পাম্প মালিকরা বলছেন জ্বালানি পাচ্ছেন না,তেল বিক্রি দেখাচ্ছে বেশি - Alokitobarta
আজ : মঙ্গলবার, ১৮ই আগস্ট, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ৩রা ভাদ্র, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সর্বশেষ সংবাদঃ

পাম্প মালিকরা বলছেন জ্বালানি পাচ্ছেন না,তেল বিক্রি দেখাচ্ছে বেশি


মোহাম্মাদ আবুবকর সিদ্দীক ভুঁইয়া:রেশনিং তোলার পরও পাম্পে তেল পাচ্ছেন না অনেক যানবাহনের চালকরা।সংশ্লিষ্টরা বলছেন,গত বছরের তুলনায় এ বছরের মার্চে ডিজেল ও অকটেন বেশি সরবরাহ করা হয়েছে। পেট্রোল তার তুলনায় একবারে কম বিক্রি করা হয়েছে ডিপো থেকে।এরপরও কেন তেলের সংকট হচ্ছে,তা দেখার বিষয়।অনেকে তেল না পাওয়ার আশঙ্কায় ঈদে বাড়ি না যাওয়ার চিন্তা করছেন।অনেক পাম্প মালিক জানান, ঈদ ও মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধের কারণে জ্বালানি তেলের অতিরিক্ত চাহিদার সৃষ্টি হয়েছে। অনেকে আতঙ্কে বেশি করে তেল ক্রয় করছেন। তারা বলছেন, সরকার গাড়ির চালকদের জন্য রেশনিং তুলে দিয়েছে। কিন্তু পাম্প মালিকদের জন্য রেশনিং রেখে দিয়েছে। তারা চাহিদা মতো তেল ডিপো থেকে কিনতে পারছেন না। তাই দিনের বেশির ভাগ সময় পাম্প বন্ধ থাকছে। তবে জ্বালানি বিভাগের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, এই অভিযোগ সত্য নয়। পাম্প মালিকরা আগের বছরের এই সময়ে যে পরিমাণে তেল বিক্রি করেছে, তার চেয়ে ২০ থেকে ২৫ শতাংশ তেল বেশি দেওয়া হচ্ছে। পদ্মা অয়েল কোম্পানির ব্যবস্থাপনা পরিচালক মফিজুর রহমান মঙ্গলবার বলেন, পাম্প মালিকদের চাহিদা অনুযায়ী তেল দেওয়া হচ্ছে। তবে সবাই একসঙ্গে তেল সংগ্রহ করতে ডিপোতে ভিড় করছেন। পাম্প মালিকদের জানানো হয়েছে, সবাই একসঙ্গে ভিড় করলে তেল দেওয়া কঠিন। তাই আজ যাকে দেওয়া হয়েছে, তাকে কাল আরেকজনের পরে দেওয়া হচ্ছে।

জ্বালানি তেল নিয়ে এখনো সারা দেশে হৈচৈ চলছে। রাজধানীসহ অনেক এলাকার পেট্রোল পাম্প বন্ধ থাকছে। গ্রাহকরা তেল কিনতে এক পাম্প থেকে অন্য পাম্পে ছোটাছুটি করছে। কোথাও কোথাও ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করেও তেল পাওয়া যাচ্ছে না।মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধের পর গত ৪ মার্চ থেকে তেল সরবরাহে রেশনিং পদ্ধতি চালু করে সরকার পাম্প মালিকদের জন্য। এরপর তেলের ভোক্তাদের জন্য রেশনিংয়ের নির্দেশ দেওয়া হয়। এ নিয়ে অনেক আলোচনার পর গত ১৫ মার্চ সব ধরনের রেশনিং তুলে নেয় সরকার। বলা হয়, পাম্প মালিকরা ২০২৫ সালের মার্চ মাসের এই সময়ে যে পরিমাণে তেল বিক্রি করেছেন এখন সেই পরিমাণে তেল পাবেন। খবর নিয়ে দেখা গেছে, গত বছরের (২০২৫) মার্চে ডিজেলের চাহিদা ছিল গড়ে দৈনিক ১২ হাজার ৭৭৭ টন। এ বছর অর্থাৎ ২০২৬ সালের ১৭ মার্চ পর্যন্ত গড়ে প্রতিদিন ডিজেল সরকারি ডিপোগুলো থেকে সরবরাহ করা হয়েছে ১৩ হাজার ৬১৯ টন। যা গত বছরের চেয়ে দৈনিক ৮৪২ টন বেশি। অকটেন গত বছরের মার্চে দেওয়া হয়েছে ১ হাজার ১৯৩ টন। এ বছরের ১৬ মার্চ পর্যন্ত দেওয়া হয়েছে গড়ে দৈনিক ১ হাজার ৪০৭ টন। যা গত বছরের চেয়ে দৈনিক ২১৪ টন বেশি। পেট্রোল গত বছরের মার্চে গড়ে ১ হাজার ৪৯৬ টন দেওয়া হলেও এ বছরের ১৬ মার্চ পর্যন্ত গড়ে দেওয়া হয়েছে ১ হাজার ৪৪৪ টন। যা গত বছরের তুলনায় দৈনিক মাত্র ৫২ টন কম।

তথ্য প্রমাণ বলছে, গত বছরের মার্চ থেকে জুনে ফার্নেস অয়েল গড়ে বিক্রি করা হয়েছে ২ হাজার ৪৪৯ টন, সেখানে এই বছরে দৈনিক বিক্রি হয়েছে ১ হাজার ৯৫৩ টন। জেট ফুয়েল গত বছরের মার্চে বিক্রি হয়েছে দৈনিক ১ হাজার ৫৪৭ টন। সেখানে এখন বিক্রি হচ্ছে গড়ে ১ হাজার ৩৭৩ টন। কেরোসিন গত বছরের মার্চে গড়ে প্রতিদিন বিক্রি হয়েছে ১৮৮ টন। এখন বিক্রি হচ্ছে ১৮৯ টন। মেরিন ফুয়েল গত বছরের এই সময়ে বিক্রি হয়েছে গড়ে ৩৪ টন। এখন বিক্রি হচ্ছে ২১৩ টন।

বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন-বিপিসি জানিয়েছে, রেশনিং তুলে নেওয়ার পর তেলের বিক্রি ডিপো থেকে বাড়ানো হয়েছে। গত সপ্তাহে রেশনিংয়ের সময় ডিজেল বিক্রি করা হতো গড়ে ৯ হাজার ২২ টন। সেখানে ১৬ মার্চ বিক্রি করা হয়েছে ১৭ হাজার ৫৯৮ টন। একইভাবে অকটেন ১ হাজার ৪০০ টনের মতো বিক্রি করা হলেও ১৬ মার্চ বিক্রি করা হয়েছে ২ হাজার ৩৪৯ টন। রেশনিংয়ের সময় পেট্রোল বিক্রি করা হয়েছে দৈনিক ১ হাজার টনের কম। সেখানে ১৬ মার্চ (সর্বশেষ বিপিসির হিসাব অনুযায়ী) বিক্রি করা হয়েছে ২ হাজার ৩১৬ টন। কিন্তু এরপরও কেন অনেক পাম্প তেল পাচ্ছে না বলে অভিযোগ করছে-তা-ই বড় প্রশ্ন হয়ে দেখা দিয়েছে। তেজগাঁও সাউদার্ন ফিলিং স্টেশনের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মনোরঞ্জন ভক্ত মঙ্গলবার বলেছেন,তেলের অভাবে মঙ্গলবার বেশির ভাগ সময় পাম্প বন্ধ রাখতে হয়েছে। তিনি বলেন, তার পাম্পে অকটেনের দৈনিক চাহিদা ২০ হাজার লিটারের মতো। কিন্তু মঙ্গলবার তিনি পেয়েছেন মাত্র ৯ হাজার লিটার। ডিজেলও সমপরিমাণে চাহিদা থাকলেও তাকে চাহিদা মতো দেওয়া হয়নি। তাই তার পাম্প বন্ধ আছে। তবে তিনি গত সোমবার ডিপো থেকে ২৭ হাজার লিটার তেল তুলতে পেরেছেন বলে জানিয়েছেন। ওই তেল কী করলেন, এই প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, সরকার তো যানবাহনে সব রেশনিং তুলে দিয়েছে। তাই গাড়িগুলোর চাহিদা অনুযায়ী তেল দিতে হচ্ছে। হঠাৎ করে তেলের চাহিদা অনেক বেড়েছে।

সংশ্লিষ্টরা বলেছেন, মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধের কারণে এবং মিডিয়ার তেল ফুরিয়ে আসছে-এমন খবরে অনেকে চাহিদার চেয়ে বেশি তেল সংগ্রহ করছেন পাম্প থেকে। যা সরকারকে বিপাকে ফেলছে। ঈদে সারা দেশে ২ কোটির বেশি মানুষ পরিবহণে করে গ্রামের বাড়ি বা আপন মানুষের কাছে যান। এ কারণে অন্যান্য সময়ের তুলনায় পরিবহণে ডিজেল ব্যবহার হয় বেশি। গ্যাস সংকটের কারণে অনেকে সিএনজি ব্যবহার না করে অকটেন বা পেট্রোল ব্যবহার করছেন বলে পাম্প মালিকদের ধারণা। সব মিলিয়ে হুট করে তেলের চাহিদা কিছুটা বেড়েছে।

ব্রাহ্মণবাড়িয়ার ফাহাদ ফিলিং স্টেশনের চেয়ারম্যান ফারহান নুর বলেন, চাহিদা অনুযায়ী তেল দিতে পারছি না। তার পাম্পে দৈনিক ২৫ হাজার লিটারের বেশি তেল বিক্রি হলেও এখন ডিপো থেকে ৯ হাজার লিটারের মতো সরবরাহ দেওয়া হচ্ছে। পেট্রোল পাম্প মালিকদের নেতা ফারহান নুর আরও বলেন, তেল নিয়ে পাম্প মালিকদের অভিজ্ঞতা বেশ খারাপ। সারা দিন গ্রাহকদের সঙ্গে বাগ্বিতণ্ডা লেগে আছে। এমনকি মধ্যরাত পর্যন্ত স্টাফদের নাজেহাল হতে হয়।

হয়রানির অভিযোগ : মেঘনা অয়েলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক শাহিরুল হাসান বলেছেন,তেলের সংকট হওয়ার কোনো সুযোগ নেই। কারণ গত বছরের এই সময়ের চেয়ে তিন বিতরণ কোম্পানি আরও বেশি তেল সরবরাহ দিয়েছে। তবুও কেন তেল পাচ্ছে না তা দেখার বিষয়। যুগান্তরের সঙ্গে আলাপকালে সংশ্লিষ্ট অনেকে বলেছেন, প্রশাসন তেল বিক্রিতে পাম্প মালিকদের সহায়তা না করে কোনো কোনো এলাকায় উলটো হয়রানি করছে। এতে অনেকে ক্ষুব্ধ হচ্ছেন। একজন ভুক্তভোগী জানালেন, কিছু দিন আগে ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় তেল সংকটের কারণে তার পাম্পে হৈচৈ হয়েছে। বিষয়টি ঢাকার প্রশাসনকে জানাতে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার জেলা প্রশাসককে রাতে ফোন দেন। পুরো বিষয়টি তিনি জানিয়ে জেলা প্রশাসকের হস্তক্ষেপ চান। পরের দিন দেখা গেছে ওই ডিসি একজন ম্যাজিস্ট্রেট পাঠিয়ে তেল কম দিচ্ছে বলে ভোক্তা অধিকার আইনে মামলা ঠুকে দেন।

ঢাকার চিত্র : তেল সংকটে রাজধানীতে মঙ্গলবারেও দিনভর কয়েকটি পেট্রোল পাম্প বন্ধ রাখতে হয়েছে। এক্ষেত্রে অকটেন ও পেট্রোল পর্যাপ্ত না পাওয়ায় এখানকার পেট্রোল পাম্পগুলো মঙ্গলবার বন্ধ রাখতে বাধ্য হয়েছে। এতে মোটরসাইকেল ও প্রাইভেট কার চালকরা ভোগান্তিতে পড়েছেন।ডেমরা ঢাকা প্রতিনিধি জানান,রেশনিং তুলে নেওয়ার পরও মঙ্গলবার সন্ধ্যা পর্যন্ত ডেমরায় অধিকাংশ পেট্রোল পাম্পে স্বাভাবিকতা ফেরেনি পুরোদমে। এখনো গ্রাহকদের চাহিদা মেটাতে পারছে না পেট্রোল পাম্পগুলো। তবে আগের তুলনায় তেল কিছুটা বেশি পাচ্ছেন গ্রাহকরা। এক্ষেত্রে মোটরসাইকেলে বর্তমানে একটু বেশি পরিমাণ অকটেন দেওয়া শুরু হয়েছে গত রোববার রাত থেকে।

Top