ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়ায়? একটা বয়ান তৈরি করে বলা হচ্ছে যে, সংকট নেই
মোহাম্মাদ মুরাদ হোসেন:ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে রোদে পুড়ে বৃষ্টিতে ভিজে মানুষ সামান্য তেল সংগ্রহ করছে, তা চাহিদার তুলনায় অপ্রতুল। অথচ আশ্চর্যের বিষয়, সংসদে মন্ত্রীদের বিবৃতি শুনলে মনে হয় দেশটা তেলের ওপর ভাসছে। বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ও সংসদে বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান জ্বালানি সংকটকে যুদ্ধের কারণে সৃষ্ট বৈশ্বিক সমস্যা হিসাবে উল্লেখ করে বলেছেন, সরকার জনগণের সঙ্গে লুকোচুরি খেলছে। তিনি বলেন, আমরা সবাই ভুক্তভোগী। শুক্রবার ঢাকার মগবাজারে আল-ফালাহ মিলনায়তনে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর ‘জেলা ও মহানগরী আমির সম্মেলনে’ উদ্বোধনী বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।আগামী দুই মাসে কোনো সংকট নেই-মন্ত্রীদের এমন বক্তব্য উদ্ধৃত করে শফিকুর রহমান বলেন, সংকট না থাকলে কিলোমিটারের পর কিলোমিটার গাড়ি আর মোটরসাইকেলের লাইন কেন? মানুষ কি শখে পড়ে রোদ-বৃষ্টির মধ্যে গিয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়ায়? একটা বয়ান তৈরি করে বলা হচ্ছে যে, সংকট নেই। কিছু লোক বারবার তেল নিয়ে মজুত করে চোরাইপথে বিক্রি করছে। এজন্য কৃত্রিম সংকট তৈরি হয়েছে।
তিনি বলেন, এটা সরকারের চরম ব্যর্থতা এবং ভুক্তভোগী জনগণের ওপর মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা। একদিকে হাঁপাতে হাঁপাতে তেল পাচ্ছে না মানুষ, অন্যদিকে তাদের তেলচোর বানানো হচ্ছে। এই তেলচোর কারা তা কি জনগণ জানে না? কার বাড়িঘর, কার গোয়ালঘর থেকে ড্রামকে ড্রাম তেল উদ্ধার হয় তা জনগণ জানে না? উদোর পিণ্ডি বুধোর ঘাড়ে চাপানো হচ্ছে।
জামায়াত আমির বলেন, জ্বালানি সংকটের কারণে বিদ্যুৎ সংকট দেখা দিয়েছে। এখন ঘণ্টার পর ঘণ্টা লোডশেডিং করা হচ্ছে। এখানেও তারা লুকোচুরি করছে। জ্বালানি সংকট, বিদ্যুৎ সংকট না থাকলে লোডশেডিং কেন? এগুলো সব হলো পরস্পরবিরোধী মিথ্যাচার। জাতির সঙ্গে ধোঁকা। আমাদের বৃহৎ শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোতে ফার্নেস অয়েলের সংকট তৈরি হয়েছে। এর সবগুলো নিয়েই জাতির সঙ্গে লুকোচুরি করা হচ্ছে।
ডা. শফিকুর রহমান বলেন, ইতিহাসের ধারাবাহিকতায় জুলাই বিপ্লবের পর দেশে একটি অন্তর্বর্তী সরকার গঠিত হয়েছিল। তাদের পবিত্র দায়িত্ব ছিল ক্ষমতা হস্তান্তরটিকে স্বচ্ছ ও গ্রহণযোগ্য করা। কার্যত তারা সে দায়িত্ব পালন করতে ব্যর্থ হয়েছেন। ফলে জুলাই গণ-অভ্যুত্থান ও ত্যাগের মধ্য দিয়ে জাতির মধ্যে যে আকাঙ্ক্ষা তৈরি হয়েছিল, নির্বাচনের মাধ্যমে তা বাস্তবায়ন হয়নি। নির্বাচনকে সুষ্ঠু হতে দেওয়া হয়নি। ব্যাপক ইঞ্জিনিয়ারিং করা হয়েছে। অন্তর্বর্তী সরকারের একজন উপদেষ্টার মুখ থেকে তা বের হয়েছে। তিনিই প্রথম রাজসাক্ষী।
জামায়াত আমির বলেন, অধ্যাপক ইউনূস যুক্তরাজ্য সফরে গিয়ে তারেক রহমানের সঙ্গে একটি বৈঠকের পর যৌথ সংবাদ সম্মেলন করে নির্বাচন ফেব্রুয়ারির প্রথমার্ধে হতে পারে বলে জানান। আমরা এটির প্রতিবাদ করেছিলাম যে, বিদেশের মাটিতে বসে দেশের নির্বাচনের তারিখ কেন ঘোষণা করা হবে? দ্বিতীয়ত, বিএনপি একমাত্র স্টেকহোল্ডার নয়। সে সময় দেশে ৩৯টি নিবন্ধিত রাজনৈতিক দল ছিল। আমরা স্পষ্ট বলেছিলাম, তিনি জাতিকে একটি ভুল বার্তা দিয়ে এসেছেন।
তিনি বলেন, ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে ইঞ্জিনিয়ারিং হয়েছে। অন্তর্র্বর্তী সরকারের উপদেষ্টাই নন, বরং সরকারেরই একজন প্রতিমন্ত্রী বলে ফেলেছেন। প্রফেসর ইউনূস যুক্তরাজ্যে গিয়ে ক্যাপ্টেনের হাতে ট্রফি তুলে দিয়ে এসেছেন। ট্রফি যদি ওখানেই তুলে দেওয়া হয়, তাহলে নির্বাচনের প্রয়োজন কী? এটি দ্বিতীয় রাজসাক্ষী। এর মাধ্যমে প্রমাণিত হয়েছে যে, নির্বাচনে যোগসাজশের মাধ্যমে ব্যাপক অনিয়ম করে জনগণের প্রত্যাশার কবর রচনা করা হয়েছে।
জামায়াত আমির আরও বলেন, দুটি ভোট একই দিনে অনুষ্ঠিত হয়েছে পৃথক ব্যালটে। একটি জাতীয় সংসদ-সদস্য নির্বাচন, আরেকটি হলো গণভোটে হ্যাঁ কিংবা না বলা। জনগণ তাদের রায় দিয়েছে। গণভোটে ৬৮ শতাংশের বেশি হ্যাঁ-এর পক্ষে ভোট দিয়েছেন। বিগত অন্তর্র্বর্তী সরকারের এক উপদেষ্টা বলেছেন, তাদের আমরা মেইন স্ট্রিমে আসতে দেইনি। তাদের ১৬৮টি পাওয়ার কথা ছিল, তাদের আমরা ৬৮টিতে বেঁধে দিয়েছি। এটি চরম লজ্জাজনক।
তিনি বলেন, ইতিহাস একদিন এই নির্বাচনের পোস্টমর্টেম করবে। সেদিন আরও অনেক জিনিস বের হয়ে আসবে। তবে আমাদের ঐক্য (১১ দল) দেশ পরিচালনার জায়গায় গেল কি না সেটি বড় আফসোসের জায়গা নয়, জনগণের আকাঙ্ক্ষার মৃত্যু হলো। আমরা চাইনি দেশে একটি অস্থিতিশীল পরিস্থিতি সৃষ্টি হোক। এই নির্বাচন শেষ নির্বাচন নয়, এই মার্কা নির্বাচন ২০০৮ সালে হয়েছিল। সেই নির্বাচনে বোঝাপড়া করে পেছনের দরজা দিয়ে ক্ষমতার মসনদে যারা গিয়েছিলেন, তারা তাদের পরিণতি বহন করে বিদায় নিয়েছেন। এখনো যদি কেউ এমন করে থাকেন, তাদের পরিণতি ভিন্ন কিছু হওয়ার কথা নয়-তা প্রমাণিত। কারণ প্রধান বিচারক আল্লাহতায়ালা।
ব্যাংক সংস্কার নিয়ে জামায়াত আমির বলেন, ব্যাংক থেকে লাখ লাখ কোটি টাকা লুট হয়ে বিদেশে পাচার হয়ে গেল। এগুলো আইনের আওতায় এনে শাস্তি নিশ্চিত করার অধ্যাদেশ ছিল। সেটা বাদ দেওয়া হলো। কোথায় বাংলাদেশের অর্থনীতিকে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে? এখন ব্যাংকের ওপর থাবা শুরু হয়েছে। সতর্ক করে তিনি বলেন, ব্যাংকের মালিক দেশবাসী, কোনো দল নয়। সবাইকে পাহারাদারের ভূমিকা পালন করতে হবে, গর্জে উঠতে হবে। আপনার আমানত আপনাকে রক্ষা করতে হবে।
তিনি বলেন, বিচার বিভাগকে রাজনৈতিক আদলে রেখে অনেক অবিচার করা হয়েছে, জুডিশিয়াল কিলিং করা হয়েছে। সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া এবং আমাদের নেতারাসহ অনেকেই ভুক্তভোগী হয়েছেন, কেউ কেউ অবিচারের শিকার হয়েছেন। সেই জায়গায় স্বাধীন বিচারালয়ের আলাদা সচিবালয় হওয়ার কথা থাকলেও এটাকে ঠেকিয়ে দেওয়া হলো। তার মানে বিচারকে আর স্বাধীনভাবে চলতে দেওয়া হবে না। আগের সেই ফ্যাসিবাদের কায়দায় এখন ডিক্টেশনের আন্ডারে বিচার চালানো হবে।
ডা. শফিকুর রহমান বলেন, গণতান্ত্রিক যত প্রতিষ্ঠান ছিল, সবগুলো ধ্বংসের পাঁয়তারা চলছে। খেলার ময়দানেও বাপের তালিকায় আবার কেউ স্বামীর তালিকায়-এভাবে দলীয়করণ করে ফেলা হলো। সিভিল প্রশাসনে যে লোকগুলো আসলে দক্ষ সে লোকগুলোকে ওএসডি করা হচ্ছে। তাদের মেধা থেকে জনগণ বঞ্চিত হচ্ছে। জনগণের ওপর জুলুম করা হচ্ছে। পুলিশেও একই অবস্থা। সব দিকে একটা মহানৈরাজ্য চলছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি চোখের পলকে বিদায় হলো। দুদক থেকে কর্মকর্তারা পদত্যাগ করেছেন, মানবাধিকার কমিশন থেকে পদত্যাগ করে খোলা চিঠি দিয়েছেন।
চাঁদাবাজির সমালোচনা করে তিনি বলেন, তারা কৃষক কার্ড, ফ্যামিলি কার্ড এবং হেলথ কার্ডও দেবেন এটা ভালো, কিন্তু সে জায়গায়ও দলীয়করণ। আবার এটাকে কেন্দ্র করে চাঁদাবাজি হচ্ছে। চাঁদাবাজি আগের চেয়ে এখন দিন দিন বাড়ছে।
সম্মেলনে জামায়াতের তিন নায়েবে আমির ছাড়াও সেক্রেটারি জেনারেল, সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল, কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদ সদস্য এবং সাংগঠনিক ৭৯টি জেলা ও মহানগরীর আমির ও সেক্রেটারি উপস্থিত ছিলেন।