জোয়ারে মনপুরা ও রাঙ্গাবালীর নিম্নাঞ্চল প্লাবিত - Alokitobarta
আজ : শনিবার, ১৮ই জুলাই, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ৩রা শ্রাবণ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

জোয়ারে মনপুরা ও রাঙ্গাবালীর নিম্নাঞ্চল প্লাবিত


নিজস্ব প্রতিবেদক:লঘুচাপের প্রভাবে আবারও বৃষ্টি বাড়তে পারে বলে জানিয়েছে আবহাওয়া অধিদপ্তর।জোয়ারের পানিতে ভোলার মনপুরা ও পটুয়াখালীর রাঙ্গাবালীতে নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে।পানিবন্দি হয়ে পড়েছে হাজারো মানুষ। এদিকে টানা প্রবল বর্ষণ ও পাহাড়ি ঢলে সৃষ্ট ভয়াবহ বন্যার পানি নেমে গেলেও কক্সবাজারের চকরিয়া ও মাতামুহুরী উপজেলায় এখন স্পষ্ট হয়ে উঠছে কৃষি খাতের ক্ষয়ক্ষতির চিত্র।সিরাজগঞ্জে যমুনা নদীর পানি বৃদ্ধি অব্যাহত থাকায় বন্যার ঝুঁকিতে রয়েছে ৩১টি ইউনিয়ন।বন্যা-পরবর্তী পরিস্থিতির কারণে মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ড চট্টগ্রামের অধীনে চলমান ২০২৬ সালের এইচএসসি এবং চট্টগ্রাম অঞ্চলে বাংলাদেশ মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ড ও বাংলাদেশ কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের এইচএসসি ও সমমানের অবশিষ্ট সব পরীক্ষা পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত স্থগিত করা হয়েছে। বৃহস্পতিবার বাংলাদেশ আন্তঃশিক্ষা বোর্ড সমন্বয় কমিটির এক প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়।

বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, বন্যাকবলিত এলাকার সার্বিক পরিস্থিতি, পরীক্ষার্থীদের মানসিক ও শারীরিক অবস্থা, অংশীজনদের সঙ্গে আলোচনা এবং বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত সড়ক যোগাযোগের কারণে পরীক্ষা কেন্দ্রে পরীক্ষার্থীদের যাতায়াতে সৃষ্ট দুর্ভোগ বিবেচনায় এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এর ফলে চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ড এবং এর আওতাধীন মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ড ও কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের এইচএসসি, আলিম, এইচএসসি (বিএমটি), এইচএসসি (ভোকেশনাল) ও ডিপ্লোমা ইন কমার্স পরীক্ষার অবশিষ্ট বিষয়গুলোর পরীক্ষা পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত স্থগিত থাকবে। পরে বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে স্থগিত পরীক্ষাগুলোর সংশোধিত সময়সূচি জানানো হবে।তবে দেশের অন্যান্য শিক্ষা বোর্ডের পরীক্ষা এবং মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ড ও কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের (চট্টগ্রাম বোর্ডের অধীন জেলা ছাড়া) অন্যান্য জেলার পরীক্ষা পূর্বঘোষিত সময়সূচি অনুযায়ী যথারীতি অনুষ্ঠিত হবে। আন্তঃশিক্ষা বোর্ড সমন্বয় কমিটির সভাপতি ও ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান অধ্যাপক সৈয়দ আক্তারুজ্জামান সংশ্লিষ্ট শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, পরীক্ষার্থী এবং সংশ্লিষ্ট সবাইকে এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার অনুরোধ জানিয়েছেন।

লঘুচাপের প্রভাবে আবারও বাড়তে পারে বৃষ্টি
উত্তর-পশ্চিম বঙ্গোপসাগর ও তৎসংলগ্ন উত্তর উড়িষ্যা-পশ্চিমবঙ্গ উপকূলীয় এলাকায় অবস্থানরত লঘুচাপটি ঘনীভূত হয়ে সুস্পষ্ট লঘুচাপ আকারে একই এলাকায় অবস্থান করছে। এর প্রভাবে সমুদ্রবন্দরসমূহ, উত্তর বঙ্গোপসাগর ও তৎসংলগ্ন বাংলাদেশের উপকূলীয় এলাকার ওপর দিয়ে ঝড়ো হাওয়া বয়ে যেতে পারে।বৃহস্পতিবার আবহাওয়া অধিদপ্তরের সতর্কবার্তায়, চট্টগ্রাম,কক্সবাজার,মোংলা ও পায়রা সমুদ্র বন্দরসমূহকে ৩ নম্বর স্থানীয় সতর্ক সংকেত দেখিয়ে যেতে বলা হয়েছে। উত্তর বঙ্গোপসাগরে অবস্থানরত মাছ ধরার নৌকা ও ট্রলারকে উপকূলের কাছাকাছি থেকে সাবধানে চলাচল করতে বলা হয়েছে।

আবহাওয়া অধিদপ্তরের পূর্বাভাসে বলা হয়েছে, আজ রংপুর, ময়মনসিংহ, খুলনা, বরিশাল, চট্টগ্রাম ও সিলেট বিভাগের অনেক জায়গায় এবং রাজশাহী ও ঢাকা বিভাগের কিছু কিছু জায়গায় অস্থায়ীভাবে দমকা হাওয়াসহ হালকা থেকে মাঝারি ধরনের বৃষ্টি/বজ সহ বৃষ্টি হতে পারে। সেই সঙ্গে সারা দেশের কোথাও কোথাও মাঝারি ধরনের ভারি থেকে ভারি বর্ষণ হতে পারে। সারা দেশের দিনের তাপমাত্রা প্রায় অপরিবর্তিত থাকতে পারে এবং রাতের তাপমাত্রা সামান্য কমতে পারে।

মেঘনার পানি বিপৎসীমার ওপরে মনপুরায় প্লাবিত নিম্নাঞ্চল
ভোলার মনপুরায় মেঘনার পানি বিপৎসীমার ওপর প্রবাহিত হয়ে বেড়িবাঁধের ভেতর ও বাইরে নিম্নাঞ্চল ৫-৬ ফুট জোয়ারের পানিতে প্লাবিত হয়েছে।এতে ১০ হাজার মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছে।এছাড়া ঢাকা যাওয়ার একমাত্র রামেনওয়াজ লঞ্চঘাটটি জোয়ারের পানিতে ডুবে যাওয়ায় ঢাকাগামী শত শত যাত্রী বিপাকে পড়েন।উপজেলা থেকে বিচ্ছিন্ন বেড়িবাঁধহীন ৫নং কলাতলীর ইউনিয়নের চরকলাতলী, কাজীরচর ও ঢালচরের অবস্থা খুবই নাজুক।ওই সব এলাকায় ৫-৭ ফুট জোয়ারের পানিতে তলিয়ে গেছে জানান কলাতলী ইউনিয়নের ইউপি সদস্য আমিন তালুকদার। বৃহস্পতিবার দুপুর ২টায় মেঘনার পানি বিপৎসীমার ১০০ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে নিশ্চিত করেন পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) ডিভিশন-২ এর নির্বাহী প্রকৌশলী মো. আসাফউদ্দৌলা। সরেজমিন ঘুরে দেখা গেছে,উপজেলার ১নং মনপুরা ইউনিয়নের ৮নং ওয়ার্ডের পূর্বপাশে ৬০ কলোনিতে জোয়ারের পানিতে প্লাবিত হয়েছে। বুকসমান পানি প্রবাহিত হচ্ছে। কলোনিতে বসবাসরত ৬০ পরিবারের বাসিন্দারা নিরাপদ আশ্রয়ের সন্ধানে ছুটছেন। কাউকে ঘরের টিনের চালে আশ্রয় নিতে দেখা গেছে।

রাঙ্গাবালীর ছয় গ্রামসহ নিম্নাঞ্চল প্লাবিত
লঘুচাপের প্রভাবে আগুনমুখা, দারছিড়া, বুড়াগৌরাঙ্গ ও রাবনাবাদ নদীতে স্বাভাবিকের চেয়ে ৩ থেকে ৪ ফুট উঁচু জোয়ারের পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় পটুয়াখালীর রাঙ্গাবালী উপজেলার চালিতাবুনিয়া ইউনিয়নের পাঁচটি গ্রাম, চরমোন্তাজ ইউনিয়নের একটি গ্রাম এবং বিভিন্ন নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে। বৃহস্পতিবার বেলা ১১টার দিকে জোয়ারের সময় চালিতাবুনিয়া ইউনিয়ন ও চরমোন্তাজ ইউনিয়নের চরআন্ডা গ্রামের ভেঙে থাকা বেড়িবাঁধ দিয়ে লোকালয়ে পানি প্রবেশ করে। এতে চালিতাবুনিয়া ইউনিয়নের গরুভাঙা, মধ্য চালিতাবুনিয়া, বিবির হাওলা, চালিতাবুনিয়া বাজার ও চিনাবুনিয়া এবং চরমোন্তাজ ইউনিয়নের চরআন্ডা গ্রাম প্লাবিত হয়।এছাড়া উপজেলার বেড়িবাঁধের বাইরের বিভিন্ন নিচু এলাকাও জোয়ারের পানিতে তলিয়ে যায়। পরে দুপুর দেড়টার দিকে ভাটা শুরু হলে ধীরে ধীরে পানি নামতে থাকে। জোয়ারের পানিতে বসতবাড়ি, রাস্তাঘাট ও বাড়ির আঙিনা তলিয়ে যায়। অনেকের পুকুরের মাছ ভেসে গেছে। পানি ঢুকে পড়ায় অনেক পরিবার রান্নাবান্নাও করতে পারেনি।

চকরিয়া-মাতামুহুরীতে কৃষকের আর্তনাদ
টানা প্রবল বর্ষণ ও পাহাড়ি ঢলে সৃষ্ট ভয়াবহ বন্যার পানি নেমে গেলেও কক্সবাজারের চকরিয়া ও মাতামুহুরী উপজেলায় এখন স্পষ্ট হয়ে উঠছে কৃষি খাতের ভয়াবহ ক্ষয়ক্ষতির চিত্র। বীজতলা থেকে শুরু করে সবজিখেত, ফলের বাগান-সবখানেই ধ্বংসের ছাপ। মাঠজুড়ে পচা কাদা, মরে যাওয়া সবজি গাছ আর খালি মাচা দেখে দিশেহারা কৃষকরা। চকরিয়া ও মাতামুহুরী উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের প্রাথমিক হিসাবে, দুই উপজেলায় ১৩ হাজার ৮৫২ জন কৃষক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে প্রায় ১ হাজার ৬৬১ হেক্টর কৃষিজমির ফসল। সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হয়েছে আমনের বীজতলা, আউশ ধান এবং গ্রীষ্মকালীন শাকসবজির আবাদে। পানি নেমে গেলেও অনেক জমিতে এখনো পুরু কাদা ও পলি জমে থাকায় নতুন করে চাষাবাদ শুরু করতে পারছেন না কৃষকরা। সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত এলাকার মধ্যে রয়েছে চকরিয়া উপজেলার বরইতলী, কৈয়ারবিল, কাকারা, সুরাজপুর-মানিকপুর, ফাঁসিয়াখালী, চিরিঙ্গা ও পৌরসভার বিভিন্ন এলাকা এবং মাতামুহুরী উপজেলার সাহারবিল, পূর্ব বড়ভেওলা, বিএমচর ও কোনাখালী ইউনিয়ন।বৃহস্পতিবার সরেজমিন দেখা যায়, অধিকাংশ সবজি ক্ষেত পানিতে পচে গেছে। কোথাও শুধু বাঁশের খালি মাচা, কোথাও শুকিয়ে দাঁড়িয়ে আছে পেঁপে গাছ। জমিজুড়ে ছড়িয়ে আছে পচা গাছপালা ও দুর্গন্ধ।

সিরাজগঞ্জে যমুনা নদীর পানি বৃদ্ধি বন্যার ঝুঁকিতে ৩১ ইউনিয়ন
সিরাজগঞ্জে যমুনা নদীর পানি বৃদ্ধি অব্যাহত রয়েছে। ফলে জেলার ৩১টি ইউনিয়নের নিম্নাঞ্চল ও চরাঞ্চলের বিস্তীর্ণ এলাকা প্লাবিত হচ্ছে। একই সঙ্গে বিভিন্ন স্থানে তীব্র নদীভাঙন শুরু হয়েছে। ফলে নদীপারের অসহায় দরিদ্র মানুষ ভাঙন আতঙ্কে রয়েছেন। যমুনার ভাঙনে দিশেহারা হয়ে পড়েছেন জেলার শাহজাদপুর উপজেলার সোনাতনী ইউনিয়নের ধীতপুর, কুরসী, মোহনপুর ও শ্রীপুর গ্রামের শত শত অসহায় দরিদ্র মানুষ। এছাড়া কাজিপুর, চৌহালী, সিরাজগঞ্জ সদর উপজেলার বিস্তীর্ণ এলাকায় ভাঙন শুরু হওয়ায় সেখানকার মানুষের বাড়িঘর চোখের সামনে যমুনা নদীগর্ভে বিলীন হয়ে যাচ্ছে। গত ২ সপ্তাহে শাহজাদপুর, কাজিপুর, সিরাজগঞ্জ সদর ও চৌহালী উপজেলায় অন্তত ৫০টি বাড়িঘর যমুনা নদীতে বিলীন হয়ে গেছে। এসব এলাকার ক্ষতিগ্রস্ত অসহায় অনেক মানুষের যাওয়ার কোনো জায়গা না থাকায় তারা ভাঙনকবলিত এলাকায় পলিথিনের ছাউনি তুলে বসবাস ও মানবেতর জীবনযাপন করছেন। সম্ভাব্য বন্যা পরিস্থিতি মোকাবিলায় জেলার ৮৩টি ইউনিয়নের মধ্যে ৩১টিকে ঝুঁকিপূর্ণ হিসাবে চিহ্নিত করেছে জেলা স্বাস্থ্য বিভাগ। বন্যা-পরবর্তী স্বাস্থ্যঝুঁকি মোকাবিলায় তারা ব্যাপক প্রস্তুতি নিয়েছে বলে জানিয়েছে। বৃহস্পতিবার সিরাজগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ডের উপবিভাগীয় প্রকৌশলী জাকির হোসেন বলেন, গত ২৪ ঘণ্টায় সিরাজগঞ্জ শহর রক্ষা বাঁধ হার্ড পয়েন্টে যমুনার পানি ২০ সেন্টিমিটার বৃদ্ধি পেয়ে বিপৎসীমার ১.৩৫ মিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে।এ পয়েন্টে বিপৎসীমা ১২.৯০ মিটার। সিরাজগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মখলেছুর রহমান বলেন, চরাঞ্চল রক্ষায় আমাদের কোনো প্রকল্প না থাকায় শাহজাদপুর উপজেলার সোনাতনী ইউনিয়নের ধীতপুর ও কুরসী এলাকায় কাজ করা সম্ভব হচ্ছে না। তবে এ ধরনের প্রকল্প পাওয়া গেলে সেখানে অবশ্যই কাজ করা হবে।

Top