রেড ক্রিসেন্টের ‘অনিয়ম’ থামছে না - Alokitobarta
আজ : শনিবার, ১৯শে সেপ্টেম্বর, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ৪ঠা আশ্বিন, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সর্বশেষ সংবাদঃ

রেড ক্রিসেন্টের ‘অনিয়ম’ থামছে না


জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক,আলোকিত বার্তা:নির্বাচিত সরকারের আমলেও অনির্বাচিত কমিটি রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটিতে। মহাসচিব ও উপ-মহাসচিব নিয়োগেও নিয়ম-নীতি অনুসরণ করেনি সংস্থাটি। চলমান অ্যাডহক কমিটির মূল কাজ ছিল পরিচালনা পর্ষদ নির্বাচন,যা নিয়ে চলছিল অনিয়ম। বিদেশি ডোনারদের হস্তক্ষেপে বন্ধ করতে হয়েছে নির্বাচন।সবশেষ ২০২৪ সালের ২০ এপ্রিল (শনিবার) রাজধানীর হলি ফ্যামিলি রেড ক্রিসেন্ট মেডিকেল কলেজ অডিটোরিয়ামে বাংলাদেশ রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটির ব্যবস্থাপনা পর্ষদের নির্বাচন ও নতুন কমিটি গঠন হয়। ২০২৪-২০২৬ মেয়াদে ব্যবস্থাপনা পর্ষদ ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের মুখে পালিয়ে গেলে ২৯ আগস্ট বাংলাদেশ রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটির অ্যাডহক কমিটি করে দেয় স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়। নতুন চেয়ারম্যান হিসেবে নিয়োগ পান মেজর জেনারেল (অব.) মো. রফিকুল ইসলাম। একই সঙ্গে সংস্থাটির নতুন মহাসচিব হিসেবে দায়িত্ব দেওয়া হয় সরকারের সাবেক অতিরিক্ত সচিব ড. কবির মো. আশরাফ আলমকে।নিয়ম অনুযায়ী, অ্যাডহক কমিটি নির্বাচন আয়োজন করার কথা থাকলেও ১৩ আগস্ট পর্যন্ত পদ আঁকড়ে ছিলেন মহাসচিব। চেয়ারম্যানসহ ব্যবস্থাপনা পর্ষদ দফায় দফায় গঠন ও পুনর্গঠন করা হয়েছে। যদিও নীতিমালা অনুযায়ী দুই বারের বেশি বিনাভোটে ব্যবস্থাপনা পর্ষদ মনোনীত করার সুযোগ নেই। এ নিয়ে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে অন্তর্বর্তী সরকারের সময় নানা আলোচনা ওঠে। কিন্তু সমাধান হয়নি। বর্তমান পর্ষদও নির্বাচন নিয়ে পাকিয়েছে তালগোল। ফলে আবারও আগের প্রক্রিয়ায় অ্যাডহক কমিটি করতে হতে পারে।

মহাসচিব-উপ-মহাসচিব নিয়োগে অনিয়ম
নিয়ম অনুযায়ী, গত ৮ জুলাই একটি দৈনিকে ডেপুটি সেক্রেটারি জেনারেল (ডিএসজি) নিয়োগের বিজ্ঞপ্তি দেয় রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটি। সে আলোকে আবেদনকারীদের ডেকে ১৫ জুলাই পরীক্ষাও নেওয়া হয়। আটজন প্রার্থী এতে অংশ নেন। পরীক্ষা নিলেও প্রকাশ হয়নি ফলাফল। বরং ওই আটজনের বাইরে থেকে এহসান-ই-এলাহি নামে একজনকে ১২ আগস্ট নিয়োগপত্র দেওয়া হয়। তিনি নিয়মমাফিক চাকরির আবেদন, পরীক্ষায় অংশগ্রহণ- কিছুই করেননি।

১২ তারিখ আবেদন নিয়ে আসেন, সেদিনই তাকে নিয়োগপত্র দেওয়া হয়। একইদিন তিনি যোগদান করেন। পরদিন ১৩ আগস্ট একই অনিয়মে হাবিবুর রহমান খান নামে একজনকে সেক্রেটারি জেনারেল (এসজি) পদে নিয়োগ ও যোগদান করানো হয়। এজন্য কোনো বিজ্ঞপ্তি বা পরীক্ষার ধার ধারেনি রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটির ‘অবৈধ বোর্ড’।এই ‍দুই নিয়োগ বৈধ করতে নতুন নিয়োগপ্রাপ্ত এসজি ওই দিনই (১৩ আগস্ট) বোর্ড মিটিং ডাকেন। ১৬ আগস্ট বোর্ড মিটিংয়ে তাদের নিয়োগ অনুমোদন করা হয়। যদিও ওই বোর্ডে মৌখিকভাবে অবহিত করে এবং পরিচয় করিয়ে তাদের নিয়োগের অনুমোদন করা হয়।নিয়ম অনুযায়ী,তাদের নিয়োগের সব কাগজপত্র প্রতিটি বোর্ড সদস্যের ফাইলে থাকার কথা,কিন্তু ছিল না।যে কারণে বোর্ড সদস্য অ্যাডভোকেট এস এম মাহিদুল ইসলাম সজীব এ বিষয়ে নোট অব ডিসেন্টও দেন।পরে এ বিষয়ে মাহিদুল ইসলাম সজীবের সঙ্গে কথা বলতে চাইলে তিনি প্রতিবেদকের পরিচয় ও বিষয়টি শুনে ফোনের লাইন কেটে দেন। হোয়াটসঅ্যাপে সংশ্লিষ্ট বিষয়ে জানালে দেখেও উত্তর দেননি।

কে এই উপ-মহাসচিব এহসান-ই-এলাহি?
এহসান-ই-এলাহি মূলত অবসরপ্রাপ্ত সচিব। আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে নানা গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে ছিলেন। প্রশাসনের মাঠ পর্যায় থেকে শুরু করে বিভিন্ন রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ ও লাভজনক সংস্থায় শীর্ষ পদে দায়িত্ব পালন করেছেন। সরকারের অতিরিক্ত সচিব হিসেবে ০৩ সেপ্টেম্বর ২০১৯ থেকে ২০ জানুয়ারি ২০২১ মেয়াদে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন করপোরেশনের (বিআরটিসি) চেয়ারম্যান পদে ছিলেন এহসান-ই-এলাহি।

দেশের অন্যতম বৃহৎ রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ করপোরেশনের (বিসিআইসি) চেয়ারম্যান (গ্রেড-১ মর্যাদা) হিসেবে ২১ জানুয়ারি ২০২১ থেকে ২৪ জুন ২০২১ মেয়াদে দায়িত্বে ছিলেন। পরে ২৯ জুন ২০২১ থেকে ১৭ আগস্ট ২০২১ মেয়াদে ভূমি সংস্কার বোর্ডের চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ২০২১ সালের আগস্টে তিনি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের সচিব ছিলেন।মন্ত্রণালয়ের ৩৩তম সচিব হিসেবে ১৭ আগস্ট ২০২১ থেকে ০৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৪ পর্যন্ত দায়িত্বে ছিলেন। ২০২৩ সালের নভেম্বর মাসে তার সাধারণ চাকরির মেয়াদ শেষ হওয়ার পর তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকার অবসরোত্তর ছুটি বাতিল করে আরও ছয় মাসের জন্য শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের সচিব পদে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দেয়।

মহাসচিব হাবিবুর রহমান খান
হাবিবুর রহমান খান বাংলাদেশ সিভিল সার্ভিস (প্রশাসন) ক্যাডারের একজন বিশিষ্ট সাবেক কর্মকর্তা। তার প্রায় ৩৩ বছরের দীর্ঘ ও সমৃদ্ধ সরকারি চাকরির অভিজ্ঞতা রয়েছে। কর্মজীবনে তিনি নয়াদিল্লির বাংলাদেশ হাইকমিশনের মিনিস্টার (কমার্শিয়াল) এবং কাউন্সেলর (কমার্শিয়াল) হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।পাশাপাশি তিনি জেলা ও স্থানীয় পর্যায়ে ডেপুটি কমিশনার (জেলা প্রশাসক),অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক এবং উপজেলা নির্বাহী অফিসারের (ইউএনও) মতো গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব সামলেছেন।

আওয়ামী লীগ আমলে স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের অতিরিক্ত সচিব (প্রশাসন) এবং করোনা সংক্রান্ত মিডিয়া সেলের প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালনের পর ২০২০ সালের জুনে তাকে কৃষি মন্ত্রণালয়ের অধীন বাংলাদেশ ফলিত পুষ্টি ও প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠানে (বারটান) নির্বাহী পরিচালক পদে বদলি করা হয়েছিল।বারটানের এই শীর্ষ পদে দায়িত্ব পালনকালেই (যা অতিরিক্ত সচিব পদমর্যাদার)তিনি সরকারি চাকরির বয়সসীমা পূর্ণ করে অবসরে যান। অবসর নেওয়ার পর তিনি বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ন্যাশনাল কনসালট্যান্ট হিসেবে কাজ করেন। এরপরে আসেন রেড ক্রিসেন্টের মহাসচিব হয়ে।

নির্বাচন নিয়ে যত অনিয়ম
২০২৬ সালের ১৬ আগস্ট রেড ক্রিসেন্টের বোর্ড সভায় পরিচালনা পর্ষদ নির্বাচনের সিদ্ধান্ত হয়। ভোটগ্রহণের তারিখ নির্ধারণ করা হয় ১৭ সেপ্টেম্বর। ভাইস চেয়ারম্যান, ট্রেজারার ও সদস্য কাজী মাহবুবুর রহমানের সঙ্গে আলোচনা করে নির্বাচন কমিশন গঠনের দায়িত্ব দেওয়া হয় মহাসচিব এবং উপ-মহাসচিবকে। সভায় জানানো হয়, ৬৮ ইউনিটের মধ্যে ৩০টির কমিটি হয়েছে। বাকি ৩৮টি থেকে অ্যাডহক কমিটি তাদের প্রতিনিধি নিয়োগ করে পাঠাতে পারবে।

সেই সিদ্ধান্তের আলোকে নির্বাচন কমিশন গঠন ও নির্বাচনের সব আয়োজন করা হয়। তবে, চট্টগ্রাম, ঝালকাঠিসহ বিভিন্ন জায়গায় প্রতিনিধি নির্ধারণে অনিয়মের অভিযোগ ওঠে। ভোটার হওয়ার যোগ্য নয়, এমন লোককে ভোটার করা হয় এবং ভোটার হওয়ার যোগ্য লোককে বাদ দেওয়ার অভিযোগ আসে। এমনকি উকিল নোটিশও ইস্যু করা হয়।বিদেশি দাতা সংস্থাগুলো এসব অভিযোগ আমলে নিয়ে চাপ দেয় রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটিকে। সবশেষ ১০ সেপ্টেম্বর নির্বাচন কমিশন বাতিল করা হয়। এমনকি নির্বাচন উপলক্ষে বিশেষ সাধারণ সভাও বাতিল করা হয়।

রেড ক্রিসেন্টের চেয়ারম্যান ব্যারিস্টার মো. আব্দুস সালাম স্বাক্ষরিত ওই চিঠিতে উল্লেখ করা হয়,নির্বাচনি প্রস্তুতির বর্তমান অবস্থা পর্যালোচনাসহ বিডিআরসিএস-এর অধীন বিভিন্ন ইউনিট থেকে প্রাপ্ত অ্যাডহক কমিটির ডেলিগেটের বৈধতা ও নির্বাচিত কমিটি থেকে ডেলিগেট মনোনয়ন বিষয়ে সুনির্দিষ্ট ও গুরুতর অভিযোগ এবং আন্তর্জাতিক অংশীদারদের উদ্বেগের পরিপ্রেক্ষিতে আমি এই মর্মে অভিমত পোষণ করি যে, নির্বাচন প্রক্রিয়ার পূর্ণাঙ্গ স্বচ্ছতা, প্রতিনিধিত্বমূলক অংশগ্রহণ, আইনগত সামঞ্জস্য ও প্রাতিষ্ঠানিক গ্রহণযোগ্যতা নিশ্চিত করে ব্যবস্থাপনা পর্ষদ গঠনের জন্য আরও কিছুদিন সময়ের প্রয়োজন।অতএব, বাংলাদেশ রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটির স্বার্থে, নির্বাচনি প্রক্রিয়ার সততা, বিশ্বাসযোগ্যতা ও বৈধতা রক্ষার লক্ষ্যে আসন্ন ব্যবস্থাপনা পর্ষদ নির্বাচন পরবর্তী কোনো এক সুবিধাজনক সময়ে অনুষ্ঠিত হবে বলে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এ পরিপ্রেক্ষিতে আগামী ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬ তারিখে অনুষ্ঠেয় বিশেষ সাধারণ সভা এতদ্বারা বাতিল করা হলো।

যা বলছে কর্তৃপক্ষ
বর্তমান বোর্ড গঠন ও নিয়োগের সময়ে স্বাস্থ্য সচিব ছিলেন কামরুজ্জামান চৌধুরী। তিনি সে সময় বলেন,এই সরকারের মেয়াদে আমরা একবারই কমিটি করে দিয়েছি। তারা নির্বাচিত কমিটি গঠনের কাজ করবে। আগের কমিটি গঠন নিয়ে আমাদের বক্তব্য নেই।নিয়োগে অনিয়মের প্রশ্নে তিনি বলেন,নিয়োগ তাদের বিষয়। রেড ক্রিসেন্ট তাদের নিয়মে চলে। স্বাধীন প্রতিষ্ঠান। এসবের উত্তর তারাই ভালো দিতে পারবে।

পরে বর্তমান স্বাস্থ্য সচিব ড. আ ন ম বজলুর রশীদের কাছে এ বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন,আমি নতুন আসছি তো, জানা নেই।আপনি বললেন,বিষয়টি আমি খোঁজ-খবর নেবো।অভিযোগ সংক্রান্ত সব নথি কাছে রয়েছে।এ বিষয়ে রেড ক্রিসেন্টের চেয়ারম্যান ব্যারিস্টার মো. আব্দুস সালামের বক্তব্য নিতে এই প্রতিবেদক গত দুই সপ্তাহ চেষ্টা করেছেন। চেয়ারম্যানের অনুমোদন ছাড়া, তার দপ্তরে প্রবেশ করতে দেওয়া হয়নি।তাকে মোবাইল, হোয়াটসঅ্যাপে মেসেজ ও কল দিয়ে সাড়া পাওয়া যায়নি। প্রশ্ন লিখে পাঠালেও জবাব দেননি।

Top