দল পুনর্গঠনে পুরোপুরি মনোযোগ দিচ্ছে বিএনপি
নুর নবী জনী : সরকার পরিচালনার পাশাপাশি দল পুনর্গঠনে পুরোপুরি মনোযোগ দিচ্ছে বিএনপি। আগামী ফেব্রুয়ারি মাসের মধ্যেই জাতীয় কাউন্সিল করতে চান দলটির নীতিনির্ধারকরা। এজন্য সব ধরনের প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে। জাতীয় কাউন্সিল ও আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচন ঘিরে শিগ্গিরই সাংগঠনিক সফরে যাবেন বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতারা। তাদের লক্ষ্য তৃণমূলে নিয়ন্ত্রণ শক্ত করা, অভ্যন্তরীণ কোন্দল থামানো, শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা, মেয়াদোত্তীর্ণ কমিটি পুনর্গঠন করা এবং সম্ভাব্য প্রার্থী বাছাইয়ের কাজ একসঙ্গে সম্পন্ন করা-যার মধ্য দিয়ে জাতীয় কাউন্সিলের মঞ্চে ওঠা।ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নিরঙ্কুশ জয়লাভের পর থেকেই বিএনপির জাতীয় কাউন্সিল অনুষ্ঠানের বিষয়টি জোরেশোরে সামনে আসে। দলটির নীতিনির্ধারকরাও কাউন্সিলের বিষয়ে জোর দিয়ে কথা বলছেন। তবে এ বিষয়ে নীতিগত সিদ্ধান্ত থাকলেও এখনই সুনির্দিষ্ট করে দিনক্ষণ চূড়ান্ত হচ্ছে না।
বিএনপির স্থায়ী কমিটির সিনিয়র সদস্য ও সরকারের প্রভাবশালী একজন মন্ত্রী জানান, স্থানীয় সরকার নির্বাচনের কারণেই বিএনপির জাতীয় কাউন্সিল বিলম্ব হচ্ছে। চলতি বছরে কাউন্সিলের সম্ভাবনা না দেখলেও আগামী বছরের প্রথম দিক অর্থাৎ ফেব্রুয়ারি টার্গেট করেই কার্যক্রম চলমান রয়েছে। কারণ হিসাবে বলছেন, ওই সময়ে সরকারের ১ বছর পূর্তি হবে। একই সঙ্গে শীতকাল। কাউন্সিলকেন্দ্রিক প্রস্তুতি গ্রহণও স্বস্তিদায়ক হবে।
জানতে চাইলে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী বলেন, দিনক্ষণ এখনো ঠিক হয়নি। দলের নীতিনির্ধারণী ফোরাম এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিয়ে জানাবে। তবে এটুকু বলতে পারি, খুব শিগ্গিরই হবে।একই কথা বলছেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ও প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা নজরুল ইসলাম খান। তিনি জানান, যত দ্রুত সম্ভব তারা কাউন্সিল করতে চান। এর জন্য নানা বিষয়ের প্রস্তুতির কথাও উল্লেখ করেন তিনি।বিএনপির সর্বশেষ জাতীয় কাউন্সিল হয়েছিল ২০১৬ সালের মার্চে। নিয়ম অনুযায়ী তিন বছর পরপর কাউন্সিল হওয়ার কথা থাকলেও এক দশকেও তা সম্ভব হয়নি। তবে এই সময়ে নির্বাহী কমিটিতে একাধিকবার পরিবর্তন আনা হয়েছে। যুক্ত হয়েছেন নতুন মুখ; কেউ পদোন্নতি পেয়েছেন, আবার কেউ দায়িত্ব থেকে সরে গেছেন।
বিএনপি সরকার গঠন করলেও বারবার জাতীয় কাউন্সিলসহ সারা দেশে সাংগঠনিক ইউনিট পুনর্গঠনের বিষয়টি সামনে আসে। সেই ধারাবাহিকতায় সরকার গঠনের পর স্থায়ী কমিটির প্রথম বৈঠক (গত ৪ এপ্রিল) শেষে বিএনপির তৎকালীন মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছিলেন, ওই বৈঠকে কাউন্সিল নিয়ে আলোচনা হয়েছে। সব প্রস্তুতি গুছিয়ে নিতে কয়েক মাস সময় লাগবে, তবে তারা দ্রুত কাউন্সিল করতে চান।পরবর্তী সময়ে নীতিনির্ধারকদের অনেকেই বলেছিলেন, তারা চলতি বছরের মধ্যেই কাউন্সিল করতে চান। কেউ কেউ ডিসেম্বরের দিকেও ইঙ্গিত করেছিলেন।তবে সামনে স্থানীয় সরকার নির্বাচন থাকায় আপাতত চলতি বছরের মধ্যে জাতীয় কাউন্সিল অনুষ্ঠানের সম্ভাবনা যে নেই,তা দলটির নীতিনির্ধারকদের কথাতেই অনেকটা স্পষ্ট।বিএনপির নীতিনির্ধারণী ফোরামের আরেক সদস্য সেলিমা রহমান বলেন,জাতীয় কাউন্সিল অনুষ্ঠানের দিনক্ষণ চূড়ান্ত হয়নি। প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি চেয়ারম্যান আমাদের বলেছিলেন, এই বছরের শেষদিকে কাউন্সিল হবে। তবে স্থানীয় সরকার নির্বাচনের দিকে খেয়াল রেখে এটি আগে-পরে হতে পারে। এক প্রশ্নের উত্তরে আগামী বছরের শুরুর দিকে জাতীয় কাউন্সিল অনুষ্ঠানের ইঙ্গিত দিয়েছেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির এই সদস্য।
এদিকে জাতীয় কাউন্সিলের আগেই বিএনপির শীর্ষ পর্যায়ে একাধিক পরিবর্তন এসেছে। দলটির সদ্য সাবেক মহাসচিব দলীয় মনোনয়ন পেয়ে রাষ্ট্রপতি হয়েছেন। ফলে তার স্থলাভিষিক্ত হয়ে ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব হিসাবে দায়িত্ব পেয়েছেন রুহুল কবির রিজভী, যিনি আগে দলটির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব ছিলেন। এছাড়া স্থায়ী কমিটিতেও কয়েকজনকে নতুন করে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। ১৯ সদস্যবিশিষ্ট স্থায়ী কমিটিতে এখনো তিনটি পদ শূন্য রয়েছে। মৃত্যু, পদত্যাগ ও বহিষ্কারের কারণে ভাইস চেয়ারম্যানের পদও শূন্য রয়েছে ১২টি। দলের প্রবীণ ও মধ্যম সারির নেতাদের মাধ্যমে এসব শূন্যপদ পূরণের উদ্যোগ চলছে। পাশাপাশি দলটির শীর্ষ নেতৃত্বের বেশির ভাগই এখন সরকারের বিভিন্ন দায়িত্বে রয়েছেন।
বিএনপির সামনে সবচেয়ে বড় সাংগঠনিক চ্যালেঞ্জ মেয়াদোত্তীর্ণ কমিটি। দলীয় সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, বিএনপির ৮২টি সাংগঠনিক ইউনিটের মধ্যে কয়েকটি ছাড়া বেশির ভাগ জেলা ও মহানগর কমিটির মেয়াদ অনেক আগেই শেষ হয়েছে। কোথাও তিন বছর, কোথাও পাঁচ বছর, আবার কোথাও প্রায় এক দশক ধরে একই কমিটি দিয়ে সাংগঠনিক কার্যক্রম চলছে। এ অবস্থায় বিভাগভিত্তিক সাংগঠনিক পুনর্গঠনের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। কোথাও নতুন আহ্বায়ক কমিটি দেওয়া হচ্ছে, কোথাও পূর্ণাঙ্গ কমিটি করা হচ্ছে, আবার বহিষ্কৃত নেতাদের ফিরিয়ে এনে দায়িত্ব পুনর্বণ্টনও করা হচ্ছে। গত জুলাই-আগস্টে সাতক্ষীরার শ্যামনগর, গোপালগঞ্জ সদর, কুমিল্লা মহানগর, কুমিল্লা উত্তর জেলা, দিনাজপুরের পার্বতীপুর ও ফুলবাড়ীসহ বিভিন্ন ইউনিটে সাংগঠনিক পরিবর্তন আনা হয়েছে। আবার কয়েকটি এলাকায় পুরোনো নেতাদের দায়িত্বও পুনর্বহাল করা হয়েছে।
পাশাপাশি বিএনপির কেন্দ্রীয় অঙ্গ ও সহযোগী ১১টি সংগঠনের মধ্যে ১০টিরই মেয়াদ উত্তীর্ণ। দলীয় গঠনতন্ত্রে প্রতি তিন বছর পর নতুন কমিটি গঠনের বিধান থাকলেও দীর্ঘদিন তা বাস্তবায়িত হয়নি। এতে তৃণমূল থেকে কেন্দ্র পর্যন্ত নেতৃত্বের স্বাভাবিক ধারাবাহিকতা বাধাগ্রস্ত হচ্ছে বলেও মনে করেন কেউ কেউ। এই অবস্থায় জাতীয় কাউন্সিলের মাধ্যমে দল পুনর্গঠন জরুরি হিসাবে দেখছেন বিএনপির বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাকর্মীরা।এদিকে জাতীয় কাউন্সিল ও স্থানীয় নির্বাচনকে সামনে রেখে সাংগঠনিক বিভাগের সঙ্গে বৈঠক শুরু করেছেন বিএনপি চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। ইতোমধ্যে দেশের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের অন্তত ১২টি জেলা ও মহানগরের নেতাদের সঙ্গে বৈঠক করে অভ্যন্তরীণ কোন্দল মেটানো, তৃণমূলের কমিটি ঢেলে সাজানো এবং স্থানীয় নির্বাচনে একক প্রার্থী বাছাইয়ে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করার নির্দেশনা দেওয়া হচ্ছে। বিতর্কিত বা দলের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করতে পারে এমন কাউকে নেতৃত্বে না আনার বিষয়েও সতর্ক করা হচ্ছে।কেন্দ্রীয় নেতারা বলছেন, স্থানীয় সরকার নির্বাচনকে সামনে রেখে বিএনপির সাংগঠনিক তৎপরতা এখন ধীরে ধীরে গতি পাচ্ছে। জেলা, মহানগর, উপজেলা ও থানা পর্যায়সহ মেয়াদোত্তীর্ণ কমিটি পুনর্গঠনের পাশাপাশি সম্ভাব্য প্রার্থীদের নিয়েও মাঠপর্যায়ে খোঁজখবর নেওয়া হচ্ছে। দলের হাইকমান্ড চাইছে স্থানীয় নির্বাচনকে শুধু ভোটের লড়াই হিসাবে না দেখে সংগঠন গোছানোর বড় সুযোগ হিসাবে কাজে লাগাতে।