আজ জুলাই সনদ এবং রাজনৈতিক বিষয় নিয়ে অনেকে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করছে ,সতর্ক থাকুন যাতে কেউ বিশৃঙ্খলা করতে না পারে
জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক,আলোকিত বার্তা:আমাদের সিদ্ধান্ত নিতে হবে-যারা স্বৈরাচার পালিয়ে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে বলেছিল আমরা ক্ষমা করে দিলাম, যারা স্বৈরাচারের সঙ্গে ঢাকার বাইরে গিয়ে গোপনে মিটিং করে; তারা জনগণের কথা বলছে নাকি যারা ফ্যামিলি কার্ড, কৃষক কার্ড, বেকারদের জন্য কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করছে, তারা জনগণের কথা বলছে। কোন বিষয়গুলো আপনাদের কাছে জরুরি, সেটি বিবেচনা করতে হবে। প্রধানমন্ত্রী বলেন, ফ্যাসিস্ট সরকারের বিদায়ের পর আমরা রাজনৈতিক দলগুলো জাতীয় সংসদের দক্ষিণ প্লাজায় জুলাই জাতীয় সনদে স্বাক্ষর করেছিলাম। সেই সনদের প্রতিটি শব্দ, প্রতিটি লাইন বিএনপি জাতীয় সংসদে পাশ করবে। তিনি দেশবাসীকে উদ্দেশ করে বলেন, আমাদের সবাইকে সতর্ক থাকতে হবে, যাতে কেউ এই দেশে আর কোনো বিশৃঙ্খলা করতে না পারে। জনগণের শান্তি বিঘ্ন করে আবারও ১৭৩ দিনের হরতাল করতে চাইলে আমরা তাদের সেই সুযোগ দেব না। কোনো জুজুবুড়ির ভয় দেখিয়ে বাংলাদেশের মানুষকে পিছিয়ে রাখা যাবে না।যশোরে জনাকীর্ণ জনসভায় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেছেন, আজ জুলাই সনদ এবং রাজনৈতিক বিষয় নিয়ে অনেকে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করছে।
প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান সোমবার বিকালে যশোর কেন্দ্রীয় ঈদগাহে জেলা বিএনপি আয়োজিত জনসভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে এসব কথা বলেন। প্রধানমন্ত্রী সোমবার দিনভর যশোরে নানা কর্মসূচিতে ব্যস্ত সময় পার করেন। সকালে ঢাকা থেকে যশোর বিমানবন্দরে নেমে সড়কপথে সোজা চলে যান শার্শার উলাশীতে। সেখানে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের স্মৃতিবিজড়িত উলাশী-যদুনাথপুর খাল পুনঃখনন কাজ উদ্বোধন করেন। সেখান থেকে যশোর মেডিকেল কলেজে এসে ৫০০ শয্যাবিশিষ্ট হাসপাতালের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন। এরপর যান ঐতিহ্যবাহী যশোর ইনস্টিটিউট পাবলিক লাইব্রেরি পরিদর্শনে। সেখান থেকে যশোর সার্কিট হাউজে এসে এরপর বিকাল সাড়ে ৪টার দিকে হেঁটে যান জনসভাস্থলে। খাল পুনঃখনন উপলক্ষ্যে যশোরের শার্শা উপজেলার উলাশী এক উৎসবমুখর মিলনমেলায় পরিণত হয়। সেখানে বহু মানুষের ভিড় আর উন্নয়নের প্রত্যাশার মাঝে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ঘোষণা করেন নতুন কর্মসূচির। তিনি বললেন, মা-বোনদের রান্নার কষ্ট কমাতে সরকার এবার ‘এলপিজি কার্ড’ দেবে। এই এক বাক্যেই উপস্থিত নারীদের মুখে ফুটে ওঠে স্বস্তির হাসি।
যশোরের জনসভায় একটি রাজনৈতিক দলকে উদ্দেশ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, তারা ১৯৭১ সালে মহান স্বাধীনতাযুদ্ধের সময় মানুষকে বিভ্রান্ত করার চেষ্টা করেছিল। ১৯৯৬ এবং ২০০৮ সালেও করেছিল। আজ ২০২৬ সালে এসেও সেই একই অপচেষ্টা করছে। আমাদের দীর্ঘদিনের আন্দোলন, সংগ্রাম আর রক্তের বিনিময়ে স্বৈরাচার বিতাড়িত হয়েছে। এখন সময় দেশ গড়ার, দেশকে সামনে নিয়ে যাওয়ার এবং দেশের মানুষের ভাগ্যের পরিবর্তন করার।
যশোর জেলা বিএনপির সভাপতি অ্যাডভোকেট সৈয়দ সাবেরুল হক সাবুর সভাপতিত্বে জনসভায় তারেক রহমান আরও বলেন, একটি গোষ্ঠী নির্বাচনের আগে বায়বীয় টিকিট বিক্রি করেছে। আমরা কোনো টিকিট বিক্রি করি না। সে কারণে দেশের মানুষ শহীদ জিয়ার দল, বেগম খালেদা জিয়ার দল বিএনপিকে ভোটে নির্বাচিত করেছে কাজ করার জন্য। আমরা কাজে বিশ্বাসী। কেননা আল্লাহপাক বলেছেন, যারা নিজেরা পরিশ্রম করে, আমি তাদের সহায়তা করি।
নারীশিক্ষার বিষয়ে তিনি বলেন, দেশের অর্ধেক জনগোষ্ঠীকে পেছনে রেখে উন্নয়ন কিংবা সামনে এগিয়ে নেওয়া সম্ভব নয়। এই জনগোষ্ঠীকে স্বাবলম্বী করতে, তাদের শিক্ষার হার বৃদ্ধি করতে বর্তমান সরকার নারীদের ডিগ্রি পর্যন্ত অবৈতনিক শিক্ষা এবং কৃতী শিক্ষার্থীদের জন্য বৃত্তির ব্যবস্থা করবে। আমরা দুইদিন আগে সিদ্ধান্ত নিয়েছি, মেয়েদের রান্নার কষ্ট লাঘব করতে ফ্যামিলি কার্ডের মতো এলপিজি (গ্যাস) কার্ডের ব্যবস্থাও করব। যাতে রান্না করতে গিয়ে আমাদের মা-বোনদের কষ্ট না হয়।
তিনি বিরোধী দলের উদ্দেশে বলেন, আপনারা অপেক্ষা করেন। আগামী দিনে যদি দেশের মানুষ আপনাদের প্রতি আস্থা রাখে, আপনাদের নির্বাচিত করে; তাহলে আপনারা তখন আপনাদের কাজ করবেন। এখন জনগণ পাঁচ বছরের জন্য আমাদের ম্যান্ডেট দিয়েছে। এখন বিএনপি নির্বাচনি প্রতিশ্রুতির পাশাপাশি জাতীয় প্রতিশ্রুতি জুলাই সনদও বাস্তবায়ন করবে।
জনসভায় অন্যদের মধ্যে বক্তব্য দেন বিএনপির কেন্দ্রীয় ভাইস চেয়ারম্যান অধ্যাপক নার্গিস বেগম, পানিসম্পদমন্ত্রী শহীদউদ্দীন চৌধুরী এ্যানি, স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন বকুল, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত, পানিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী ফরহাদ হোসেন আজাদ, বিএনপির কেন্দ্রীয় সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক জয়ন্ত কুমার কুণ্ডু, কেন্দ্রীয় সদস্য ইঞ্জিনিয়ার টিএস আইয়ূব, সাবেরা সুলতানা মুন্নী, আবুল হোসেন আজাদ, জেলা বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক মুনীর আহমেদ সিদ্দিকী বাচ্চু, নগর বিএনপির সভাপতি বিপ্লব চৌধুরী মুল্লুকচাঁদ, সদর উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক মঞ্জুরুল হক খোকন, জেলা যুবদলের সভাপতি এম তমাল আহমেদ, সাধারণ সম্পাদক আনছারুল হক রানা, স্বেচ্ছাসেবক দলের আহ্বায়ক মোস্তফা আমির ফয়সাল প্রমুখ।
পাঁচ দশকের ব্যবধানে পিতা-পুত্রের ইতিহাস একাকার : ১৯৭৬ সালের ১ নভেম্বর উলাশী-যদুনাথপুর খাল খনন কর্মসূচি উদ্বোধন করেছিলেন তৎকালীন রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান। তখন স্বেচ্ছাশ্রমভিত্তিক খাল খনন কর্মসূচিতে ব্যাপক সাড়া পড়ে। ৫০ বছর পর সোমবার বাবার স্মৃতিবিজড়িত সেই উলাশী-যদুনাথপুর খাল পুনঃখনন কাজের উদ্বোধন করলেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। পাঁচ দশকের ব্যবধানে পিতা-পুত্রের দুই ইতিহাস একাকার হলো। খাল পুনঃখনন অনুষ্ঠানে তারেক রহমানকে কাছে পেয়ে স্মৃতির ঝাঁপি খুলে দেন ৮২ বছর বয়সি শাহাদাত হোসেন। পঞ্চাশ বছর আগে রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের সঙ্গে ঝুড়ি-কোদাল হাতে খাল খননকাজে নেমেছিলেন ৩০ বছরের টগবগে যুবক শাহাদাত। একই স্থানে দাঁড়িয়ে দুই প্রজন্মের ইতিহাসের সাক্ষী হলেন তিনি।
উলাশী খাল পুনঃখনন কর্মসূচির উদ্বোধন শেষে প্রবীণদের সঙ্গে কুশল বিনিময়ের সময় বয়সের ভারে ন্যুব্জ শাহাদাত হোসেনকে দেখে প্রধানমন্ত্রী নিজেই এগিয়ে যান। সহাস্যে জিজ্ঞাসা করেন, ‘চাচা, আমার বাপের নাম কী?’
জবাবে আবেগাপ্লুত শাহাদাত হোসেন গর্বের সঙ্গে বলেন, শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান। তিনি প্রধানমন্ত্রীকে বলেন, আপনার বাবা রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান আর মা বেগম খালেদা জিয়াও তো প্রধানমন্ত্রী ছিলেন। এরপর প্রধানমন্ত্রী তার বয়সের কথা জানতে চাইলে শাহাদাত হোসেন জানান, যখন এই খালের কাজ শুরু হয়েছিল, তখন তার বয়স ছিল ৩২ বছর, আর এখন তিনি অশীতিপর বৃদ্ধ।
একপর্যায়ে প্রধানমন্ত্রী হাসিমুখে জিজ্ঞেস করেন, চাচা, আজ কাটতে পারবেন না খাল? প্রধানমন্ত্রীর এমন রসিকতায় শাহাদাত হোসেন খুশিতে ধরা গলায় বলেন, বাবার সঙ্গে একবার এই মাটিতে কোদাল দিয়েছিলাম,এখন কি আর সেই শক্তি আছে বাজান! বাবা জিয়াউর রহমানের হাতের সেই কোদাল সন্তান তারেক রহমানের হাতে দেখে বেজায় খুশি শাহাদাত হোসেন।