নির্বাচনে অপপ্রচারের নতুন অস্ত্র এআই - Alokitobarta
আজ : মঙ্গলবার, ১০ই ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ২৭শে মাঘ, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

নির্বাচনে অপপ্রচারের নতুন অস্ত্র এআই


মোহাম্মাদ আবুবকর সিদ্দীক ভুঁইয়া :ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে কৃত্রিম বুদ্ধমত্তা বা এআই’কে অপপ্রচারের নতুন অস্ত্র হিসাবে ব্যবহার করা হচ্ছে।উদ্বেগ বাড়ছে রাজনৈতিক অঙ্গনে। রাজনৈতিক নেতাদের মুখ ও কণ্ঠস্বর নকল করেও তৈরি হচ্ছে ডিপফেক অডিও ও এআই ভিডিও; যা হয়ে উঠছে ডিজিটাল অপপ্রচারের নতুন অস্ত্র। এতে প্রার্থী ও ভোটারদের মাঝে তৈরি হচ্ছে আতঙ্ক। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এমনসব ভিডিও ও ছবি ছড়িয়ে পড়ছে, যা দেখলে প্রথমে অবিশ্বাস করার উপায় নেই। তাৎক্ষণিকভাবে তা যাচাই করারও সুযোগ থাকে না। বুঝে-না-বুঝে তা শেয়ার দিয়ে নেট-দুনিয়ায় ছড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে, যা তৈরি করছে সন্দেহ ও অবিশ্বাস। বিভ্রান্ত হচ্ছে সাধারণ মানুষ।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিবিসি বাংলার লগো ব্যবহার করে ছড়িয়ে পড়া একটি ফটোকার্ডে দেখা যায়, গণভোটে ‘না’ ভোট দিলে আইনের আওতায় আনার হুঁশিয়ারি দিয়েছেন আইন উপদেষ্টা আসিফ নজরুল। ফ্যাক্ট চেকে দেখ যায়, ফটোকার্ডটি ভুয়া। তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, এমন কোনো ফটোকার্ড বিবিসি নিউজ বাংলা প্রকাশ করেনি।কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) দিয়ে তৈরি করা হয় এ ধরনের কনটেন্ট, যা দেখে সাধারণ মানুষ বিভ্রান্ত হয়ে নানারকম মন্তব্য করেন। কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগসংশ্লিষ্টরা এ ভুয়া ফটোকার্ড সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে দিচ্ছে। নির্বাচনে অংশ নেওয়ার সুযোগ না থাকায় অনলাইনে বিভ্রান্তি ছড়িয়ে বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি করছে।আরেকটি ঘটনায় দেখা যায়, মেট্রোরেলের খরচ বেশি, ক্ষমতায় গেলে জনগণের স্বার্থে মেট্রোরেল বন্ধ করে ডিজিটাল লোকাল বাস চালু করবে বিএনপি। এ ধরনের একটি ভুয়া ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়ালে জনমনে বিভ্রান্তি তৈরি হয়।

লাল টেলিফোনে কথা বলছেন প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস। পাশে জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান, বিএনপি নেতা সালাহউদ্দিন আহমদ এবং এনসিপির নেতা নাহিদ ইসলাম। এমন একটি ভিডিও ছড়ানো হচ্ছে। এতে দেখানো হয়, ফোনকলে ভারতে পলাতক শেখ হাসিনার সঙ্গে কথা বলছেন তারা। বাস্তবে জুলাই স্মৃতি জাদুঘর পরিদর্শনে যান প্রধান উপদেষ্টাসহ রাজনৈতিক দলের নেতারা। জাদুঘরে রাখা ফ্যাসিস্ট হাসিনার ব্যবহৃত বিভিন্ন উপকরণের মধ্যে লাল টেলিফোনটি তারা হাতে নাড়াচাড়া করে দেখেন।১২ ফেব্রুয়ারি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ঘিরে বিভিন্ন ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে সয়লাব এমন রাজনৈতিক প্রোপাগান্ডা, ডিপফেক ভিডিও, কণ্ঠ নকল করে বানানো অডিও ক্লিপ এবং কৌশলে এডিট করা বক্তব্য। এতে আতঙ্ক ছড়াচ্ছে রাজনীতিকসহ সবার মাঝে।এসব অপকর্মের পেছনে নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের সাইবার অপরাধীরা সক্রিয় বলে মনে করছে ফ্যাসিবাদবিরোধী রাজনৈতিক শক্তি। নিষিদ্ধ দলটির বিভিন্ন পর্যায় থেকে নির্বাচন ঠেকানোর মতো ভয়ংকর হুংকার সংবলিত ফটোকার্ড এমনকি নানারকম ভিডিও ছাড়া হচ্ছে। এর মধ্যে কোনটা আসল আর কোনটা নকল, যাচাই করার আগেই তা নেটে ছড়িয়ে পড়ছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এসব এআই ঝুঁকি মোকাবিলায় বাংলাদেশে এখনো তৈরি হয়নি আইন, নীতিমালা কিংবা কার্যকর প্রযুক্তিনির্ভর নিয়ন্ত্রণ কাঠামো। নীতিগত এই শূন্যতার সুযোগ নিয়েই ডিপফেক ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ধীরে ধীরে হয়ে উঠছে রাজনৈতিক অপপ্রচারের হাতিয়ার।

প্রযুক্তি বিশ্লেষক ও বেসিসের সাবেক চেয়ারম্যান প্রকৌশলী রাফেল কবির বলেন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার অপব্যবহার এখন বাংলাদেশের নির্বাচনি প্রক্রিয়ার জন্য বড় ঝুঁকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। এআই দিয়ে তৈরি ডিপফেক ভিডিও, ভুয়া অডিও কিংবা ফটোকার্ড সাধারণ মানুষের পক্ষে শনাক্ত করা অসম্ভব। এতে রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণে বিভ্রান্তি তৈরির শঙ্কা রয়েছে।

তিনি বলেন, নির্বাচনের আগে এমন ভুয়া কনটেন্ট ব্যক্তি বা দলের সুনাম নষ্ট করছে বলে মনে করি। বাংলাদেশে এআইনির্ভর অপপ্রচার ঠেকাতে কোনো নির্দিষ্ট নীতিমালা না থাকায় এটি বেশি ঘটছে। এ পর্যায়ে জাতীয়ভাবে একটি ডিজিটাল ফ্যাক্ট চেকিং ফ্রেমওয়ার্ক, সামাজিক যোগাযোগ প্ল্যাটফর্মগুলোর সঙ্গে সমন্বয় এবং আইনগত সংস্কারের ওপর গুরুত্ব আরোপ করেন তিনি।

এআই প্রযুক্তি ব্যবহার করে গণমাধ্যমের ফটোকার্ড, নিউজ পোর্টালের ডিজাইনে ভুয়া গ্রাফিকসের মাধ্যমে মনগড়া মিথ্যা তথ্য একযোগে বহু পেজ ও অ্যাকাউন্ট থেকে ছড়িয়ে দেওয়ার সমন্বিত অপপ্রচারের ঘটনাও ঘটছে। মূলধারার গণমাধ্যমের আদলে তৈরি একটি ফটোকার্ড ছড়িয়ে পড়ে ২১ জানুয়ারি। এতে দেখানো হয়, কুমিল্লা-৪ আসনে বিএনপির প্রার্থী মঞ্জুরুল আহসান মুন্সীর মনোনয়ন বৈধ ঘোষণা করেছেন হাইকোর্ট। বাস্তবে ওই ফটোকার্ডের কোনো ভিত্তি নেই মর্মে ফ্যাক্ট চেকে দেখা যায়।

বিশ্ব রাজনীতিতে এআই বিড়ম্বনা : একটি এআই জেনারেটেড ফোন কল কীভাবে ভোটারের মাইন্ডসেট বদলে দিতে পারে, এর জলন্ত উদাহরণ যুক্তরাষ্ট্রের সর্বশেষ প্রেসিডেনন্ট নির্বাচন। সেখানে একটি ডিপফেক ফোন কল ভাইরাল হয়। যাতে প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের কণ্ঠে ভোটারদের ভোট না দেওয়ার আহ্বান শোনা যায়। পরে প্রমাণিত হয় এটি এআই দিয়ে বানানো হয়েছিল।

একই রকম ঘটনা ২০২৪ সালে ভারতের লোকসভা নির্বাচনেও দেখা যায়। বেশ কয়েকটি রাজনৈতিক দলের নেতাদের এআইনির্ভর ভিডিও প্রকাশ পায়, যেখানে বিরোধী নেতাদের মুখে বিকৃত বা বানানো বক্তব্য বসিয়ে প্রচার চালানো হয়। তেলেঙ্গানায় এক প্রার্থীর ‘ডাবিং করা এআই ভিডিও’ ভাইরাল হয়, যা পরে ভুল তথ্য প্রমাণিত হয়। গত বছর কানাডার নবনির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নিকে শিশু যৌন নিপীড়ক জেফরি এপস্টেইনের সঙ্গে সুইমিংপুলে একসঙ্গে সাঁতার কাটার ছবি এক্স (সাবেক টুইটার) প্ল্যাটফর্মে ছড়িয়ে পড়তে দেখা যায়। যদিও এ অপপ্রচার কাজে আসেনি। নাইজেরিয়া, আর্জেন্টিনা, মেক্সিকোতেও নির্বাচনে এআইচালিত গুজব ছড়ানোর নজির রয়েছে।

সজাগ ইসি : বাংলাদেশে নির্বাচন কমিশন আসন্ন নির্বাচনে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) অপব্যবহারকে একটি চ্যালেঞ্জ হিসাবে দেখছে। প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) এএমএম নাসির উদ্দিন বলেন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করে যেভাবে নানামুখী অপপ্রচার চালানো হচ্ছে, তা মোকাবিলাই এখন আমাদের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। আমরা এখন এআই-এর যুগে। শুরু থেকেই আমি এ বিষয়টি নিয়ে শঙ্কা প্রকাশ করে আসছি।বিএনপি, জামায়াতসহ কয়েকটি রাজনৈতিক দল নির্বাচন কমিশনের কাছে এ নিয়ে উদ্বেগ জানায়। এ পরিপ্রেক্ষিতে নির্বাচনি আচরণবিধিতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচারসংক্রান্ত নিয়মকানুনে এআই-এর বিষয়টিও যুক্ত করা হয়। সে অনুযায়ী, প্রার্থী বা তার নির্বাচনি এজেন্ট কিংবা প্রার্থীর পক্ষে অন্য কেউ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার করে নির্বাচনি প্রচার চালাতে পারবেন। তবে প্রচার শুরুর আগে সংশ্লিষ্ট সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের নাম, অ্যাকাউন্ট আইডি, ই-মেইলসহ প্রয়োজনীয় শনাক্তকরণ তথ্য রিটার্নিং কর্মকর্তার কাছে দাখিল করতে হবে।

এএফপির ফ্যাক্ট চেক এডিটর ইয়ামিন সাজিদ বলেন, সাধারণত অপতথ্য এবং ভুয়া কনটেন্ট ছড়ানোর অন্যতম একটি প্রধান কারণ হচ্ছে ভিউ বাণিজ্য বা আর্থিক সুবিধা লাভ করা। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে অপতথ্যের লক্ষ্যবস্তু আর ভিউ বাণিজ্যের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। নির্বাচন সামনে রেখে অপতথ্য এখন রাজনৈতিক অস্থিরতা সৃষ্টির প্রধান হাতিয়ার হিসাবে ব্যবহার হচ্ছে। এক রাজনৈতিক দলের কর্মী-সমর্থকরা অন্য দলের নেতাদের স্বাস্থ্য, চরিত্র এবং সম্পদ নিয়ে অপতথ্য ছড়াচ্ছে। এসব করে অপতথ্য বিস্তারকারীদের বিশেষ দলের ভোটব্যাংক, সমর্থকদের বিভ্রান্ত এবং মানসিকভাবে প্রভাবিত করে রাজনৈতিক স্বার্থ হাসিলের অপচেষ্টা করতে দেখা যায়। এসব অপতথ্যের শিকার থেকে সমাজ এবং নিজেকে বাঁচাতে হলে জনগণকে নির্ভরযোগ্য গণমাধ্যম থেকে তথ্য জানার চেষ্টা বাড়াতে হবে। সামাজিক মাধ্যমে কোনো সেনসিটিভ তথ্য দেখলে সেটা বিশ্বাস করার আগে অবশ্যই যাচাই করে দেখতে হবে।জানা যায়, ভুয়া তথ্য, বিভ্রান্তিকর কনটেন্ট ও গুজব প্রতিরোধে আগামী জাতীয় নির্বাচন পর্যন্ত একটি বিশেষ সেল গঠন করেছে জাতীয় সাইবার সুরক্ষা এজেন্সি (এনসিএসএ)। প্রধান উপদেষ্টার প্রেস উইং, প্রেস ইনস্টিটিউট বাংলাদেশ (পিআইবি), বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থা (বাসস), বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন (বিটিআরসি) এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীগুলোর সঙ্গেও সমন্বয় করছে এনসিএসএ।

তথ্যপ্রযুক্তি বিভাগের সচিব শীষ হায়দার চৌধুরী বলেন, এনসিএসএ যে কোনো ধরনের ভুয়া তথ্য, অপতথ্য ও ডিজিটাল অপপ্রচার রোধে সক্রিয় রয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমকেন্দ্রিক ভুয়া কনটেন্ট শনাক্ত ও অপসারণে ৩৪ জন বিশেষজ্ঞ নিয়ে একটি বিশেষ টিম কাজ করছে। সার্বক্ষণিকভাবে সোশ্যাল মিডিয়ায় ছড়ানো প্রোপাগান্ডা পর্যবেক্ষণ, যাচাই ও প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিচ্ছে। তিনি বলেন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) নীতিমালার কাজ প্রায় শেষ পর্যায়ে। শীষ হায়দার চৌধুরী বলেন, নীতিমালাটি ইতোমধ্যে জনমত গ্রহণের জন্য ওয়েবসাইটে প্রকাশ করা হয়েছে। আমরা আশা করছি, নির্বাচনের আগেই এটি অনুমোদন পাবে।

Top