বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ কমেছে দুই কারণে ,কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রতিবেদন
মোহাম্মাদ মুরাদ হোসেন:সংকোচনমুখী মুদ্রানীতি অনুসরণ ও ঋণের সুদের হারের সীমা তুলে দেওয়ার কারণে বাণিজ্যিক ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর ঋণের সুদহার বেড়েছে। আর্থিক খাতে ঋণের সুদহার বৃদ্ধি ও সরকারের বেশি মাত্রায় ঋণ গ্রহণের ফলে বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ কমেছে। পরিবর্তিত রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে যে হারে খেলাপি ঋণ বাড়ছে, সে সমস্যার সমাধান করা এখন ব্যাংকিং খাতের জন্য অন্যতম প্রধান চ্যালেঞ্জ। এ চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় কেন্দ্রীয় ব্যাংক নানামুখী পদক্ষেপ নিচ্ছে। রোববার প্রকাশিত কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রতিবেদনে এসব কথা বলা হয়েছে।এদিকে বিশ্লেষকরা জানিয়েছেন, নতুন বেসরকারি বিনিয়োগ না হওয়ায় কর্মসংস্থান সৃষ্টি হচ্ছে না। এছাড়া বিদ্যমান রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সংকটের কারণে চালু শিল্পকারখানার সব সূচক নিম্নগামী। সবাই নির্বাচন ও নির্বাচিত সরকারের দিকে তাকিয়ে আছে। তবে ভোটের আগে অন্তর্বর্তী সরকারকে বেসরকারি শিল্প খাত বাঁচাতে কার্যকর নীতিসহায়তাও দিতে হবে।নির্বাচনের আগে বিনিয়োগ, ব্যবসা-বাণিজ্যের ধারাবাহিকতা বজায় রাখার স্বার্থে সরকারের করণীয় সম্পর্কে বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) সাবেক মহাপরিচালক ও বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. মুস্তফা কে মুজেরী বলেন, নির্বাচনের আগে বেসরকারি বিনিয়োগ বা বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ বাড়ানো কঠিন হবে। কারণ এখন কোনো উদ্যোক্তা নতুন কিছু শুরু করবে না। এখন সরকারকে ব্যবসা-বাণিজ্যের ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে হবে। ব্যবসায়ীদের স্বল্পমেয়াদি সমস্যাগুলো জরুরি ভিত্তিতে সমাধান করতে হবে। ব্যবসার ধারাবাহিকতা রক্ষা করতে ঋণের জোগান অব্যাহত রাখতে হবে। সরকার থেকে যাতে নতুন করে কোনো সমস্যার সৃষ্টি না হয় সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে।
তিনি আরও বলেন, সরকার এখন নির্বাচন নিয়েই বেশি ব্যস্ত থাকবে। নির্বাচনকালীন সময়ে অর্থনীতি সব সময় কিছুটা চাপের মধ্যেই থাকে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে বৈশ্বিক অস্থিরতা। এই চাপ কমাতে ব্যবসায়ীদের যথাসম্ভব নীতিসহায়তা দিতে হবে। কারণ অর্থনীতিকে এগিয়ে নিতে হবে। এ জন্য উদ্যোক্তাবান্ধব নীতি গ্রহণ করতে হবে।কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রতিবেদনে বলা হয়, মূল্যস্ফীতির ঊর্ধ্বগতি নিয়ন্ত্রণের জন্য কেন্দ্রীয় ব্যাংক ধারাবাহিকভাবে সংকোচনমুখী মুদ্রানীতি অনুসরণ করছে। এর প্রভাবে নীতি সুদহার বাড়ানো হয়েছে। যা ঋণের সুদের হার বাড়াতে ভূমিকা রেখেছে। আগে ঋণের সুদের হারের সীমা বেঁধে দেওয়া ছিল। সেই সীমা প্রত্যাহার করা হয়েছে। এতেও ঋণের সুদের হার বেড়েছে। মূলত এই দুই কারণে ঋণের সুদহার বেড়েছে। এদিকে রাজস্ব আয় কম হওয়ায় সরকার আর্থিক খাত থেকে বাড়তি ঋণ নিচ্ছে। ফলে ঋণের সুদহার বৃদ্ধি ও সরকারের মাত্রাতিরিক্ত ঋণ গ্রহণ-এই দুই কারণে বেসরকারি খাতে ঋণের প্রবাহ কমেছে।এতে আরও বলা হয়, রাজনৈতিক পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে বর্তমানে ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণ মাত্রাতিরিক্ত হারে বেড়ে যাচ্ছে। এর সমাধান করা এখন ব্যাংক খাতের জন্য অন্যতম প্রধান চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এ চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় কেন্দ্রীয় ব্যাংক বেশ কিছু পদক্ষেপ নিয়েছ। বাণিজ্যিক ব্যাংক থেকে সরকারের বর্ধিত ঋণের চাহিদার পরিপ্রেক্ষিতে ব্যাংক ব্যবস্থায় নিট অভ্যন্তরীণ সম্পদের প্রবৃদ্ধি হয়েছে, যে কারণে লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে মুদ্রা সরবরাহ বেড়েছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়, সামষ্টিক অর্থনীতির উল্লেখযোগ্য চ্যালেঞ্জগুলো সামনে রেখে বর্তমানে উচ্চ প্রবৃদ্ধি অর্জিত হবে না। এ কারণে মাঝারি মাত্রার দেশজ প্রবৃদ্ধি অর্জনে সহায়ক ভূমিকা রাখতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক পদক্ষেপ নিচ্ছে। এর মধ্যে অভ্যন্তরীণ বাজারমূল্য বিশেষত খাদ্য মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে রেখে পণ্যমূল্যে স্থিতিশীলতা আনয়নে কেন্দ্রীয় ব্যাংক জরুরি ও প্রয়োজনীয় নীতিমালা প্রণয়ন করছে। তবে, বিশ্বব্যাপী বাণিজ্য উত্তেজনা বৃদ্ধি পাওয়ার প্রেক্ষাপটে দেশের অগ্রাধিকার খাতসমূহ যথা-কৃষি, রপ্তানিমুখী শিল্প, আমদানি বিকল্প শিল্প ও সিএমএসএমই খাতে প্রয়োজনীয় ঋণপ্রবাহ নিশ্চিত করা, খেলাপি ঋণের মাত্রা হ্রাসে কার্যকর পদক্ষেপ বাস্তবায়ন, ব্যাংক খাতে তারল্য পরিস্থিতি স্বস্তিদায়ক পর্যায়ে ফিরিয়ে আনা, আমানতকারীদের স্বার্থ সুরক্ষা ও আস্থা পুনরুদ্ধারসহ আর্থিক খাতে সুশাসন নিশ্চিত করার লক্ষ্যে বাংলাদেশ ব্যাংক সরকারের সঙ্গে সমন্বিত প্রচেষ্টা অব্যাহত রেখেছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়, বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি তুলনামূলক কম হওয়ায় অভ্যন্তরীণ ঋণের প্রবৃদ্ধি লক্ষ্যমাত্রা এবং পূর্ববর্তী বছরের প্রকৃত প্রবৃদ্ধির তুলনায় কম হয়েছে। বার্ষিক ভিত্তিতে ব্যাংকব্যবস্থা থেকে গৃহীত সরকারের পুঞ্জীভূত নিট ঋণ স্থিতি ২০ দশমিক ২৯ শতাংশ বেড়েছে। সরকারের রাজস্ব আয় নির্ধারিত মাত্রার তুলনায় কম হওয়ায় সাম্প্রতিক সময়ে সরকারি ঋণের চাহিদা বেড়েছে।মূল্যস্ফীতি প্রসঙ্গে এতে বলা হয়, সংকোচনমূলক মুদ্রানীতির পাশাপাশি শীতকালীন শাকসবজির সরবরাহ বাড়ার কারণে ও বাজার ব্যবস্থায় সরবরাহ চেইন স্বাভাবিকীকরণের ফলে খাদ্য মূল্যস্ফীতি হ্রাস পেয়েছে। যা আলোচ্য সময়ে মূল্যস্ফীতি হ্রাসে সহায়ক ভূমিকা পালন করেছে।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, গত জুন পর্যন্ত জনসাধারণের নগদ অর্থ ধরে রাখার প্রবণতা বৃদ্ধি পেয়েছিল। পাশাপাশি সরকারের নিট ঋণ বেড়েছে। এ কারণে ব্যাংকগুলো তারল্য ব্যবস্থাপনার দিক থেকে অনেকটা চাপের মধ্যে ছিল। তবে কেন্দ্রীয় ব্যাংক কর্তৃক গৃহীত নানাবিধ পদক্ষেপ ও বিশেষ তারল্য সহায়তার ফলে ব্যাংক খাতের তারল্য পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি দেখা যাচ্ছে।