আইনের মধ্যে থেকে অতিরিক্ত বলপ্রয়োগ,নির্বাচনি দায়িত্বে নিরপেক্ষতা বজায় রাখার ওপর জোর
মোহাম্মাদ মুরাদ হোসেন:আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সম্পূর্ণ নিরপেক্ষ থেকে দায়িত্ব পালন করবে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী। অবাধ, সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণ নির্বাচন আয়োজন ও জনগণের মনে আস্থা ফেরাতে বাহিনীর পক্ষ থেকে সব ধরনের প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। সাধারণ মানুষ যাতে নির্ভয়ে ভোটকেন্দ্রে যেতে পারে, সেটা নিশ্চিত করা হবে বাহিনীর অন্যতম দায়িত্ব।এ লক্ষ্যে নির্বাচন ঘিরে এক লাখ সেনা সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে। পাশাপাশি নির্বাচনের আগে ও পরে যে কোনো ধরনের সহিংসতা প্রতিরোধে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে সেনাবাহিনী বদ্ধপরিকর। নির্বাচনে অপ্রীতিকর পরিস্থিতি রোধে সেনাবাহিনী আইনের মধ্যে থেকে প্রক্রিয়া অনুসরণ করে প্রয়োজনে অতিরিক্ত বলপ্রয়োগ করবে।
বৃহস্পতিবার রাজধানীর গুলিস্তানস্থ রোলার স্কেটিং কমপ্লেক্সে ‘ইন এইড টু সিভিল পাওয়ার’-এর আওতায় নিয়োজিত সেনাবাহিনীর কার্যক্রম সম্পর্কিত বিষয়ে প্রেস ব্রিফিংয়ে সেনা সদরের সামরিক অপারেশন্স পরিদপ্তরের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল দেওয়ান মোহাম্মদ মনজুর হোসেন এসব কথা বলেন।প্রেস ব্রিফিংয়ের আগে আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট-২০২৬ উপলক্ষ্যে গুলিস্তানস্থ জাতীয় স্টেডিয়ামে সেনাক্যাম্প পরিদর্শন ও অসামরিক প্রশাসনের সঙ্গে মতবিনিময় করেন সেনাবাহিনী প্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান।
জাতীয় স্টেডিয়ামের সম্মেলন কক্ষে আয়োজিত সভায় ঊর্ধ্বতন পর্যায়ের সামরিক, ঢাকা মহানগর, বিভাগীয় ও জেলা প্রশাসন এবং বিভিন্ন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কর্মকর্তাদের সঙ্গে মতবিনিময় করেন সেনাপ্রধান। এ সময় আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে শান্তিপূর্ণ, নিরপেক্ষ ও সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করার লক্ষ্যে আন্তঃপ্রাতিষ্ঠানিক সমন্বয় এবং সামগ্রিক নিরাপত্তা ব্যবস্থাপনা নিয়ে আলোচনা হয়। পেশাদারিত্ব, নিরপেক্ষতা, শৃঙ্খলা, ধৈর্য ও নাগরিকবান্ধব আচরণের মাধ্যমে দায়িত্ব পালনের ওপর বিশেষ গুরুত্বারোপ করেন সেনাপ্রধান। তিনি ‘ইন এইড টু দ্য সিভিল পাওয়ার’-এর আওতায় মোতায়েনকৃত সেনা সদস্যদের কার্যক্রম সরেজমিন পর্যবেক্ষণ ও প্রয়োজনীয় দিকনির্দেশনা প্রদান করেন।
এদিকে আন্তঃবাহিনী জনসংযোগ পরিদপ্তরের (আইএসপিআর) পাঠানো এক বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট অবাধ, সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও শান্তিপূর্ণভাবে আয়োজনের লক্ষ্যে বরগুনা পরিদর্শন করেন নৌবাহিনী প্রধান। পাশাপাশি বিমানবাহিনী প্রধান ঢাকা সেনানিবাসস্থ বিএএফ ঘাঁটি বাশারে অবস্থিত সি-১৩০ হ্যাঙ্গারে অনুষ্ঠিত আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট ২০২৬ উপলক্ষ্যে মাঠপর্যায়ে নিয়োজিত বিমানবাহিনী সদস্যদের উদ্দেশে দিকনির্দেশনামূলক বক্তব্য প্রদান করেন।সেনা সদরের প্রেস ব্রিফিংয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্ন ছিল-নির্বাচন কেন্দ্রগুলোর অবস্থা বিবেচনায় যদি অতিরিক্ত বলপ্রয়োগের প্রয়োজন হয় সেক্ষেত্রে সেনাবাহিনীর রুলস অব এনগেজমেন্ট কী হবে? বিজিবি বলেছে তারা কোনো অতিরিক্ত বলপ্রয়োগ করবে না।
এক্ষেত্রে সেনাবাহিনী কী করবে-এমন প্রশ্নের জবাবে ব্রিগেডিয়ার জেনারেল দেওয়ান মোহাম্মদ মনজুর হোসেন বলেন, সেনাবাহিনীর জন্য সুনির্দিষ্টভাবে এনগেজমেন্ট বলে দেওয়া আছে। আমরা আইনের আওতায় থেকে সে রুলস অব এনগেজমেন্ট অনুসরণ করে আমরা আমাদের দায়িত্ব পালন করে থাকি। যদি সত্যি সত্যি কোনো ক্ষেত্রে অতিরিক্ত বলপ্রয়োগের প্রয়োজন হয়, তাহলে রুলস অব এনগেজমেন্টে যে ক্রমান্বয়ে বলপ্রয়োগের মাত্রা বৃদ্ধির একটা প্রক্রিয়া আছে সেটা অনুসরণ করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।তিনি বলেন, বাংলাদেশ সেনাবাহিনী একটি সুশৃঙ্খল বাহিনী এবং দেশমাতৃকার সেবায় নিয়োজিত একটি বাহিনী। সেনাপ্রধান পরিষ্কারভাবে একটি কথা বলে দিয়েছেন-সম্পূর্ণ নিরপেক্ষভাবে আমরা আমাদের দায়িত্ব পালন করব। দেশের সাধারণ মানুষ যাতে নির্বিঘ্নে ও নির্ভয়ে ভোটকেন্দ্রে যেতে পারে এবং তার ভোট দিতে পারে তা নিশ্চিত করা হবে আমাদের অন্যতম দায়িত্ব।
ভোটের দিন, আগে কিংবা পরে মব হলে সেনাবাহিনীর ভূমিকা কী হবে-এমন প্রশ্নে সামরিক অপারেশন্স পরিদপ্তরের পরিচালক বলেন, এর আগে দেখেছি বেশ কয়েকটি হামলার ঘটনা ঘটেছে। মবের ইনসিডেন্ট আমরা দেখেছি। বাংলাদেশ সরকার, নির্বাচন কমিশন, অসামরিক প্রশাসন এবং সব আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পাশাপাশি সশস্ত্র বাহিনী একটি অবাধ এবং সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্য যা যা করণীয় তা করতে বদ্ধপরিকর। সুষ্ঠু নির্বাচন করতে গিয়ে যা করণীয়, আইন অনুযায়ী যে ধরনের ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন, সে ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পাশাপাশি সশস্ত্র বাহিনী সর্বদা প্রস্তুত রয়েছে।তিনি জানান, নির্বাচনে সুষ্ঠু ও নির্বিঘ্ন পরিবেশ নিশ্চিতে এক লাখ সেনা সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে। এর আগের নির্বাচনগুলোতে আমরা সর্বোচ্চ ৪০-৪২ হাজার সদস্য মোতায়েন করেছি। অন্যান্য নির্বাচন থেকে এবারের নির্বাচনে আমাদের সদস্য মোতায়েনের পার্থক্য হচ্ছে, এবার ভোটকেন্দ্রের আঙিনা পর্যন্ত সশস্ত্র বাহিনীকে যাওয়ার অনুমতি দেওয়া হয়েছে। আগের নির্বাচনগুলোতে এই অনুমতি ছিল না। আগের নির্বাচনগুলোতে আমরা স্ট্রাইকিং ফোর্স হিসাবে দূরবর্তী জায়গায় অবস্থান করেছি। এবার সাধারণ ভোটাররা যেন নির্বিঘ্নে ভোটকেন্দ্রে যেতে পারেন, সেটা মাথায় রেখে সেনাবাহিনী প্রধান ন্যূনতম প্রয়োজনীয় সেনা সদস্যদের সেনানিবাসে রেখে সুষ্ঠু ইলেকশন করার জন্য বাকি সব সেনা সদস্যকে নির্বাচন ঘিরে নিয়োগ করা হয়েছে।
ব্রিগেডিয়ার জেনারেল দেওয়ান মোহাম্মদ মনজুর হোসেন আরও বলেন, একটি সুষ্ঠু নির্বাচন অনুষ্ঠানের জন্য নির্বাচনের আগেই আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক এবং নিয়ন্ত্রণে রাখা অত্যন্ত জরুরি। যে কারণে গত ১০ জানুয়ারি বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ৩৫ হাজার থেকে বাড়িয়ে মোতায়েনকৃত সেনা সদস্য ৫০ হাজারে উন্নীত করা হয়েছে। পরে ২০ জানুয়ারি ১ লাখ সেনা মোতায়েন করা হয়। এর পাশাপাশি নৌবাহিনী ৫ হাজার এবং বিমানবাহিনী ৩ হাজার ৭৩০ জন সেনা মোতায়েন করেছে।
তিনি আরও জানান, বাংলাদেশ সেনাবাহিনী সারা দেশে ৬৪টি জেলার মধ্যে ৬২টি জেলার ৪১১টি উপজেলায় এবং মেট্রোপলিটন শহরগুলোতে সর্বমোট ৫৪৪টি অস্থায়ী ক্যাম্প স্থাপন করেছে। এতে নিয়মিত টহল, যৌথ অভিযান এবং চেকপোস্ট স্থাপনের মাধ্যমে নজরদারি বৃদ্ধি করা হয়েছে। পাশাপাশি অস্ত্র উদ্ধার কার্যক্রম চলমান রাখা হয়েছে। এর ফলে একদিকে অস্ত্র উদ্ধারের সংখ্যা যেমন অনেক গুণ বেড়ে গেছে, অন্যদিকে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির যথেষ্ট উন্নতি হয়েছে।পরিসংখ্যান দিয়ে তিনি জানান, গত ২০ জানুয়ারি থেকে বৃহস্পতিবার (৫ ফেব্রুয়ারি) পর্যন্ত অর্থাৎ এই ১৪ দিনে আমরা প্রায় দেড় শতাধিক অস্ত্র উদ্ধার করেছি। যার অধিকাংশই বিদেশি পিস্তল। বাংলাদেশ সেনাবাহিনী এখন পর্যন্ত ১০ হাজার ১৫২টি অস্ত্র, ২ লাখ ৯১ হাজার গোলাবারুদ উদ্ধার করেছে। পাশাপাশি ২২ হাজার ২৮২ জন চিহ্নিত সন্ত্রাসী এবং দুষ্কৃতকারীকে আটক করে পুলিশের কাছে হস্তান্তর করেছে।
এখনো মানুষের মাঝে একটা সংশয় রয়েছে, আসলেই নির্বাচন হবে কি না-এ প্রশ্নে ব্রিগেডিয়ার জেনারেল দেওয়ান মোহাম্মদ মনজুর হোসেন বলেন, এই সংশয় দূর করার জন্যই সেনাবাহিনী প্রধান সব বিভাগে ব্যক্তিগতভাবে গিয়েছেন এবং নির্বাচনসংশ্লিষ্ট অসামরিক প্রশাসন এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর যারা নির্বাচনের সঙ্গে নিয়োজিত থাকবেন তাদের সঙ্গে মতবিনিময় করেছেন। তিনি দুটো উদ্দেশ্য নিয়ে গিয়েছেন। এর মধ্যে একটি হচ্ছে-যে কোনো সহায়তায় নির্বাচনসংশ্লিষ্ট অসামরিক প্রশাসন এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর জন্য সেনাবাহিনী প্রস্তুত আছে। দ্বিতীয়টি-জনগণকে আস্থা ও সুস্পষ্টভাবে বার্তা দেওয়া যে, সব বাহিনী সমন্বিতভাবে একটি সুন্দর নির্বাচন উপহার দেওয়ার জন্য প্রস্তুত আছে। তিনি জানান, নন-লেথাল ওয়েপন এবং রায়ট কন্ট্রোল ইকুইপমেন্ট দিয়ে আমাদের বাহিনীকে ইকুইপ করেছি। নির্বাচনকে সামনে রেখে আরও বেশকিছু রায়ট কন্ট্রোল ইকুইপমেন্ট আমাদের সেনা সদস্যদের জন্য নিয়ে এসেছি। নির্বাচনের আগে ও পরে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি বা হুমকি নিয়ে সেনাবাহিনীর নিজস্ব কোনো বিশ্লেষণ আছে কি না-এমন প্রশ্নের জবাবে ব্রিগেডিয়ার জেনারেল দেওয়ান মোহাম্মদ মনজুর হোসেন বলেন, হুমকি মূল্যায়নের ভিত্তিতেই সেনা মোতায়েনের পরিকল্পনা করা হয়েছে।