শেয়ারবাজারের সংকট কি কাটবে?নতুন কোম্পানি আসার দুয়ার খুলছে - Alokitobarta
আজ : শনিবার, ২৪শে অক্টোবর, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ৮ই কার্তিক, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সর্বশেষ সংবাদঃ
ভার্চুয়াল মোহের ফাঁদে ঘরছাড়া কিশোর-কিশোরী শেয়ারবাজারের সংকট কি কাটবে?নতুন কোম্পানি আসার দুয়ার খুলছে কোথাও কর্মী ছাঁটাই প্রভাব কর্মসংস্থানে,বন্ধ হয়েছে অন্তত ৫০টির বেশি কারখানা সংসদ নির্বাচনে ভোট রক্ষায় দুর্বলতা ছিল, সিটি করপোরেশনে ভুল হবে না প্রতিশ্রুতিতেই সীমাবদ্ধ জলবায়ু তহবিল,ঋণ নয় অনুদান চায় বাংলাদেশ ঝুঁকি ৬৩৮ কোটি ডলারের,এলডিসি উত্তরণের প্রভাব রপ্তানিতে ফ্লাইওভারে নতুন কৌশল ‘সুতা-ডাকাতি’রাতে রাজধানীতে ছিনতাইকারীর ফাঁদ জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) তাদের কেন্দ্রীয় আহ্বায়ক কমিটি পুনর্গঠন রোজার আগেই কারসাজি,তেল পেঁয়াজ ডাল চিনি ছোলা খেজুরের দাম বাড়ছে দেশের কোথাও বৃষ্টির সম্ভাবনা নেই

শেয়ারবাজারের সংকট কি কাটবে?নতুন কোম্পানি আসার দুয়ার খুলছে


জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক,আলোকিত বার্তা:দীর্ঘদিন ধরে দরপতন, লেনদেনে মন্দা ও নতুন কোম্পানির তালিকাভুক্তির সংকটে ভুগছে দেশের পুঁজিবাজার।বাজারে বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফেরানো, নজরদারি জোরদার করা ও ভালো কোম্পানির অংশগ্রহণ নিশ্চিত করাই এখন বড় চ্যালেঞ্জ।তারা বলছেন, দীর্ঘদিনের অনিয়ম, মানসম্মত কোম্পানির অভাব, আইপিও নিয়ে অনিশ্চয়তা ও দুর্বল নজরদারির কারণে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে আস্থার সংকট তৈরি হয়েছে। তা কাটাতে নিয়ন্ত্রক সংস্থা, স্টক এক্সচেঞ্জ, ব্রোকারেজ প্রতিষ্ঠান ও তালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলোর সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন।একদিকে অধিকাংশ শেয়ারের দরপতনে বিনিয়োগকারীদের লোকসান বাড়ছে, অন্যদিকে নতুন প্রাথমিক গণপ্রস্তাবের (আইপিও) অভাবে বাজারে বিনিয়োগের সুযোগ ও গভীরতা কমছে। গত আড়াই বছরে নতুন কোনো কোম্পানি আইপিওর আবেদন না করায় পরিস্থিতি আরও উদ্বেগজনক হয়ে উঠেছে।এমন প্রেক্ষাপটে আইপিও নীতিমালা সংশোধন এবং সরাসরি তালিকাভুক্তির নতুন বিধিমালা কার্যকর হওয়ায় বাজারে নতুন কোম্পানি আসার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। তবে সংশ্লিষ্টদের মতে, শুধু নতুন কোম্পানি তালিকাভুক্ত করলেই সংকট কাটবে না।

বাজারে নেই স্পষ্ট স্থিতিশীলতার লক্ষণবাজার পর্যালোচনায় দেখা যায়, ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) প্রধান সূচক ডিএসইএক্স গত কয়েক মাসে উল্লেখযোগ্য ওঠানামার মধ্য দিয়ে গেছে। আগস্টের শেষ দিকে সূচক ৫ হাজার ৬০০ পয়েন্টের ঘরে থাকলেও অক্টোবরের প্রথমার্ধে তা নেমে ৫ হাজার ৪০০ পয়েন্টের আশপাশে চলে আসে।গত ৬ অক্টোবর ডিএসইএক্স ২০ দশমিক ৩৭ পয়েন্ট কমে ৫ হাজার ৪২৪ দশমিক ৬২ পয়েন্টে নেমেছিল। ওই সময় টানা চার কার্যদিবসে সূচকটি প্রায় ১২৫ পয়েন্ট হারায়। ১৮ অক্টোবর তা আরও কমে ৫ হাজার ৪২২ দশমিক ৬৭ পয়েন্টে দাঁড়ায়। অবশ্য ১৯ অক্টোবর ২৭ দশমিক ৯৬ পয়েন্ট বেড়ে এটি ৫ হাজার ৪৫০ দশমিক ৬৩ পয়েন্টে ওঠে। অর্থাৎ, কোনো কোনো দিন সূচকে ইতিবাচক পরিবর্তন এলেও সামগ্রিকভাবে বাজারে স্থিতিশীলতার স্পষ্ট লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না।বাজারসংশ্লিষ্টরা বলছেন, সূচকের সাময়িক উত্থানকে বাজার ঘুরে দাঁড়ানোর নিশ্চিত ইঙ্গিত হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। কারণ, সূচকের পাশাপাশি লেনদেনের পরিমাণ, কতটি শেয়ারের দাম বাড়ছে বা কমছে এবং বিনিয়োগকারীদের অংশগ্রহণের প্রবণতাও বিবেচনায় নিতে হয়। অক্টোবরের বিভিন্ন কার্যদিবসে দরপতন ও সীমিত লেনদেনের চিত্র বাজারের দুর্বলতাকেই সামনে এনেছে।একটি ব্রোকারেজ হাউজের এক শীর্ষ কর্মকর্তা বলেন, বাজারে যখন অধিকাংশ শেয়ারের দাম কমে, তখন বিনিয়োগকারীদের মধ্যে নতুন করে শেয়ার কেনার আগ্রহ কমে যায়। অনেকে লোকসানে থাকা শেয়ার বিক্রি করে বাজার থেকে বেরিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেন। আবার কেউ আরও দরপতনের আশঙ্কায় হাতে থাকা অর্থ বিনিয়োগ না করে অপেক্ষা করেন।তিনি জানান, দরপতনের আশঙ্কা দেখা দিলে বাজারে বিক্রির চাপ বাড়ে এবং নতুন অর্থের প্রবাহ কমে যায়। একপর্যায়ে কম লেনদেন, দরপতন ও আস্থার সংকট পরস্পরকে আরও তীব্র করে তোলে। সাম্প্রতিক সময়ে শেয়ারবাজারে সেই চিত্র স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। তবে সূচকের ওঠানামাকে একমাত্র সংকটের মাপকাঠি হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। বাজারে ভালো কোম্পানির শেয়ারের দাম, কোম্পানির মুনাফা, নগদ প্রবাহ, লভ্যাংশ ও সামগ্রিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতিও বিবেচনায় নিতে হবে।ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) প্রধান সূচক ডিএসইএক্স গত কয়েক মাসে উল্লেখযোগ্য ওঠানামার মধ্য দিয়ে গেছে/ফাইল ছবিলেনদেনে খরা কাটছে নাবাজারের আরেকটি বড় সমস্যা লেনদেনের নিম্নমুখী প্রবণতা। বিনিয়োগকারীদের অংশগ্রহণ কমে গেলে শেয়ার কেনাবেচার পরিমাণ কমে যায়।

এতে বাজারের তারল্য দুর্বল হয় এবং তুলনামূলক বড় অঙ্কের শেয়ার কেনাবেচায় দামের ওপর বেশি প্রভাব পড়তে পারে। বিনিয়োগকারীদের আস্থার সংকটের পাশাপাশি উচ্চ সুদের হার, অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা, কোম্পানির ভবিষ্যৎ মুনাফা নিয়ে সংশয় ও বাজারে ভালো বিনিয়োগের সুযোগের অভাবও সিদ্ধান্ত গ্রহণে প্রভাব ফেলতে পারে।ডিএসইতে গত ১৪ অক্টোবর লেনদেন হয় ৪১৬ কোটি টাকা। পরদিন ১৫ অক্টোবর তা বেড়ে ৪৯৯ কোটি টাকায় দাঁড়ালেও ১৭ অক্টোবর কমে ৩১৭ কোটি টাকায় চলে আসে। পরের কার্যদিবস ১৮ অক্টোবর লেনদেন হয় ৩৬৫ কোটি। এতে চলতি বছরে প্রথমবার টানা দুই কার্যদিবস ডিএসইতে লেনদেন তিনশ কোটি টাকার ঘরে সীমাবদ্ধ থাকে।ডিএসইর এক সদস্য বলেন, লেনদেন বাড়ানোর জন্য কৃত্রিমভাবে সূচক বাড়ানোর চেয়ে বিনিয়োগের পরিবেশ উন্নত করা জরুরি। কোম্পানির আর্থিক তথ্যের নির্ভরযোগ্যতা, বাজারে অনিয়মের বিরুদ্ধে দ্রুত ব্যবস্থা এবং দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগের সুযোগ বাড়ানো গেলে স্বাভাবিকভাবেই বিনিয়োগকারীদের অংশগ্রহণ বাড়তে পারে।নতুন আইপিও নেই আড়াই বছরদেশের শেয়ারবাজারের জন্য সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয়গুলোর একটি হলো নতুন কোম্পানির আইপিও আসা বন্ধ থাকা। সর্বশেষ আইপিও এসেছিল ২০২৪ সালের মার্চে। এরপর আর তা আসেনি। প্রায় আড়াই বছরে নতুন আইপিও আবেদন জমা পড়েনি।এ নিয়ে কথা হলে ডিএসই পরিচালক মিনহাজ মান্নান ইমন জানান, আইপিও না থাকায় বাজারে নতুন বিনিয়োগের ক্ষেত্র তৈরি হচ্ছে না। তালিকাভুক্ত কোম্পানির সংখ্যা ও বৈচিত্র্য বাড়ানোর সুযোগ সীমিত হচ্ছে। একই সঙ্গে পুঁজিবাজারের মাধ্যমে বেসরকারি খাতে নতুন মূলধন সরবরাহের পথও সংকুচিত হয়ে পড়ছে।ডিএসই ব্রোকার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ডিবিএ) সভাপতি সাইফুল ইসলাম বলেন, সরকারি মালিকানাধীন লাভজনক প্রতিষ্ঠানসহ মানসম্মত কোম্পানিগুলোকে দ্রুত পুঁজিবাজারে আনার উদ্যোগ নেওয়া দরকার। পাশাপাশি স্টক এক্সচেঞ্জকে আরও কার্যকর ও ক্ষমতায়িত করা এবং বাজারের কাঠামোগত সংস্কার জরুরি।

পুঁজিবাজারের টেকসই উন্নয়নের জন্য শুধু আইপিও বিধিমালা পরিবর্তন যথেষ্ট নয়। বাজারের কাঠামোগত সংস্কার, স্টক এক্সচেঞ্জকে কার্যকর ভূমিকা পালনের সুযোগ দেওয়া ও সরকারি মালিকানাধীন লাভজনক প্রতিষ্ঠানকে দ্রুত তালিকাভুক্ত করাও গুরুত্বপূর্ণ।- ডিবিএ সভাপতি সাইফুল ইসলামনতুন আইপিও নীতিমালায় বড় পরিবর্তনের উদ্যোগআইপিও সংকট কাটাতে ২০২৫ সালের পাবলিক অফার অব ইক্যুইটি সিকিউরিটিজ বিধিমালা সংশোধনের খসড়া প্রকাশ করেছে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি)। ১৮ অক্টোবর থেকে পরবর্তী দুই সপ্তাহের মধ্যে খসড়াটির বিষয়ে জনমত, পরামর্শ ও আপত্তি জানানোর সুযোগ রাখা হয়েছে।প্রস্তাবিত সংশোধনে আইপিওর আগে কোম্পানির আর্থিক ও অন্যান্য তথ্য স্বাধীনভাবে যাচাই, শেয়ারের মূল্য নির্ধারণে একাধিক পদ্ধতি ব্যবহার, উদ্যোক্তাদের বিদ্যমান শেয়ার বিক্রির সুযোগ এবং বিনিয়োগকারীদের মধ্যে শেয়ার বরাদ্দের পদ্ধতিতে পরিবর্তনের প্রস্তাব রয়েছে।খসড়ার গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, আইপিও আবেদন জমা দেওয়ার আগে বাধ্যতামূলকভাবে প্রাথমিক গণপ্রস্তাব পূর্ব যাচাই বা প্রি-আইপিও ভেরিফিকেশন। বিএসইসির নির্ধারিত প্যানেল থেকে নিয়োগ করা নিরীক্ষক সংশ্লিষ্ট কোম্পানির আর্থিক বিবরণী, প্রসপেক্টাসের তথ্য এবং সংশ্লিষ্ট নথিপত্র যাচাই করবেন।প্রস্তাবে যাচাইয়ের আওতায় ১৫টি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র রাখা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে কোম্পানির বিক্রি ও রাজস্ব, পাওনা ও দেনা, মজুত পণ্য, স্থায়ী সম্পদ, নগদ অর্থ, ব্যাংক হিসাব, ঋণ ও দায়, কর ও ভ্যাট, উদ্যোক্তা-পরিচালকদের তথ্য, ব্যবসায়িক কার্যক্রম এবং শেয়ার মালিকানার বিবরণ। ভুয়া বিক্রি, সম্পদ বাড়িয়ে দেখানো, আর্থিক হিসাব সাজিয়ে উপস্থাপন ও ঋণের অর্থ অন্য খাতে সরিয়ে নেওয়ার মতো ঝুঁকিও যাচাইয়ের আওতায় আনার প্রস্তাব করা হয়েছে।এছাড়া শেয়ারের মূল্য নির্ধারণে অন্তত চারটি পদ্ধতি ব্যবহারের প্রস্তাব রয়েছে। এর মধ্যে অন্তত দুটি হবে পরম মূল্যায়ন পদ্ধতি এবং দুটি তুলনামূলক মূল্যায়ন পদ্ধতি। এতে কোম্পানি ও ইস্যু ব্যবস্থাপককে শেয়ারের মূল্য যৌক্তিকভাবে উপস্থাপন করতে হবে।

প্রস্তাবিত বিধিমালায় নির্দিষ্ট শর্তে লোকসানে থাকা অবকাঠামো ও মূলধননিবিড় কোম্পানি এবং নতুন প্রকল্পের কোম্পানিকেও আইপিওতে আসার সুযোগ দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। তবে এ সুযোগের অর্থ এই নয় যে, যে কোনো লোকসানি কোম্পানি যাচাই ছাড়াই তালিকাভুক্ত হতে পারবে।এ বিষয়ে আলাপ হলে প্রাইম ব্যাংক সিকিউরিটিজের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. মনিরুজ্জামান বলেন,মুক্তবাজার অর্থনীতিতে কোন কোম্পানিতে বিনিয়োগ করবেন, সেই সিদ্ধান্ত নেওয়ার স্বাধীনতা বিনিয়োগকারীর থাকা উচিত। একজন বিনিয়োগকারী লোকসানি বা ঝুঁকিপূর্ণ কোম্পানিতে বিনিয়োগ করতে পারেন। তবে এ ধরনের বিনিয়োগের ঝুঁকি সম্পর্কে তাদের সচেতন থাকা জরুরি।এ নিয়ে ডিএসই পরিচালক মিনহাজ মান্নান ইমন বলেন, শুধু লাভ-লোকসানের ভিত্তিতে কোনো কোম্পানির আইপিওর যোগ্যতা নির্ধারণ করা ঠিক নয়। কোম্পানি লোকসানে থাকলেই তাকে পুঁজিবাজারে আসতে দেওয়া যাবে না, এমন ধারণা সঠিক নয়। তবে কোনো কোম্পানি তালিকাভুক্ত হলে বিনিয়োগকারীরা উপকৃত হবেন কি না, তা নিশ্চিত করে বলা যায় না।তার মতে, কোম্পানির বর্তমান লোকসানের পাশাপাশি ব্যবসার ধরন, ভবিষ্যৎ আয়ের সম্ভাবনা, ঋণের চাপ, নগদ প্রবাহ ও শেয়ারের মূল্যায়ন বিবেচনায় নেওয়া জরুরি।

একই সঙ্গে আইপিও থেকে সংগৃহীত অর্থ কোন খাতে ব্যয় হচ্ছে, সেটিও নজরদারির আওতায় রাখতে হবে।পুঁজিবাজারের নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন ভবন/ফাইল ছবিসরাসরি তালিকাভুক্তির নতুন বিধিমালাআইপিও সংকট কাটাতে আরেকটি উদ্যোগ হলো সরাসরি তালিকাভুক্তির বিধিমালা। ১৮ অক্টোবর ‘বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (স্টক এক্সচেঞ্জে সিকিউরিটিজের সরাসরি তালিকাভুক্তি) বিধিমালা, ২০২৬’ গেজেট আকারে প্রকাশিত হয়। এই ব্যবস্থায় নির্ধারিত শর্ত পূরণকারী কোম্পানির বিদ্যমান শেয়ারহোল্ডাররা আইপিওর মাধ্যমে নতুন শেয়ার ইস্যু না করেও শেয়ার বিক্রি করে স্টক এক্সচেঞ্জে তালিকাভুক্তির সুযোগ পাবেন। এতে বড় ও প্রতিষ্ঠিত কোম্পানিকে পুঁজিবাজারে আনার বিকল্প পথ তৈরি হয়েছে।সরাসরি তালিকাভুক্তির সুবিধা হলো, কোম্পানিকে নতুন শেয়ার ইস্যু করে অর্থ সংগ্রহের প্রক্রিয়ায় যেতে হবে না। তবে এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য রয়েছে। বিদ্যমান শেয়ার বিক্রি করে যে অর্থ পাওয়া যাবে, তা কোম্পানির পরিবর্তে শেয়ার বিক্রেতাদের হাতে যাবে। ফলে কোম্পানির ব্যবসা সম্প্রসারণ বা নতুন বিনিয়োগের জন্য সরাসরি নতুন মূলধন সংগ্রহ হবে না।তাই আইপিও এবং সরাসরি তালিকাভুক্তি দুটিরই আলাদা গুরুত্ব রয়েছে। আইপিও কোম্পানির নতুন মূলধন সংগ্রহের সুযোগ তৈরি করে। আর সরাসরি তালিকাভুক্তি বাজারে প্রতিষ্ঠিত কোম্পানির অংশগ্রহণ বাড়াতে পারে। তবে বড় কোম্পানি তালিকাভুক্ত হলেই শেয়ারের দাম বাড়বে বা বিনিয়োগকারীরা লাভবান হবেন, এমন নিশ্চয়তা নেই। কোম্পানির আর্থিক সক্ষমতা, শেয়ারের মূল্যায়ন, বাজারে শেয়ারের সরবরাহ ও বিনিয়োগকারীদের চাহিদার ওপর এর ফল নির্ভর করবে।ডিবিএ সভাপতি সাইফুল ইসলাম বলেন, পুঁজিবাজারের টেকসই উন্নয়নের জন্য শুধু আইপিও বিধিমালা পরিবর্তন যথেষ্ট নয়। বাজারের কাঠামোগত সংস্কার, স্টক এক্সচেঞ্জকে কার্যকর ভূমিকা পালনের সুযোগ দেওয়া ও সরকারি মালিকানাধীন লাভজনক প্রতিষ্ঠানকে দ্রুত তালিকাভুক্ত করাও গুরুত্বপূর্ণ।তিনি ডিমিউচুয়ালাইজেশন স্কিম পর্যালোচনা, সেন্ট্রাল ডিপোজিটরি বাংলাদেশ লিমিটেডে (সিডিবিএল) ডিএসইর মালিকানা বৃদ্ধি ও সেন্ট্রাল কাউন্টারপার্টি বাংলাদেশ লিমিটেডে (সিসিবিএল) ডিএসইর নিয়ন্ত্রণমূলক অংশীদারত্ব নিশ্চিত করার দাবি জানান।আইপিওর নতুন নীতিমালা বাজারে প্রাণ ফেরানোর সুযোগ তৈরি করতে পারে।

তবে তার জন্য স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে। অতীতের মতো কোনো দুর্বল কোম্পানি বাজার থেকে টাকা তুলে নিতে পারবে না, বিনিয়োগকারীরা সেই নিশ্চয়তা পেলে বাজারের প্রতি আস্থা বাড়বে।- ডিএসইর এক সদস্যআস্থা ফেরাতে দরকার দুর্বল নজরদারি দূর করাবাজারে সংকটের পেছনে শুধু আইপিওর অভাব নয়, দীর্ঘদিনের আস্থাহীনতাও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। ডিএসইর এক সদস্য বলেন, ভালো ও মানসম্পন্ন কোম্পানির সংকটের পাশাপাশি দুর্বল নজরদারি ব্যবস্থার কারণে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে অনাস্থা বেড়েছে। তবে দ্রুত কিছু ভালো কোম্পানি তালিকাভুক্ত হলে বাজারে গতি ফিরবে। বিনিয়োগকারীর সংখ্যা ও লেনদেন বাড়বে।তিনি উল্লেখ করেন, বাজারের নেতৃত্বে থাকা ব্যক্তিদের পুঁজিবাজার সম্পর্কে যথেষ্ট জ্ঞান ও বোঝাপড়া থাকা জরুরি। বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফেরাতে নিয়ন্ত্রক সংস্থা, স্টক এক্সচেঞ্জ ও কোম্পানিগুলোর সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। মানহীন আইপিও ঠেকানোর পাশাপাশি কোম্পানিগুলো সংগৃহীত অর্থ কীভাবে ব্যবহার করছে, তা নিশ্চিত করতে হবে।তিনি আরও বলেন, সন্দেহজনক লেনদেন শনাক্ত হলে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া, বাজার কারসাজির অভিযোগ তদন্ত করা, মূল্যসংবেদনশীল তথ্য প্রকাশে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা ও অনিয়মের বিরুদ্ধে কার্যকর শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি। সেই সঙ্গে বিনিয়োগকারীদের অভিযোগ নিষ্পত্তির প্রক্রিয়াও সহজ ও দ্রুত করতে হবে।প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগ বাড়ানোর তাগিদসংশ্লিষ্টরা বলছেন, বাজারকে টেকসই করতে ব্যক্তিশ্রেণির বিনিয়োগকারীদের পাশাপাশি ব্যাংক, বিমা কোম্পানি, মিউচুয়াল ফান্ড ও সম্পদ ব্যবস্থাপনা প্রতিষ্ঠানের অংশগ্রহণ বাড়ানো প্রয়োজন। তবে প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগ যেন যথাযথ ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা ও সুশাসনের ভিত্তিতে হয়, সেটিও নিশ্চিত করতে হবে।একই সঙ্গে মিউচুয়াল ফান্ডের ব্যবস্থাপনা ও জবাবদিহি শক্তিশালী করা জরুরি। বিনিয়োগকারীদের অর্থ পেশাদারভাবে ব্যবস্থাপনার জন্য যে প্রতিষ্ঠানগুলো দায়িত্ব পায়, তাদের কার্যক্রমে স্বচ্ছতা নিশ্চিত না হলে দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগের পরিবেশ তৈরি হবে না।ডিএসইর সাবেক পরিচালক মো. শাকিল রিজভী জানান, নতুন আইপিও আসার সঙ্গে সঙ্গে বাজারে নতুন বিনিয়োগকারীও আসে। এতে বাজারে তারল্য বাড়ে এবং বিনিয়োগের বিকল্প তৈরি হয়। তাই দ্রুত কিছু ভালো কোম্পানি তালিকাভুক্তির ব্যবস্থা করতে হবে।তিনি বলেন, ‘আমাদের শেয়ারবাজার অনেকটাই খুচরা বিনিয়োগকারী নির্ভর।

এ কারণে বাজারে বেশি অস্থিরতা দেখা যায়। প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারী বাড়লে বাজারের ভিত শক্তিশালী হয়। নতুন আইপিও আনার পাশাপাশি প্রতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের অংশগ্রহণ বাড়ানোর দিকেও নজর দিতে হবে।‘তিনি আরও উল্লেখ করেন, নতুন বিনিয়োগপণ্য, বন্ড ও অন্যান্য ঋণপণ্যের কার্যকর বাজার গড়ে উঠলেও অর্থায়নের বিকল্প বাড়বে। এতে কোম্পানিগুলোর জন্য শুধু ব্যাংকঋণের ওপর নির্ভর না করে পুঁজিবাজার থেকে দীর্ঘমেয়াদি অর্থ সংগ্রহের সুযোগ তৈরি হবে।সামনে বড় পরীক্ষাআইপিও নীতিমালা সংশোধন এবং সরাসরি তালিকাভুক্তির নতুন বিধিমালা দেশের শেয়ারবাজারে নতুন কোম্পানি আনার সম্ভাবনা তৈরি করেছে। কিন্তু এসব উদ্যোগের সুফল নির্ভর করবে বাস্তবায়নের স্বচ্ছতা, কোম্পানির মান ও বিনিয়োগকারীদের স্বার্থ কতটা সুরক্ষিত হচ্ছে তার ওপর।ডিএসইর এক সদস্যের মতে, বাজারে নতুন কোম্পানি আনতে হবে, কিন্তু তা যেন বিনিয়োগকারীদের জন্য নতুন ঝুঁকির কারণ না হয়। শেয়ারবাজারের টেকসই উন্নয়নে কয়েকটি বিষয়কে সমান গুরুত্ব দিতে হবে। এর মধ্যে রয়েছে- মানসম্মত কোম্পানির তালিকাভুক্তি, স্বচ্ছ ও যৌক্তিক মূল্য নির্ধারণ, শক্তিশালী নজরদারি, প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগ বৃদ্ধি এবং বিনিয়োগকারীদের আস্থা পুনর্গঠন। এগুলো করা না গেলে বাজার স্থিতিশীল হবে না।তিনি বলেন, একদিকে বাজারে টানা দরপতন ও লেনদেন খরা দেখা যাচ্ছে, অন্যদিকে আইপিও সংকট কাটাতে আইপিও নীতিমালা সংশোধন করা হচ্ছে। এটাকে শেয়ারবাজারের এক গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণ বলা যায়। আইপিওর নতুন নীতিমালা বাজারে প্রাণ ফেরানোর সুযোগ তৈরি করতে পারে। তবে তার জন্য স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে। অতীতের মতো কোনো দুর্বল কোম্পানি বাজার থেকে টাকা তুলে নিতে পারবে না, বিনিয়োগকারীরা সেই নিশ্চয়তা পেলে বাজারের প্রতি আস্থা বাড়বে। নিয়ন্ত্রক সংস্থার জন্য বিনিয়োগকারীদের এই আস্থা প্রতিষ্ঠা করা এখন এক প্রকার বড় পরীক্ষা।

Top