আসামি হচ্ছেন সাবেক আইজিপি মামুনও ,শাপলা চত্বরে গণহত্যা মামলা
মোহাম্মাদ মহাব্বাতুল্লাহ মাহাদ:রাজধানীর মতিঝিলে শাপলা চত্বরে হেফাজতে ইসলামের সমাবেশে গণহত্যার মামলায় এবার আসামি হচ্ছেন সাবেক আইজিপি চৌধুরী আবদুল্লাহ আল মামুন।প্রসিকিউশনের সময়ের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে ট্রাইব্যুনাল আগামী ২৬ এপ্রিল শুনানির নতুন তারিখ নির্ধারণ করেছেন। এছাড়া জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে শহীদ হওয়া ইমাম হাসান তাইমের সুরতহাল প্রতিবেদনে পুলিশের ছোড়া গুলির তথ্য গোপন করা হয়েছে বলে ট্রাইব্যুনালে জবানবন্দিতে জানিয়েছেন তার বাবা পুলিশের উপ-পরিদর্শক (এসআই) ময়নাল হোসেন ভূঁইয়া। এ ঘটনায় তার সম্পৃক্ততা পেয়েছে তদন্ত সংস্থা। বুধবার গণমাধ্যমকে এ তথ্য নিশ্চিত করেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর আমিনুল ইসলাম।এ বিষয়ে কথা বলেছেন। এদিকে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে রাজধানীর মোহাম্মদপুরে ৯ জনকে হত্যা মামলায় অভিযোগ গঠনের শুনানি দ্বিতীয় দফা পিছিয়েছে।
চিফ প্রসিকিউটর আমিনুল ইসলাম বলেন, ২০১৩ সালে শাপলা চত্বরের মহাসমাবেশে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডে তৎকালীন র্যাবের কর্মকর্তা সাবেক আইজিপি চৌধুরী আবদুল্লাহ আল মামুনের সম্পৃক্ত থাকার তথ্য পেয়েছে তদন্ত সংস্থা। চিফ প্রসিকিউটর বলেন, এ মামলায় আসলে কারা আসামি হতে যাচ্ছেন, তা এখনই প্রকাশ করতে পারছি না। তবে তৎকালীন আইজিপি চৌধুরী আবদুল্লাহ আল মামুনসহ অনেক কর্মকর্তাদের সম্পৃক্ততা পাচ্ছি। আগামী কয়েকদিনের মধ্যে পূর্ণ প্রতিবেদন পাব বলে আমরা আশাবাদী। এ নিয়ে কাজ করছে তদন্ত সংস্থা। নারকীয় এ হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িতদের ছাড় দেওয়া হবে না বলে জানিয়েছেন আমিনুল ইসলাম। আমিনুল বলেন, আব্দুল্লাহ আল মামুনসহ তৎকালীন দায়িত্বশীল অনেক কর্মকর্তার নামও রয়েছে। শাপলা চত্বরের ঘটনাকে একটি ‘স্বতন্ত্র ঘটনা’ হিসাবে বিবেচনায় নিয়ে আলাদাভাবে তদন্ত করা হচ্ছে। একইসঙ্গে দেশে সংঘটিত গুম ও কথিত বন্দুকযুদ্ধের ঘটনাগুলোর একটি পূর্ণাঙ্গ তালিকা সংশ্লিষ্ট থানা থেকে চাওয়া হয়েছে। এসব ঘটনার মধ্যে যেগুলো ‘ওয়াইড স্প্রেড’ এবং ‘সিস্টেমেটিক’ অপরাধ হিসাবে প্রমাণিত হবে, সেগুলো পর্যায়ক্রমে মানবতাবিরোধী অপরাধ হিসাবে বিচার প্রক্রিয়ায় আনা হবে। মামুনের অন্য একটি মামলায় রাজসাক্ষী হওয়ার বিষয়ে আমিনুল ইসলাম বলেন, একটি মামলায় রাজসাক্ষী হওয়া মানে এই নয় যে, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি অন্য ঘটনায় দায়মুক্তি পাবেন। মানবতাবিরোধী অপরাধে এর আগে মামুনকে পাঁচ বছরের দণ্ড দেওয়া হয়েছে।
শহীদ তাইমের বাবার সাক্ষ্য : জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে রাজধানীর যাত্রাবাড়ীতে তাইম হত্যা মামলায় ১১ আসামির বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দেন তার বাবা পুলিশের এসআই ময়নাল হোসেন ভূঁইয়া। বর্তমানে রাজারবাগ পুলিশ লাইনসে কল্যাণ ও ফোর্স বিভাগে এসআই হিসাবে কর্মরত তিনি। ২০২৪ সালের ২০ জুলাই কাজলা এলাকায় খুব কাছ থেকে গুলি চালিয়ে তার ছেলেকে হত্যা করে পুলিশ। বুধবার ট্রাইব্যুনাল-২ এর বিচারক নূর মোহাম্মদ শাহরিয়ার কবীরের একক বেঞ্চে জবানবন্দি দেন ময়নাল হোসেন।তিনি বলেন, ২১ জুলাই সকালে পরিবারের সদস্য-সহকর্মীদের নিয়ে ঢামেক হাসপাতালে অবস্থান করছিলাম আমি। সুরতহাল ও ময়নাতদন্তের জন্য তাইমের লাশ হাসপাতালে নেওয়া হয়। আমার সঙ্গে দেখা করেন শাহবাগ থানার এসআই শাহাদাত। তিনি পরিচয় দিয়ে তাইমকে পুলিশ গুলি করে মেরে ফেলার কথা জানান।একইসঙ্গে সুরতহাল ও ময়নাতদন্তের ব্যবস্থা করার কথা বলি। কিন্তু একই পেশার সহকর্মী হিসাবে কোনো সান্ত্বনা না দিয়ে আরেকজনের সঙ্গে মোবাইল ফোনে কথা বলেন তিনি।
তাইমের বাবা বলেন,সকালে হাসপাতালে এলেও অকারণে দেরি করতে থাকেন শাহাদাত।দুপুর ১২টার দিকে সুরতহাল করতে যান তিনি। সুরতহালে গুলিবিদ্ধ হওয়ার চিহ্নগুলো না লিখে কিছু ছিদ্র ও কালো স্পট থাকার কথা উল্লেখ করেন। তাকে জিজ্ঞাসা করি-‘আপনি পুলিশের গুলিতে বিদ্ধ হওয়ার কথা না লিখে স্পট থাকার কথা কেন লিখলেন’। জবাবে এসআই শাহাদাত বলেন ‘এটা উপরের অর্ডার, আমি গুলির কথা লিখতে পারব না’।তিনি বলেন,ছাত্র-জনতার আঘাতে ও গুলিতে আপনার ছেলে মারা গেছে’। এই বলে সুরতহাল প্রতিবেদন প্রস্তুত করে আমাকে স্বাক্ষর করতে বলেন।এতে আমি অনেক চিন্তায় পড়ে যাই।
ময়নাল বলেন,আমার ছেলে মারা গেছে। চাকরি হারানোর ভয়। মৃত্যুর পর ২৪ ঘণ্টা পেরিয়ে গেছে। লাশে প্রায় পচন ধরে গেছে। এসব চিন্তা করে সুরতহাল প্রতিবেদনে স্বাক্ষর করতে বাধ্য হই। বিকাল ৪টার দিকে ময়নাতদন্তের জন্য নির্ধারিত কক্ষে নেওয়া হয়। সাড়ে ৪টার পর সম্পন্ন হলে আমরা তাইমের মরদেহটি বুঝে পাই। এ মামলায় ১১ আসামির মধ্যে গ্রেফতার করা হয়েছে দুজনকে। তাদের আজ সকালে ট্রাইব্যুনালে হাজির করা হয়। এরা হলেন- যাত্রাবাড়ী থানার তৎকালীন ওসি আবুল হাসান ও সাবেক এসআই শাহাদাত আলী।
মোহাম্মদপুরে ৯ হত্যা মামলায় অভিযোগ গঠনের শুনানি ২৬ এপ্রিল : জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে রাজধানীর মোহাম্মদপুরে ৯ জনকে হত্যার ঘটনায় মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় অভিযোগ গঠনের শুনানি দ্বিতীয় দফা পিছিয়েছে। প্রসিকিউশনের সময়ের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল আগামী ২৬ এপ্রিল শুনানির নতুন তারিখ নির্ধারণ করেছেন। বুধবার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ এর সদস্য বিচারক মো. মোহিতুল হক এনাম চৌধুরীর একক বেঞ্চ এই তারিখ নির্ধারণ করে দেন।