দুদকের নতুন যাত্রা
মু.এবি সিদ্দীক ভুঁইয়া: দেশের মানুষ যেরকম প্রত্যাশা করেন, সেটা প্রত্যাশা পূরণ হবে। বুধবার সকালে আমাদের কর্মকর্তাদের সঙ্গে তাঁরা মতবিনিময় করবেন।এর আগে গত ১৭ আগস্ট সোমবার সুপ্রিমকোর্টের আপিল বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি এ কে এম আসাদুজ্জামানকে দুদকের চেয়ারম্যান নিয়োগ দিয়ে প্রেসিডেন্টের পক্ষে প্রজ্ঞাপন জারি করেছেন মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের সচিব নাসিমুল গনি।ওই প্রজ্ঞাপনে কমিশনার হিসেবে ড.জাহাঙ্গীর আলম খান ও ড. সাজ্জাদ হোসেন ভূঁইয়াকে নিয়োগ দেয়া হয়।আজ (বুধবার) থেকে দুর্নীতি দমন কমিশনে যোগদান করবেন নয়া কমিশন। আপিল বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি একেএম আসাদুজ্জামান নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের কমিশন গতকাল মঙ্গলবার মন্ত্রিপরিষদ বিভাগে যোগদান করেছেন। আজ সকাল থেকে তারা সেগুনবাগিচাস্থ দুর্নীতি দমন কমিশনে অফিস করবেন। টেলিফোনে সংবাদমাধ্যমকে এমন তথ্য জানিয়েছেন সংস্থার নবনিযুক্ত চেয়ারম্যান বিচারপতি একেএম আসাদুজ্জামান স্বয়ং। কমিশনের অপর দুই সদস্য-ড. জাহাঙ্গীর আলম খান এবং ড. সাজ্জাদ হোসেন ভুইয়াও আজ যোগদানের কথা রয়েছে বলে জানিয়েছেন দুদক সচিব সাইদুর রহমান খান।তিনি বলেন,দীর্ঘ প্রতীক্ষার অবসান হয়েছে। সোমবার গেজেটের মাধ্যমে নতুন চেয়ারম্যান ও দুই কমিশনার নিয়োগ দেয়া হয়েছে।মঙ্গলবার বেলা ২টার দিকে তাঁরা মন্ত্রিপরিষদ বিভাগে যোগদান করেছেন। বুধবার থেকে তারা দুদক কার্যালয়ে এসে দায়িত্ব পালন শুরু করবেন বলে আশা করছি।সাইদুর রহমান খান বলেন, ১৯ আগস্ট বুধবার থেকে নতুন যাত্রা শুরু হবে দুদকের।
বিচারপতি এ কে এম আসাদুজ্জামান ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে আপিল বিভাগ থেকে অবসর নেন। বর্ণাঢ্য তার বিচার বিভাগীয় জীবন। ২০০৩ সালের ২৭ আগস্ট একেএম আসাদুজ্জামান হাইকোর্ট বিভাগের অতিরিক্ত বিচারক নিযুক্ত হন। ২০০৫ সালের একই তারিখে সুপ্রিমকোর্টের হাইকোর্ট বিভাগের বিচারপতি হিসেবে স্থায়ী হন। তখন থেকে টানা ২০ বছর তিনি হাইকোর্ট বিভাগের বিচারপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। চব্বিশের জুলাই অভ্যুত্থানের পর ২০২৫ সালের ২৫ মার্চ তাকে আপিল বিভাগের বিচারপতি নিয়োগ করা হয়।হাইকোর্ট বিভাগে দায়িত্ব পালনকালে বেশ কিছু আলোচিত মামলার রায় দেন তিনি। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য কয়েকটি হচ্ছে, ২০১৮ সালের ২৩ জুলাই তার নেতৃত্বাধীন ডিভিশন বেঞ্চ বেগম খালেদা জিয়ার মামলার দ্রুত নিষ্পত্তি ও জামিন দেয়। কুমিল্লার বিশেষ আদালতকে মামলাটি দ্রুত নিষ্পত্তির নির্দেশ দেন রায়ে। ২০২১ সালের সেপ্টেম্বরে এ মামলায় বেগম খালেদা জিয়ার জামিনের মেয়াদ বৃদ্ধি করেন। ২০১৮ সালের ৩০ জুলাই বিচারপতি একেএম আসাদুজ্জামান নেতৃত্বাধীন ডিভিশন বেঞ্চ একটি মানহানি মামলায় ‘আমার দেশ’ সম্পাদক মাহমুদুর রহমানকে জামিন দেন। এর আগে অবশ্য ২০১৯ সালের ২০ জুন টাঙ্গাইল-৩ আসনের আওয়ামী এমপি আমানুর রহমান রানার জামিন মঞ্জুর করেন। ২০২০ সালের ১৪ অক্টোবর সুপ্রিমকোর্টের অ্যাডভোকেট আসিফ ইমতিয়াজ খান জিসাদেও রহস্যজনক মৃত্যুর মামলায় অভিযুক্ত আসামিদের জামিন আবেদন নাকচ করে দেন।
বিচারপতি একেএম আসাদুজ্জামান ১৯৫৯ সালের ১ মার্চ নওগাঁ জেলার সাপাহার উপজেলার খঞ্জনপুর তালকুড়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। পিতা-অ্যাডভোকেট এম.এ.সামাদ। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে এলএলএম করে ১৯৮৩ সালের ৫ সেপ্টেম্বর জেলা আদালতের আইনজীবী হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন। ১৯৮৫ সালের ৫ সেপ্টেম্বর হাইকোর্ট বিভাগের আইনজীবী হন। ২০০১ সালের ২৫ অক্টোবর আপিল বিভাগের আইনজীবী হিসেবে অ্যানরোলড হন।দুদকের কমিশনার (অনুসন্ধান) ড. সাজ্জাদ হোসেন ভূঁইয়া জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) সাবেক কর কমিশনার। ড. মুহাম্মদ ইউনূস নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে তিনি অর্থ মন্ত্রণালয়ের অধিভুক্ত ফিন্যান্সিয়াল রিপোর্টিং কাউন্সিলের (এফআরসি) চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালন করেন। অপর কমিশনার (তদন্ত) ড. জাহাঙ্গীর আলম খান অবসরপ্রাপ্ত সচিব। তিনি ১৯৮৫ ব্যাচের প্রশাসন ক্যাডারের কর্মকর্তা।
প্রসঙ্গত: গত ৩ মার্চ ড. মোহাম্মদ আবদুল মোমেন নেতৃত্বাধীন দুদকের চেয়ারম্যানসহ তিন কমিশনার পদত্যাগ করেন। এর পর থেকে কমিশন শূন্য অবস্থায় ছিলো দুদক। ৫ মাসেরও বেশি সময় পর নিয়োগ দেয়া হলো এ কমিশন। এর আগে আপিল বিভাগের বিচারপতি মো: রেজাউল হক নেতৃত্বাধীন পাঁচ সদস্যের সার্চ কমিটি দুদকের শূন্য ৩টি পদের বিপরীতে ৬ জনের নাম সুপারিশ করেন। তাদের মধ্য থেকে ৩ জনকে যথাক্রমে চেয়ারম্যান ও কমিশনার নিয়োগ দেয়া হয়। ২০০৪ সালে আইনের মাধ্যমে ‘দুর্নীতি দমন ব্যুরো’ ‘দুর্নীতি দমন কমিশন’ এ উন্নীত হয়। কমিশন গঠনের ২২ বছর পর বিচার বিভাগীয় কর্মকর্তা সংস্থারি চেয়ারম্যান নিযুক্ত হলেন। এর আগের সময়গুলোতে দুদক চেয়ারম্যানের পদটি ছিলো প্রশাসন ক্যাডারের কব্জায়। দুদকের প্রথম চেয়ারম্যান ছিলেন আপিল বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি সুলতান হোসেন খান। কিন্তু জেঁকে বসা আমলাতন্ত্র একের পর এক জটিলতা সৃষ্টি করে কাজ করতে দেয়নি সুলতান হোসেন খানের কমিশনকে। এরপর ‘ব্যর্থ’ কমিশনের ট্যাগ দিয়ে বিচার বিভাগীয় কাউকে চেয়ারম্যান পদে বসাতে দেয়া হয়নি। এবারের নিয়োগের মধ্য দিয়ে দুদকের চেয়ারম্যান পদটি অ্যাডমিন ক্যাডারের রাহুমুক্ত হলো।