থাকল র্যাবের প্রায় সবই,নতুন হলো এসআরবি
মোহাম্মাদ আবুবকর সিদ্দীক ভুঁইয়া :বিরোধী দল বিলটি তড়িঘড়ি করে পাশ না করার অনুরোধ জানিয়ে বলেছে, নাম পরিবর্তন করে র্যাবের মতোই আরেকটি বাহিনী গঠন করা হচ্ছে। তাদের ভাষায়, এটি ‘নতুন বোতলে পুরোনো মদ’। এ ধরনের বাহিনী গঠনের দাবি কোনো রাজনৈতিক দল জানায়নি বলেও সংসদে মন্তব্য করেন বিরোধী দলের সদস্যরা। বহুল আলোচিত-সমালোচিত র্যাব বিলুপ্ত করে পুলিশের নতুন বিশেষায়িত ইউনিট ‘স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ন (এসআরবি)’ গঠন করা হয়েছে। বিরোধী দলের আপত্তির মুখেই বৃহস্পতিবার জাতীয় সংসদে ‘স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ন (এসআরবি) বিল-২০২৬’ কণ্ঠভোটে পাশ হয়। নতুন আইনে র্যাবের জনবল, সম্পদ, যানবাহন, অস্ত্রশস্ত্র, সরঞ্জামসহ বিদ্যমান কাঠামো এসআরবির কাছে হস্তান্তরের বিধান রাখা হয়েছে।
জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, বিএনপির প্রতিশ্রুতি ছিল র্যাব বিলুপ্ত করা, সেটাই করা হচ্ছে। বিরোধী দলের আপত্তির জবাবে তিনি বলেন, বিলটি যতই বিলম্বিত হবে, ততদিন র্যাবের অস্তিত্ব ঠিকই রয়ে যাবে।
বিএনপি নেতৃত্বাধীন চার দলীয় জোট সরকারের আমলে ২০০৪ সালে র্যাব গঠন হয়। শুরুর দিকে আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখলেও পরবর্তীকালে মানবাধিকার লঙ্ঘন, বিরোধী দলকে দমন, গুম-খুনের মতো গুরুতর অপরাধের অভিযোগ ওঠে র্যাবের অনেক সদস্যের বিরুদ্ধে। ২০২১ সালের ১০ ডিসেম্বর যুক্তরাষ্ট্র র্যাব ও কয়েকজন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে। এর ফলে র্যাব নিয়ে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ বিতর্ক আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক ইস্যুতেও পরিণত হয়।
জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে র্যাব বিলুপ্ত করার প্রতিশ্রুতি দেয় বিএনপি। এরই ধারাবাহিকতায় বৃহস্পতিবার র্যাব বিলুপ্ত করে এসআরবি গঠনের আইন পাশ করল সরকার। র্যাব বিলুপ্ত করতে সংশ্লিষ্ট আইন থেকে প্রয়োজনীয় অংশ বাদ দিয়ে পৃথক এসআরবি আইন করা হয়েছে। একই দিনে সংসদে ‘আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়ন অর্ডিন্যান্স’ রহিত করে নতুন এপিবিএন আইন করতেও আরেকটি বিল পাশ হয়েছে। এতে এপিবিএনকে তদন্তের ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী দুটি বিল পৃথকভাবে পাশের জন্য উত্থাপন করলে তা কণ্ঠভোটে পাশ হয়। এর আগে বিল দুটি নিয়ে জনমত যাচাই, বাছাই কমিটিতে পাঠানো এবং সংশোধনী নিষ্পত্তি হয়। ৩ সেপ্টেম্বর ‘স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ন (এসআরবি) বিল-২০২৬’ সংসদে উত্থাপন করা হয়েছিল। সেদিনও বিলটি উত্থাপনে আপত্তি জানিয়েছিল বিরোধী দল। সংসদীয় কমিটিতেও তারা বিলটি নিয়ে আটটি বিষয়ে নোট অব ডিসেন্ট দেয়। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ এসআরবি গঠনের বিলটি অবিলম্বে বিবেচনার জন্য সংসদে তোলার পর বৃহস্পতিবার এর ওপর জনমত যাচাই ও বাছাই কমিটিতে পাঠানোর প্রস্তাব দিয়ে আলোচনায় অংশ নেন বিরোধী দলের সদস্যরা।
বিলের ওপর আলোচনায় বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান বলেন, এই বাহিনীর বিলুপ্তি সবার দাবি ছিল। খালেদা জিয়াও বারবার এ বিষয়ে কথা বলেছেন। দেশি-বিদেশি মানবাধিকার সংস্থাগুলোও কথা বলেছে। এটি বিলুপ্ত করে আরেকটি বাহিনী গঠনের দাবি কারও ছিল না। শুধুই বিলুপ্তির দাবি ছিল।
তিনি বলেন, ‘কি আমরা এখন দেখতে পাচ্ছি যে সরকারি তরফ থেকে ঠিক একই ধরনের আরেকটা বাহিনী বিল্ডআপ করার দাবি নিয়ে আসা শুধু হয়নি, হুবহু বাহিনীটাকে জায়গায় রেখে সবকিছু জায়গায় রেখে, একটা প্রস্তাবনা নিয়ে আসা হয়েছে।জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের এক ছাত্রীকে তুলে নেওয়ার জন্য এসেছিল উল্লেখ করে বিরোধীদলীয় নেতা বলেন, এ ঘটনা বার্তা দিচ্ছে, বাহিনীর সঙ্গে সম্পৃক্ত সদস্যরা কেমন ছিলেন এবং এখন কেমন আছেন। তারা আগে যেমন ছিলেন, এখন তেমনই আছেন। সেই একই বাহিনীর লোকেরা একই জায়গায় হস্তান্তর হচ্ছেন। তাদের স্থাপনা, লজিস্টিক ও জনবলও একই থাকছে।
শুধু একটি নাম বদলে আরেকটি বাহিনী এসেছে দাবি করে বিরোধীদলীয় নেতা বলেন, কেন এমন একটি বাহিনীর প্রয়োজন, তার যথার্থতা আরও পরিষ্কার হওয়া দরকার। জাতি অনুভব করুক, কী ধরনের একটি বিশেষায়িত বাহিনী তাদের প্রয়োজন। জাতি এ বিষয়ে নিশ্চিত হোক। তিনি বলেন, ‘আমি মনে করি যে এই আইনটা কোনো অবস্থায় পাশ করা উচিত নয়। এবং এই আইনটা ফিরিয়ে নেওয়া দরকার।’
এর আগে বিরোধী দলের সংসদ-সদস্য নুরুল ইসলাম বলেন, র্যাবের প্রতি মানুষের আতঙ্ক আছে। র্যাব মানবাধিকার লঙ্ঘন করেছে এবং গোটা বাংলাদেশে গুমের ঘটনায় নতুন মাত্রা যোগ করেছে। কোনো ধরনের আলোচনা ছাড়াই মাত্র চার কর্মদিবসের মধ্যে বিলটি পাশের জন্য নিয়ে আসা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। বিলটির বিষয়ে অংশীজনদের সঙ্গে আলোচনা দরকার বলেও তিনি মন্তব্য করেন। আইনে যে অভিযোগ প্রতিকার কমিটি গঠনের কথা বলা হয়েছে, সেই কমিটি অভিযোগ প্রতিকারের মতো সামর্থ্য রাখে কিনা, তা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন তিনি। বিচার বিভাগের একজন সাবেক বিচারপতির নেতৃত্বে এই কমিটি গঠনের প্রস্তাব দেন নুরুল ইসলাম।
২০১৪ সালের নারায়ণগঞ্জের আলোচিত সাত খুনের ঘটনা তুলে ধরে বিরোধী দলের নাজিবুর রহমান বলেন, ওই ঘটনার পর র্যাবকে ‘কিলিং স্কোয়াড’ আখ্যা দিয়েছিলেন খালেদা জিয়া। সে সময় তিনি র্যাব বিলুপ্তিরও দাবি জানিয়েছিলেন। ২০১৯ সালে তিনি র্যাবকে ‘ক্যানসার’ আখ্যায়িত করেন। ২০২৪ সালে বিএনপি র্যাব বিলুপ্তির আনুষ্ঠানিক সুপারিশ করে।
তিনি বলেন, রাজনৈতিক দলগুলোর পাশাপাশি জাতিসংঘ, হিউম্যান রাইটস ওয়াচ ও গুম কমিশনও র্যাব বিলুপ্তির সুপারিশ করেছিল। বিলের ২৭ ধারায় র্যাবের জনবল, কার্যালয়, ক্ষমতা, নথিপত্র, সম্পদ, চুক্তি, দায় ও দায়িত্ব সরাসরি এসআরবির কাছে চলে যাবে উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘অর্থাৎ শুধু সাইনবোর্ডটাই চেঞ্জ হচ্ছে, নতুন বোতলে পুরোনো মদ। র্যাবের নাম ছাড়া আর কোনো কিছু পরিবর্তন হচ্ছে না। সব ঠিক থাকছে।’ এতে গুমসহ অনেক অপরাধের মামলা ও তদন্ত ত্রুটির মুখে পড়বে বলেও তিনি মন্তব্য করেন।
বিরোধী দলের বক্তব্যের জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, বিএনপির প্রতিশ্রুতি ছিল র্যাব বিলুপ্ত করা, সেটা করা হচ্ছে। এখন এই বিল যতই বিলম্বিত হবে, র্যাবের অস্তিত্ব ঠিকই রয়ে যাবে। তিনি বলেন, বিলটি সংসদীয় কমিটিতে আলোচনা হয়েছে। এর আগে মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইটেও দীর্ঘদিন ছিল। বিভিন্ন মতামত এসেছে। অভিযোগ প্রতিকার কমিটি হচ্ছে ইউনিটের সদস্যের বিরুদ্ধে বিভাগীয় অভিযোগ নিষ্পত্তির জন্য।
র্যাব বিলুপ্তির প্রতিশ্রুতি নিয়ে বিরোধী দলের অভিযোগের জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘র্যাব আমরা বিলুপ্ত করেছি। তারপরে আমরা একটা নতুন ব্যাটালিয়ন রেইজ করছি। সেই ব্যাটালিয়নের নাম হবে এসআরবি। র্যাবের সঙ্গে এটার কোনো সংস্পর্শ নেই।’
তিনি বলেন, র্যাবের সব স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তি নতুন সংগঠনের কাছে যাবে। এত অস্ত্রশস্ত্র, ইকুইপমেন্ট, ইন্টেলিজেন্স ইকুইপমেন্ট ও সম্পদ কোথায় যাবে? কোথাও না কোথাও তো যাবে। রাষ্ট্রীয় সম্পদ হস্তান্তরের জন্য তা এপিবিএনে যেতে পারত অথবা নতুন যে সংস্থা গঠন করা হবে, সেখানে যাবে। আবার নতুন করে এসব সংগ্রহ করার দরকার নেই। রাষ্ট্রীয় সম্পদ রক্ষা করতে হবে।
এসআরবি বিলে যা আছে : এসআরবি বিলে বলা হয়েছে, পুলিশ বাহিনীর আওতাধীন ‘স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ন (এসআরবি)’ নামে একটি বিশেষায়িত ইউনিট থাকবে। সরকারের প্রয়োজনীয়তার নিরিখে পুলিশ, শৃঙ্খলা বাহিনী ও নির্ধারিত সংখ্যক কর্মকর্তা, আর্মড পারসোনেল বা কর্মচারী পদায়ন বা প্রেষণে নিয়োগের মাধ্যমে এ ইউনিট গঠিত হবে। ইউনিটের কর্মকর্তা, আর্মড পারসোনেল বা কর্মচারীদের পদবিন্যাস, নিয়োগ পদ্ধতি ও চাকরির শর্তাবলি বিধি দ্বারা নির্ধারিত হবে। ইউনিটের জন্য বিধি দ্বারা নির্ধারিত একটি পতাকা, প্রতীক ও সুনির্দিষ্ট পোশাক থাকবে। এসআরবির মহাপরিচালক হবেন পুলিশে কর্মরত একজন অন্যূন অতিরিক্ত পুলিশ মহাপরিদর্শক।
বিলে বলা হয়েছে, র্যাবের জনবল, আদেশ, ক্ষমতা, কর্তৃত্ব, বিদ্যমান সুবিধা, তহবিল, নগদ ও ব্যাংকে রাখা অর্থ, দায়, চুক্তি, স্থাবর বা অস্থাবর সম্পত্তি, রেজিস্ট্রার, রেকর্ডপত্রসহ সব দলিল এসআরবির কাছে স্থানান্তর হবে। নতুন আইনে বিধিমালা না হওয়া পর্যন্ত বিদ্যমান ২০০৫ সালের বিধিমালায় র্যাবসংক্রান্ত বিভাগীয় শৃঙ্খলামূলক ব্যবস্থা বা আদালতের কার্যধারা বহাল থাকবে।
এসআরবিকে ফৌজদারি অপরাধ তদন্ত,তল্লাশি, গ্রেফতার ও জব্দের ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে।পাশাপাশি নিজস্ব হাজতখানা, মালখানা ও জিজ্ঞাসাবাদ কক্ষ রাখার বিধানও রাখা হয়েছে।
আইনের খসড়ায় নাগরিকদের অভিযোগ এবং ইউনিটের সদস্যদের অভ্যন্তরীণ সংক্ষোভ নিষ্পত্তির জন্য একটি অভিযোগ প্রতিকার কমিটি গঠনের বিধান রাখা হয়েছে। ইউনিটের একজন অতিরিক্ত মহাপরিচালক হবেন এ কমিটির সভাপতি।
এপিবিএন পেল তদন্তের ক্ষমতা : বৃহস্পতিবার পাশ হওয়া ‘আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়ন (এপিবিএন) বিল-২০২৬’-এ বলা হয়েছে, পুলিশ বাহিনীর অধীনে এপিবিএন গঠিত ও পরিচালিত হবে। এই ইউনিটে স্পেশাল সিকিউরিটি অ্যান্ড প্রটেকশন ব্যাটালিয়ন, পার্বত্য ব্যাটালিয়ন, বিমানবন্দর ব্যাটালিয়ন ও অন্য কোনো ব্যাটালিয়ন অন্তর্ভুক্ত থাকবে।
প্রস্তাবিত আইনে এপিবিএনকে ফৌজদারি অপরাধ তদন্তের ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে। ফৌজদারি কার্যবিধি ও বিদ্যমান অন্যান্য আইন প্রতিপালন সাপেক্ষে কোনো স্থানে প্রবেশ, তল্লাশি, জব্দকরণ ও গ্রেফতার করার ক্ষমতাও দেওয়া হয়েছে।
বিলে বলা হয়েছে, এই ইউনিটের কোনো সদস্য যথাযথ কর্তৃপক্ষের পূর্বানুমতি ছাড়া প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে কোনো ইলেকট্রনিক মিডিয়া ও সংবাদপত্রে কোনো প্রকার তথ্য বা অন্য প্রকার দলিল প্রকাশ করতে পারবেন না, প্রকাশে সহযোগিতা করতে পারবেন না বা প্রকাশ করার কারণ হতে পারবেন না।