হাসিনা-রেহানা ও নাসার নজরুলের বিরুদ্ধে মামলা,২৭৬ কোটি টাকা আত্মসাৎ
মোহাম্মাদ মুরাদ হোসেন: বঙ্গবন্ধু মেমোরিয়াল ট্রাস্টের নাম ব্যবহার করে ৪১টি ব্যাংকের সামাজিক দায়বদ্ধতা ফান্ড (সিএসআর) থেকে ২৭৬ কোটি ৩৪ লাখ ৫০ হাজার টাকা সংগ্রহ করে আত্মসাতের অভিযোগে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, তার বোন শেখ রেহানাসহ তিনজনের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে।মামলার এজাহারে বলা হয়েছে, ২০১৭ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত সময়ে আসামিরা পরস্পর যোগসাজশে ক্ষমতার অপব্যবহার ও অপরাধমূলক বিশ্বাসভঙ্গের মাধ্যমে বিভিন্ন ব্যাংকের সামাজিক দায়বদ্ধতা তহবিল থেকে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান মেমোরিয়াল ট্রাস্টের অনুকূলে ওই অর্থ সংগ্রহ করেন। এতে রাষ্ট্রীয় আর্থিক ক্ষতি হয়েছে।এজাহার সূত্রে জানা যায়, ১৯৯৪ সালের ৬ সেপ্টেম্বর মোহাম্মদপুর সাবরেজিস্ট্রি অফিসে নিবন্ধিত ট্রাস্ট সম্পত্তির দলিল নম্বর ৩০৪১-এর মাধ্যমে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান মেমোরিয়াল ট্রাস্ট গঠন করা হয়। ট্রাস্টের প্রতিষ্ঠাতা ট্রাস্টিদের মধ্যে শেখ হাসিনাকে আজীবন সভাপতি এবং তার অনুপস্থিতিতে শেখ রেহানাকে সভাপতির দায়িত্ব পালনের কথা উল্লেখ করা হয়েছে।বৃহস্পতিবার দুদকের সমন্বিত জেলা কার্যালয়, ঢাকা-১-এর উপপরিচালক ইসমাইল হোসেন বাদী হয়ে মামলাটি করেন। মামলায় অপর আসামি হলেন-নাসা গ্রুপের কর্ণধার বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকসের সাবেক সভাপতি ও এক্সিম ব্যাংকের সাবেক চেয়ারম্যান মো. নজরুল ইসলাম মজুমদার। দুদক সচিব সাইদুর রহমান খান সংবাদ সম্মেলনে এ তথ্য জানান।
দুদকের অনুসন্ধানে ৪১টি তফসিলি ব্যাংক থেকে পাওয়া তথ্য ও নথিপত্র পর্যালোচনা করা হয়। এতে দেখা যায়, শেখ হাসিনা ও শেখ রেহানার নেতৃত্বাধীন ট্রাস্টের অনুকূলে অর্থ দেওয়ার বিষয়টি বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকসের নির্বাহী কমিটির সভার নিয়মিত আলোচ্যসূচিতে ছিল না। এরপরও বিষয়টি ‘বিবিধ’ আলোচনার অংশ হিসাবে উপস্থাপন করা হয়। বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকসের তৎকালীন সভাপতি মো. নজরুল ইসলাম মজুমদার সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রভাব কাজে লাগিয়ে নির্বাহী কমিটির সভায় বিষয়টি উপস্থাপন করেন। পরে বিভিন্ন সভায় ৪১টি ব্যাংকের সামাজিক দায়বদ্ধতা তহবিল থেকে ওই ট্রাস্টে অর্থ দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়। সিদ্ধান্তের আলোকে ব্যাংকগুলোতে চিঠিও পাঠানো হয়। দুদকের অনুসন্ধান অনুযায়ী, বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকসের ওইসব চিঠির পরিপ্রেক্ষিতে ৪১টি ব্যাংকের সামাজিক দায়বদ্ধতা তহবিল থেকে মোট ২৭৬ কোটি ৩৪ লাখ ৫০ হাজার টাকা সংগ্রহ করা হয়।
সিএসআর তহবিল ব্যবহারে নীতিমালা লঙ্ঘনের অভিযোগ : এজাহারে বলা হয়, বাংলাদেশ ব্যাংকের ২০০৮ সালের ১ জুনের ডিওএস সার্কুলার এবং ২০২২ সালের জানুয়ারিতে প্রকাশিত ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের সামাজিক দায়বদ্ধতা নীতিমালায় সামাজিক দায়বদ্ধতার অর্থ ব্যয়ের বিষয়ে নির্দেশনা রয়েছে। কিন্তু বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান মেমোরিয়াল ট্রাস্টকে এই তহবিল থেকে অনুদান দেওয়ার কোনো বিধান ওই নীতিমালায় নেই। দুদকের দাবি, এরপরও বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকসের মাধ্যমে বিভিন্ন ব্যাংকের ওপর প্রভাব খাটিয়ে ট্রাস্টের অনুকূলে অর্থ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। এজাহারে বলা হয়, দুদকের অনুসন্ধানকারী দল সরেজমিন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান মেমোরিয়াল ট্রাস্টের ঠিকানা পরিদর্শন করে কোনো দাপ্তরিক কার্যক্রমের অস্তিত্ব পায়নি। প্রতিষ্ঠানটি সমাজসেবা অধিদপ্তর ও এনজিওবিষয়ক ব্যুরোর অনুমোদিত প্রতিষ্ঠান নয়।
প্রতিশ্রুত কার্যক্রম না করার অভিযোগ : এজাহারে বলা হয়, শেখ হাসিনা ও শেখ রেহানা ব্যক্তিগত লাভের অসৎ উদ্দেশ্যে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান মেমোরিয়াল ট্রাস্ট নামে প্রতিষ্ঠানটি গড়ে তোলেন। কিন্তু ট্রাস্টের নামে প্রতিশ্রুত কোনো কার্যক্রমের অস্তিত্ব অনুসন্ধানে পাওয়া যায়নি। অভিযোগে বলা হয়, ট্রাস্টের অনুকূলে সামাজিক দায়বদ্ধতা তহবিলের টাকা সংগ্রহের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকসকে ব্যবহার করা হয়। সাবেক সভাপতি নজরুল ইসলাম মজুমদার তার পদ ও প্রভাব কাজে লাগিয়ে নির্বাহী কমিটির সভায় বিষয়টি উপস্থাপন করেন এবং ব্যাংকগুলোকে অর্থ দেওয়ার জন্য চিঠি পাঠানোর ব্যবস্থা করেন।দুদকের ভাষ্য অনুযায়ী, সামাজিক দায়বদ্ধতা তহবিলের অর্থ ট্রাস্টে দেওয়ার ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ব্যাংকের নীতিমালায় কোনো অনুমোদন না থাকা সত্ত্বেও এভাবে ৪১টি ব্যাংক থেকে অর্থ সংগ্রহ করা হয়েছে।
তদন্তে অন্যদেরও আনার কথা : এজাহারে বলা হয়, শেখ হাসিনা, শেখ রেহানা ও নজরুল ইসলাম মজুমদার পরস্পর যোগসাজশে ক্ষমতার অপব্যবহার এবং অপরাধমূলক বিশ্বাসভঙ্গের মাধ্যমে ২৭৬ কোটি ৩৪ লাখ ৫০ হাজার টাকা সংগ্রহ করে অবৈধভাবে রাষ্ট্রীয় আর্থিক ক্ষতিসাধন করেছেন। এ ঘটনায় দণ্ডবিধির ৪০৯ ও ১০৯ ধারা এবং দুর্নীতি প্রতিরোধ আইন, ১৯৪৭-এর ৫(২) ধারায় তাদের বিরুদ্ধে মামলা করা হয়েছে।দুদক জানিয়েছে, মামলার তদন্তকালে ঘটনার সঙ্গে অন্য কারও সংশ্লিষ্টতা পাওয়া গেলে তাকেও আইনের আওতায় আনা হবে। একই সঙ্গে নতুন কোনো তথ্য পাওয়া গেলেও তা তদন্তে অন্তর্ভুক্ত করা হবে।