‘সবার জন্য সমান’ নীতি বাস্তবায়নই বড় চ্যালেঞ্জ
মোহাম্মাদ মুরাদ হোসেন : ক্ষমতার পালাবদলের সঙ্গে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) ভূমিকাও বদলে যাওয়ার অভিযোগ দীর্ঘদিনের। তবে প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে শুরু থেকেই দুটি অভিযোগ এক রকম প্রতিষ্ঠিত।এছাড়া বর্তমানে দুদকে বহু রাজনীবিদ, সাবেক ও বর্তমানে কর্মরত উচ্চপদস্থ সরকারি কর্মকর্তাসহ সমাজের নানা শ্রেণি-পেশার প্রভাবশালী দুর্নীতিবাজদের অনুসন্ধান, তদন্ত ও বিচারাধীন মামলা রয়েছে। প্রশ্ন হলো-নতুন কমিশন কী সব কিছুর ঊর্ধ্বে উঠে এদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে পারবে।এটি তারা সত্যিই পারবে কিনা তা কয়েক মাসের মধ্যে স্পষ্ট হবে।প্রথমত,দুর্নীতিগ্রস্ত ক্ষমতাসীনদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নেওয়া এবং দ্বিতীয়ত, রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে হয়রানি করার হাতিয়ার হিসাবে দুদককে অপব্যবহার করা। এই যখন অবস্থা তখন মার্চে মোমেন কমিশন পদত্যাগ করার পর দীর্ঘ প্রায় সাড়ে পাঁচ মাস পর নতুন নেতৃত্ব পেল দুদক।পর্যবেক্ষক মহল বলছে, সঙ্গতকারণে উল্লিখিত দুটি চ্যালেঞ্জ তো এই কমিশনের সামনে থাকবেই। উপরন্তু এর সঙ্গে যুক্ত হবে গণ-অভ্যুত্থান পরবর্তী বাংলাদেশে দুদকের ওপর জনগণের বিপুল প্রত্যাশা।এজন্য সংশ্লিষ্টরা বলছেন, নতুন কমিশনের সামনে সবচেয়ে বড় পরীক্ষা হচ্ছে ‘সবার জন্য সমান’ নীতি বাস্তবায়ন করা। রাজনৈতিক পরিচয়, ক্ষমতার অবস্থান কিংবা প্রভাব নয়, দুর্নীতি প্রমাণের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নেওয়ার সক্ষমতা দেখাতে পারলেই ফিরতে পারে দুদকের হারানো আস্থা।ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন,দুদক অনেকদিন পর নতুন করে গঠিত হয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে সংস্থাটি যে আস্থাহীনতার সংকটে ভুগছে, তার অন্যতম কারণ হলো দুদক স্বাধীন ও সক্রিয়ভাবে রাজনৈতিক এবং আমলাতান্ত্রিক প্রভাবমুক্ত থেকে কাজ করতে পারেনি। নতুন কমিশনের সদস্যদের কাছে বিষয়টি নিশ্চয়ই অজানা নয়। তাই তাদের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হবে, কোনো ধরনের রাজনৈতিক বা আমলাতান্ত্রিক প্রভাবমুক্ত থেকে কাজ করার দৃষ্টান্ত স্থাপন করা।নতুন কমিশন গঠনের পর মঙ্গলবার দুদক চেয়ারম্যান হিসাবে সাবেক বিচারপতি একেএম আসাদুজ্জামান এবং দুই কমিশনার ড. জাহাঙ্গীর আলম খান ও ড. মো. সাজ্জাদ হোসেন ভূঁইয়া মন্ত্রিপরিষদ বিভাগে যোগদান করেন। বুধবার থেকে তারা অফিস শুরু করেছেন।
এদিকে অফিস শেষে বিকালে দুদকের নতুন চেয়ারম্যান ও দুই কমিশনার সাংবাদিকদের মুখোমুখি হন। এ সময় দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) কোনো চাপের মধ্যে নেই এবং স্বাধীনভাবে কাজ করবে বলে বিচারপতি একেএম আসাদুজ্জামান সাংবাদিকদের কাছে দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করেন।তিনি বলেন, ‘আজকে আমাদের প্রথম কার্যদিবস ছিল। আমরা কাজ শুরু করেছি। আপনারা আমাদের জন্য দোয়া করবেন, যেন মানুষের প্রত্যাশা অনুযায়ী দেশের জন্য কাজ করাসহ দুদকের ভাবমূর্তি ফিরিয়ে আনতে পারি। দেশকে দুর্নীতিমুক্ত করার জন্য আমরা যথাসাধ্য চেষ্টা করব।
ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে শুরু হওয়া বিভিন্ন অনুসন্ধান,তদন্ত ও অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে করা কাজগুলোর বিষয়ে কমিশনের অবস্থান জানতে চাইলে চেয়ারম্যান বলেন,আমাদের সামনে এখনো কোনো ফাইল আসেনি। আমরা কেবল বসেছি। ফাইল আসুক, তখন জানতে পারবেন কী করছি আমরা, নিজেরাই দেখতে পারবেন। আগাম কোনো বিষয়ে কথা বলতে চাই না।’ তিনি বলেন, ‘আমরা একটা কথা বললাম, কিন্তু কাজ করতে পারলাম না, তখন আপনারাই আমাদের প্রশ্ন করবেন। অতএব, আমাদের কাজ শুরু করতে দিন। আমরা স্বাধীনভাবে কাজ করছি। সামনে যে সমস্যাই আসুক, সেগুলোর সঠিক সমাধান দেওয়ার চেষ্টা করব।’
এ সময় দুদক কমিশনার ড. সাজ্জাদ হোসেন ভূঁইয়া বলেন, ‘আমাদের চেয়ারম্যান একজন অত্যন্ত অভিজ্ঞ বিচারপতি। আমরা স্যারের নেতৃত্বে প্রতিটি বিষয়ে পুঙ্খানুপুঙ্খ ও নিরপেক্ষভাবে সিদ্ধান্ত দেব। আপনারা এত অল্প সময়ের মধ্যে এসব বিষয়ে অগ্রগতি জানতে চাইছেন? আমাদের কাজ করার জন্য কিছুটা সময় দিন।’ জনগণের করণীয় সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বলেন,জনগণের করণীয় হলো অপেক্ষা করা এবং আমরা কী করছি, তা পর্যবেক্ষণ করা। আমরা ১৮ কোটি মানুষের প্রত্যাশা সামনে রেখে এখানে এসেছি। আশা করি, জনগণ হতাশ হবে না।’
দুদকসংশ্লিষ্টরা বলছেন, এই ‘নতুন যাত্রা’ মোটেই সহজ নয়। সামনে শুধু নতুন মামলা করার চ্যালেঞ্জ নয়, বরং বছরের পর বছর জমে থাকা অনুসন্ধান, তদন্ত, অনুমোদনের অপেক্ষায় থাকা মামলা, অভিযোগপত্র, আদালতে বিচারাধীন হাজারো মামলা, জব্দ, অবরুদ্ধ সম্পদের ব্যবস্থাপনা, বিদেশে পাচার করা অর্থ ফেরত আনা, কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ওপর আস্থা ফেরানো। এছাড়া সবচেয়ে বড় কথা, রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত একটি প্রতিষ্ঠান হিসাবে দুদকের নতুন পরিচয় তৈরি করার কঠিন পরীক্ষা।
দুদকের হালনাগাদ পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত সংস্থাটিতে ১ হাজার ৩৮০টি অনুসন্ধান হয়েছে। একই সময়ে ৫৬৩টি এফআইআর করা হয়েছে। এসব মামলায় আসামি করা হয়েছে ২ হাজার ৯৯৫ জনকে। ওই বছর ৪৬৮টি চার্জশিটে ১ হাজার ৬৬২ জনকে আসামি করা হয়েছে। আর ৯৮টি মামলায় চূড়ান্ত প্রতিবেদন দেওয়া হয়েছে, যেখানে আসামি ছিলেন ২৪১ জন। এছাড়া সারা দেশের বিভিন্ন আদালতে দুদকের ৮ হাজার ২৫৪টি মামলা বিচারাধীন রয়েছে। এর মধ্যে নিম্ন আদালতে ৩ হাজার ৪৩৮টি এবং সুপ্রিমকোর্টে ৪ হাজার ৮১৬টি মামলা রয়েছে। উচ্চ আদালতের মামলার মধ্যে হাইকোর্টে ৪ হাজার ১০৮টি এবং আপিল বিভাগে ৭০৮টি।
দুদকসংশ্লিষ্টরা বলছেন, এই পরিসংখ্যানই নতুন কমিশনের সামনে কাজের ব্যাপক চাপের চিত্র তুলে ধরে। একদিকে নতুন করে হাজার হাজার অভিযোগ জমা পড়ছে, অন্যদিকে পুরোনো অনুসন্ধান ও তদন্তের নিষ্পত্তি করতে হবে। কমিশন দীর্ঘ সময় না থাকায় অনুমোদননির্ভর অনেক কার্যক্রমও থমকে ছিল।বিশেজ্ঞরা মনে করেন, নতুন কমিশনের প্রথম ৬ মাস হবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই সময়ের মধ্যে পুরোনো অনুসন্ধান ও তদন্তের ফাইল পর্যালোচনা, অনুমোদনের অপেক্ষায় থাকা মামলার দ্রুত নিষ্পত্তি, বিচারাধীন মামলার অগ্রগতি তদারকি, আলোচিত দায়মুক্তির সিদ্ধান্ত যাচাই এবং বড় দুর্নীতির অর্থ ও সম্পদ উদ্ধারে দৃশ্যমান উদ্যোগ নিতে হবে।
এদিকে টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন,দুদকের নিজস্ব একটি ভাবমূর্তির সংকটও রয়েছে। দুদক নিজেই দুর্নীতিগ্রস্ত বলে পরিচিত হয়েছে, এটি কোনো গোপন বিষয় নয় এবং এর পক্ষে দালিলিক প্রমাণও রয়েছে। দুদক সংস্কার কমিশনের পক্ষ থেকেও এ বিষয়ে সুনির্দিষ্ট কিছু সুপারিশ করা হয়েছে। নতুন নেতৃত্বের উচিত হবে, সেসব সুপারিশ বিবেচনায় নিয়ে দুদকের ভেতরের দুর্নীতির যে কালিমা রয়েছে, তা দূর করতে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া। কিন্তু এটি করতে না পারলে একদিকে দুর্নীতিগ্রস্তদের বিচারের আওতায় আনা কঠিন হবে। অন্যদিকে দুদকের প্রতি মানুষের আস্থার সংকটও দূর করা সম্ভব হবে না।