শেষ মুহূর্তে পরিচালন ব্যয় বাড়ল ৮ হাজার কোটি - Alokitobarta
আজ : শনিবার, ১৫ই আগস্ট, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ৩১শে শ্রাবণ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

শেষ মুহূর্তে পরিচালন ব্যয় বাড়ল ৮ হাজার কোটি


মোহাম্মাদ আবুবকর সিদ্দীক ভুঁইয়া :নবম জাতীয় পে-স্কেল বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেওয়ায় শেষ মুহূর্তে অনুৎপাদনশীল এ খাতে আরও ৮ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ বাড়ানো হয়েছে। এর ফলে পরিচালন ব্যয় লাফিয়ে বেড়ে ৬ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকায় দাঁড়াচ্ছে, যা ৩ লাখ কোটি টাকার বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির (এডিপি) দ্বিগুণেরও বেশি। বিশাল এই পরিচালন ব্যয় মেটাতে গিয়ে উন্নয়ন খাত যেমন সংকুচিত হচ্ছে, তেমনই অর্থনীতিতে মূল্যস্ফীতির নতুন চাপ তৈরি হতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন বিশেষজ্ঞরা। তারা বলছেন, শুধু বেতন বৃদ্ধি নয়, বরং কাঠামোগত সংস্কারের মাধ্যমে রাজস্ব আয় এবং সরকারি সেবার মান বাড়াতে না পারলে বিশাল ঘাটতির এই বাজেট বাস্তবায়ন বড় চ্যালেঞ্জের মুখে পড়বে। কঠোর ব্যয় সংকোচনের ঘোষণা থাকলেও আসন্ন ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জাতীয় বাজেটে পরিচালন ব্যয়ের লাগাম টানা সম্ভব হচ্ছে না। ধারণা করা হচ্ছে, এর আগে মে মাসে বাজেটের প্রাথমিক রূপরেখা তৈরির সময় পরিচালন ব্যয়ের জন্য ৬ লাখ ৩০ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ রাখার প্রস্তাব ছিল। একই সঙ্গে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি) বাস্তবায়নে ৩ লাখ কোটি টাকা বরাদ্দের অনুমোদন দেওয়া হয়। কিন্তু নবম জাতীয় পে-স্কেল বাস্তবায়নের সিদ্ধান্ত সামনে আসার পর হিসাবনিকাশ বদলে যায়। নতুন পে-স্কেলের প্রথম ধাপ কার্যকর করতে বাজেটে অতিরিক্ত ৩৭ হাজার কোটি টাকার প্রয়োজন হবে। তাই শেষ পর্যন্ত পরিচালন ব্যয়ে আরও ৮ হাজার কোটি টাকা যুক্ত করা হয়। এর ফলে সামগ্রিক বাজেটের আকার বেড়ে হয়েছে ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকা।

অর্থ বিভাগের কর্মকর্তারা বলছেন, নতুন পে-স্কেল বাস্তবায়নের ফলে সরকারি চাকরিজীবীদের ক্রয়ক্ষমতা বাড়বে। এতে বাজারে চাহিদা বৃদ্ধি পাবে এবং অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে কিছু ইতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। তবে উৎপাদন না বাড়িয়ে ভোগ ব্যয় বাড়লে মূল্যস্ফীতির ওপর নতুন চাপ সৃষ্টি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

এ প্রসঙ্গে সাবেক অর্থ সচিব মাহবুব আহমেদ বলেন, বহু বছর ধরে বেতন কাঠামোয় বড় ধরনের সমন্বয় হয়নি। মূল্যস্ফীতি এবং জীবনযাত্রার ব্যয় বিবেচনায় বেতন বাড়ানো প্রয়োজন ছিল। তবে এই ব্যয়ের বিপরীতে প্রশাসনিক দক্ষতা ও সেবার মানও বাড়তে হবে। শুধু বেতন বৃদ্ধি করলে রাষ্ট্রের ব্যয় বাড়বে; কিন্তু কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া যাবে না। তিনি আরও বলেন, বর্তমানে সরকারের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হচ্ছে রাজস্ব আয় বৃদ্ধি। যদি রাজস্ব আহরণ উল্লেখযোগ্যভাবে না বাড়ে, তাহলে বাড়তি ব্যয় মেটাতে সরকারকে ঋণের ওপর আরও বেশি নির্ভর করতে হবে। এতে বেসরকারি খাতের জন্য ঋণপ্রবাহ সংকুচিত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।

এদিকে পরিচালন ব্যয়ের এই লাগামহীন বৃদ্ধির কারণে ক্রমাগত সংকুচিত হয়ে পড়ছে উন্নয়ন খাতের পরিধি। ফলে থমকে যাচ্ছে নতুন অবকাঠামো নির্মাণ এবং সরকারি বিনিয়োগের গতি। একটি উন্নয়নশীল দেশের জন্য পরিচালন ব্যয় ও উন্নয়ন ব্যয়ের মধ্যে একটি সুস্থ ভারসাম্য থাকা জরুরি বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। তারা বলছেন, এই ভারসাম্য ফিরিয়ে আনতে হলে কঠোর ব্যয় সংকোচন নীতি, সরকারি কর্মকর্তাদের অপ্রয়োজনীয় বিদেশ ভ্রমণ, বিলাসবহুল গাড়ি কেনা এবং অনুৎপাদনশীল খাতের খরচ কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। অন্যদিকে, রাজস্ব আয় বাড়ানো, ভর্তুকি ব্যবস্থার সংস্কার, এডিপি বাস্তবায়নে দক্ষতা বৃদ্ধি, অবকাঠামো খাত উন্নয়নে সরকারি বিনিয়োগ বাড়ানোর মতো পদক্ষেপ নিতে হবে।

এ প্রসঙ্গে পলিসি এক্সচেঞ্জ বাংলাদেশের চেয়ারম্যান এম মাসরুর রিয়াজ বলেন,সরকারি ব্যয়ের দক্ষতা এবং রাজস্ব খাতের কাঠামোগত সংস্কারের ওপর জোর দেওয়া সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ। বর্তমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতিতে যে কোনো ধরনের অপ্রয়োজনীয় পরিচালন ব্যয় বা অপচয় কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করা উচিত। বাজেট বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে শুধু বরাদ্দের আকার না বাড়িয়ে ব্যয়ের গুণগত মান নিশ্চিত করা এবং বেসরকারি খাতের জন্য বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ ধরে রাখতে সরকারকে কৃচ্ছ্রসাধন নীতি অনুসরণ করতে হবে।

Top