স্বেচ্ছাচারিতার বেড়াজালে ভালো গ্রাহকও খেলাপি! - Alokitobarta
আজ : মঙ্গলবার, ১৮ই আগস্ট, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ৩রা ভাদ্র, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সর্বশেষ সংবাদঃ

স্বেচ্ছাচারিতার বেড়াজালে ভালো গ্রাহকও খেলাপি!


মোহাম্মাদ আবুবকর সিদ্দীক ভুঁইয়া:ঋণ সমন্বয় রীতিনীতির কোনো তোয়াক্কা করছে না সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক (এসআইবিএল)।এ ধরনের অনেক ঘটনায় ব্যাংকটিতে দেখা দিয়েছে ব্যাপক গ্রাহক অসন্তোষ। বাংলাদেশ ব্যাংকে জমা পড়েছে ভুক্তভোগীদের বেশকিছু অভিযোগও।এমনকি আমানত সমন্বয় করে ঋণ পরিশোধ করতে চান-এমন স্বনামধন্য গ্রাহকও হচ্ছেন চরম হয়রানির শিকার। যেখানে ঋণ পরিশোধ হওয়ার পর ‘থ্যাংকস লেটার’ পাওয়ার কথা, সেখানে উলটো সমন্বয় না করে খেলাপি করা হয়েছে।

প্রাপ্ত অভিযোগে দেখা যায়, সম্প্রতি দেশের একজন শীর্ষস্থানীয় শিল্পোদ্যোক্তাকে কোনো কারণ দর্শানো নোটিশ ছাড়াই ঋণখেলাপি করে দেয় এসআইবিএল। অথচ এ ঘটনার এক মাস আগে থেকেই সংশ্লিষ্ট গ্রাহক স্বপ্রণোদিত হয়ে ব্যাংকের সঙ্গে দায়দেনা সমন্বয়ের উদ্যোগ নেন। তিনি লিখিতভাবে ব্যাংকটিকে জানান, ব্যাংকটিতে তার ঋণের পরিমাণ ৬ কোটি ৪৬ লাখ টাকা। এছাড়া ব্যাংকটিতে এফডিআর ও মুনাফাসহ জমা আছে ৫ কোটি ৫২ লাখ টাকা। এখন এই আমানতের সঙ্গে ঋণ সমন্বয় করা হলে অবশিষ্ট ঋণের পরিমাণ থাকে ৯৪ লাখ টাকা। গ্রাহক অবশিষ্ট টাকা পরিশোধ করে দায়দেনা থেকে একেবারে বেরিয়ে যেতে চান। এ বিষয়ে গ্রাহককেও জানিয়ে দেওয়া হয় যে-বিষয়টি নিয়ে ব্যাংক কাজ করছে। অথচ হঠাৎ করে গত সপ্তাহে ব্যাংক এই গ্রাহককে খেলাপি হিসাবে তালিকাভুক্ত করে। এ ঘটনায় বিস্মিত ও চরম সংক্ষুব্ধ হন সংশ্লিষ্ট গ্রাহক। সূত্রমতে, তিনি এখন বিষয়টি নিয়ে মামলা করার প্রস্তুতি নিচ্ছেন।

এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে এসআইবিএলের সাবেক এমডি শফিকুর রহমান বলেন, ‘কেউ টাকা দিতে চায় আর ব্যাংক সে টাকা না নিয়ে উলটো খেলাপি করে-এটা জীবনে প্রথম শুনলাম। আসলে এরা ব্যাংকিংয়ের ‘ব’ও বোঝে না। আমি হলে কয়েক ঘণ্টার মধ্যে এই ঋণ সমন্বয় করে গ্রাহককে থ্যাংকস লেটার পাঠাতাম।’

তিনি বলেন, এদের (বর্তমান প্রশাসকের) বাণিজ্যিক ব্যাংক চালানোর কোনো যোগ্যতাই নেই। এছাড়া প্রাতিষ্ঠানিক আমানতকারীদের কোনো মুনাফা না দেওয়ারও তীব্র সমালোচনা করেন তিনি। এক প্রশ্নের জবাবে শফিকুর রহমান বলেন, এ ধরনের কিছু ব্যাংকের স্বেচ্ছাচারিতার কারণে ভালো গ্রাহকও খেলাপি হয়ে যান। বিষয়টিকে কেস স্টাডি হিসাবে বাংলাদেশ ব্যাংকের তদন্ত করা উচিত।

সূত্র জানায়, সম্পূর্ণ নিয়মবহির্ভূত ও আলোচিত এই ঋণখেলাপি করার ঘটনায় ব্যাপক হইচই হওয়ার পর গ্রাহককে এফডিআরের ৪ কোটি টাকা (প্রিন্সিপাল) ফেরত দিয়েছে এসআইবিএল, যা পরে ব্যাংকের ঋণ অ্যাকাউন্টে জমা দিলে খেলাপি স্ট্যাটাস প্রত্যাহার করা হয়। কিন্তু সিআইবির ইতিহাসে ঠিকই লেখা থাকবে খেলাপি। মূল এফডিআর ফেরত দিলেও এখনো ব্লক অ্যাকাউন্টে আটকে রেখেছে ১ কোটি ৫২ লাখ টাকার মুনাফা। অভিযোগ রয়েছে, বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ড. আহসান এইচ মনসুরের সরাসরি নির্দেশনায় ব্যাংকগুলো এ ধরনের অনৈতিক কাজ করছে, যা স্বয়ং ব্যাংকাররাও সমর্থন করছেন না।

এদিকে বাংলাদেশ ব্যাংকের গ্রাহকবিরোধী এক সিদ্ধান্তে ব্যাংকগুলোকে জানানো হয়, ২০২৪ ও ২০২৫ সালে প্রাতিষ্ঠানিক আমানতকারীদের কোনো মুনাফা দেবে না একীভূত হতে যাওয়া পাঁচ ব্যাংক। অথচ এই আমানতকারীদেরই সংশ্লিষ্ট ব্যাংকে কোনো ঋণ থাকলে সে ক্ষেত্রে কেটে নেবে ১৪ শতাংশ হারে মুনাফা।

এমন সিদ্ধান্তে ক্ষুব্ধ আমানতকারীরা বলছেন, এটা কোন আইনে আছে? আমানতকারীরা তো ব্যাংক লুটপাট করেনি, আর এসব ব্যাংক প্রাকৃতিক দুর্যোগের কবলেও পড়েনি। এখানে যে ধ্বংসযজ্ঞ হয়েছে, সবই মানবসৃষ্ট। এস আলম ও নজরুল ইসলাম মজুমদার যখন এসব ব্যাংক লুট করে, তখন বাংলাদেশ ব্যাংক কী করেছিল? এই যে লুটপাটকারী এবং লুটের সহযোগীদের কি কোনো কার্যকর বিচার হয়েছে? হয়নি। তাহলে লুটের দায় কেন আমানতকারীরা নেবেন, জিজ্ঞাসা ভুক্তভোগী আমানতকারীদের।

এদিকে ব্যক্তি আমানতকারীদের ব্যাংক দেবে ৪ শতাংশ মুনাফা, আর নেবে ১৪ শতাংশ। দুইয়ের ব্যবধান বা স্প্রেড ১০ শতাংশ। অথচ স্প্রেডের আন্তর্জাতিক স্ট্যান্ডার্ড মান হচ্ছে মাত্র ৩ শতাংশ, যা একীভূত হতে যাওয়া পাঁচটি ব্যাংকে কোনোভাবে মানা হচ্ছে না। এটা সাধারণ গ্রাহকদের কাছে ‘এক ধরনের ডাকাতি’। আবার নতুন নিয়ম অনুযায়ী উল্লিখিত পাঁচটি ব্যাংকে প্রাতিষ্ঠানিক আমানতকারীরা কোনো মুনাফা পাবেন না। অথচ ব্যাংকে তাদের আমানতের পরিমাণ সবচেয়ে বেশি।

এ অবস্থায় সংক্ষুব্ধ আমানতকারীদের অনেকে বলেন, ‘এসব ব্যাংকে আর থাকব না। আমাদের ন্যায্যতার ভিত্তিতে বের হওয়ার সুযোগ দিতে হবে। তা না হলে দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) মামলা করব।’

এ বিষয়ে জানতে সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংকের প্রশাসক ও বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক সালাহ উদ্দিনের সঙ্গে সরাসরি ও মুঠোফোনে যোগাযোগ করার চেষ্টা করলেও তার কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি। তবে ব্যাংকটির উপব্যবস্থাপনা পরিচালক (ডিএমডি) নাজমুস সা’য়াদাত জানান, ‘খেলাপি করার বিষয়টি জানি না। আর ৪ শতাংশ মুনাফা দেওয়ার সিদ্ধান্ত বাংলাদেশ ব্যাংকের। এটা ব্যাংকের কোনো নিজস্ব সিদ্ধান্ত নয়।জানতে চাইলে বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান বলেন, ‘শুরুতে কোনো মুনাফা দেওয়ার কথা ছিল না। একদম শূন্য ছিল। নানা চাপে সবশেষ ব্যক্তি আমানতে ৪ শতাংশ মুনাফা দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে। এটাই এখন পর্যন্ত চূড়ান্ত।

জানা গেছে, এটা শুধু এসআইবিএলের একার সমস্যা নয়। সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের আওতায় পাঁচটি ব্যাংকেরই একই সমস্যা। এসব ব্যাংকে প্রায় ৭৬ লাখ আমানতকারীর এক লাখ ৪২ হাজার কোটি টাকা জমা আছে।একীভূত হতে যাওয়া পাঁচটি ব্যাংকের মধ্যে রয়েছে-সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক, এক্সিম ব্যাংক, ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক, গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক ও ইউনিয়ন ব্যাংক।

Top