বিচার বিভাগ পৃথক হলো
মোহাম্মাদ মুরাদ হোসেন: বিচার বিভাগের পূর্ণ স্বাধীনতা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে সুপ্রিমকোর্ট সচিবালয় অধ্যাদেশ, ২০২৫ জারি করা হয়েছে। এর মাধ্যমে নির্বাহী বিভাগ থেকে পুরোপুরি পৃথক হলো বিচার বিভাগ। রোববার রাষ্ট্রপতির নির্দেশে আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রণালয় থেকে এ অধ্যাদেশ জারি করা হয়।এর আগে গত ২০ নভেম্বর অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা পরিষদ সুপ্রিমকোর্টের জন্য একটি পৃথক সচিবালয় প্রতিষ্ঠা সংক্রান্ত সুপ্রিমকোর্ট সচিবালয় অধ্যাদেশ, ২০২৫ এর খসড়ার চূড়ান্ত অনুমোদন দেয়।
বিচার বিভাগের প্রাতিষ্ঠানিক স্বতন্ত্রীকরণ নিশ্চিতে প্রধান বিচারপতির উদ্যোগে ২০২৪ সালের ২৭ অক্টোবর সুপ্রিমকোর্ট থেকে পৃথক বিচার বিভাগীয় সচিবালয় গঠনসংক্রান্ত প্রস্তাব আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়। সুপ্রিমকোর্ট সচিবালয় অধ্যাদেশ, ২০২৫ জারি করার মাধ্যমে বিচার বিভাগের জন্য পৃথক সচিবালয় প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন বাস্তব রূপ নিল।
এর আগে ২ সেপ্টেম্বর সুপ্রিমকোর্টের জন্য পৃথক সচিবালয় তিন মাসের মধ্যে প্রতিষ্ঠার নির্দেশ দিয়ে রায় দেন হাইকোর্ট। রায়ে আদালত বলেন, সুপ্রিমকোর্ট কর্তৃপক্ষের প্রস্তাব অনুসারে বিশেষত তিন মাসের মধ্যে সচিবালয় প্রতিষ্ঠা করতে বিবাদীদের নির্দেশ দেওয়া হলো। রায়ে অধস্তন আদালতের নিয়ন্ত্রণ ও শৃঙ্খলাসংক্রান্ত ১৯৭২ সালের সংবিধানের ১১৬ অনুচ্ছেদ পুনর্বহাল করেছেন হাইকোর্ট।
১৯৭২ সালের সংবিধানের ১১৬ অনুচ্ছেদ অনুসারে, বিচারকর্ম বিভাগে নিযুক্ত ব্যক্তিদের এবং বিচার বিভাগে দায়িত্ব পালনরত ম্যাজিস্ট্রেটদের নিয়ন্ত্রণ (কর্মস্থল নির্ধারণ, পদোন্নতি দান, ছুটি মঞ্জুরিসহ) ও শৃঙ্খলাবিধান সুপ্রিমকোর্টের ওপর ন্যস্ত থাকবে।
বিদ্যমান সংবিধানের ১১৬ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, বিচারকর্ম বিভাগে নিযুক্ত ব্যক্তিদের এবং বিচার বিভাগীয় দায়িত্ব পালনরত ম্যাজিস্ট্রেটদের নিয়ন্ত্রণ (কর্মস্থল নির্ধারণ, পদোন্নতি, ছুটি মঞ্জুরিসহ) ও শৃঙ্খলাবিধান রাষ্ট্রপতির ওপর ন্যস্ত। সুপ্রিমকোর্টের সঙ্গে পরামর্শক্রমে রাষ্ট্রপতি তা প্রয়োগ করে থাকেন। ১৯৭২ সালের সংবিধানের ১১৬ অনুচ্ছেদ অনুসারে, অধস্তন আদালতের নিয়ন্ত্রণ ও শৃঙ্খলাসংক্রান্ত বিষয় সুপ্রিমকোর্টের ওপর ন্যস্ত ছিল। ১৯৭৫ সালে সংবিধানের চতুর্থ সংশোধনীর মাধ্যমে এই দায়িত্ব রাষ্ট্রপতির ওপর ন্যস্ত করা হয়। পরে সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে ‘এবং সুপ্রিমকোর্টের সঙ্গে পরামর্শক্রমে রাষ্ট্রপতি কর্তৃক তা প্রযুক্ত হবে’ শব্দগুলো যুক্ত করা হয়।
১১৬ অনুচ্ছেদ সংশোধন সংবিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক উল্লেখ করে রায়ে হাইকোর্ট বলেন, ২০১১ সালে পঞ্চদশ সংশোধনী আইনের ৩৯ ধারা অনুসারে ১১৬ অনুচ্ছেদের সংশোধন সংবিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক বলে বাতিল করা হলো। একইভাবে ১৯৭৫ সালের চতুর্থ সংশোধনী আইনের ১৯ ধারার মাধ্যমে ১১৬ অনুচ্ছেদ সংশোধনও সাংঘর্ষিক বলে বাতিল করা হলো।
বিচার বিভাগ পৃথকের জন্য যে সাংবিধানিক রোডম্যাপ দেওয়া হয়েছিল ১৯৭২ সালের আদি সংবিধানে, তা বাস্তবায়নের জন্য ১৯৯৯ সালের ২ ডিসেম্বর মাসদার হোসেন মামলায় ১২ দফা নির্দেশনার রায় দেওয়া হয়। রায়ের আলোকে অধস্তন আদালতের বিচারকদের চাকরিতে নিয়োগ, বদলি, শৃঙ্খলা ইত্যাদি সংক্রান্ত বিষয়ে বিধিমালা প্রণয়নের নির্দেশনা ছিল। একপর্যায়ে ২০০৪ সালে বাদীপক্ষকে আদালত অবমাননার মামলাও করতে হয়েছে। এটা সত্য যে ১২ দফার মধ্যে ইতোমধ্যে কিছু কিছু আংশিকভাবে হলেও বাস্তবায়ন করেছে সরকার। তবে খুব সহজে হয়নি, এ জন্য বারবার আদেশ দিতে হয়েছে সর্বোচ্চ আদালতকে। এরপর ২০০৭ সালের ১ নভেম্বর বিগত তত্ত্বাবধায়ক সরকার বিচার বিভাগকে নির্বাহী বিভাগ থেকে পৃথক ঘোষণা করেন।