অর্থনীতিতে গণতন্ত্রায়ন না হওয়ায় বৈষম্য বাড়ছে * পুঁজি আহরণ, উৎপাদন এবং বাজার ব্যবস্থা সব স্থানেই সমস্যা - Alokitobarta
আজ : সোমবার, ৪ঠা মার্চ, ২০২৪ খ্রিস্টাব্দ | ২০শে ফাল্গুন, ১৪৩০ বঙ্গাব্দ

অর্থনীতিতে গণতন্ত্রায়ন না হওয়ায় বৈষম্য বাড়ছে * পুঁজি আহরণ, উৎপাদন এবং বাজার ব্যবস্থা সব স্থানেই সমস্যা


আলোকিত বার্তা:সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) চেয়ারম্যান প্রফেসর রেহমান সোবহান বলেছেন, দেশে ব্যাংক ঋণের সুদের হার বেশি। ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পে এত বেশি সুদে ঋণ নিয়ে উন্নতি করা যায় না। রিসিডিউল করে ঋণখেলাপিদের সুদ হার কমানো হয়। কিন্তু যারা ছোট ব্যবসায়ী তারা নিয়মিত ঋণ পরিশোধ করলেও তাদের বেশি সুদ দিতে হয়। পুঁজি প্রাপ্তির ক্ষেত্রে সবার সমান সুযোগ থাকা উচিত। এজন্য ব্যাংকিং খাতে ডিসিপ্লিন আনার ওপর গুরুত্বারোপ করেন তিনি।সোমবার বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) সমালোচনামূলক কথন অনুষ্ঠানের একটি অধিবেশনে সভাপতির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। প্রফেসর রেহমান সোবহান বলেন, অর্থনীতিতে গণতন্ত্রায়ন না হওয়ায় বৈষম্য বৃদ্ধি পাচ্ছে। পুঁজি আহরণ, উৎপাদন এবং বাজার ব্যবস্থা সব স্থানেই সমস্যা রয়েছে।

রাজধানীর একটি হোটেলে আয়েজিত অনুষ্ঠানে ‘ডেমোক্রেটাইজেশন অব দ্য ইকোনমি : ভিশন, পলিসিস অ্যান্ড চ্যালেঞ্জ’ শীর্ষক অধিবেশনে সভাপতিত্ব করেন প্রফেসর রেহমান সোবহান। মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন বিআইডিএসের গবেষণা পরিচালক ড. কাজী আলী তৈফিক। আলোচনা করেন, ব্র্যাক ইন্সটিটিউট অব গভর্নেন্স অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের সিনিয়র রিসার্চ ফেলো ড. মীর্জা এম হাসান, আইন ও সালিশ কেন্দ্রের প্রতিষ্ঠাতা সদস্য ড. হামিদা হোসেন এবং গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের প্রতিষ্ঠাতা ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী।

এছাড়া অনুষ্ঠানের অন্য অধিবেশনে বক্তারা বলেছেন, দেশের প্রচলিত শিক্ষা ব্যবস্থা দক্ষ জনশক্তি তৈরিতে ব্যর্থ হচ্ছে। বিশেষ করে উচ্চ শিক্ষা কর্মউপযোগী না হওয়ায় শিক্ষিত বেকারের সংখ্যা বাড়ছে। তাছাড়া উন্নয়নে দীর্ঘমেয়াদের সবচেয়ে বড় ঝুঁকি হচ্ছে শিক্ষা ব্যবস্থা। আয়ের হিসেবে আমরা হয়তো মধ্যম আয়ের দেশে যাব। কিন্তু সবার জন্য সমান উন্নয়ন আসবে না। এজন্য উৎপাদনশীলতা বাড়াতে হলে দেশের শিক্ষা ব্যবস্থার মান উন্নয়ন করে বাজারভিত্তিক করার পাশাপাশি মানসম্মত শিক্ষক তৈরি এবং শিক্ষাকে রাজনৈতিক প্রভাব থেকে মুক্ত রাখার তাগিদ দেয়া হয়েছে।ড.কাজী আলী তৌফিক বলেন,আমাদের বনজসম্পদের প্রধান অংশই সরকারিভাবে রয়েছে। এগুলোর সঠিক ব্যবস্থাপনা জরুরি। তাছাড়া শহরায়ন, জলবায়ু পরিবর্তনসহ নানা কারণে প্রাকৃতিক মৎস্য সম্পদ কমে যাচ্ছে। বাড়ছে চাষের মাছ। তিনি বলেন, যে সম্পদই হোক না কেন এসব সম্পদ যারা যারা ব্যবহার করেন, ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব তাদের হাতে থাকলেই ভালো হয়। প্রাকৃতিক সম্পদ রক্ষায় নীতিমালার সমস্যা, সুশাসনের অভাবসহ নানা সমস্যা রয়েছে। তিনি সমবায় ব্যবস্থার ওপর জোর দেন। ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী বলেন, আমাদের দেশে ওষুধের দাম বাড়ছে। ২০০০ সাল পর্যন্ত ওষুধের যে দাম ছিল সেটি এখন ৩০০ গুণ বেড়েছে। আনলিমিটেড লাভের কারণে এভাবে দাম বাড়ছে। এক্ষেত্রে সরকারি নিয়ন্ত্রণে থাকা ১১৭টি ওষুধের দাম বাড়েনি। দেশে বৈষম্য বাড়ার অন্যতম কারণ হচ্ছে চিকিৎসা ব্যয়। তিনি বলেন, কমিউনিটি ক্লিনিকের প্রয়োজন আছে। কিন্তু সেগুলো সঠিকভাবে পরিচালনা করতে হবে।

‘কোয়ালিটি অব এডুকেশন অ্যান্ড গ্রাজুয়েট আনইমপ্লয়মেন্ট’ শীর্ষক অপর এক অধিবেশনে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন বিআইডিএসের সিনিয়র রিসার্চ ফেলো ড. মিনহাজ মাহমুদ। তিনি বলেন, পরিকল্পনা অনুযায়ী ২০৩১ সালের মধ্যে উচ্চ মধ্যম আয়ের দেশ এবং ২০৪৬ সালের মধ্যে উচ্চ আয়ের দেশে যেতে হলে সার্বিক উৎপাদনশীলতা বাড়াতে হবে। ড. মহিউদ্দিন আলমগীরের এক গবেষণার উদ্ধৃতি দিয়ে তিনি বলেন, এক্ষেত্রে লক্ষ্য অর্জনে ২০২১ সাল থেকে ২০৩১ সালের মধ্যে বর্তমানের উৎপাদনশীলতা শূন্য দশমিক ৩ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ২ দশমিক ৩ শতাংশ নিয়ে যেতে হবে। এছাড়া ২০৩২ সাল থেকে ২০৪১ সালের মধ্যে সেটি আরও বাড়িয়ে ৩ দশমিক ৬ শতাংশে নিতে হবে।তিনি বলেন, আগামী দিতে অর্থনীতিতে একটি পরিবর্তন আনতে হলে শ্রমশক্তিকে দক্ষ করে গড়ে তোলার মতো শিক্ষা দিতে হবে। এ সময় তিনি কোন শিক্ষায় কতটুকু বেকার তার একটি হিসাব তুলে ধরেন।এই অধিবেশনের সভাপতি ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের এমিরেটাস প্রফেসর ড. মঞ্জুর হোসেন বলেন, মানবসম্পদ উন্নয়নে শিক্ষার বিকল্প নেই। কিন্তু সে শিক্ষা হতে হবে সময় উপযোগী। টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি) বাস্তবায়ন করতে হলে এ বিষয়ে নজর দিতে হবে। দক্ষ মানবসম্পদ উন্নয়ন ও মানসম্মত শিক্ষা এসডিজির সব লক্ষ্যের সঙ্গেই সম্পৃক্ত। টেকসই মানবসম্পদ ছাড়া টেকসই উন্নয়ন সম্ভব নয়।তিনি আরও বলেন, প্রাথমিক পর্যায় থেকে যেসব শিক্ষার্থী উঠে আসছেন তারা উচ্চ শিক্ষার যোগ্য নয়। কিন্তু তাদের নিয়েই উচ্চ শিক্ষা চালাতে হচ্ছে। শিক্ষার মান বাড়ানোর জন্য নীতিনির্ধারকরা দায়িত্ব পালন করছেন না। সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে রাজনৈতিকভাবেই শিক্ষকসহ প্রায় সব নিয়োগই দেয়া হচ্ছে।সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা রাশেদা কে. চৌধুরী বলেন, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীন ২ হাজার ২৫৪টি কলেজ রয়েছে। এর বাাইরে ১৭৩টি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় এবং অনেক সরকারি বিশ্ববিদ্যালয় রয়েছে। মানসম্মত শিক্ষার সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হচ্ছে শিক্ষক। মানসম্মত শিক্ষক না হলে মানসম্মত শিক্ষা হবে কীভাবে। আমরা বর্তমান শিক্ষা ব্যবস্থায় শিক্ষিত বেকার তৈরি করছি। বিআইডিএসের মহাপরিচালক কেএএস মুর্শিদ বলেন, উচ্চ শিক্ষার আগে প্রাইমারি শিক্ষার মান বাড়াতে হবে। বেসিক ভিত্তি শক্তিশালী না হলে পরবর্তীতে সারাজীবন তাদের নিয়ে সংগ্রাম করতে হবে।

সমাপনী অধিবেশনে সঞ্চালনার দায়িত্বপালন করেন প্রফেসর রেহমান সোবহান। এতে প্রধান অতিথি ছিলেন প্রধানমন্ত্রীর অর্থ বিষয়ক উপদেষ্টা মশিউর রহমান, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক ইমতিয়াজ আহমেদ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক তাসনিম সিদ্দিকী, তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা হোসেন জিল্লুর রহমান, সুপ্রিমকোর্টের আইনজীবী সারা হোসেনসহ অন্যরা।বক্তারা বলেন,দেশ এখন পুঁজিবাদ ও নজরদারি মডেলে চলছে। এখন কোনো কিছু লিখতে ও সমালোচনা করতে কয়েকবার চিন্তা করতে হয়। সরকার ও দলের বিরুদ্ধে সমালোচনা করা যায় না। কেউ সমালোচনা করলে তাকেসহ চৌদ্দগোষ্ঠী হয়রানি করা হয়। ধনীর হার ক্রমাগত বাড়ছে। দেশে বিচারহীনতার সংস্কৃতি চলছে উল্লেখ করে বক্তারা আরও বলেছেন, দেশে অগণিত ঘটনা ঘটছে। কিন্তু কোনোটিরই বিচার হচ্ছে না। বিশ্বব্যাংকের মধ্যম আয়ের দেশ এবং জাতিসংঘ ঘোষিত উন্নয়নশীল দেশের কাতারে যেতে সরকারের মধ্যে যতটুকু তীব্র আকাঙ্ক্ষা রয়েছে, মানুষের জীবনের নিরাপত্তা নিশ্চিতে তার ছিটেফোঁটা নেই বলেও অভিযোগ করেন তারা।প্রধানমন্ত্রীর অর্থ উপদেষ্টা মশিউর রহমান বলেন,মামলা নিষ্পতি হতে সময় বেশি শুধু বাংলাদেশেই নয়, অনেক দেশেই সময় বেশি লাগে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট জন এফ কেনেডি ও আব্রাহাম লিঙ্কনের মৃত্যুর কারণ আজ পর্যন্ত দেশটি বের করতে পারেনি। শিশুদের যৌন হয়রানির বিষয়ে মশিউর রহমান বলেন, এই ধরনের যৌন হয়রানির ঘটনা নিম্ন আয়ের পরিবারে হয়। উচ্চবিত্তদের ঘরে হয় না। নিম্ন আয়ের পরিবার আর্থিকভাবে চাপে থাকে। প্রতিনিয়তই চাপে থাকার কারণে রাগে-ক্ষোভে এই ধরনের যৌন হয়রানির ঘটনা ঘটে।

Top
%d bloggers like this: