রাজধানীতে চলছে প্রায় ডজনখানেক ডিজাইনের রিকশা - Alokitobarta
আজ : মঙ্গলবার, ১০ই ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ২৭শে মাঘ, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

রাজধানীতে চলছে প্রায় ডজনখানেক ডিজাইনের রিকশা


মোহাম্মাদ আমিনুল ইসলাম :ঘণ্টার টুংটাং মিষ্টি শব্দে ভরে উঠত গলিপথ। কিন্তু সেই দিন আর নেই। সময় বদলে গেছে।একসময় ঢাকার রাস্তায় শুধু প্যাডেল রিকশাই চলত।এখন রাজধানীতে চলছে প্রায় ডজনখানেক ডিজাইনের রিকশা। অনুমোদিত কোনো ডিজাইনের বালাই নেই। যে যেভাবে পারছে, সেভাবেই রিকশা তৈরি করে বিক্রি করছে এবং রাস্তায় নামাচ্ছে।মেকানিক্যাল নিরাপত্তা বা মাপজোখেরও কোনো ধরাবাঁধা নিয়ম নেই।বিগত দুই বছরে দুই সিটিতে ব্যাটারিচালিত রিকশার সংখ্যা কত, সে তথ্য কেউ জানে না। কারণ এগুলোর কোনো লাইসেন্স নেই। সরকারের উপেক্ষা ও অসহযোগিতার কারণে সিটি করপোরেশনও এগুলোকে লাইসেন্স নিতে বাধ্য করতে পারেনি।এক হিসাবে দেখা গেছে, ঢাকা ও গাজীপুরে দৈনিক অটোরিকশা চলে প্রায় ৪০ লাখ।

২০২৩ সালে অনুমান করা হয়েছিল, ঢাকায় অনুমোদিত রিকশার সংখ্যা দেড় লাখের মতো। আর অনুমোদনহীন রিকশার সংখ্যা প্রায় ছয় গুণ, সব মিলিয়ে প্রায় ১২ লাখ। এই সংখ্যা আরও অনেক বেশি বলেই মনে করেন অনেকে। কারণ একটি লাইসেন্স নিয়ে ১০-১২টি রিকশা চালানোর নজিরও আছে।দুই বছর আগেও যেখানে শুধু প্যাডেল রিকশাই ছিল, সেখানে ব্যাটারিচালিত রিকশা রাস্তায় নামার পর এখন রাজধানীর দুই সিটিতে মোট কত রিকশা চলাচল করে, তার সুনির্দিষ্ট তথ্য কারও কাছে নেই।রাজধানীর কিছু এলাকায় এখনো প্যাডেলচালিত রিকশা চলে। রাজধানী ঘুরে ১৩ ধরনের ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার দেখা মিলেছে। সেই রিকশাগুলোর কিছু তথ্য নিচে তুলে ধরা হলো

মিশুক গাড়ি
দেশীয় প্রযুক্তিতে তৈরি। পাঁচটি ব্যাটারি। দাম প্রায় ১ লাখ ২০ হাজার টাকা। ছোট চাকার এই রিকশায় তিনজন যাত্রী বহন করা যায়।

অটোরিকশা
ঢাকার রিকশা গ্যারেজগুলোতেই প্যাডেল রিকশায় ব্যাটারি ও মোটর লাগিয়ে অটোরিকশায় রূপান্তর করা হয়। খরচ পড়ে ৫০ থেকে ৬৫ হাজার টাকা।

নৌকা রিকশা
ছোট চাকা, লাল-সবুজ সুন্দর রঙে দেশীয় প্রযুক্তিতে তৈরি। চারটি ব্যাটারিতে চলে। দুইজন যাত্রী বহন করতে পারে। দাম ৯০ হাজার টাকা। তৈরি হচ্ছে নরসিংদীতে।

ইজিবাইক
চীন থেকে আমদানি করা। ছয়টি ব্যাটারিতে চলে। পাঁচজন যাত্রী বহন করতে পারে। বড় চাকা। দাম ২ লাখ ৩০ হাজার টাকা।

আল মদিনা
চারটি ব্যাটারি। দেশীয় প্রযুক্তিতে তৈরি। গাজীপুরের কারখানায় উৎপাদিত। দাম ৯০ হাজার টাকা। মাঝারি চাকা। দুইজন যাত্রী বহন করতে পারে।

মিশু
গাজীপুরে তৈরি। বডি দুই ভাগে বিভক্ত। চিকন চাকা। দুইজন যাত্রী বহন করতে পারে। দাম ৮০ হাজার টাকা।

মিনি অটোরিকশা
মোটা চাকা। গাজীপুরে দেশীয় প্রযুক্তিতে তৈরি। পাঁচটি ব্যাটারি। চারজন যাত্রী বহন করতে পারে। দাম ১ লাখ ৪০ হাজার টাকা।

লাল রঙের অটোরিকশা
নরসিংদীতে তৈরি। দাম ৬২ হাজার টাকা। মোটা চাকা। বডি দুই ভাগে বিভক্ত।

বিশু
সবুজ রঙের দেশীয় প্রযুক্তিতে তৈরি ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা। তৈরি হচ্ছে চেরাগ আলীতে। দাম ৯৫ হাজার টাকা। চারটি ব্যাটারি। চারজন যাত্রী বহন করতে পারে। মোটা চাকা।

রিকশার বিকল্প মোটা চাকার রিকশা
দাম ৭০ হাজার টাকা। তৈরি হচ্ছে মিরপুর ১২ নম্বরে। শুধু চাকার পার্থক্য, বাকি সব রিকশার মতোই দেখতে। দুইজন যাত্রী বহন করতে পারে।

হলুদ মিশুক
দেখতে খুব সুন্দর। দাম ১ লাখ ৫০ হাজার টাকা। পাঁচজন যাত্রী বহন করতে পারে। চারটি ব্যাটারি ও মোটা চাকা। তৈরি হচ্ছে গাজীপুর এলাকায়।

লাল রঙের অটো প্রাইভেট
চীনে তৈরি। বাংলাদেশে এনেছে আকিজ কোম্পানি। দাম ৩ লাখ ৯৫ হাজার টাকা। পাঁচটি ব্যাটারি। ছয় মাস পরপর ব্যাটারি পরিবর্তন করতে হয়। একবার চার্জে ৬০ কিলোমিটার চলতে পারে। দুজন যাত্রী বহন করা সম্ভব। বাংলাদেশের রাস্তায় চলছে প্রায় দুই মাস ধরে।

ব্যাটারিচালিত খোলা অটো
দেখতে অনেকটা ছোট তিনচাকার প্রাইভেট কারের মতো। সামনে ও পেছনে গ্লাস দেওয়া। দাম ২ লাখ ৩৫ হাজার টাকা। চীনে তৈরি। দুজন যাত্রী বহন করতে পারে। একবার চার্জে সারাদিন চলা সম্ভব।

সবচেয়ে দ্রুত বেড়েছে ব্যাটারিচালিত রিকশার ব্যবহার। পুরোনো রিকশাগুলোকে স্থানীয় গ্যারেজে মেরামত করে মোটর সংযুক্ত করা হচ্ছে। এসব রিকশা দ্রুত চলে, কিন্তু শহরের যানজট ভয়াবহভাবে বাড়িয়ে তুলছে।আগে থেকেই ঢাকার প্রধান সড়কে যানজট থাকলে অলিগলিতে সহজে হাঁটা যেত। এখন প্রতিনিয়ত ব্যাটারি রিকশা এসে হর্ন বাজায়। শব্দও বেশি, দুর্ঘটনাও বেড়েছে। আর পাল্লা দিয়ে বেড়েছে যানজট, যার জন্য প্রধানত দায়ী অটোরিকশা।সড়কে বাড়তি রিকশার চাপে যানজট, বিদ্যুৎ অপচয় ও চার্জিং সংকট—সব মিলিয়ে নগরজীবনে তৈরি হয়েছে নতুন জটিলতা।ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, এসব ব্যাটারি রিকশার কোনো নিবন্ধন নেই এবং চালকদের অনেকেই অপ্রশিক্ষিত। ফলে সড়ক দুর্ঘটনার হার দিন দিন বাড়ছে।নগরীতে এখন রিকশা বানানো, চালানো এমনকি ভাড়া বিক্রিও চলছে অঘোষিতভাবে। একেকটি নতুন ব্যাটারিচালিত রিকশার দাম ৮০ হাজার থেকে ৩ লাখ ৩৫ হাজার টাকা পর্যন্ত।তবে নগর পরিকল্পনাবিদরা বলছেন, এই বাড়তি রিকশার ঢল শহরের দীর্ঘমেয়াদি পরিবহন সংকটকে আরও জটিল করে তুলবে।রিকশা থাকা দরকার। কিন্তু এইভাবে অনিয়ন্ত্রিতভাবে বাড়তে থাকলে ঢাকার রাস্তায় অন্যান্য যানবাহনের চলাচল মারাত্মকভাবে বিঘ্নিত হবে। অচিরেই যদি কোনো ব্যবস্থা না নেওয়া হয়, তাহলে গাড়ি তো দূরের কথা, পায়ে হাঁটাও মুশকিল হয়ে পড়বে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, সিটি করপোরেশন ও বিআরটিএ’র মধ্যে সমন্বয়ের অভাবেই এই বিশৃঙ্খলা তৈরি হয়েছে। তারা বলছেন, প্রযুক্তিনির্ভর রিকশা টিকবে, কিন্তু তার আগে প্রয়োজন একটি নিয়ন্ত্রণমূলক নীতিমালা, যাতে বিদ্যুৎ অপচয় ও যানজট দুটিই নিয়ন্ত্রণে থাকে।

Top