সারা দেশে গ্যাসের জন্য হাহাকার চলছে
নুর নবী জনী: সারা দেশে গ্যাসের জন্য হাহাকার চলছে।সিএনজি পাম্পে গ্যাস না থাকার পরও পাম্পগুলোর সামনে ঘণ্টার পর ঘণ্টা ঠায় দাঁড়িয়ে থাকছে শত শত প্রাইভেটকার ও সিএনজি অটোরিকশা।বাসার গ্যাসের চুলাগুলোও বন্ধ। শিল্পকারখানার চাকা ঘুরছে না।গ্যাসের অভাবে কয়েক হাজার শিল্প চরম সংকটের মুখে।মূল্য বেশি হলেও এতে বাংলাদেশের চলমান গ্যাসের সংকট কিছুটা হলেও কাটবে।পেট্রোনাসের একটি প্রতিনিধিদল গতকাল সরকারি সংস্থা পেট্রোবাংলায় গিয়ে আইএসও পদ্ধতিতে এলএনজি বিক্রির প্রস্তাব দেয়।সেখানে আয়োজিত বৈঠকে বিজিএমইএ, বিকেএমইএ এবং বিটিএমএ’র প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন।দু-চার দিনের মধ্যে আগুনে ক্ষতিগ্রস্ত এলএনজি টার্মিনাল চালুর কোনো সম্ভাবনা দেখা যাচ্ছে না।কবে চালু হবে তাও জানে না কেউ।এই অনিশ্চিত অবস্থায় মালয়েশিয়ার তেল ও গ্যাস কোম্পানি পেট্রোনাস ক্রোয়োজেনিক লরি ট্যাংকার বা আইএসও পদ্ধতিতে গ্যাস সরবরাহের প্রস্তাব দিয়েছে বাংলাদেশ সরকার এবং দেশের শিল্পমালিকদের।তারা প্রতি ইউনিট গ্যাসের মূল্য ৩১ টাকার বদলে ১০০ টাকা করে নেওয়ার প্রস্তাব দিয়েছে।পেট্রোনাস জানিয়েছে, আইএসও পদ্ধতিতে ৭-১০ দিনের মধ্যে মালয়েশিয়া থেকে গ্যাস এনে বাংলাদেশের শিল্পে এলএনজি (তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস) সরবরাহ করা সম্ভব।
পেট্রোনাসের এলএনজি বিক্রির প্রস্তাবসংক্রান্ত বৈঠকে অংশগ্রহণকারী বিটিএমএ’র প্রতিনিধি রাজীব হায়দার বলেছেন,দেশে চরম গ্যাস সংকট। এখন সবার চাহিদা হচ্ছে গ্যাস। এই অবস্থায় পেট্রোনাসের এই প্রস্তাবের ব্যাপারে সবাই আগ্রহী। কিন্তু সমস্যা হলো তাদের গ্যাসের দাম অনেক। এই দামে গ্যাস কেনা কঠিন।পেট্রোনাসের প্রতিনিধিদল আজ মঙ্গলবার নারায়ণগঞ্জের জেরা ৮০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎকেন্দ্র এবং বেসরকারি একটি সুগার মিল পরিদর্শন করবেন। প্রতিনিধিদলের নেতৃত্ব দেবেন পেট্রোনাসের মহাব্যবস্থাপক নরহামিজাম বিন নরদিন। সেখানে তারা আইএসও পদ্ধতিতে গ্যাস সরবরাহের সম্ভাবনা যাচাই করবে। তবে পেট্রোনাসের এই প্রস্তাবের ব্যাপারে সরকার এখনো কোনো সিদ্ধান্ত নেয়নি।
সম্প্রতি বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান মালয়েশিয়া সফর করেন।এই সময়ে জ্বালানি খাত নিয়ে মালয়েশিয়ার সঙ্গে বাংলাদেশের একটি সমঝোতা চুক্তি (এমওইউ) সই হয়।সেই চুক্তির আওতায় পেট্রোনাসের আইএসও পদ্ধতিতে গ্যাস বিক্রির এ প্রস্তাব। সরকারি কর্মকর্তারা জানান,বাংলাদেশে গ্যাসের সংকট মারাত্মক। স্বল্প সময়ে এই সংকট কাটাতে পেট্রোনাস এই প্রস্তাব দিয়েছে।
বাংলাদেশের জন্য আইএসও একেবারে নতুন একটি প্রস্তাব। পেট্রোনাসের তথ্য অনুযায়ী ২০ ফিট (প্রতিটিতে এলএনজি থাকবে ৯ টন) এবং ৪০ ফিটের (প্রতিটিতে এলএনজি থাকবে ১৮ টন) ট্যাংক (অনেকটা কনটেইনারের মতো) জাহাজে করে বাংলাদেশে পাঠানো যায়। প্রতিটি জাহাজে ৬০০-এর মতো ট্যাংক থাকবে। এই ট্যাংক লরির মাধ্যমে চট্টগ্রাম বন্দর থেকে সরকারের গ্যাস পাইপলাইন বা বিভিন্ন ফ্যাক্টরি এলাকায় নিয়ে যাওয়া হবে। এরপর স্থানীয় ট্যাংকে আমদানি করা এই এলএনজি লোড করা হবে। তবে এজন্য ব্যবহারকারীর স্থাপনায় রিজার্ভ ট্যাংক এবং রিগ্যাসিফিকেশন বসাতে হবে। এজন্য অর্থ বিনিয়োগের দরকার হবে। পেট্রোনাস জানিয়েছে, ট্যাংকারে ওই এলএনজি চট্টগ্রাম বন্দরে আসতে সময় লাগে প্রায় ৭ দিন। তবে সবচেয়ে চিন্তায় ফেলেছে দাম নিয়ে। বর্তমানে সরকার ৩১ টাকায় শিল্প গ্রাহককে প্রতি ইউনিট গ্যাস বিক্রি করে। কিন্তু আইএসও পদ্ধতিতে গ্যাস নিতে চাইলে প্রতি ইউনিটের দাম (বর্তমান আন্তর্জাতিক বাজারমূল্য অনুযায়ী) পড়বে কমপক্ষে ১০০ টাকা। এত দাম দিয়ে কোনো প্রতিষ্ঠান মালয়েশিয়ার গ্যাস নেবে? যুদ্ধের কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে এলএনজির দাম চড়া। এখন পেট্রোবাংলাকে এলএনজি আমদানি করতে হচ্ছে প্রতি ইউনিট ৬৬ টাকায়। এই চড়া মূল্যের চেয়েও অনেক বেশি পেট্রোনাসের এলএনজি। তাই তাদের প্রস্তাবের ব্যাপারে আপাতত আগ্রহ দেখায়নি সরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান। বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড-পিডিবি জানিয়েছে, গ্যাসের অভাবে ৬ হাজারের বেশি মেগাওয়াট বিদ্যুৎ কম উৎপাদন করা হচ্ছে। বিকল্প হিসাবে বেশি দামে ফার্নেস অয়েল কিনে বিদ্যুৎ উৎপাদন করে তা সামাল দেওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে। এতে প্রতি ইউনিটের মূল্য পড়ছে ২৫ টাকার বেশি। এখন আইএসও পদ্ধতিতে গ্যাস আমদানি করে কতটুকু পোষাবে তার একটি বিশ্লেষণ করছে পিডিবি। গ্যাস সরবরাহে যে অর্থ সরকারের ব্যয় হয় তার ৬৯ দশমিক ৫৯ শতাংশই এলএনজি আমদানিতে ব্যয় হয়। গত বছর এলএনজির খাতে সরকারের ব্যয় হয়েছে ৪৫ হাজার কোটি টাকা। এবার সেই ব্যয় ৬০ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে যেতে পারে। এর অন্যতম কারণ মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধ। প্রতি ইউনিট ১০ ডলারের এলএনজি এখন ২২ ডলারে কিনতে হচ্ছে বাংলাদেশকে। গ্যাসের সংকটের কারণে ডিমান্ড নোটের টাকা জমা দিয়েও গত ৫ বছরে গ্যাস সংযোগ পাচ্ছে না ৫৫০টি শিল্পকারখানা।