অর্থ অপচয়ের আয়োজন
মোহাম্মাদ আবুবকর সিদ্দীক ভুঁইয়া :দেশের সর্বাধুনিক টিয়ার-৪ জাতীয় ডেটা সেন্টারের অর্ধেকেরও বেশি সক্ষমতা এখনো অব্যবহৃত।৬০৪টি র্যাকের মধ্যে ৩০০টির বেশি বছরের পর বছর খালি পড়ে আছে।এই উদ্যোগকে সরকারি অর্থের অপচয় ও পরিকল্পনার চরম ব্যর্থতা হিসাবে আখ্যা দিয়ে এর যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন সংশ্লিষ্টরা।অথচ এই বিদ্যমান ও উন্নত অবকাঠামো ব্যবহার না করেই নতুন করে অপেক্ষাকৃত নিম্নমানের টিয়ার-৩ ডেটা সেন্টার নির্মাণের উদ্যোগ নিয়েছে বাংলাদেশ টেলিকমিউনিকেশনস কোম্পানি লিমিটেড (বিটিসিএল)।
প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞ ফাহিম মাশরুর বলেন, একটি টিয়ার-৪ জাতীয় ডেটা সেন্টারের কয়েকশ র্যাক যখন খালি পড়ে আছে, তখন একই ধরনের সেবা দিতে নতুন করে টিয়ার-৩ ডেটা সেন্টার নির্মাণের যৌক্তিকতা নেই। আগে বিদ্যমান অবকাঠামোর সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করা উচিত। প্রয়োজন হলে সেটিকেই সম্প্রসারণ করা যেত। একই ধরনের সক্ষমতার জন্য আলাদা অবকাঠামো তৈরি করলে সরকারি অর্থের অপচয় হবে। এটি পরিকল্পনার দুর্বলতা এবং সম্পদের অদক্ষ ব্যবহারেরই ইঙ্গিত দেয়।জানতে চাইলে ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তিমন্ত্রী ফকির মাহবুব আনাম বলেন,বিষয়টি এখনো আমার নজরে আসেনি। বিস্তারিত খোঁজ নিয়ে দেখব। যদি প্রকল্পটির প্রযুক্তিগত বা অর্থনৈতিক যৌক্তিকতা না থাকে, তাহলে রাষ্ট্রের অর্থ অপচয় হয় এমন কোনো প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হবে না। সরকার জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট নয় এমন কোনো প্রকল্পে বিনিয়োগ করবে না।
প্রাপ্ত তথ্যমতে, বিটিসিএলের ইন্টারনেট প্রটোকল (আইপি) নেটওয়ার্ক উন্নয়ন ও সম্প্রসারণ প্রকল্পের আওতায় ঢাকা ও যশোরে দুটি টিয়ার-৩ ডেটা সেন্টার নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।এ লক্ষ্যে আন্তর্জাতিক দরপত্রও আহ্বান করা হয়। দরপত্রের শর্ত অনুযায়ী, টার্নকি ভিত্তিতে ডেটা সেন্টার স্থাপন, পরীক্ষা, চালু ও সংশ্লিষ্ট অবকাঠামো নির্মাণের কাজ সম্পন্ন হবে। এছাড়া প্রকল্পে অংশ নিতে বিদেশি ঠিকাদারদের জন্য ন্যূনতম ২ কোটি (২০ মিলিয়ন) মার্কিন ডলার বার্ষিক টার্নওভার,শক্তিশালী আর্থিক সক্ষমতা ও গত ৮ বছরের মধ্যে সমজাতীয় প্রকল্প বাস্তবায়নের অভিজ্ঞতার কথা বলা হয়েছে। ফলে প্রকল্প বাস্তবায়নে বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা ব্যয়ের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
জানা যায়,সরকারি সংস্থাগুলোর তথ্য একক ক্লাউড প্ল্যাটফর্মে সংরক্ষণ,সাইবার নিরাপত্তা নিশ্চিত ও সেবা বিক্রি করে রাজস্ব আয়ের লক্ষ্যে ২০২০ সালে প্রায় ১৬শ কোটি টাকা ব্যয়ে টিয়ার-৪ ডেটা সেন্টার নির্মাণ করা হয়। আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী এই ডেটা সেন্টারকে সর্বোচ্চ মানের অবকাঠামো হিসাবে বিবেচনা করা হয়। এতে প্রায় ৯৯.৯৯৫ শতাংশ আপটাইম, পূর্ণ রিডানডেন্সি এবং সর্বোচ্চ ফল্ট টলারেন্স নিশ্চিত করা সম্ভব।অন্যদিকে টিয়ার-৩ অবকাঠামোর আপটাইম ও নির্ভরযোগ্যতা কম। এমন বাস্তবতায় প্রশ্ন উঠেছে, দেশে যখন আন্তর্জাতিকমানের টিয়ার-৪ জাতীয় ডেটা সেন্টার বিদ্যমান, তখন তুলনামূলক নিম্নমানের টিয়ার-৩ কেন প্রয়োজন।
তথ্যপ্রযুক্তি বিভাগের একজন কর্মকর্তা বলেন,জাতীয় ডেটা সেন্টারের ভেতরেই বিটিসিএলের জন্য ডেডিকেটেড টেলকো জোন, পৃথক নেটওয়ার্ক সেগমেন্ট ও নিজস্ব নিরাপত্তা ব্যবস্থা গড়ে তোলা সম্ভব। এতে নতুন ভবন, বিদ্যুৎ, কুলিং ও নেটওয়ার্ক অবকাঠামো নির্মাণে বিপুল অর্থ ব্যয়ের প্রয়োজন নেই।
এদিকে বিশ্বজুড়ে ডেটা সেন্টার খাতে বিনিয়োগের কেন্দ্রবিন্দু এখন এআই-রেডি, হাই-ডেনসিটি ও জিপিইউভিত্তিক অবকাঠামো। সংশ্লিষ্টদের মতে,আগামী কয়েক বছরের প্রযুক্তিগত চাহিদা বিবেচনায় প্রচলিত টিয়ার-৩ মডেলের ওপর নতুন বিনিয়োগ দ্রুতই সীমাবদ্ধ হয়ে পড়তে পারে। তাই নতুন অবকাঠামো নির্মাণের পরিবর্তে বিদ্যমান জাতীয় ডেটা সেন্টারকে আরও আধুনিক করে তার ব্যবহার বাড়ানোর দিকেই গুরুত্ব দেওয়া উচিত।
জানতে চাইলে বিটিসিএলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) মো. আসলাম হোসেন বলেন, আমাদের নিজস্ব সেবা ও কনটেন্ট সংরক্ষণের জন্য নিজস্ব অবকাঠামো দরকার। একজন সার্ভিস প্রোভাইডার হিসাবে আমরা অন্যের অবকাঠামোর ওপর নির্ভর করতে চাই না।তাই বিটিসিএলের নিজস্ব একটি প্ল্যাটফর্ম থাকা দরকার। এআই-রেডি, হাই-ডেনসিটি ও জিপিইউভিত্তিক আধুনিক অবকাঠামোর পরিবর্তে ব্যাকডেটেড টিয়ার-৩ ডেটা সেন্টারের যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন করা হলে আসলাম হোসেন বলেন,এখানে অনেক কমপ্লায়েন্সের বিষয় আছে। বাংলাদেশের মার্কেট এখনো এআইয়ের জন্য রেডি নয়।
তবে সেবা বিক্রি করে রাজস্ব আয়ের লক্ষ্যে জাতীয় ডেটা সেন্টার নির্মাণ করা হলেও এর পূর্ণ সক্ষমতা কাজে লাগানো যায়নি। কয়েকশ র্যাক খালি পড়ে আছে। সেগুলো কাজে লাগিয়ে ব্যবসা বাড়াতে পারছে না সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান। নেই কার্যকর মার্কেটিং সক্ষমতাও। এর মধ্যে দীর্ঘদিন বাংলাদেশ ডেটা সেন্টার কোম্পানি লিমিটেডের (বিডিসিসিএল) ব্যবস্থাপনা পরিচালকের (এমডি) পদটিও ছিল শূন্য। ১৫ জুলাই নতুন এমডি হিসাবে দায়িত্ব নেন মোহাম্মদ ইয়ামিন খান। তিনি বলেন, আমি এখানে এসেছি খুব বেশি দিন হয়নি। তবে আসার পর থেকেই চেষ্টা করছি মার্কেটিং কার্যক্রম বাড়ানোর। বিটিসিএল ডেটা সেন্টার তৈরির উদ্যোগ নিয়েছে কিনা, সে বিষয়ে আমি এখনো জানি না। তবে দীর্ঘদিন ধরে বিপুল বিনিয়োগের পরও বিডিসিসিএল কেন প্রত্যাশিত ব্যবসা করতে পারছে না এবং এর পেছনে আগের সরকারের ব্যর্থতা রয়েছে কিনা-এ বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন,আমি এসব বিষয়ে কথা বলতে চাচ্ছি না,বলেই তিনি ফোনের সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেন।
একজন আন্তর্জাতিক ক্লাউড আর্কিটেক্ট বলেন, আজ যে ডেটা সেন্টার নির্মাণ করা হবে, সেটি অন্তত ১০ থেকে ১৫ বছরের প্রযুক্তিগত চাহিদা বিবেচনায় রেখেই পরিকল্পনা করতে হয়। কিন্তু অবকাঠামোটি যদি এআই-রেডি না হয়, তাহলে কয়েক বছরের মধ্যেই সেটিকে আধুনিকায়ন করতে কিংবা নতুন করে বড় বিনিয়োগ করতে হতে পারে।