শিশুর জ্বরের পথ্যেও ভয়ানক বিষের থাবা - Alokitobarta
আজ : শুক্রবার, ৩১শে জুলাই, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ১৬ই শ্রাবণ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

শিশুর জ্বরের পথ্যেও ভয়ানক বিষের থাবা


ডা.মুন্সী মুবিনুল হক:সবুজের আভা নয়, পুরো গায়ে টসটসে হলুদ-দেখতে এমন আকর্ষণীয় আনারসই এখন ভোক্তার জন্য বড় বিপৎসংকেত। দ্রুত লাভের আশায় গাছে থাকা অবস্থায় এবং সংগ্রহের পর ইথোফন, ক্যালসিয়াম কার্বাইড, বিভিন্ন রাসায়নিক ও হরমোন ব্যবহার করে পাকানো হচ্ছে আনারস।সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয়-জ্বরের সময় সহজপাচ্য ও ভিটামিনসমৃদ্ধ ফল হিসাবে শিশু থেকে বয়স্ক অনেকেই নিয়মিত আনারস খেয়ে থাকেন। কিন্তু সেই আনারসই শরীরে প্রবেশ করাচ্ছে ‘বিষ’।কৃষক পর্যায় থেকে শুরু হওয়া এই অনিয়ম পাইকারি বাজার ঘুরে খুচরা বিক্রেতার মাধ্যমে পৌঁছে যাচ্ছে সাধারণ ভোক্তার হাতে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন,এসব রাসায়নিকের দীর্ঘমেয়াদি প্রভাবে কিডনি ও লিভারের ক্ষতি, হরমোনের ভারসাম্যহীনতা, স্নায়ুতন্ত্রের জটিলতা এবং ক্যানসারসহ নানা প্রাণঘাতী রোগের ঝুঁকি বাড়ছে।বুধবার কথা হয় রাঙামাটির আনারসচাষি সায়মংয়ের সঙ্গে। তিনি বলেন, গাছে পাকা আনারস চেনা খুব সহজ। অনেকেই জানেন না বলেই বিষমাখা আনারস কিনে প্রতারিত হচ্ছেন এবং এসব খেয়ে স্বাস্থ্যঝুঁকিতে পড়ছেন। তিনি জানান, আনারস গাছে থাকা অবস্থায় পুরোপুরি হলুদ ও টসটসে হয় না। সবুজই থাকে। আনারসের গায়ে কিছুটা হলুদ রং আসে। তাও খুব সামান্য। কিন্তু ক্রেতা আনারস কিনতে গেলে টসটসে হলুদ দেখে কিনতে চান।বিভিন্ন রাসায়নিক ও হরমোন দিয়ে এমন রং ও মোটাতাজা করা হয়। যা নির্দিষ্ট মাত্রায় ব্যবহার করা যেতে পারে। কিন্তু অনেকেই এর ব্যবহার সম্পর্কে জানেন না। তাই তারা তাদের খেয়াল খুশিমতো বিষপ্রয়োগ করছে। এমনকি বিষপ্রয়োগের পরপরই গাছ থেকে আনারস তুলে ব্যাপারিদের কাছে বিক্রি করে দেয়। আর এই আনারস পাইকারি পর্যায় হয়ে খুচরা ক্রেতার হাতে চলে যায়। যা খুব ভয়ানক ব্যাপার।

এদিকে বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ (বিএফএসএ) ও বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ড অ্যান্ড টেস্টিং ইনস্টিটিউট (বিএসটিআই), জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর ও মাঠ প্রশাসনও বলছে বাজারে ভেজালের মাত্রা বেড়েছে উদ্বেগজনক হারে। মানুষের পাতে উঠা প্রতিদিনের এসব খাবারের সঙ্গেই মানবদেহে ঢুকছে ‘বিষ’।

মাছ, মাংস, ফল, মসলায় অতি মুনাফার লোভে মেশানো হচ্ছে ক্ষতিকর রাসায়নিক উপাদান। শিশুখাদ্য দুধ তৈরি হচ্ছে কেমিক্যাল দিয়ে। জিলাপিতে দেওয়া হচ্ছে হাইড্রোজ। জীবন রক্ষাকারী ওষুধেও মেশানো হচ্ছে ভেজাল। ফ্লেভার এবং কাপড়ে ব্যবহৃত রং মিশিয়ে বানানো হচ্ছে ফলের জুস। পাশাপাশি অপরিপক্ব ফল পাকাতে ব্যবহার করা হচ্ছে কার্বাইড ও হরমোন। যা শুধু সাধারণ মানুষই নয়, শিশুসহ অসুস্থ রোগীর পেটেও যাচ্ছে। নিত্যদিনের খাবারে বিষ মেশানো ভেজাল খাবারে জনস্বাস্থ্য হুমকির মুখে।

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা.শামীম আহমেদ বলেন,ভেজাল ও অস্বাস্থ্যকর খাবার এখন নীরব ঘাতকে পরিণত হয়েছে। সবকিছু চোখের সামনেই হচ্ছে। এসব খাবারে শিশুদের শারীরিক বৃদ্ধি ব্যাহত হচ্ছে। বিষমিশ্রিত খাবার মানুষের পেটে গিয়ে হজমে সমস্যা থেকে শুরু করে পাতলা পায়খানা ও ক্যানসারের মতো জটিল রোগের ঝুঁকি সৃষ্টি করছে। ভেজাল খাবার লিভার ও কিডনির মতো গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গের কার্যকারিতা নষ্ট করে ফেলছে।

নয়াবাজারে আনারস কিনছেন মো. শাহ আলম। তার সঙ্গে কথা হলে তিনি বলেন, আমার চার বছরের মেয়ের জ্বর। তাই বাজারে আনারস কিনতে এসেছি। সব আনারসই টসটসে হলুদ ও পাকা। বিক্রেতারা বলছেন এটা গাছপাকা। কিন্তু এই আনারসে কোনো মাছি বসে না। তাই বোঝাই যায় এতে ঝামেলা আছে। আনারসের মাথা ভেঙে কোনো গন্ধ পাওয়া যায় না। কী করব, যা আছে তাইতো নিতে হবে।

ইবনেসিনা মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের সিনিয়র কনসালট্যান্ট ডায়েটিশিয়ান সিরাজাম মুনিরা বলেন, যে খাবার থেকে রোগীর সুস্থতার জন্য পুষ্টি পাওয়ার কথা, সেই খাবারেই মিশে থাকে ভেজাল, ক্ষতিকর রাসায়নিক, অতিরিক্ত অ্যান্টিবায়োটিক বা ভারী ধাতু। শিশুরা বিষমাখা খাবার খাওয়ার ফলে বিভিন্ন ধরনের অ্যালার্জি, সংক্রমণ ও দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্যঝুঁকিতে আক্রান্ত হয়ে পড়ছে। এসব খাবারে ক্যানসার, কিডনি ও লিভারসহ নানা জটিল রোগের ঝুঁকি বাড়ছে।

জানতে চাইলে কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) কেন্দ্রীয় কমিটির ভাইস প্রেসিডেন্ট এসএম নাজের হোসাইন বলেন, খাদ্যে বিষ ও ভেজাল রোধে সরকার ফরমালিন নিয়ন্ত্রণ আইন-২০১৫, নিরাপদ খাদ্য আইন-২০১৩ এবং ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ আইন-২০০৯ প্রণয়ন করেছে।

এমনকি ১৯৭৪ সালের বিশেষ ক্ষমতা আইনেও খাদ্যে ভেজাল দেওয়া ও বিক্রির সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ডের বিধান রয়েছে। কিন্তু এসব আইনের যথাযথ প্রয়োগ না থাকায় জনগণ ভেজাল খাদ্যের জালে আটকে গেছে। তিনি বলেন, তদারকি সংস্থার জনবল বাড়িয়ে মাঠপর্যায় থেকে শুরু করে ভোক্তার কাছে পৌঁছানো পর্যন্ত কঠোরভাবে তদারকি করতে হবে। অনিয়ম পেলেই দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির আওতায় আনতে হবে। এতে ভোক্তা স্বস্তি পাবে।

নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের সদস্য (জনস্বাস্থ্য ও পুষ্টি) ড. মোহাম্মদ মোস্তফা বলেন, আমরা বাজার থেকে পণ্যের নমুনা সংগ্রহ করে ল্যাবে টেস্ট করি। সেখানে ভেজাল পেলে ওইসব পণ্য বিক্রেতাদের চিঠি দেই। আবারও নমুনা সংগ্রহ করে ফলোআপ করি। যদি দেখি পণ্যে ভেজাল আছে সেক্ষেত্রে অসাধুদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করি।

Top