোত্তাকিনের ক্ষেত্রে তার অতীতের কলঙ্কিত রেকর্ড এবং রাজনৈতিক পরিচয় থাকার পরেও এই পদায়ন সবাইকে হতবাক করেছে। অনেকেই মনে করছেন, শিক্ষা খাতের বিশাল বাজেটের বড় একটি অংশ এই ঢাকা সার্কেলের মাধ্যমে ব্যয় হয়। ফলে এখানে একজন “আস্থাভাজন” ব্যক্তিকে বসিয়ে গত ১৫ বছরের মতো লুটতরাজের ধারাবাহিকতা বজায় রাখার চেষ্টা করছে সেই পুরোনো সিন্ডিকেট। শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের সাধারণ কর্মকর্তারা দ্রুত এই বিতর্কিত বদলি আদেশ বাতিল এবং গোলাম মোত্তাকিনের বিরুদ্ধে কুষ্টিয়া ও খুলনায় থাকাকালীন দুর্নীতির অভিযোগগুলো পুনরায় তদন্তের দাবি জানিয়েছেন। অন্যথায়, অধিদপ্তরের প্রশাসনিক শৃঙ্খলা ভেঙে পড়ার এবং সাধারণ কর্মকর্তা-কর্মচারীদের পক্ষ থেকে বড় ধরনের আন্দোলনের আশঙ্কা করা হচ্ছে। এই বিষয়ে অধিদপ্তরের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সুনির্দিষ্ট ব্যাখ্যা ও হস্তক্ষেপ এখন সময়ের দাবি।