লোডশেডিংয়ের শঙ্কা নতুন বছরে
মোহাম্মাদ আবুবকর সিদ্দীক ভুঁইয়া :দেশে বিদ্যুৎ উৎপাদনের সক্ষমতা থাকলেও গ্যাস ও তেল সংকটের কারণে মে-জুনে লোডশেডিং হতে পারে।বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড-পিডিবির নীতিনির্ধারক সূত্র এ তথ্য জানিয়ে বলেছেন,নতুন সরকার ক্ষমতায় এসে বিপাকে পড়তে পারে।সব ঠিকঠাক থাকলে ফেব্রুয়ারিতে জাতীয় নির্বাচন হবে।আসবে নতুন সরকার।সেই নতুন সরকার বিদ্যুৎ নিয়ে অস্বস্তিতে পড়তে পারে।কারণ তবে কী পরিমাণে লোডশেডিং হতে পারে তার কোনো পরিসংখ্যান দিতে পারেনি পিডিবি। সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, গ্যাসের উৎপাদন ও সরবরাহ দুইই কমছে। অন্যদিকে পিডিবির কাছে সরকারি-বেসরকারি কোম্পানিগুলোর (আইপিপিসহ) পাওনা ৩৭ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্র বা আইপিপিগুলো পাবে ২১ হাজার ৩০৩ কোটি টাকা। এত বেশি দেনার কারণে আইপিপিগুলো ফার্নেস অয়েল কেনার জন্য এলসি পর্যন্ত করতে পারছে না। এ পরিস্থিতিতে ২০২৬ সালে বিদ্যুৎ উৎপাদনের সক্ষমতা থাকলেও বিদ্যুৎকেন্দ্রে জ্বালানি সংকটের কারণে উৎপাদন ব্যাহত হয়ে লোডশেডিং হতে পারে।
দেশে এখন বিদ্যুৎ উৎপাদনের সক্ষমতা আছে ২৮ হাজার মেগাওয়াটের বেশি। ২০২৬ সালের গরমের সময়ে পিক টাইমে বিদ্যুতের চাহিদা থাকতে পারে ১৮ হাজার মেগাওয়াট। যা এ বছর ছিল ১৭ হাজারের কম। এ বছর অর্থাৎ ২০২৫ সালে দীর্ঘ সময় ধরে বৃষ্টির কারণে বিদ্যুতের চাহিদা টানা বাড়েনি। অর্থাৎ পিক টাইমে মোটামুটি সামাল দেওয়া গেছে। ২০২৬ সালের মার্চ পর্যন্ত বিদ্যুৎ নিয়ে তেমন কোনো চিন্তা নেই। কারণ জানুয়ারিতে বিদ্যুতের তেমন চাহিদা থাকে না। ১০ থেকে ১১ হাজার মেগাওয়াট। ফেব্রুয়ারিতে নির্বাচন। এই মাসেই পবিত্র রমজান শুরু। মার্চে রোজা ও ঈদুল ফিতর। টানা ১৫ দিন কর্মচাঞ্চল্য কম থাকার সম্ভাবনা। এপ্রিলে বাড়বে গরম। এছাড়া ইরি-বোরো চাষে বিদ্যুতের চাহিদা কিছুটা বাড়বে। মে-জুন-জুলাইয়ে বিদ্যুতের চাহিদা টানা বাড়তে থাকবে। তখনই সংকটের শঙ্কা পিডিবির। পরিস্থিতি সামাল দিতে পিডিবির দরকার হবে দৈনিক ১২০ কোটি ঘনফুট গ্যাস। কিন্তু ২০২৫ সালে পিক টাইমে পিডিবি পেয়েছে ১০০ কোটি ঘনফুটের কম গ্যাস।
এদিকে,পেট্রোবাংলার চেয়ারম্যান গত সপ্তাহে বলেছেন, মার্চ পর্যন্ত দেশের শিল্পকারখানা আগের চেয়ে দৈনিক ২০ কোটি ঘনফুটের বেশি গ্যাস পাবে। কম পাবে বিদ্যুৎ খাত। কিন্তু এরপর কিভাবে গ্যাসের বিলিবণ্টন হবে তার কোনো সিদ্ধান্ত এখনো বিদ্যুৎ ও জ্বালানি মন্ত্রণালয় নেয়নি। দেশে গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে দৈনিক ৯ হাজার মেগাওয়াটের বেশি বিদ্যুৎ উৎপাদনের সক্ষমতা আছে পিডিবির। এখন চাহিদা না থাকায় সেখানে উৎপাদন হচ্ছে অর্ধেকের কম।
এদিকে,বেসরকারি বিদ্যুৎ কোম্পানিগুলোর অ্যাসোসিয়েশনের একজন বলেছেন, বাংলাদেশি বিদ্যুৎ কোম্পানিগুলোর বিল বাকি ৬-৭ মাসের। তারা ব্যাংক ঋণ শোধ করতে পারছে না। অন্যদিকে বিদ্যুৎ প্ল্যান্টের জন্য ফার্নেস অয়েলও আমদানি করতে পারছে না।
পিডিবি জানিয়েছে, ২০৩০ সাল পর্যন্ত আরও প্রায় ৫ হাজার মেগাওয়াটের ১৮টি প্ল্যান্ট বিদ্যুৎ উৎপাদনে আসতে পারে। এর মধ্যে ২০২৬ সালে রূপপুরের একটি ইউনিট ও পুরো প্ল্যান্ট আগামী দুই বছরে উৎপাদনে আসবে। রূপপুরের ওই প্ল্যান্টে বিদ্যুৎ উৎপাদনের সক্ষমতা আছে ২ হাজার ৪০০ মেগাওয়াট। এছাড়া গ্যাসভিত্তিক রূপসা ৮০০ মেগাওয়াট, ইউনাইটেডের আনোয়ারা ৫৯০ মেগাওয়াট, ঘোড়াশালের ৩ এবং ৪ নম্বর ইউনিট, আরপিজিসিএলের ময়মনসিংহ ৪০০ মেগাওয়াট এবং নরিনকোর কয়লাভিত্তিক ৬০০ মেগাওয়াটের দ্বিতীয় ইউনিট। মাসখানেক আগে নরিনকোর ৬০০ মেগাওয়াটের প্রথম ইউনিট চালু হয়েছে। ২০৩০ সালের মধ্যে ৯১৮ মেগাওয়াটের ১২টি সৌর বিদ্যুৎকেন্দ্র উৎপাদনে আসতে পারে। কিন্তু এত প্ল্যান্ট থাকার পরও সবচেয়ে বেশি চ্যালেঞ্জ হচ্ছে জ্বালানি (গ্যাস, কয়লা ও ফার্নেস অয়েল) সরবরাহ।
পিডিবি বলছে, মূলত বড় সমস্যা হচ্ছে বিদ্যুৎ বিতরণ ও বিক্রির মূল্যে ব্যাপক পার্থক্য। অর্থাৎ বেশি দামে কিনে কম দামে বিক্রি করে পিডিবি। এক্ষেত্রে বিদ্যুৎ উৎপাদন খরচ কমানো অথবা বিদ্যুতের দাম সমন্বয় ছাড়া উপায় নেই নতুন সরকারের কাছে। পিডিবির হিসাব অনুযায়ী, এখন প্রতি ইউনিট গড়ে উৎপাদন করতে তাদের খরচ হচ্ছে ১২ টাকা ৩৫ পয়সা। আর বিক্রি করছে ৬ টাকা ৬৩ পয়সা। প্রতি ইউনিটে পিডিবি লোকসান দেখাচ্ছে ৫ টাকা ৭২ পয়সা।
এদিকে, পেট্রোবাংলা বলছে, আগামী কয়েক বছরে গ্যাসের সরবরাহ আরও কমতে পারে। নতুন নতুন কূপে গ্যাস পেলেও ২০২৬ সালে গ্যাস সরবরাহ হতে পারে গড়ে দৈনিক ২৮৫ কোটি ৬০ লাখ, ২০২৭ সালে দৈনিক ২৮৫ কোটি ৫০ লাখ, ২০২৮ সালে দৈনিক ২৮৫ কোটি ৫৭ লাখ ঘনফুট। আরও একটি (তৃতীয়) এলএনজি টার্মিনাল বসানো হলে ২০২৮ সালের শেষে অথবা ২০২৯ সালে গ্যাসের সরবরাহ বাড়বে দৈনিক ৩৬৪ কোটি ৪০ লাখ ঘনফুট। ২০৩০ সালে নতুন করে এলএনজি আমদানির পর সরবরাহ কমবে। তখন সরবরাহ করা হবে দৈনিক ৩৫৫ কোটি ৫০ লাখ ঘনফুট।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এলএনজি আমদানি করে গ্যাস সরবরাহ দিতে দুটি টার্মিনাল আছে। তৃতীয়টি সামিট করার কথা। কিন্তু অন্তর্বর্তী সরকার সেটি বাতিল করে দিয়েছে। সেখানে তৃতীয় টার্মিনালের জন্য এখনো কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। সুতরাং এখন পর্যন্ত ২০২৮-২৯ সালে এলএনজির তৃতীয় টার্মিনাল চালুর কোনো সম্ভাবনা নেই।