সড়ক, নৌ ও রেলপথে ঢাকামুখী জনস্রোত
মু.এ বি সিদ্দীক ভুঁইয়া:ঈদুল ফিতর ও স্বাধীনতা দিবসসহ সাপ্তাহিক ছুটি কাটিয়ে এখন কর্মস্থলে ফেরার তাড়া প্রিয়জনদের সঙ্গে ঈদ আনন্দ উদযাপন করতে যাওয়া মানুষের।যাত্রীরা বলেছেন, নানা ধরনের দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে তাদের।তবে কোথাও কোথাও অতিরিক্ত ভাড়াও আদায় করা হচ্ছে।সময় হয়েছে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খোলারও। সব মিলিয়ে আর প্রিয়জনদের সঙ্গে সময় কাটানোর অবকাশ নেই কারও। তাই এখন রেল, নৌ ও সড়কপথে হাজার হাজার মানুষ ফিরছেন কর্মব্যস্ত, যানজট, জলজটের নগরী ঢাকায়।পাশাপাশি ঈদযাত্রার দুর্ঘটনার দুঃসহ স্মৃতিতে আতঙ্কগ্রস্ত দেখা গেছে যাত্রীদের।কেউ কেউ বলছেন,দুর্ঘটনায় নিহতদের তালিকায় তার নামও থাকতে পারত। সবাই ঈদযাত্রাকে নির্বিঘ্ন করতে সরকারের সংশ্লিষ্টদের বিশেষ দৃষ্টি দেওয়ার অনুরোধ জানিয়েছেন।
সদরঘাট লঞ্চ টার্মিনাল ঘুরে হাজারীবাগ (ঢাকা) প্রতিনিধি জানান, ছুটির রেশ কাটেনি, সদরঘাটে অব্যাহত যাত্রী চাপ দেখা গেছে শুক্রবারও। এদিন রাজধানীতে ফিরেছেন দক্ষিণাঞ্চলের বিভিন্ন জেলার মানুষ। এতে যাত্রীদের ভিড়ে জমজমাট হয়ে উঠেছে সদরঘাট লঞ্চ টার্মিনাল। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ছুটির শেষ দিন পেরিয়েও আগামী দুই-এক দিন এই চাপ অব্যাহত থাকতে পারে। ঈদের লঞ্চযাত্রার চিত্র পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, গত দুই থেকে তিন দিন ধরে দক্ষিণাঞ্চলের বিভিন্ন এলাকা থেকে ঢাকামুখী যাত্রীদের চাপ অব্যাহত রয়েছে। অনেকেই ছুটি শেষে কিছুটা দেরিতে রওনা হওয়ায় এখনো ঘাটে যাত্রীদের উপস্থিতি চোখে পড়ছে। বিশেষ করে দিনমজুর ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা টানা ছুটি শেষে কাজের তাগিদে ধীরে ধীরে রাজধানীতে ফিরছেন।
সরেজমিন দেখা গেছে, শুক্রবার ভোর থেকে একে একে লঞ্চগুলো সদরঘাটে এসে পৌঁছায়। এতে ঘাটজুড়ে সৃষ্টি হয়েছে ব্যস্ততা ও যাত্রীদের চাপ। ফলে সদরঘাট ও আশপাশের সড়কে সৃষ্টি হয় তীব্র যানজটেরও। ফিরে আসা যাত্রীরা জানান, তারা নির্ধারিত ভাড়ায় ও তুলনামূলকভাবে কোনো ভোগান্তি ছাড়াই ঢাকায় ফিরতে পেরেছেন। তবে যাত্রীসংখ্যা বেশি থাকায় ঘাট এলাকায় কিছুটা ভিড় লক্ষ করা গেছে।
আওলাদ শিপিং লাইন্সের পরিচালক ও লঞ্চ মালিক যুবরাজ হোসাইন বলেন, ঈদের আগে যেসব লঞ্চ দক্ষিণাঞ্চলের বিভিন্ন গন্তব্যে যাত্রী নিয়ে গিয়েছিল, সেগুলো এখন আবার যাত্রী বোঝাই করে সদরঘাটে ফিরছে। শুক্রবার ভোর থেকে রাত সাড়ে ৮টা পর্যন্ত প্রায় ৭০ থেকে ৭৫টি লঞ্চ ঘাটে ভিড়েছে। তিনি আরও বলেন, আগামী দুই দিনও ফিরতি যাত্রীর চাপ অব্যাহত থাকবে।
এদিকে, সরেজমিন শুক্রবার কমলাপুর ও বিমানবন্দর স্টেশন ঘুরে দেখা গেছে, ঈদের আগে যেমন ঝুঁকি নিয়ে ট্রেনের ছাদ, ইঞ্জিন ও ট্রেনের ভেতর দাঁড়িয়ে যাত্রীরা গ্রামে ছুটেছেন- একই দৃশ্য দেখা যাচ্ছে ঈদ ফেরত যাত্রীদের বেলায়ও। শুক্রবার সকালে কর্মমুখী মানুষের ঢল নেমেছে রাজধানীর কমলাপুর ও বিমানবন্দর রেলওয়ে স্টেশনে। অতিরিক্ত যাত্রী চাপ সামাল দিতে না পেরে অনেকেই জীবনের ঝুঁকি নিয়ে ট্রেনের ছাদে চড়ে ঢাকায় ফিরছেন হাজারো যাত্রী। ঝুঁকিপূর্ণ এই যাত্রা থামাতে পারছে না সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ।
কমলাপুর স্টেশন মাস্টার মো. আনোয়ার হোসেন বলেন, ঢাকায় আসা প্রতিটি ট্রেনেই যাত্রীদের উপচে পড়া ভিড় চোখে পড়ছে। শুক্রবার যাত্রীদের চাপ ছিল বেশি, শনিবারও যাত্রীদের চাপ থাকবে। ট্রেনের ছাদেও যাত্রীরা রাজধানীতে আসছেন। এতে করে কিছুটা গতি কমিয়ে ট্রেন চালাতে হচ্ছে। যাত্রীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতেই এমনটা করা হচ্ছে। শুক্রবার একতা, রংপুর, চিলাহাটি, পর্যটক এক্সপ্রেসসহ কয়েকটি ট্রেন ১ ঘণ্টা থেকে ৩ ঘণ্টা বিলম্বে ঢাকায় এসে পৌঁছে। সরেজমিন দেখা যায়, সকাল থেকেই প্ল্যাটফর্মজুড়ে ছিল কর্মস্থলে ফেরা মানুষের ঢল। ট্রেন থেকে নেমেই কেউ ছুটছেন বাস বা সিএনজি স্ট্যান্ডে, আবার কেউ অ্যাপভিত্তিক গাড়ির খোঁজে ব্যস্ত হয়ে পড়ছেন। ব্যাগ-সুটকেস হাতে পরিবারসহ ফিরছেন অনেকে, আবার একা কর্মস্থলে ফেরা তরুণদের উপস্থিতিও চোখে পড়ার মতো।
কমলাপুর স্টেশন ম্যানেজার সাজেদুল ইসলাম বলেন, ঈদের পর ফিরতি যাত্রীদের কয়েক দিন চাপ থাকে। এটি স্বাভাবিক চিত্র। এবার ঈদযাত্রায় পাঁচ জোড়া স্পেশাল ট্রেন চলাচল করছে। ঈদের আগে তিন জোড়া ট্রেন যুক্ত হয়েছিল। ঈদের পর ফিরতি যাত্রীর চাপ সামলাতে আরও দুই জোড়া ট্রেন যুক্ত করা হয়েছে। শনি ও রোববার পর্যন্ত যাত্রীদের এমন চাপ থাকবে এমনটা জানিয়ে তিনি বলেন, স্টেশন এলাকায় নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে। রেলওয়ে পুলিশ ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা যাত্রীদের সহায়তায় কাজ করছেন। স্টেশন চত্বরের বাইরে সিএনজি অটোরিকশা ও রিকশার জন্য যাত্রীদের দীর্ঘ লাইন দেখা গেছে। এ সময় ভাড়া নিয়ে অসন্তোষের কথাও জানান যাত্রীরা।
গাবতলী বাস টার্মিনাল সরেজমিন ঘুরে মিরপুর (ঢাকা) প্রতিনিধি জানান, শুক্রবার সকাল থেকেই ঢাকায় ফেরা যাত্রীদের চাপ ছিল। বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে যাত্রীবাহী বাসের চাপ আরও বাড়তে থাকে। পর্বতা সিনেমা হলের সামনে গিয়ে দেখা যায়, আমিন বাজার ব্রিজ দিয়ে একের পর এক দূরপাল্লার বাস গাবতলীতে ঢুকছে। গাড়ি থেকে নামার পর যাত্রীরা বিভিন্ন গন্তব্যের জন্য যানবাহন খুঁজতে ব্যস্ত। তেমনি দূরপাল্লার বাস থেকে যাত্রী নামলেই গন্তব্য জেনে ছুটে যাচ্ছেন অটোরিকশা, বাইক ও সিএনজিচালকরা। মাঝে মাঝে বাসের চাপ বেশি থাকায় আমিন বাজার ব্রিজ (পর্বতা সিনেমা হল) থেকে গাবতলী মাজার রোড পর্যন্ত যানজট দেখা গেছে। এ ছাড়া স্বল্প দূরত্বে চলাচলকারী পরিবহণের ভেঙে ভেঙে আসা যাত্রীদেরও চাপ রয়েছে গাবতলীতে। গাবতলীর পরিবহণ সংশ্লিষ্টরা বলছেন- সকালে যাত্রীর যে চাপ ছিল সন্ধ্যার পর এই চাপ আরও বাড়বে। পরিবার পরিজন নিয়ে চুয়াডাঙ্গার আলমডাঙ্গা থেকে গাবতলীতে ফেরা মিরপুর আইডিয়াল স্কুলের শিক্ষক মোজাম্মেল হক বলেন, ঈদে বাড়ি যাওয়ার সময় বাড়তি ভাড়া না দিলেও ঢাকায় ফেরার সময় বেশি ভাড়া দিয়ে টিকিট কাটতে হয়েছে।
সরেজমিন সায়েদাবাদ বাস টার্মিনাল ঘুরে যাত্রাবাড়ী প্রতিনিধি জানান, ঈদের আনন্দ শেষে এখনো ঢাকায় ফিরছেন মানুষ। পবিত্র ঈদুল ফিতরে গ্রামে আনন্দ শেষে এখনো ঢাকায় ফিরছেন মানুষ। দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে বাস, মাইক্রোবাস, ব্যক্তিগত গাড়ি (প্রাইভেটকার) করে তাদের ঢাকায় ফিরতে দেখা গেছে।
শুক্রবার সায়েদাবাদ বাস টার্মিনাল, ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের শনিরআখড়া, রায়েরবাগ, যাত্রাবাড়ী এবং ঢাকা-মাওয়া সড়কের দোলাইরপাড়, জুরাইন রেলহেট, যাত্রাবাড়ী মোর ঘুরে এমন চিত্র দেখা গেছে।
বেলা ১১টার দিকে সায়েদাবাদ আন্তঃজেলা বাস টার্মিনালে গিয়ে দেখা যায়, দেশের দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের চট্টগ্রাম, কুমিল্লা, নোয়াখালী, ফেনী, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, চাঁদপুর, বরিশাল, ভোলা, পটুয়াখালী, সাতক্ষীরা অঞ্চলের যাত্রীরা বাসে করে কেউ টার্মিনালে নামছেন। কেউ আবার টার্মিনালে পৌঁছানোর আগে যাত্রাবাড়ী শনিরআখড়াসহ বিভিন্ন বাস স্টপেজেও নামতে দেখা গেছে। কুমিল্লা থেকে তিশা বাসে ঢাকায় ফেরেন জাহাঙ্গীর। সঙ্গে ছিল স্ত্রী ও তার দুই মেয়ে। তিনি বলেন, বাড়ি যাওয়ার সময় যানজটের ভোগান্তি ছিল। তবে গ্রামে সবার সঙ্গে ঈদ করতে পেরে ভালো লেগেছে। আর ফেরার সময় সড়কে খুব একটা যানজট পাইনি।
চাঁদপুরের কচুয়া থেকে নিয়াজ খোরশেদ সানী মা, ভাই, বোন নিয়ে মাইক্রোবাসে ঢাকায় ফেরেন। তিনি বলেন, তারা কচুয়া-গৌরীপুর সড়কের সাচার এলাকার যাত্রী। সুরমা বাসগুলো কচুয়া থেকে পরিপূর্ণ হয়ে আসে। এতে সাচার বাজারে বাস আসার পর কোনো সিট পাননি। অতিরিক্ত টাকা দিয়ে মাইক্রোবাস ভাড়া করে সবাইকে নিয়ে ঢাকা আসতে হয়েছে। শুক্রবার মহাখালী বাস টার্মিনাল এলাকায় দেখা যায়, গত কয়েক দিনের তুলনায় ঢাকায় ফেরা মানুষের চাপ বেশি। সকাল থেকেই দেশের উত্তরাঞ্চলসহ বিভিন্ন এলাকা থেকে বাসযাত্রীরা এই টার্মিনালে নামছেন। তাদের কেউ কেউ উত্তরা, বনানীসহ বিভিন্ন যাত্রাপথেই নেমে গেছেন। এদিন যানজটের ভোগান্তি ছাড়াই ঢাকায় ফিরতে পেরে অনেকেই সন্তুষ্টির কথা জানান। পরিবহণসংশ্লিষ্টরা বলছেন, যাত্রীর চাপ কিছুটা বেড়েছে। রোববার সব অফিস খোলা হচ্ছে, তাই ছুটির শেষ দিন শনিবার (আজ) ঢাকায় ফেরার চাপ কয়েক গুন বাড়বে। অনেক যাত্রী বিভিন্ন পরিবহণের আগাম টিকিটও সংগ্রহ করে রেখেছেন।
কিশোরগঞ্জ থেকে ঢাকায় ফিরেছেন একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা কামাল হোসেন। তিনি বলেন, গত ঈদের তুলনায় এবারের যাত্রা অনেকটা স্বস্তিদায়ক ছিল। ঢাকা জেলা বাস মিনিবাস সড়ক পরিবহণ শ্রমিক ইউনিয়নের কোষাধ্যক্ষ রহিম উদ্দিন যুগান্তরকে বলেন, দুই দফা ছুটি শেষে রোববার সব অফিস খোলা হচ্ছে। এজন্য শুক্রবার সকাল থেকেই যাত্রীদের চাপ বেড়েছে।
মাত্রাতিরিক্ত যাত্রী নিয়ে রাজধানীমুখী লঞ্চ বাস : বরিশাল ব্যুরো জানায়, শুক্রবার সকাল থেকেই বিভিন্ন প্রান্ত থেকে রাজধানীমুখী যাত্রীদের উপচে পড়া ভিড় দেখা গেছে বরিশালের বাস টার্মিনাল ও লঞ্চ ঘাটে। অতিরিক্ত যাত্রীচাপের কারণে অনেক লঞ্চ ও দূরপাল্লার বাসে ধারণক্ষমতার চেয়ে বেশি যাত্রী বহনের অভিযোগও উঠেছে। সকাল থেকেই বরিশালসহ দক্ষিণাঞ্চলের বিভিন্ন রুটে লঞ্চ ও বাসে রাজধানীমুখী যাত্রীদের চাপ ছিল চোখে পড়ার মতো। পরিবার-পরিজনের সঙ্গে ঈদের আনন্দ কাটিয়ে কর্মস্থলে ফেরার তাগিদে ভোর থেকেই টার্মিনালগুলোতে ভিড় জমতে শুরু করে। অধিকাংশ লঞ্চ ও বাস যাত্রীতে পরিপূর্ণ হয়ে রাজধানীর উদ্দেশে ছেড়ে যায়। অনেক ক্ষেত্রে দাঁড়িয়ে যাত্রা করতে দেখা গেছে যাত্রীদের। যাত্রীরা জানান, ঈদের ছুটি শেষে কর্মস্থলে ফেরার তাগিদেই ভিড় বেড়েছে।