এক লাখ ১০ হাজার কোটি টাকা পুনঃতপশিল চান ২০ ব্যবসায়ী - Alokitobarta
আজ : মঙ্গলবার, ১৮ই আগস্ট, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ৩রা ভাদ্র, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সর্বশেষ সংবাদঃ

এক লাখ ১০ হাজার কোটি টাকা পুনঃতপশিল চান ২০ ব্যবসায়ী


মোহাম্মাদ নাসির উদ্দিন: এক হাজার আবেদনের বিপরীতে দুই লাখ কোটি টাকার মতো ঋণ পুনঃতপশিল চাওয়া হয়েছে।ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণ দ্রুত বেড়ে এখন ছয় লাখ ৪৪ হাজার ৫১৫ কোটি টাকায় ঠেকেছে, যা মোট ঋণের ৩৫ দশমিক ৭৩ শতাংশ। বিপুল অঙ্কের খেলাপি ঋণ কমাতে চলতি বছরের শুরুতে বিশেষ সুবিধায় ঋণ পুনঃতপশিলের সুযোগ দেয় বাংলাদেশ ব্যাংক। দেশের ২০ ব্যবসায়ী গ্রুপ এক লাখ ১০ হাজার ৩০০ কোটি টাকার ঋণ নিয়মিত করার আবেদন করেছে।অবশ্য এ তালিকায় এসব ব্যবসায়ীর সব ঋণ রয়েছে এমনটি নয়, ঋণের আংশিক নিয়মিত করতে চেয়েছেন কোনো কোনো ব্যবসায়ী। কেন্দ্রীয় ব্যাংক সুযোগ দিলেও অনেক ক্ষেত্রে ব্যাংকগুলো সুবিধা দিচ্ছে না বলে জানা গেছে।

সংশ্লিষ্টরা জানান, হু হু করে সামনে আসা খেলাপি ঋণ কমাতে গত জানুয়ারিতে বিশেষ ব্যবস্থায় ঋণ পুনঃতপশিলের উদ্যোগ নেয় বাংলাদেশ ব্যাংক। কোনো নীতিমালা না করে শুরুতে পাঁচ সদস্যের একটি কমিটির মাধ্যমে আবেদন চাওয়া হয়। এই কমিটি মাত্র ২ শতাংশ ডাউন পেমেন্ট দিয়ে ১০ বছরের জন্য খেলাপি ঋণ পুনঃতপশিল, পুনর্গঠনের সুযোগ দেয়। তবে নির্দিষ্ট কোনো সার্কুলার জারি না করে কমিটির মাধ্যমে সুবিধা দেওয়া নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। অনৈতিক লেনদেনের মাধ্যমে তালিকায় নাম ওঠানো হচ্ছে– এ রকম অভিযোগও পায় কেন্দ্রীয় ব্যাংক।

বাংলাদেশ ব্যাংকের বিভিন্ন পর্যায়ে কথা বলে জানা গেছে, সরাসরি গ্রাহকের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে এভাবে ঋণ পুনঃতপশিল করা কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কাজ নয়। এ রকম অবস্থায় বিশেষ বিবেচনায় পুনঃতপশিল করে দেওয়ার কথা বলে অনৈতিক পদক্ষেপেরও অভিযোগ আসে। যে কারণে গত সেপ্টেম্বরে একটি সার্কুলারের মাধ্যমে বিশেষ পুনঃতপশিলের বিষয়টি ব্যাংকগুলোর হাতে ছেড়ে দেওয়া হয়। প্রথমে বলা হয়েছিল, জুন পর্যন্ত খেলাপি হওয়া ঋণে এ সুবিধা দেওয়া যাবে। পরে নভেম্বরের প্রথম সপ্তাহে আরেকটি সার্কুলার জারি করে বলা হয়, ৩০ নভেম্বর পর্যন্ত খেলাপি ঋণে বিশেষ সুবিধার জন্য আবেদন করতে পারবে।

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের সাবেক অধ্যাপক ড. মইনুল ইসলাম বলেন, এভাবে খেলাপি ঋণ কমানো কোনো সমাধান নয়। এ রকম টোটকা দাওয়াই দিয়ে খেলাপি ঋণ সমস্যার সমাধান হবে না।

গত জানুয়ারিতে গঠিত যাচাই-বাছাই কমিটির কাছে এক হাজার ৪০টি আবেদন জমা পড়ে। এর মধ্যে পাঁচটি আবেদনে ৫৫ হাজার ৩৪৪ কোটি টাকার পুনঃতপশিল চাওয়া হয়েছে। এককভাবে সর্বোচ্চ ১৪ হাজার ৭৭১ কোটি টাকা পুনঃতপশিল চেয়েছে মাগুরা গ্রুপ। আট ব্যাংক ও তিন আর্থিক প্রতিষ্ঠানে তাদের এই ঋণ রয়েছে।

এস আলম গ্রুপের ১২ হাজার ৭৬৬ কোটি টাকা পুনঃতপশিল চেয়েছে গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক। এই আবেদন এস আলমের পক্ষ থেকে করা হয়নি। তাদের পক্ষে গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক আবেদন করলেও এতে কোনো সাড়া দেয়নি কেন্দ্রীয় ব্যাংক।

তৃতীয় সর্বোচ্চ ১১ হাজার ১৬৪ কোটি টাকা পুনঃতপশিলের আবেদন করেছে বসুন্ধরা গ্রুপ। এ ঋণ রয়েছে ২৮ ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানে।

নজরুল ইসলাম মজুমদারের নাসা গ্রুপ ৯ হাজার ৭২৪ কোটি টাকা নিয়মিত করার আবেদন করেছে। এই আবেদন করেছেন গ্রুপটির ভাইস চেয়ারম্যান খন্দকার মো. সাইফুল আলম।

সাবেক প্রধানমন্ত্রীর বেসরকারি, শিল্প ও বিনিয়োগ উপদেষ্টা বেক্সিমকো গ্রুপের ভাইস চেয়ারম্যান সালমান এফ রহমানের কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের ছয় হাজার ৯১৯ কোটি টাকার পুনঃতপশিল চাওয়া হয়েছে। এই আবেদন করেছেন গ্রুপটির নির্বাহী পরিচালক ওসমান কায়সার চৌধুরী। গত বছরের আগস্টে সরকার পতনের পর থেকে নজরুল ইসলাম মজুমদার ও সালমান এফ রহমান জেলে রয়েছেন।

ঋণ পুনঃতপশিলের দৌড়ে ষষ্ঠ অবস্থানে আছে জিপিএইচ ইস্পাত গ্রুপ। ২৮ ব্যাংকে গ্রুপটির ঋণ রয়েছে ছয় হাজার ৮৯৪ কোটি টাকা। এই ঋণ পুনঃতপশিল চেয়ে আবেদন করেছেন গ্রুপটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. জাহাঙ্গীর আলম।

জানতে চাইলে জিপিএইচ ইস্পাতের কোম্পানি সচিব মো. মোশারফ হোসেন বলেন, তাদের ঋণ খেলাপি হয়েছে তেমন নয়, নিয়মিত আছে। তবে করোনাভাইরাস ও রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের প্রভাবে বিনিময়হারজনিত লোকসানের কারণে কিছু সমস্যা হচ্ছে। যে কারণে পুনঃতপশিলের মাধ্যমে ঋণ পরিশোধে এখন বাড়তি সময় চাওয়া হয়েছে।

বিভিন্ন ব্যাংক থেকে ঋণের নামে বিপুল অঙ্কের অর্থ নিয়ে আলোচিত সাদ মুসা গ্রুপ। বেনামিসহ বিভিন্ন ব্যাংকের পাঁচ হাজার ১০০ কোটি টাকার ঋণ পুনঃতপশিলের আবেদন করেছে তারা। এর মধ্যে নিজ নামে ১৬ ব্যাংক ও ছয় আর্থিক প্রতিষ্ঠানের ঋণ সাড়ে চার হাজার কোটি টাকা। আর দুই ব্যাংক ও এক আর্থিক প্রতিষ্ঠানের বেনামি ৬০০ কোটি টাকা পুনঃতপশিল চাওয়া হয়েছে।

অষ্টম অবস্থানে থাকা ওপেক্স সিনহা গ্রুপ চার হাজার ৪৬৩ কোটি টাকা পুনঃতপশিল চেয়েছে। এ ছাড়া পরিমাণ বিবেচনায় ৩০ ব্যাংকে চার হাজার ১৮৬ কোটি টাকা পুনঃতপশিলের আবেদন করেছে নবম অবস্থানে থাকা আনোয়ার গ্রুপ।

ইসলামী ব্যাংকে নাবিল গ্রুপ চার হাজার ১৬১ কোটি টাকা পুনঃতপশিলের আবেদন করেছে। এর মধ্যে এজে ট্রেড ইন্টারন্যাশনালের এক হাজার ৩৮৪ কোটি, আনোয়ার ফিড মিলসের এক হাজার ১৭৫ কোটি, নাবিল গ্রেইন ক্রপসের ৯৪০ কোটি এবং নাবা এগ্রো ট্রেড ইন্টারন্যাশনালের নামে ৬৬২ কোটি টাকার ঋণ নিয়মিত করার আবেদন করা হয়েছে।

পরিমাণ বিবেচনায় ১১ নম্বরে থাকা পারটেক্স ২০ ব্যাংকে চার হাজার ৬২ কোটি টাকা বিশেষ পুনঃতপশিল চেয়েছে। এর মধ্যে পারটেক্স গ্রুপের দুই হাজার ২০০ কোটি এবং পারটেক্স স্টার গ্রুপের রয়েছে এক হাজার ৮৬১ কোটি টাকা।

এর পরের অবস্থানে থাকা গোল্ডেন সনের ১০ ব্যাংকে তিন হাজার ৮৭৪ কোটি, প্রভিটা গ্রুপের ২৩ ব্যাংকে তিন হাজার ৪০৬ কোটি, রুবি ফুড প্রোডাক্টের ১৩ ব্যাংকে তিন হাজার ৩৫৭ কোটি এবং আহসান গ্রুপের ১২ ব্যাংকে তিন হাজার ২৮ কোটি টাকার ঋণ পুনঃতপশিল চাওয়া হয়েছে।

পর্যায়ক্রমে পরিমাণ বিবেচনায় ১৬ নম্বরে থাকা আনোয়ার খান মডার্ন হাসপাতালের দুই হাজার ৮৫৭ কোটি এবং মেজর (অব.) মান্নানের সানম্যান গ্রুপের দুই হাজার ৫৪১ কোটি টাকার ঋণ নিয়মিত করার আবেদন করা হয়েছে। আব্দুল মোনেম গ্রুপ ২২ ব্যাংকে দুই হাজার ৫১১ কোটি, ডার্ড গ্রুপ সাত ব্যাংকে দুই হাজার ২১৫ কোটি এবং ১১ ব্যাংকে দুই হাজার ২০১ কোটি টাকার ঋণ নিয়মিত করার আবেদন করেছে জেএমআই গ্রুপ। এরই মধ্যে অনেক ক্ষেত্রে আবেদন নিষ্পত্তির জন্য ব্যাংকগুলোকে চিঠি দিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। তারা কোনো কোনো আবেদন নাকচ করে দিয়েছে। আবার সুবিধা অনুমোদন করে কেন্দ্রীয় ব্যাংক চিঠি দিলেও অনেক ব্যাংক সুবিধা দিচ্ছে না।

জেএমআই গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আব্দুর রাজ্জাক বলেন, কেন্দ্রীয় ব্যাংক ঋণ নিয়মিত করার অনুমোদন দিলেও ব্যাংকগুলো তা মানছে না। এতে করে ব্যবসা পরিচালনা কঠিন হয়ে যাচ্ছে। এ অবস্থায় কেন্দ্রীয় ব্যাংকে অভিযোগ করেছেন তিনি।

বিগত সরকারের সময় খেলাপি ঋণ আড়াল করার সুযোগ ছিল। তবে লুকিয়ে রাখা খেলাপি ঋণ এখন বেরিয়ে আসছে। গত সেপ্টেম্বর শেষে খেলাপি ঋণের পরিমাণ ঠেকেছে ছয় লাখ ৪৪ হাজার ৫১৫ কোটি টাকা। মোট ঋণের যা ৩৫ দশমিক ৭৩ শতাংশ এবং দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে সর্বোচ্চ।

গত বছরের সেপ্টেম্বরের শেষে খেলাপি ছিল দুই লাখ ৮৪ হাজার ৯৭৭ কোটি টাকা, মোট ঋণের ১৬ দশমিক ৯৩ শতাংশ। সে বিবেচনায় এক বছরে খেলাপি ঋণ বেড়েছে তিন লাখ ৫৯ হাজার ৫৩৮ কোটি টাকা বা দ্বিগুণের বেশি। খেলাপি ঋণ বেশি বাড়লে দেশের ঋণ মান কমাসহ ব্যবসা-বাণিজ্যে নানা সমস্যা তৈরি হয়। এ অবস্থায় বিশেষ বিবেচনায় খেলাপি ঋণ নিয়মিত করার এ উদ্যোগ নেওয়া হয়।

বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র ও নির্বাহী পরিচালক আরিফ হোসেন খান বলেন, ব্যাংকগুলোর ঋণ শ্রেণীকরণ করার ক্ষেত্রে কেন্দ্রীয় ব্যাংক এখন কঠোর অবস্থান নিয়েছে। তবে এই কঠোরতার কারণে কোনো প্রকৃত ব্যবসায়ী যেন সমস্যায় না পড়েন, সে জন্য বিশেষ ব্যবস্থায় ঋণ পুনঃতপশিলের সুযোগ দেওয়া হয়েছে।

Top