গতি বেড়েছে অর্থনীতির চাকায় - Alokitobarta
আজ : রবিবার, ১৬ই আগস্ট, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ১লা ভাদ্র, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

গতি বেড়েছে অর্থনীতির চাকায়


মোহাম্মাদ রফিকুল ইসলাম:অন্তর্র্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেয়ার পর স্থিতিশীলতায় ফিরছে দেশের অর্থনীতিতে। রেমিট্যান্স প্রবাহ বাড়ায় বেড়েছে রিজার্ভ। রফতানি আয়ে প্রবৃদ্ধি, ব্যাংকখাতে স্থিতিশীলতা ফিরেছে। ডলারের বাজার স্থিতিশীল হয়েছে। ড. ইউনূসের কারণে বিশ্ব মোড়ল যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়ন হওয়ায় পোশাক খাতের দীর্ঘদিনের অস্থিরতা অনেকটা কেটে গেছে। অর্থনীতির অধিকাংশ সূচকে অগ্রগতি হওয়ায় গতি বেড়েছে অর্থনীতির চাকায়। ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে গত ৫ আগস্ট পলাতক স্বৈরাচার হাসিনা গত ১৬ বছরে রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় দেশের অর্থনীতিকে খাদের কিনারে নিয়ে যায়। ড. ইউনূসের দায়িত্ব নেয়ার এখনো আড়াই মাস পূরণ হয়নি।ইতোমধ্যে আর্থিক খাতের সূচক গতি এসেছে। ইতোমধ্যে বিশ্বব্যাংক, এডিবি, আইএমএফসহ বিভিন্ন দাতা সংস্থা বাংলাদেশ সরকারকে অর্থায়ন সহযোগিতা অব্যাহত রাখার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। আইএমএফের বাজেট সহায়তার প্রতিশ্রুত সাড়ে চার বিলিয়ন ডলার ঋণ পাওয়ার ব্যাপারে আশাবাদ ব্যক্ত করেছে বাংলাদেশ। এছাড়া বাংলাদেশ ব্যাংক রিজার্ভ থেকে কোনো অর্থ ব্যয় না করেই গত দুই মাসে দেড় বিলিয়ন ডলার (১১৯ টাকা হিসেবে ১৭ হাজার ৮৭০ কোটি টাকা) দেনা পরিশোধ করেছে। এর ফলে পণ্য আমদানিতে অনিশ্চয়তা কাটতে শুরু করেছে। দীর্ঘদিনের অস্থিরতা কাটিয়ে ইতিবাচক ধারায় ফিরছে দেশের পোশাকখাত। তৈরি পোশাকের বৈশ্বিক ক্রেতারা আগামী মৌসুমের কার্যাদেশ নিয়ে বাংলাদেশের বাজারে ফিরতে শুরু করেছে। এছাড়া বন্যায় মাটিতে পলি পড়ায় আগামীতে ধান ও শাক-সবজির বাম্পার ফলনের সুযোগ তৈরি হয়েছে। একই সঙ্গে পরিকল্পনামাফিক আগামী সেচ মৌসুম, পোল্ট্রি ও হ্যাচারি এবং শিল্প কারখানায় বিদ্যুৎ সরবরাহ স্বাভাবিক রাখা গেলে ঘুড়ে দাঁড়াবে দেশের অর্থনীতি। বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকারের অল্প সময়ের মধ্যে আর্থিকখাতের বিভিন্ন সূচকের উন্নয়ন আগামীতে বিভিন্ন প্রকল্পে বিদেশি বিনোয়োগের জন্য আস্থা বাড়াবে বলে মত দিয়েছেন আর্থিকখাতের বিশেষজ্ঞরা। বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ড. আহসান এইচ মনসুর বলেছেন, ডিসেম্বরের মধ্যে সব দায় মেটানো শেষে আরো ইতিবাচক ধারায় ফিরবে দেশের অর্থনীতি। বিনিয়োগ, প্রবৃদ্ধি নিয়ে এই মুহূর্তে চিন্তা না করে, ধৈর্য ধরার পরামর্শ দেন তিনি। তিনি বলেন, আগের সরকারের বিভিন্ন বকেয়া পরিশোধের পর, চাপ কমবে আর্থিক ব্যবস্থাপনায়। যা গতি বাড়াবে সার্বিক কর্মকাণ্ডে।

বিজিএমইএ সভাপতি খন্দকার রফিকুল ইসলাম বলেন, ক্রেতারাও বাংলাদেশের পোশাক শিল্পের ওপর আস্থা রাখছেন। তৈরি পোশাকের বৈশ্বিক ক্রেতারা আগামী মৌসুমের কার্যাদেশ নিয়ে বাংলাদেশের বাজারে ফিরতে শুরু করেছেন। আগামী শরৎ ও শীত মৌসুমের জন্য কার্যাদেশ বা অর্ডার দিচ্ছেন। এনভয় লিগ্যাসির চেয়ারম্যান কুতুবউদ্দিন আহমেদ বলেন, আসন্ন মৌসুমের কার্যাদেশ প্রবাহে বড় ধরনের কোনো চ্যালেঞ্জ নেই। তারা এখান থেকে অর্ডার সরায়নি। ধীরে ধীরে বাংলাদেশ সে অবস্থানে যাচ্ছে।

সূত্র মতে, অন্তর্বর্তী সরকারের অন্যতম প্রধান চ্যালেঞ্জ ছিল অর্থনীতিতে স্থিতি এবং গতি ফেরানো। স্বৈরাচার হাসিনার অর্থপাচার ও লুটপাটসহ বৈদেশিক খাতে মৌলিক কিছু সমস্যায় দেশের অর্থনীতি ধুঁকছিল। বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ তলানিতে এসেছিল। ডলারের মূল্য বেশি পাওয়ায় রেমিট্যান্স প্রবাহের গতি শ্লথ হয়ে পড়েছিল। এতে ব্যাংকিং ব্যবস্থার ভঙ্গুর অবস্থা হয়ে পড়ে অর্থনীতির জন্য এক নম্বর সমস্যা। সরকারি ক্ষমতা প্রয়োগ করে বেসরকারি ব্যাংকগুলোর একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণ দেয়া হয় বিতর্কিত এস আলম গ্রুপকে। গ্রুপটি লুটপাট করে ফোকলা করে ফেলে ব্যাংকগুলোকে। অধিকাংশ ব্যাংকের অবস্থা বিপজ্জনক পর্যায়ে উপনীত হয়। সিপিডির মতে, ২০০৮ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত ১৫ বছরে দেশের ব্যাংক খাতে বড় বড় অন্তত ২৪টি আর্থিক কেলেঙ্কারির ঘটনা ঘটেছে। এর মাধ্যমে লোপাট হয়েছে ৯২ হাজার ২৬১ কোটি টাকা। এ অর্থ গত অর্থবছরের বাজেটের ১২ শতাংশ। অন্যদিকে, এ সময়ে খেলাপি ঋণ বেড়ে দাঁড়িয়েছে এক লাখ ৮২ হাজার ২৯৫ কোটি টাকা। ২০০৯ সালে খেলাপি ঋণের এই পরিমাণ ছিল ২২ হাজার ৪৮১ কোটি টাকা। পুরো ব্যাংকখাতই কার্যত নিয়মনীতির বাইরে চলে গেছে।
বিপর্যস্ত ব্যাংকখাতকে ফেরাতে ইতোমধ্যে নানামুখী পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে। তারল্য সংকটে ভুগতে থাকা দুর্বল ছয় ব্যাংককে মোট এক হাজার ৬৪০ কোটি টাকা ঋণ সহায়তা দিয়েছে সবল তিন ব্যাংক। এতে আর্থিকভাবে কিছুটা সংকট কাটিয়ে উঠে স্বাভাবিক ধারায় ফিরছে তারল্য সংকটে পড়া দুর্বল ব্যাংকগুলো।শুধু তারল্য সঙ্কট দূর করাই নয়; বাংলাদেশ ব্যাংক রিজার্ভ থেকে কোনো অর্থ ব্যয় না করেই গত দুই মাসে দেড় বিলিয়ন ডলার (১১৯ টাকা হিসেবে ১৭ হাজার ৮৭০ কোটি টাকা) দেনা পরিশোধ করেছে। আর এর ফলে পণ্য আমদানিতে অনিশ্চয়তা কাটতে শুরু করেছে। ৮ অক্টোবর পর্যন্ত বিপিএম-৬ হিসাব অনুযায়ী, বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ দাঁড়িয়েছে ১৯ দশমিক ৮২ বিলিয়ন মার্কিন ডলারে এবং মোট রিজার্ভ ২৪ দশমিক ৯৭ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ড. আহসান এইচ মনসুর বলেন, ২ দশমিক ৫ বিলিয়নের মতো অনাদায়ী, অনিষ্পন্ন দায় ছিল সরকারের। সেটি ছিল ডলারের। সেটি আমরা কমিয়ে ৭০০ মিলিয়নে নিয়ে এসেছি। সারের জন্য প্রচুর টাকা দেয়া হয়েছে, বিদ্যুতের জন্য দেয়া হয়েছে, আদানি-শেভরনকে দেয়া হয়েছে। সবার দেনাটা কিছুটা কমিয়ে আনা হয়েছে। আমাদের লক্ষ্য আগামী দুই মাসের মধ্যে দেনা জিরোতে নামিয়ে আনব।
এদিকে অস্থিরতা দূর করে পোশাকখাতে আবারো আস্থা ফিরছে বৈশ্বিক ক্রেতাদের। ডেকো লিগ্যাসি গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক কল্পন হোসেন বলেন, শিল্পাঞ্চলগুলোতে স্বাভাবিক অবস্থা ফিরে এসেছে এবং কারখানাগুলো উৎপাদন শুরু করেছে। আমরা ক্রেতাদের সঙ্গে বৈঠক করেছি। স্থিতিশীল ব্যবসা ও রাজনৈতিক পরিবেশ অব্যাহত থাকলে আগামী মৌসুম ব্যবসার জন্য ভালো হবে বলে আশা করছি। অনন্ত গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক শরীফ জহির বলেন, আশাবাদী, আগামী মৌসুমগুলো ভালো যাবে। কারণ পরিস্থিতি স্বাভাবিক হওয়ায় ক্রেতারা এখন অর্ডার বাড়াচ্ছেন।এছাড়া প্রবাসী আয়ের প্রবাহ বাড়ায় দেশের রিজার্ভ পরিস্থিতির উন্নতি ঘটেছে। রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর প্রবাসীরা গত আগস্ট মাস থেকে বৈধ চ্যানেলে বেশি পরিমাণ আয় পাঠাচ্ছেন। তাতে এ খাতে ভালো প্রবৃদ্ধি হয়েছে। একই সঙ্গে আমদানি ব্যয় হ্রাস পাওয়া ও বাড়তি বৈদেশিক ঋণের প্রতিশ্রুতির ফলে বহিস্থ খাতে কিছুটা স্বস্তি মিলছে। সব মিলিয়ে বিনিময় হারে এক ধরনের স্থিতিশীলতা ফিরে এসেছে বলে আর্থিক খাতসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানিয়েছেন। এদিকে রিজার্ভ থেকে ডলার বিক্রি একেবারেই বন্ধ করে দেয়ায় বৈদেশিক মুদ্রার মজুদের পতন থেমেছে। ব্যাংকে এখন ডলার ১২০ টাকা ও খোলাবাজারে ১২২ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে।

ব্যাংক কর্মকর্তারা বলছেন, ডলার নিয়ে যে হাহাকার ছিল, তা অনেকটা কমে এসেছে। বিদেশি মেয়াদোত্তীর্ণ বিলের অনেকগুলোই মেটানো হয়েছে। এরপরও তিন বিলিয়ন ডলারের দেনা রয়ে গেছে, যা আগামীতে পরিশোধ করতে হবে। ব্যাংক নির্বাহীদের সংগঠন অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স বাংলাদেশের (এবিবি) সাবেক চেয়ারম্যান ও মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ মাহবুবুর রহমান বলেন, ডলার নিয়ে অস্থিতিশীল যে পরিস্থিতি ছিল, তা কেটে গেছে। আগের মতো দাম নিয়েও তেমন হইচই নেই। সরকারি ব্যাংকগুলোর কিছু বকেয়া বিল এখনো রয়ে গেছে।বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাবে, গত সেপ্টেম্বরমোট প্রবাসী আয় এসেছে ২৪০ কোটি মার্কিন ডলার। গত বছরের সেপ্টেম্বরে এসেছিল ১৩৩ কোটি ডলার। সেই হিসাবে গত বছরের একই সময়ের তুলনায় গত মাসে প্রবাসীরা ৮০ শতাংশ বেশি অর্থ দেশে পাঠিয়েছেন। এর আগে আগস্টেও দেশে এসেছিল ২২২ কোটি ডলারের প্রবাসী আয়।

Top