ইসির কেনাকাটায় হরিলুট,ঘুসের বিনিময়ে নিম্নমানের যন্ত্রাংশ সরবরাহ
মু.এবি সিদ্দীক ভুঁইয়া:ইসির কেনাকাটায় হরিলুট,ঘুসের বিনিময়ে নিম্নমানের যন্ত্রাংশ সরবরাহ।নির্বাচন কমিশনে তথ্যপ্রযুক্তি সরঞ্জাম কেনাকাটায় ভয়াবহ দুর্নীতির চিত্র সামনে এসেছে। আইডিইএ-২ প্রকল্পের আওতায় ভোটার তালিকা হালনাগাদ ও এনআইডি সার্ভারের জন্য কেনা কয়েক কোটি টাকার যন্ত্রাংশের বড় অংশই কাগজে আছে, বাস্তবে নেই।তদন্তে ধরা পড়ার পর অভিযুক্ত পাঁচজন ঘুসের টাকা ও মোবাইল ফেরতও দিয়েছেন। এ ঘটনায় জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু করেছে কমিশন। যা সরবরাহ করা হয়েছে তাও নিম্নমানের ও রিফার্বিশড (ব্যবহৃত)। এমন জালিয়াতির সুযোগ করে দিয়ে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে নগদ টাকা ও দামি মোবাইল ফোন ঘুস হিসাবে নিয়েছেন ইসির কয়েকজন কর্মকর্তা। সম্প্রতি একটি তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনে এমন চাঞ্চল্যকর তথ্য উঠে এসেছে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, তথ্যপ্রযুক্তি ও আইটি যন্ত্রাংশ কেনাকাটা এবং এনআইডি (জাতীয় পরিচয়পত্র) তথ্যভান্ডার রক্ষণাবেক্ষণকে কেন্দ্র করে নির্বাচন কমিশনে একাধিক সিন্ডিকেট গড়ে উঠেছে। যারা টেন্ডার কারসাজি, নিম্নমানের যন্ত্রাংশ ক্রয় এবং গুদাম থেকে যন্ত্রাংশ নিয়ে বাইরে বিক্রি করে দেওয়াসহ নানা অনিয়ম-দুর্নীতিতে জড়িত। কিন্তু বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই এসব জালিয়াতির ঘটনা ধরাছোঁয়ার বাইরেই থেকে যায়।
জানতে চাইলে নির্বাচন কমিশনের সিনিয়র সচিব আখতার আহমেদ বলেন, অনিয়মের ঘটনায় জড়িত কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার বিষয়টি প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। ইসির কর্মকর্তাদের অপরাধের মাত্রা আরও পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে, সেই অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।
আইডেন্টিফিকেশন সিস্টেম ফর ইনহ্যান্সিং একসেস টু সার্ভিসেস (আইডিইএ-২) প্রকল্পের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মোহাম্মদ আজিজুর রহমান সিদ্দিকী বলেন, ওই ঘটনায় জড়িত প্রকল্পের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা স্থগিত করা হয়েছে। কয়েকজনকে চাকরিচ্যুত করা হয়েছে।
জানা গেছে, জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পর ২০২৫ সালের ভোটার তালিকা হালনাগাদ করার জন্য জরুরি ভিত্তিতে আইডিইএ-২ প্রকল্পের আওতায় আইটি যন্ত্রাংশ ও আনুষঙ্গিক মালামাল কেনা হয়। জিডি-৩৬.১ এবং জিডি-৫৭ প্যাকেজের মালামাল কেনা ও ব্যবহারে অনিয়ম পেয়েছে এ প্রকল্পের উপপ্রকল্প পরিচালক মেজর মো. তারেক আজিজের নেতৃত্বাধীন সাত সদস্যের তদন্ত কমিটি। যদিও কমিটিতে ইসির নিজস্ব কর্মকর্তাদের কেউ ছিলেন না।
ঘটনা-১ : প্যাকেজ জিডি ৩৬.১ এর আওতায় ভোটার তালিকার সার্ভারের জন্য আট ধরনের এক হাজার ৪০২ পিস যন্ত্রাংশ এবং ইসির কর্মকর্তাদের ল্যাপটপের জন্য পাঁচ ধরনের তিন হাজার ৫০ পিস নতুন ও অরিজিনাল যন্ত্রাংশ কেনার জন্য টেন্ডার হয়। চার কোটি ৪৩ লাখ ৫১ হাজার টাকায় ওইসব যন্ত্রাংশ সরবরাহের কাজ পায় ‘টিমওয়ার্ক ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড সল্যুশন’ নামে একটি প্রতিষ্ঠান। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সার্ভারের জন্য ডেল ব্র্যান্ডের ২০০ পিস টাইপ-১ মাদারবোর্ড সরবরাহের কথা থাকলেও বাস্তবে ৫৮ পিস পেয়েছে তদন্ত কমিটি। বাকি ১৪২ পিস মাদারবোর্ডের হদিস নেই। যেসব মাদারবোর্ড পাওয়া গেছে সেগুলোও নতুন নয়, রিফার্বিশড। ৮০০ পিস হার্ডডিস্ক সরবরাহের কথা থাকলেও তদন্ত কমিটি ৪৪৫ পিস পেয়েছে। সেগুলোও রিফার্বিশড। ১০০ পিস প্রসেসরের স্থলে পেয়েছে ৫১ পিস। তাও স্থানীয় প্যাকেটজাত করা এবং কুলিং ফ্যান নেই। একইভাবে ল্যাপটপের জন্য এক হাজার ২০০ এসএসডি’র স্থলে পেয়েছে ২০৪টি। ৪০০ পিস র্যাম সরবরাহের কথা থাকলেও কমিটি এক পিসও পায়নি। ল্যাপটপের অ্যাডাপ্টার ২৫০ পিসের স্থলে ১২ পিস পেয়েছে কমিটি।
তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রতিষ্ঠানের মালিক মো. তারেক রহমানসহ প্রকল্পের কিছু কর্মকর্তা-কর্মচারী এই জালিয়াতিতে জড়িত। অন্যরা হলেন-আইডিইএ-২ প্রকল্পের হার্ডওয়্যার কনসালটেন্ট কে. এম মাসুদুর রহমান কামাল, সহকারী প্রোগ্রামার মো. সুজন হোসেন, সহকারী প্রোগ্রামার মো. মাজেদুর রহমান ও ডাটা এন্ট্রি অপারেটর মো. ফজলে রাব্বী।
এতে আরও বলা হয়, ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান চুক্তি অনুযায়ী সব মালামাল সরবরাহ করেনি। কিছু মালামাল সরবরাহ করেছে। বাকি মালামালের বিনিময়ে ১৮ লাখ টাকা উপঢৌকন দিয়েছেন। সুজন হোসেন তদন্ত কমিটিকে দেওয়া জবানবন্দিতে জানান, ১৮ লাখ টাকা থেকে তার সহযোগী মাজেদুর রহমানকে ৮ লাখ টাকা এবং আরেক সহযোগী ফজলে রাব্বীকে দুই লাখ টাকা দিয়েছেন। যদিও একপর্যায়ে তিনজনই কমিটির কাছে সব টাকা ফেরত দিয়েছেন।
শুধু তাই নয়, টিমওয়ার্ক ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের মালিক মো. তারেক রহমানের টেন্ডার কারসাজির সঙ্গে যুক্ত থাকার প্রমাণ পেয়েছে কমিটি। তাকে জিজ্ঞাসাবাদের একপর্যায়ে তার মোবাইলে হোয়াটস অ্যাপ চ্যাটে এ প্রকল্পের তৎকালীন উপপ্রকল্প পরিচালক রুহুল আমিন মল্লিকের (বর্তমানে জনসংযোগ অধিশাখার পরিচালক) সঙ্গে টেন্ডার ডকুমেন্ট এবং প্রতিষ্ঠানের ব্ল্যাঙ্ক প্যাড আদান-প্রদানের তথ্য পাওয়া যায়। এসব বিষয়ে জানতে চাইলে টিমওয়ার্ক ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের মালিক মো. তারেক রহমান বলেন, চুক্তি অনুযায়ী মালামাল সরবরাহ করা হয়েছে। কাউকে টাকা বা মোবাইল দেইনি। তিনি কোনো ধরনের স্বীকারোক্তি দেননি বলেও দাবি করেন।
ঠিকাদারের সঙ্গে যোগসাজশ থাকার কথা অস্বীকার করে রুহুল আমিন মল্লিক বলেন,ওই প্রতিষ্ঠানের মালিক একদিন তার প্যাড প্রিন্ট করে দেওয়ার অনুরোধ জানিয়ে আমার হোয়াটস অ্যাপে দেন। আমি তাকে শুধু প্রিন্ট করে দিয়েছি।
হার্ডওয়্যার কনসালটেন্ট কে. এম মাসুদুর রহমান কামাল ও সহকারী প্রোগ্রামার মো.সুজন হোসেনের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করেও তাদের বক্তব্য পাওয়া যায়নি। সহকারী প্রোগ্রামার মো. মাজেদুর রহমান বলেন,এ বিষয়ে আমি কিছু বলতে চাই না।
মালামাল গ্রহণেই অনিয়মের শেষ নয়। এসব মালামাল ব্যবহারের ক্ষেত্রেও জালিয়াতির আশ্রয় নেওয়া হয়েছে। বিভিন্ন জেলায় নির্বাচন অফিসে এসব মালামাল ব্যবহারের কথা নথিপত্রে উল্লেখ করা হয়। তদন্ত কমিটির সদস্যরা আকস্মিক চট্টগ্রাম জেলা নির্বাচন অফিস পরিদর্শন করে ওইসব মালামাল ব্যবহারের প্রমাণ পায়নি। এ ঘটনার সঙ্গেও সহকারী প্রোগ্রামার মো. সুজন হোসেনসহ কয়েকজনকে দায়ী করা হয়েছে। এমনকি প্রকল্পের উপপ্রকল্প পরিচালক (সম্পদ ব্যবস্থাপনা ও রক্ষণাবেক্ষণ) মো. তারিফুজ্জামান ওইসব মালামাল তছরুপ করতে সহযোগিতা করেছেন বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
জানতে চাইলে তারিফুজ্জামান বলেন,আমি শুধু অফিশিয়াল কাজ করেছি। নিচের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা কী করেছেন তা আমি অবগত নই। এর সঙ্গে যুক্তও নই;বরং মালামাল চুরির বিষয়টি আমিই ধরিয়ে দিয়েছি।
ঘটনা-২ : আরেকটি অনিয়মের ঘটনা ঘটেছে জিডি-৫৭ প্যাকেজে। এই প্যাকেজের আওতায় কল সেন্টারের জন্য ২৭টি অনলাইন ইউপিএস ও কম্পিউটার-ল্যাপটপের এসএসডি কেনা হয়। এসব মালামাল সরবরাহ করেন ডাইভারসিটি নামে একটি প্রতিষ্ঠান। এক্ষেত্রেও নিম্নমানের মালামাল সংগ্রহের প্রমাণ পেয়েছে তদন্ত কমিটি। এসব মালামাল কেনার বিনিময়ে সহকারী প্রোগ্রামার মো. সুজন হোসেন ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান থেকে স্যামসাং ব্র্যান্ডের এস২৫ মডেলের দামি ফোন নেন। সহকারী পরিচালক শফিউল্লাহ নেন ওয়ান প্লাস ব্র্যান্ডের দামি ফোন। তদন্তে বিষয়টি প্রমাণিত হলে তারা মোবাইল ফোন ফেরত দিয়েছেন।
এসব মালামাল পরীক্ষণ ও গ্রহণ কমিটির প্রধান মো. ফরিদুল ইসলাম বলেন, আমি যোগ দেওয়ার আগেই মালামাল ব্যবহার করা হয়। ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে বিল দেওয়ার জন্য কাগজে-কলমে রিসিভ করা হয়। কমিটির অন্য সদস্যদের অনুরোধে আমি সই করেছি।