দলের সিদ্ধান্তের বাইরে কেউ ভোট দিতে পারবেন না,কেউ ভোট দিলে তার সংসদ-সদস্য পদ বাতিল হবে
মোহাম্মাদ আবুবকর সিদ্দীক ভুঁইয়া : রাষ্ট্রপতি পদে ভোটগ্রহণের প্রস্তুতি নিয়ে জাতীয় সংসদে ভারপ্রাপ্ত স্পিকারের সঙ্গে বৈঠক করেছেন নির্বাচন কমিশনের (ইসি) কর্মকর্তারা। ওই বৈঠকে ভোটগ্রহণের স্থান ও পদ্ধতিসহ বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়। ভোটগ্রহণের জন্য জাতীয় সংসদের অধিবেশন কক্ষ ব্যবহার, যাবতীয় লজিস্টিক সাপোর্ট দেওয়া এবং সংসদ-সদস্যদের উপস্থিতি নিশ্চিত করার বিষয়েও কথা বলেন তারা। বৈঠকে ভারপ্রাপ্ত স্পিকার কায়সার কামাল বলেন, রাষ্ট্র কাঠামোর সর্বক্ষেত্রে ফ্যাসিস্টমুক্ত করতে হবে। ফ্যাসিবাদমুক্ত বাংলাদেশ বিনির্মাণে রাষ্ট্রপতি নির্বাচন একটি ঐতিহাসিক মাহেন্দ্রক্ষণ।ইসির ঘোষিত তফসিল অনুযায়ী, আগামী ২০ আগস্ট জাতীয় সংসদের অধিবেশন কক্ষে বেলা ২টা থেকে বিকাল ৫টা পর্যন্ত ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হবে। এতে প্রধানমন্ত্রী, বিরোধীদলীয় নেতাসহ ৩৪৯ জন সংসদ-সদস্য ভোট দেবেন। পরে ফলাফল ঘোষণা করবেন প্রধান নির্বাচন কমিশনার ও নির্বাচনের নির্বাচনি কর্তা এএমএম নাসির উদ্দিন। ভোটগ্রহণের জন্য ওইদিন সংসদ-সদস্যদের বৈঠক ডেকেছেন সিইসি।
রাষ্ট্রপতি পদে বিএনপি এখনো চূড়ান্ত প্রার্থী ঘোষণা করেনি। যদিও দলটির সর্বস্তরের সূত্রগুলো দাবি করেছে, দলীয় মনোনয়ন শেষ পর্যন্ত মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরই পাচ্ছেন এবং তিনিই হবেন দেশের ২৩তম রাষ্ট্রপতি। বিএনপি আজ বুধ বা কাল বৃহস্পতিবার সকালে প্রার্থীর নাম ঘোষণা করতে পারে। কারণ আগামীকাল বৃহস্পতিবার বিকাল ৪টা পর্যন্ত মনোনয়নপত্র দাখিলের শেষ সময়। এরই মধ্যে দলটির প্রার্থীর মনোনয়নপত্র জমা দিতে হবে। অপর দিকে এ নির্বাচনে জামায়াত নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোট এলডিপির চেয়ারম্যান কর্নেল (অব.) অলি আহমদকে প্রার্থী ঘোষণা করেছে। গতকাল পর্যন্ত অলি আহমদের পক্ষেও মনোনয়নপত্র জমা হয়নি।
জাতীয় সংসদে বৈঠকের পর মিডিয়া সেন্টারে জাতীয় সংসদের সরকারি দলের চিফ হুইপ মো. নূরুল ইসলাম মনি বলেন, ‘সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদ যেহেতু সংশোধিত হয়নি, সুতরাং এটা কার্যকর আছে। দলের সিদ্ধান্তের বাইরে কেউ ভোট দিতে পারবেন না। কেউ ভোট দিলে তার সংসদ-সদস্য পদ বাতিল হবে।সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদে বলা আছে, কেউ একটি দলের প্রার্থী হিসাবে নির্বাচিত হয়ে, সেই দল ছেড়ে দিলে তার সংসদ-সদস্য পদ চলে যাবে। এ ছাড়া সংসদে নিজের দলের বিরুদ্ধে ভোট দিলে তার আসন শূন্য হবে। তবে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে ৭০ অনুচ্ছেদ প্রয়োগ হওয়া না হওয়ার বিষয়ে নানা মত আছে। এরই পরিপ্রেক্ষিতে বিষয়টি সাংবাদিকরা সামনে আনলে চিফ হুইপ ওই মন্তব্য করেন।
রাষ্ট্রপতি নির্বাচন সম্পর্কে চিফ হুইপ আরও বলেন, ২০ আগস্ট সংসদকক্ষে বেলা ২টা থেকে বিকাল ৫টা পর্যন্ত রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে ভোটগ্রহণ হবে। সংসদ-সদস্যরা তাদের বিভক্তি সংখ্যা অনুযায়ী ভোট দেবেন। রাষ্ট্রপতি, সংসদ নেতা, বিরোধীদলীয় নেতা এবং ভারপ্রাপ্ত স্পিকার যখন ভোট দেবেন, তখন সেটি টেলিভিশনে সরাসরি সম্প্রচার করা হবে। ভোট গণনা থেকে শুরু করে ফলাফল হওয়া পর্যন্ত সরাসরি সম্প্রচার চলবে।অপর প্রশ্নের জবাবে নূরুল ইসলাম মনি বলেন, বিএনপির দলীয় প্রার্থী এখনো চূড়ান্ত হয়নি। প্রধানমন্ত্রীকে প্রার্থী চূড়ান্ত করার দায়িত্ব দিয়েছে বিএনপি, তিনি প্রার্থী ঘোষণা করবেন। বিরোধী দল থেকে প্রার্থী দেওয়া হয়েছে। এ কারণে সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্য আমরা বৈঠক করেছিলাম।
নির্বাচনে বিরোধী দলের অবস্থান সম্পর্কে জানতে চাইলে বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ নাহিদ ইসলাম বলেন, গণতন্ত্রের জন্য একটি অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন প্রয়োজন এবং আমরা দেশবাসীকে রাজনৈতিক অবস্থানটাও জানান দিতে চাই। আমাদের যিনি প্রার্থী তাকে আমরা মনে করছি এই মুহূর্তে বাংলাদেশের অভিভাবক হিসাবে তিনি সবচেয়ে গ্রহণযোগ্য হবেন। তিনি বলেন, ‘জুলাই সনদ’ অনুযায়ী রাষ্ট্রপতি নির্বাচনটা হওয়া উচিত ছিল। যেহেতু গণভোটের রায়ও সংস্কারের পক্ষে এসেছে, তাই ৭০ অনুচ্ছেদ সংস্কার করে রাষ্ট্রপতি নির্বাচন করা যেত। তাহলে নির্বাচিত রাষ্ট্রপতি আরও বেশি সম্মানিত ও গ্রহণযোগ্য হতো। নাহিদ বলেন, তারপরেও যেহেতু নির্বাচন হচ্ছে, এটাকে বিনা কনটেস্টে দিতে চাই না। আমরা সে কারণে বিরোধী দলের জায়গা থেকে প্রার্থী দিয়েছি।পরে চিফ হুইপ নূরুল ইসলাম দাবি করেন, জুলাই সনদ অনুযায়ীও রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের সময় বিদ্যমান ৭০ অনুচ্ছেদ প্রযোজ্য হবে।
জাতীয় সংসদের ভারপ্রাপ্ত স্পিকার কায়সার কামালের সভাপতিত্বে সভায় জাতীয় সংসদের চিফ হুইপ মো. নূরুল ইসলাম মনি, বিরোধী দলের চিফ হুইপ নাহিদ ইসলাম এবং সরকারদলীয় হুইপ জি কে গউছ, রকিবুল ইসলাম বকুল, মিয়া নুরুদ্দিন আহাম্মেদ অপু, আখতারুজ্জামান মিয়া ও এ বি এম আশরাফ উদ্দিন নিজান অংশগ্রহণ করেন। এছাড়া নির্বাচন কমিশনের সিনিয়র সচিব আখতার আহমেদ ও জাতীয় সংসদ সচিবালয়ের সচিব মো. গোলাম সরওয়ার ভুঁইয়া উপস্থিত ছিলেন।
পরে আগারগাঁওয়ের নির্বাচন ভবনে এসে ভোটগ্রহণ পদ্ধতি সম্পর্কে সাংবাদিকদের ব্রিফ করেন ইসির সিনিয়র সচিব আখতার আহমেদ। তিনি বলেন, ১৯৯১ সালের পর দীর্ঘ বিরতিতে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের ভোটগ্রহণ হচ্ছে আগামী ২০ আগস্ট। এতে সংসদ-সদস্যরা তাদের নিজ নিজ আসনে বসবেন। নির্বাচন কমিশনের সহায়তাকারী কর্মকর্তারা (স্পিকারসহ ২০ জন) ব্যালট পেপার সদস্যদের কাছে পৌঁছে দেবেন। সদস্যরা তাদের পছন্দের প্রার্থীকে চিহ্নিত করে সামনে রাখা তিনটি ব্যালট বক্সের যেকোনোটিতে ভোট প্রদান করবেন।
গণনা ও ফলাফল ঘোষণা বিষয়ে ইসি সচিব জানান, বিকাল ৫টায় ভোটগ্রহণ শেষ হওয়ার পর তাৎক্ষণিকভাবে অধিবেশন কক্ষেই ভোট গণনা করা হবে। মোট ব্যালট সংখ্যা ৩৪৯টি। গণনা শেষে প্রাথমিক ফলাফল সেখানে সিইসি ঘোষণা করবেন এবং পরবর্তীতে সচিবালয় থেকে চূড়ান্ত গেজেট প্রকাশ করা হবে। নির্বাচনি প্রক্রিয়া সংসদ থেকে সরাসরি সম্প্রচার করা হবে এবং সংবাদকর্মীদের জন্য নির্ধারিত বসার ব্যবস্থা থাকবে।
ইসি সচিব বলেন, ব্যালট পেপারের দুটি অংশ থাকবে। একটি হচ্ছে মুড়ি। এতে ক্রমিক নম্বর, ভোটারের নাম, বিভক্তি নম্বর এবং স্বাক্ষরের জায়গা থাকবে। অন্য অংশে প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীদের নাম থাকবে এবং পাশে ভোটারকে নাম লিখে স্বাক্ষর করতে হবে।সাংবাদিকদের বিভিন্ন প্রশ্নের জবাবে তিনি আরও বলেন, প্রার্থীর নামের পাশে ভোটারকে পূর্ণ নাম লিখে স্বাক্ষর করতে হবে।