ব্যবসা প্রতিষ্ঠান পরিচালনায় ঋণ খেলাপিরা থাকতে পারবে না
মোহাম্মাদ আবুবকর সিদ্দীক ভুঁইয়া:অর্থ পরিশোধ ও নিষ্পত্তিসংক্রান্ত ব্যবসা প্রতিষ্ঠান পরিচালনায় ঋণ খেলাপিরা থাকতে পারবে না। এমন বিধান রেখেই ‘পেমেন্ট অ্যান্ড সেটেলমেন্ট সিস্টেমস আইন-২০২১’ চূড়ান্ত করেছে অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ। এটি অনুমোদনের জন্য চলতি সপ্তাহে মন্ত্রিসভার বৈঠকে উপস্থাপনের সম্ভাবনা রয়েছে। সে লক্ষ্যে সব ধরনের কার্যক্রম সম্পন্ন করে গত ১৭ নভেম্বর প্রস্তাবটি আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ থেকে পাঠানো হয়েছে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগে। এর আগে মন্ত্রিসভা পেমেন্ট অ্যান্ড সেটেলমেন্ট সিস্টেমস আইনের খসড়ায় নীতিগত অনুমোদন দেয়। এরপর খসড়া বিলের ওপর লেজিসলেটিভ ও সংসদবিষয়ক বিভাগে ভেটিং হয়। সংশ্লিষ্ট সূত্রে পাওয়া গেছে এসব তথ্য।মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের সচিবের কাছে পাঠানো চিঠিতে বলা হয়, আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের উদ্যোগে ‘পেমেন্ট অ্যান্ড সেটেলমেন্ট সিস্টেমস আইন-২০২১’ চূড়ান্ত করা হয়েছে। মন্ত্রিসভায় নীতিগত অনুমোদন পাওয়ার পর লেজিসলেটিভ ও সংসদবিষয়ক বিভাগের ভেটিং করা হয়। চূড়ান্ত অনুমোদনের লক্ষ্যে প্রস্তাবের ৫০ কপি সারসংক্ষেপ আকারে পাঠানো হলো।
জানতে চাইলে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ এমকে মুজেরি বলেন, আগেও যেকোনো আর্থিক প্রতিষ্ঠানের পরিচালনা পর্ষদে ঋণখেলাপিদের অবস্থান ছিল না। এ ধরনের আইনও আছে। কিন্তু এর পরও ফাঁকফোকর দিয়ে ঋণখেলাপিরা ফাইন্যান্সিয়াল ইনস্টিটিউটের বোর্ডে ঢুকে পড়েন। আইনে ঋণখেলাপি না হলেও ঋণ রিশিডিউল করে সেখানে বসেন। এসব হচ্ছে আইনের খেলাধুলা। বর্তমান পেমেন্ট অ্যান্ড সেটেলমেন্ট সিস্টেমস আইনে ঋণখেলাপিদের ব্যাপারে বিধিনিষেধ আরোপ করার উদ্যোগটি ভালো। তবে এটি বাস্তবায়ন কতটুকু হবে সেটি দেখার বিষয়। কারণ ঋণখেলাপিরা এতটা প্রভাবশালী যে, আইনকে পাশ কাটিয়ে তারা কাজ করে। অতীতের অভিজ্ঞতা ভালো নয়।পেমেন্ট অ্যান্ড সেটেলমেন্ট সিস্টেমস আইনের বিধানগুলো দেশের ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান এবং বিমা, পুঁজিবাজারসহ ৪৬ ধরনের আর্থিক ব্যবসা পরিচালনার ক্ষেত্রে পরিপালন করতে হবে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে ইন্টারনেট ব্যাংকিং পরিচালনা, ডেবিট ও ক্রেডিট কার্ড, ইলেকট্রনিক তহবিল স্থানান্তর (ইএফটি)। আইনগতভাবে স্বীকৃত মুদ্রায় পরিচালিত ব্যবসা প্রতিষ্ঠান, বিভিন্ন ব্যাংকের লেনদেনে অ্যাপস ই-ওয়ালেট, ইলেকট্রনিক মুদ্রা কেন্দ্রীয় ব্যাংক ডিজিটাল মুদ্রাও এর মধ্যে অন্তর্ভুক্ত। এ ছাড়া চেক ও চেকের ইলেকট্রনিক উপস্থাপন, নগদ অর্থ ও নিকাশ ঘর পরিচালনা, পরিশোধ সেবার ব্যবসা, সরকারি সিকিউরিটিজ সেটেলমেন্ট সিস্টেমসও আছে।এ ধরনের ব্যবসা যদি ব্যাংক করতে চায় সে ক্ষেত্রে কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে অনুমোদন এবং কোম্পানির ক্ষেত্রে লাইসেন্স নিতে হবে। কেন্দ্রীয় ব্যাংক প্রয়োজন মনে করলে শর্ত পরিবর্তন করতে পারবে। ব্যবসার মাধ্যমে ক্ষতিকর কার্যকলাপ পরিচালনা করলে কোম্পানির ক্ষেত্রে লাইসেন্স বাতিল করার ক্ষমতা রাখবে বাংলাদেশ ব্যাংক।কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মাধ্যমে নির্ধারিত পরিমাণে এ ব্যবসার মূলধন সংরক্ষণ করতে হবে। অনুমোদন ছাড়া এ ব্যবসা পরিচালনা পর্ষদের অন্য কোনো উদ্যোক্তা পরিচালকের শেয়ার হস্তান্তর করা যাবে না। এর কোনো একটি বিধিবিধান লঙ্ঘন করে অর্থ লেনদেন সংক্রান্ত ব্যবসা পরিচালনা করলে সংশ্লিষ্ট দায়ী ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এর মধ্যে প্রতিষ্ঠানের ওপর বিধিনিষেধ আরোপসহ সর্বোচ্চ ২৫ লাখ টাকা জরিমানা করতে পারবে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। পাশাপাশি প্রতিষ্ঠানের লাইসেন্স স্থগিত ও প্রত্যাহার হতে পারে।
কোনো বিধি লঙ্ঘনের দায়ে লাইসেন্স বাতিলের পরও এ ধরনের ব্যবসা করলে সর্বোচ্চ ২৫ লাখ এবং সর্বনিম্ন এক লাখ টাকা জরিমানা করা হবে। এর পরও একই কার্যক্রম অব্যাহত রাখলে প্রতিদিনের জন্য ৫০ হাজার থেকে এক লাখ টাকা পর্যন্ত জরিমানা করা হবে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের লাইসেন্স ছাড়াই কেউ এ ব্যবসা করে ধরা পড়লেও একই শাস্তি হবে।নিরীক্ষা কাজসহ অন্যান্য ক্ষেত্রে বাধা দিলে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের পরিচালক বা প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তাকে এক লাখ থেকে পাঁচ লাখ টাকা পর্যন্ত দণ্ডের বিধান রাখা হয়েছে।প্রস্তাবে আরও উল্লেখ করা হয়, গ্রাহক বা জনস্বার্থবিরোধী কোনো কার্যক্রমে লিপ্ত হলে এ সংক্রান্ত ব্যবসা প্রতিষ্ঠান অবসায়ন করতে হাইকোর্ট বিভাগে আবেদন করতে পারবে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। তবে তৃতীয় কোনো পক্ষের আবেদনে এ ধরনের প্রতিষ্ঠানের অবসায়ন হবে না। আর আদালত থেকে অবসায়ন কার্যক্রম জারি করা হলে ওই প্রতিষ্ঠান গ্রাহকের সঙ্গে কোনো লেনদেন করতে পারবে না। গ্রাহকের দায়দেনা প্রশাসকের ওপর বর্তাবে। তবে অবসায়নকালে গ্রাহককে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিতে হবে। এ ছাড়া লেনদেন ব্যবস্থা কার্যক্রম ও ঝুঁকি কমাতে এ সংক্রান্ত কাজের আধুনিকায়নের লক্ষ্যে কেন্দ্রীয় ব্যাংক নীতিমালা প্রণয়ন করবে।