হ্যাকারের দখলে সরকারি সাইট,নিরাপত্তা ঝুঁকিতে ডিজিটাল সিস্টেম - Alokitobarta
আজ : শনিবার, ২৯শে আগস্ট, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ১৪ই ভাদ্র, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সর্বশেষ সংবাদঃ
পুলিশের শীর্ষ ১০০ কর্মকর্তার মধ্যে একজন নারী মালয়েশিয়ায় ১০ হাজার কর্মী যাবে ‘জিরো কস্টে’ একই দিনে দুই প্রধান শক্তির শোডাউন,রাজনৈতিক অঙ্গনে নানা জল্পনা-কল্পনা ঢাবিসহ ৭ বিশ্ববিদ্যালয়ের সময়সূচি প্রকাশ,ভর্তি পরীক্ষা জেনারেটরে পুড়ছে লাভের টাকা, হতাশ ব্যবসায়ীরা,লোডশেডিংয়ে কুয়াকাটার পর্যটনে ধস হ্যাকারের দখলে সরকারি সাইট,নিরাপত্তা ঝুঁকিতে ডিজিটাল সিস্টেম কৌশলে বাজারে সয়াবিন চিনির কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করেছে কোম্পানি গুলো দল পুনর্গঠনে পুরোপুরি মনোযোগ দিচ্ছে বিএনপি দিন যত যাচ্ছে বেরিয়ে আসছে ঋণ জালিয়াতির ঘটনা,রেকর্ড লোকসানে ব্যাংক খাত অস্থিতিশীলতা সৃষ্টির লক্ষ্যে বোমা আতঙ্ক,কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের

হ্যাকারের দখলে সরকারি সাইট,নিরাপত্তা ঝুঁকিতে ডিজিটাল সিস্টেম


রিপোর্ট আলোকিত বার্তা :সরকারি ওয়েবসাইট ও ডিজিটাল সিস্টেমের কোথাও দেখা যাচ্ছে অনুমোদনহীন কনটেন্ট, কোনো সাইটে চলছে অনলাইন জুয়া ও ক্যাসিনোর বিজ্ঞাপন।আবার কোনো কোনো সরকারি সিস্টেমের অ্যাকসেস বিক্রি হচ্ছে টেলিগ্রামে। এভাবে দিনের পর দিন অরক্ষিত অবস্থায় পরিচালিত হচ্ছে সরকারের ডিজিটাল সিস্টেম। আর এই সুযোগে রাষ্ট্র ও নাগরিকদের গুরুত্বপূর্ণ তথ্য হাতিয়ে নিচ্ছে হ্যাকাররা। তারা এসব তথ্য ডার্কওয়েব ও টেলিগ্রামের বিভিন্ন গ্রুপে অবাধে বিক্রি করছে। ক্ষেত্রবিশেষে দৃশ্যমান ওয়েব পেজ সরিয়ে পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে।তবে বন্ধ হয়নি মূল সিস্টেমে অনুপ্রবেশের পথ।

রাজশাহীর গোদাগাড়ী উপজেলার বাঘাইল প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক মো. আসাদুজ্জামানের শিক্ষক আইডির ব্যক্তিগত তথ্য বাইরে চলে গেছে। তার প্রোফাইলে নাম-ঠিকানা, জাতীয় পরিচয়পত্রের নম্বরসহ একেবারে গোপনীয় বেশ কিছু তথ্য এখন ওপেন সিক্রেট। যে কেউ তার আইডিতে ঢুকে তাকে ব্ল্যাকমেইল করাসহ বড় ধরনের ক্ষতিসাধন করতে পারবে। জাতীয় শিক্ষক বাতায়নে (টিচার্স ডট গভ.বিডি) মো. আসাদুজ্জামানের মতো শত শত শিক্ষকের দেওয়া ব্যক্তিগত তথ্য হ্যাকারদের গ্রুপে গ্রুপে ঘুরছে। একই ভাবে বর্তমান সরকারের জনপ্রিয় প্রকল্প ফ্যামিলি কার্ডের সাইটের অনেক কিছু নিয়ন্ত্রণ করছে হ্যাকাররা। এ ছাড়াও আরও বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ সাইট হ্যাক হওয়ার তথ্য অনুসন্ধানে বেরিয়ে এসেছে।

ডিজিটাল ফরেনসিক ও সাইবার নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ তানভির হাসান জোহা বলেন,দ্রুততম সময়ের মধ্যে তদন্ত, ঝুঁকি মূল্যায়ন, সাইবার অডিট ও প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নেওয়া না হলে ভবিষ্যতে আরও বড় ধরনের সাইবার হামলা বা তথ্য অপব্যবহারের ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। হ্যাক হওয়া সিস্টেমগুলো দ্রুত সুরক্ষিত না করলে বড় ধরনের সাইবার হামলার ঝুঁকিতে পড়তে পারে রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান।

তথ্যানুসন্ধানে সরকারি যেসব ওয়েবসাইট ও ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম নিরাপত্তা ঝুঁকিতে রয়েছে তার মধ্যে আছে-স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরো (ইপিবি), ফ্যামিলি কার্ডের মতো গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগের ওয়েব প্ল্যাটফর্ম, পুলিশের বিভিন্ন ডিজিটাল সেবা এবং সরকারি বিভিন্ন দপ্তরের পোর্টাল। দীর্ঘদিন ধরে এসব সাইটে বেআইনিভাবে হ্যাকারদের প্রবেশের ‘ফুটপ্রিন্ট’ রয়েছে। এরপরও সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর সাইটে কার্যকর ও পূর্ণাঙ্গ নিরাপত্তা অডিট করা হয়নি। এর ফলে সংকট আরও বাড়ছে।

সাইবার নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞদের মতে, বিষয়টিকে শুধু ‘ওয়েবসাইট হ্যাক’ হিসাবে দেখলে চলবে না। এটি শুধু প্রযুক্তিগত দুর্বলতার ইঙ্গিত নয়, বরং জাতীয় নিরাপত্তা ও রাষ্ট্রীয় সক্ষমতার জন্যও হুমকি। কার্যকর সাইবার অডিট, স্বচ্ছ তদন্ত ও দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নিলে পরিস্থিতি আরও গভীর হতে পারে। বর্তমান সরকারের গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক সুরক্ষা উদ্যোগ ফ্যামিলি কার্ড। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, এটি একটি ডেটাবেজ ড্রিভেন আইডেন্টিফিকেশন ও সোশ্যাল প্রটেকশন ইন্সট্রুমেন্ট। এই ব্যবস্থায় পরিবারের বিভিন্ন তথ্য ডিজিটালি সংরক্ষণ এমন গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগের ওয়েব প্ল্যাটফর্মের প্রযুক্তিগত নিরাপত্তা করুণ দশায় রয়েছে। জানা যায়, সাইটটি ডেভেলপ করা হয়েছে ওয়ার্ড প্রেসে। ব্যবহার করা হয়েছে সবচেয়ে বেসিক ফ্রি টেমপ্লেট। ওয়ার্ডপ্রেসও অনেকদিন আপডেট করা হয়নি। অথচ প্রযুক্তি ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার দ্রুত পরিবর্তনের কারণে ওয়ার্ডপ্রেস নিয়মিত নতুন ভার্সন ও নিরাপত্তা আপডেট দেয়। কেননা পুরোনো ভার্সন দীর্ঘদিন ব্যবহার করা হলে নিরাপত্তা ঝুঁকি বেড়ে যায়। ফ্যামিলি কার্ডের এই সাইটটি অনেকদিন ধরেই হ্যাক অবস্থায় রয়েছে। যদিও সাইটটি খুললে সেটি যে হ্যাক হয়েছে তা বোঝার উপায় নেই। সাইট ফ্যামিলিকার্ড ডট গভ ডট বিডি লিখে সার্চ করলে ব্রাউজার থেকে বেটিং সাইটের তথ্য দেখায়।

প্রযুক্তি বিশ্লেষক সহিবুর রহমান খান রানা বলেন, কোনো সাইটের সামনে সব স্বাভাবিক দেখালেই যে ভেতরের সিস্টেমও নিরাপদ, এমনটি নয়। বাইরে থেকে ওয়েবসাইট ঠিকঠাক দেখা গেলেও ভেতরে কোনো দুর্বলতা বা অনুমোদন ছাড়া প্রবেশের সুযোগ থাকতে পারে। ফ্যামিলি কার্ডের ক্ষেত্রে সেটিই হয়েছে।

গুরুতর প্রশ্ন উঠেছে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ওয়েব অবকাঠামোর নিরাপত্তা নিয়েও। অনুসন্ধানে মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ওয়েবসাইটের কনটেন্ট সরবরাহকারী অবকাঠামোতে (সিডিএন) অনুনমোদিত কনটেন্ট দেখা যায়। ব্রাউজারে সাইটের নাম লিখে সার্চ করলে সিডিএন হ্যাক অবস্থায় দেখায়। এতে সরকারি ডোমেইনের সঙ্গে বেটিং, ক্যাসিনো, অনলাইন জুয়া কিংবা অন্যান্য অনাকাঙ্ক্ষিত কনটেন্টের লিংক ও বিজ্ঞাপন দেখা যায়।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এমন পেজ হ্যাক হওয়ার পর পেজ সরিয়ে ফেলার উদ্যোগ নেওয়া হলেও মূল সিস্টেমে হ্যাকারদের প্রবেশের পথ বন্ধ হয়েছে কিনা, তা নিশ্চিত করা হয়নি। কারণ শুধু আক্রান্ত পেজ মুছে ফেললেই সাইবার হামলার ঝুঁকি শেষ হয় না। কীভাবে অনুপ্রবেশ ঘটেছে, সার্ভারে কোনো ক্ষতিকর কোড বা ব্যাকডোর রয়ে গেছে কিনা কিংবা অন্য কোনো তথ্য বা সিস্টেমে প্রবেশ করা হয়েছে কিনা এসবও খতিয়ে দেখা জরুরি।

হ্যাক হওয়া সিস্টেমের তালিকায় রয়েছে দেশের রপ্তানি খাতের গুরুত্বপূর্ণ তথ্য ব্যবস্থাপনার সঙ্গে যুক্ত রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) ‘এক্সপোর্ট ট্র্যাকার সিস্টেম’। এ সাইটের ফ্রন্টএন্ড (সামনে থেকে) দেখে স্বাভাবিক মনে হয়। কিন্তু পেছনে রয়েছে অন্য গল্প। রপ্তানির প্রবণতা, সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান, কোন পণ্য কোন দেশে যাচ্ছে ও বাজারভিত্তিক তথ্য এসব অর্থনৈতিক ও কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ তথ্যের ওয়েবসাইটটিতে ক্লিক করলে হ্যাকারের মেসেজ ভেসে উঠে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ব্যবহৃত বিভিন্ন সফটওয়্যার, বিভিন্ন অনলাইন গ্রুপ ও টেলিগ্রাম মেসেজিং গ্রুপে পুলিশের ক্রিমিনাল ডাটাবেজ, জেনারেল ডায়েরি (জিডি), পুলিশ ক্লিয়ারেন্স এবং অন্যান্য সিস্টেমের এক্সেস বিক্রির বিজ্ঞাপন দেওয়া হচ্ছে। টেলিগ্রামের একাধিক চ্যানেলে পুলিশের তথ্য ভান্ডারের তথ্য বিক্রির বিজ্ঞাপনের তথ্য মিলেছে। সামান্য টাকার বিনিময়ে কোনো ব্যক্তির নামে থাকা মামলার তথ্যও সাইট থেকে কিনে নেওয়া যায়।

হ্যাকারদের কবলে পড়া ওয়েবসাইটের তালিকায় আরও রয়েছে- মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের উদ্যোগে তৈরি স্মার্ট কেস ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম। সাইটটিতে প্রবেশের চেষ্টা করলে তাতে ‘হ্যাকড বাই ফোর্স এএনও’ বার্তা দেখা যাচ্ছে। এ ছাড়া সারা দেশের শিক্ষকদের মূল ডাটাবেজ সিস্টেম ‘শিক্ষক বাতায়ন’, হাজী দানেশ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, শাহীন স্কুল, বরিশাল শিক্ষা বোর্ড, সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তর, স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়, মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ড, বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব কল সেন্টার আন্ড আউটসোর্সিং (বাক্কো), বিভিন্ন জেলার সরকারি পোর্টাল। এমন আরও একাধিক গুরুত্বপূর্ণ ওয়েবসাইট হ্যাকারদের কবলে পড়েছে।

Top