কেউ বা গোপনে ষড়যন্ত্র করছে ,কেউ প্রকাশ্যে
জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক,আলোকিত বার্তা:প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান বলেছেন, কেউ প্রকাশ্যে এবং কেউ গোপনে এখনো ষড়যন্ত্র করছে।দলের নেতাকর্মীদের সতর্ক করে তিনি বলেন, থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়া যাবে না।জনগণ আমাদের যেভাবে সমর্থন করেছে সেই সমর্থন ধরে রাখতে হবে।এদিন সিলেটের উন্নয়নে ৪ হাজার ৬৩৫ কোটি টাকার মেগা প্রকল্প উদ্বোধন ও ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপনসহ দিনভর নানামুখী কর্মসূচিতে ব্যস্ত সময় পার করেছেন প্রধানমন্ত্রী।তাদের রাজনৈতিকভাবে মোকাবিলা করতে হবে।আমি অনেক কিছুই জানি,সময়মতো সব বলব।সিলেট সফরকালে শনিবার সন্ধ্যায় জেলা শিল্পকলা একাডেমিতে বিএনপি আয়োজিত কর্মী সমাবেশে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি একথা বলেন।
প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব গ্রহণের পর প্রথম সিলেট সফরে এসে গতকাল তিনি আধ্যাত্মিক রাজধানীখ্যাত এই নগরীকে একটি আধুনিক পর্যটন ও ‘ভাইব্রেন্ট সিটি’ হিসাবে গড়ে তোলার ঘোষণা দেন। সফরের অন্যতম প্রধান আকর্ষণ ছিল তৃণমূল থেকে ক্রীড়া প্রতিভা অন্বেষণের লক্ষ্যে সরকারি বিশেষ উদ্যোগ ‘নতুন কুঁড়ি স্পোর্টস-২০২৬’-এর জমকালো উদ্বোধন। এছাড়া সড়ক ও রেলপথে ঢাকার সঙ্গে সিলেটের দূরত্ব কমিয়ে আনতে ডাবল রেললাইন স্থাপনসহ একগুচ্ছ উন্নয়ন পরিকল্পনা তুলে ধরেন সরকারপ্রধান।
সকাল ১০টায় তুমুল বৃষ্টির মধ্যে সিলেটে পৌঁছান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। সফরসঙ্গী হিসাবে তার সঙ্গে ছিলেন সহধর্মিণী ডা. জোবাইদা রহমান। সিলেটে পৌঁছেই তিনি প্রথমে সুফিসাধক হজরত শাহজালাল (রহ.)-এর মাজার জিয়ারত করেন। এরপর বেলা সাড়ে ১১টার দিকে নগরীর চাঁদনীঘাট এলাকায় সুরমা নদী তীর উন্নয়ন ও সৌন্দর্যবর্ধন প্রকল্পের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন প্রধানমন্ত্রী। বাস্তবায়নাধীন এই মেগা প্রকল্পের আওতায় নদীর দুই তীরে বন্যা প্রতিরোধী অবকাঠামো ও বিনোদনকেন্দ্র গড়ে তোলা হবে। এ সময় প্রধানমন্ত্রী নির্ধারিত সময়ের মধ্যে গুণগতমান বজায় রেখে কাজ শেষ করার নির্দেশ দেন।
উদ্বোধন শেষে নগর ভবনে সিলেট সিটি করপোরেশন আয়োজিত এক সুধী সমাবেশে যোগ দেন প্রধানমন্ত্রী। সমাবেশে তিনি সিলেট-ঢাকা যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ ঘোষণা দেন। প্রধানমন্ত্রী বলেন, নির্বাচনের আগে আমি যখন সিলেট এসেছিলাম তখন বলেছিলাম, সিলেট থেকে লন্ডন যেতে সাড়ে ৯ ঘণ্টা সময় লাগে, অথচ সিলেট থেকে সড়কপথে ঢাকা যেতে ১০ ঘণ্টা সময় লাগে। এই চিত্র আমরা বদলাতে চাই। সিলেট-ঢাকা মহাসড়ক সম্প্রসারণের জমি অধিগ্রহণের সমস্যাগুলো আমরা দূর করেছি, দ্রুতই কাজ শুরু হবে। সড়কপথের পাশাপাশি আমরা ঢাকা-সিলেট রেলপথকে ডাবল লাইন করার পরিকল্পনা নিয়েছি।
তিনি আরও বলেন, সিলেটে পরিত্যক্ত অবস্থায় থাকা ২০০ শয্যার হাসপাতাল দ্রুত চালু করা হবে এবং ওসমানী হাসপাতালকে ১২০০ শয্যায় উন্নীত করার চেষ্টা চলছে। সারা দেশে রোগ প্রতিরোধ সচেতনতায় ১ লাখ স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগ করা হবে, যার ৮০ শতাংশই হবেন নারী।
নগরের জলাবদ্ধতা প্রসঙ্গে সরকারপ্রধান বলেন, চাঁদনীঘাটে যে প্রকল্পের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করলাম, সেটি বাস্তবায়িত হলে সিলেটে আর জলাবদ্ধতা থাকবে না। তবে নদী ও পরিবেশ রক্ষায় মানুষের সচেতনতা জরুরি। নদীতে প্লাস্টিকের স্তর জমে পানি বিষাক্ত হয়ে যাচ্ছে, স্কুল পর্যায় থেকে শিশুদের এ বিষয়ে সচেতন করে তুলতে হবে।
নগর ভবনের এই সমাবেশে সিসিক প্রশাসক আব্দুল কাইয়ুম চৌধুরীর সভাপতিত্বে আরও বক্তব্য রাখেন শিল্প ও বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির, শ্রম ও কর্মসংস্থানমন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী, প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্রবিষয়ক উপদেষ্টা হুমায়ুন কবির, হুইপ জিকে গউছ এবং সিসিক-এর প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা রেজাই রাফিন সরকার।
দুপুরে প্রধানমন্ত্রী সিলেট সদর উপজেলার কান্দিগাঁও ইউনিয়নে যান। সেখানে তিনি ‘বাসিয়া নদী পুনঃখনন’ কাজের উদ্বোধন করেন। ১৯৭৯ সালে তৎকালীন রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান তার খাল কাটা কর্মসূচির আওতায় সর্বশেষ নদীটি খনন করেছিলেন। নদী তীরে আয়োজিত এক বিশাল জনসভায় প্রধানমন্ত্রী যখন বক্তব্য দিতে মঞ্চে ওঠেন, তখন উপস্থিত জনতা ‘দুলাভাই, দুলাভাই’ স্লোগানে আকাশ-বাতাস মুখরিত করে তোলেন। সিলেট প্রধানমন্ত্রীর শ্বশুরবাড়ি হওয়ায় জনতা তাকে এই সম্বোধনে স্বাগত জানান। এতে হাস্যরস সৃষ্টি হলে প্রধানমন্ত্রী কৌতুক করে বলেন, ‘দুলাভাইকে কথা বলতে না দিলে দুলাভাই যাবে গিয়া, যাই আমি। যাব?’ উপস্থিত জনতা তখন উচ্চস্বরে ‘না’ বলে ওঠেন। প্রধানমন্ত্রী তখন বলেন, চুপ করতে হবে, আমি কথা বলি, শ্বশুরবাড়ির লোকজনকে শুনতে হবে।
নদী খনন নিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, খাল পুনঃখননের মাধ্যমে প্রায় ৮০ হাজার কৃষক উপকৃত হবেন এবং ৭ হাজার টন অতিরিক্ত ফসল উৎপাদিত হবে। আমরা দেশের ৬০ জেলায় খাল খনন শুরু করেছি। কৃষকদের জন্য সুখবর দিয়ে তিনি বলেন, নির্বাচনের ১০ দিন পরই ১২ লাখ কৃষকের ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত ঋণ সুদসহ মওকুফ করা হয়েছে। কৃষি কার্ডের মাধ্যমে সার ও বীজ নিশ্চিত করা হচ্ছে। বিকালে প্রধানমন্ত্রী সিলেট জেলা স্টেডিয়ামে ‘নতুন কুঁড়ি স্পোর্টস-২০২৬’-এর আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন।
সফরের বিভিন্ন কর্মসূচিতে আরও উপস্থিত ছিলেন প্রধানমন্ত্রীর সহধর্মিণী ডা. জোবাইদা রহমান, বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির, শ্রম ও প্রবাসী কল্যাণমন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী, পানিসম্পদমন্ত্রী শহীদউদ্দীন চৌধুরী অ্যানি, প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা হুমায়ুন কবির, হুইপ জিকে গউছ, সিলেট-৩ আসনের সংসদ-সদস্য এমএ মালিক, সিলেট-৬ আসনের সংসদ-সদস্য অ্যাডভোকেট এমরান আহমদ চৌধুরী, সিলেট-২ আসনের সংসদ-সদস্য মোছা. তাহসিনা রুশদীর লুনা, সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ-সদস্য শাম্মী আক্তার, সিসিকের প্রশাসক আব্দুল কাইয়ুম চৌধুরী, জেলা পরিষদের প্রশাসক আবুল কাহের শামীম, বিএনপির সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক মিফতাহ সিদ্দিকী, মহানগর বিএনপির সাধারণ সম্পাদক ইমদাদ হোসেন চৌধুরী, মুক্তিযোদ্ধা আব্দুর রাজ্জাকসহ প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা।
ব্যস্ততম এই সফরের ফাঁকে প্রধানমন্ত্রী সার্কিট হাউজে সিলেটের ঐতিহ্যবাহী খাবার ‘সাতকড়া দিয়ে গরুর মাংস’ দিয়ে মধ্যাহ্নভোজ সম্পন্ন করেন। সন্ধ্যায় জেলা শিল্পকলা একাডেমিতে দলীয় নেতাদের সঙ্গে মতবিনিময় শেষে তিনি ঢাকার উদ্দেশে সিলেট ত্যাগ করেন।
এখনো ষড়যন্ত্র করছে, আপনাদের ঐক্যবদ্ধ হতে হবে : সিলেট শিল্পকলা একাডেমিতে বিএনপি আয়োজিত কর্মী সমাবেশে প্রধানমন্ত্রী আরও বলেন, আগামী স্থানীয় সরকার নির্বাচনের আগে আপনাদের ঐক্যবদ্ধ হতে হবে। আমি অনেক কিছুই জানি, সময়মতো সব বলব। তারেক রহমান দলীয় সংসদ-সদস্যদের গ্রুপিং রাজনীতি থেকে দূরে থাকার আহ্বান জানিয়ে বলেন, আপনারা দলের কর্মীদের অমুকের লোক বা তমুকের লোক বলবেন না, এতে বিভক্তি বাড়বে।
অতীত আন্দোলনে নেতাকর্মীদের ত্যাগের কথা স্মরণ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আপনারা আন্দোলন-সংগ্রাম করেছেন এবং অনেক কষ্ট সহ্য করেছেন। পরিবারের জন্য যেমন মায়া আছে, দলের জন্যও তেমনই মমত্ববোধ থাকতে হবে। আপনাদের আচরণে যাতে কোনো সাধারণ মানুষ বা কর্মী কষ্ট না পায়, সেদিকে বিশেষ খেয়াল রাখতে হবে। কর্মীদের উদ্দেশে তিনি আরও বলেন, আমি সরকারি দলের লোক-এই অহংকার মাথা থেকে সরিয়ে সব সময় ভাবতে হবে আমি দলের একজন সাধারণ কর্মী। কেউ ভুল করলে তাকে বোঝাতে হবে এবং শাসন করতে হবে; যদি সে না মানে তবেই তার বিরুদ্ধে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নিন।
প্রধানমন্ত্রী আগামী তিন মাসের সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা নিয়ে কাজ করার নির্দেশনা দিয়ে বলেন, কীভাবে জনগণের আরও কাছাকাছি যাওয়া যায়, সেই লক্ষ্য নিয়ে এগোতে হবে। একই সঙ্গে তিনি স্থানীয় সরকার নির্বাচনের প্রস্তুতি নিতে তৃণমূল কর্মীদের প্রতি আহ্বান জানান।
মহানগর বিএনপির ভারপ্রাপ্ত সভাপতি রেজাউল হাসান লোদী কয়েসের সভাপতিত্বে এবং জেলা সাধারণ সম্পাদক এমরান আহমদ চৌধুরী ও নগর সাধারণ সম্পাদক এমদাদ হোসেন চৌধুরীর যৌথ পরিচালনায় সভায় স্থানীয় জ্যেষ্ঠ নেতারা বক্তব্য দেন। অনুষ্ঠানে বিএনপি ও এর অঙ্গ-সহযোগী সংগঠনের শীর্ষ নেতাদের পরিচয় করিয়ে দেওয়া হয়।
প্রধানমন্ত্রীকে মঞ্চে রেখে যা বললেন সিলেটের দুই মন্ত্রী : সুধী সমাবেশে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে মঞ্চে রেখে গুরুত্বপূর্ণ বক্তব্য দিয়েছেন সিলেটের দুই মন্ত্রী। শিল্প ও বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির এবং শ্রম ও কর্মসংস্থানমন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী সিলেটকে ঘিরে ‘বৈষম্যের অভিযোগ’ ও বিগত সরকারের সময়কার তিক্ত অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরেন।
শিল্প ও বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির বলেন, সিলেটের যে কারও হাতে মাইক্রোফোন দিলেই প্রথমেই বলা হয় সিলেট বৈষম্যের শিকার, কিন্তু আমি পুরোপুরি তা মানি না। তিনি স্মরণ করিয়ে দেন, সাবেক অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী এম সাইফুর রহমান এই অঞ্চলের সংসদ-সদস্য থাকাকালে অন্য অঞ্চলের বরাদ্দ কেটে এনে সিলেটের উন্নয়ন করেছেন বলে ধারণা প্রচলিত আছে। এরপরই তিনি পরবর্তী সময়ের তুলনা টেনে বলেন, সিলেট থেকে আরও দুজন মন্ত্রী দায়িত্ব পালন করেছিলেন, তাই বিষয়টি বৈষম্যের শিকার নাকি ওই মন্ত্রীদের পারফরম্যান্সের সমস্যা তা ভাবা দরকার।
অন্যদিকে শ্রম ও কর্মসংস্থানমন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরীর কণ্ঠে ঝরেছে বিগত সরকারের সময়কার অবহেলার আক্ষেপ। তিনি অভিযোগ করেন, নগরের জলাবদ্ধতা নিরসনে যে প্রকল্পগুলো আজ উদ্বোধনের পর্যায়ে এসেছে, সেগুলোর প্রস্তাব তিনি মেয়র থাকাকালেই জমা দিয়েছিলেন। কিন্তু বিরোধীদলীয় মেয়র হওয়ায় সেসব উদ্যোগ অনুমোদন পায়নি এবং আওয়ামী লীগের শাসনামলে এক দশকেও কোনো বড় প্রকল্প বাস্তবায়ন হয়নি। তিনি আরও জানান, সিলেটের ওয়াটার ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট এবং বর্জ্য ব্যবস্থাপনা নিয়ে বিশ্বব্যাংকের প্রকল্পটিও চূড়ান্ত পর্যায়ে গিয়ে থেমে গিয়েছিল।
নগরের জলাবদ্ধতা নিরসনে লাক্কাতুরা এলাকা থেকে ছড়া খনন করে সুরমা নদীর সঙ্গে সংযোগ স্থাপনের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেন আরিফুল হক চৌধুরী। তিনি বিশ্বাস করেন, বর্তমান সরকারের সময়েই এই উদ্যোগ বাস্তবায়ন সম্ভব।