বিচারের অপেক্ষায় স্বজনরা,সাত খুনের পাঁচ বছর - Alokitobarta
আজ : সোমবার, ২৭শে মে, ২০২৪ খ্রিস্টাব্দ | ১৩ই জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩১ বঙ্গাব্দ
সর্বশেষ সংবাদঃ

বিচারের অপেক্ষায় স্বজনরা,সাত খুনের পাঁচ বছর


আলোকিত বার্তা:শনিবার ২৭ এপ্রিল নারায়ণগঞ্জের আলোচিত সাত খুনের পাঁচ বছর পূর্ণ হচ্ছে। মামলাটির বিচারকাজ দুটি আইনি প্রক্রিয়া শেষে এখন আপিল ডিভিশনে তৃতীয় পর্যায়ে আইনি প্রক্রিয়ার অপেক্ষায়। মামলার আইনজীবী,নিহতদের পরিবারসহ সারাদেশের মানুষ এ হত্যাকাণ্ডের বিচারের অপেক্ষায়। দ্রুত রায় কার্যকরের ব্যাপারে সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন তারা।
২০১৪ সালের ২৭ এপ্রিল দিনদুপুরে র‌্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়নের (র‌্যাব) পোশাকধারী একদল সদস্য নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের প্যানেল মেয়র নজরুল ইসলাম, ব্যবসায়ী তাজুল ইসলাম, অ্যাডভোকেট চন্দন সরকারসহ সাতজনকে অপহরণের পর নৃশংসভাবে হত্যা করে। পরে লাশ গুম করার উদ্দেশে শীতলক্ষ্যা নদীতে ফেলে দেয়। দুদিন পর একের পর এক তাদের লাশ ভেসে উঠলে পুলিশ গিয়ে উদ্ধার করে। পরে ওই ঘটনায় ফতুল্লা থানায় আলাদা দুটি মামলা করেন নিহত নজরুল ইসলামের স্ত্রী সেলিনা ইসলাম বিউটি ও চন্দন সরকারের জামাতা ডা. বিজয় কুমার।

পরবর্তী সময়ে দেড় বছরের বেশি বিচারকাজ সম্পন্ন করে নারায়ণগঞ্জের জজ আদালত তৎকালীন র‌্যাব কর্মকর্তা লেফটেন্যান্ট কর্নেল তারেক সাঈদ, কমান্ডার এম এম রানা ও মেজর আরিফ হোসেন এবং সিদ্ধিরগঞ্জ আওয়ামী লীগের সাবেক সভাপতি কাউন্সিলর নূর হোসেনসহ ২৬ জনের বিরুদ্ধে মৃত্যুদণ্ডের আদেশ দেয়। আসামিপক্ষ ওই আদেশের বিরুদ্ধে উচ্চ আদালতে আপিল করলে উল্লিখিত চারজনসহ ১৫ জনের বিরুদ্ধে একই আদেশ বহাল রেখে বাকি ১১ জনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডাদেশ দেয় আদালত। মামলাটি বর্তমানে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগে রয়েছে।সিদ্ধিরগঞ্জের আওয়ামী লীগ নেতা ওয়ার্ড কাউন্সিলর নূর হোসেন ও আওয়ামী লীগের আরেক নেতা প্যানেল মেয়র নজরুল ইসলামের বিরোধের জেরে ওই সাত খুনের ঘটনা ঘটেছে বলে আদালত এরই মধ্যে প্রমাণ করতে পেরেছে। অর্থের বিনিময়ে র‌্যাব সদস্যদের হত্যাকাণ্ডে ব্যবহার করেছিলেন নূর হোসেন।

জানা যায়,ঘটনার দিন আদালতে কোনো একটি মামলার হাজিরা শেষে ফেরার পথে ফতুল্লার খানসাহেব স্টেডিয়ামের কাছে লিঙ্ক রোডে প্রাইভেটকারের গতিরোধ করে প্যানেল মেয়র নজরুল ইসলাম ও তার বন্ধু তাজুল ইসলামসহ পাঁচজনকে মারধর করে টেনেহিঁচড়ে অপহরণ করেন র‌্যাব সদস্যরা। সে সময় চন্দন সরকার তা দেখে বাধা দেওয়ায় চালকসহ তাকেও অপহরণ করা হয়।আদালতে আসামিরা জানান, অপহরণের পর মাইক্রোবাসের ভেতর প্রত্যেককে চেতনানাশক ইনজেকশন দেওয়া হয় এবং পলিথিনে মাথাসহ মুখমণ্ডল আটকে দেওয়া হয়। পরে তাদের হত্যা করে মরদেহে ইটের বস্তা বেঁধে ও পেট ছিদ্র করে রাতের আঁধারে ট্রলারের মাধ্যমে মেঘনা, ধলেশ্বরী ও শীতলক্ষ্যার মোহনায় ডুবিয়ে দেওয়া হয়।আলোচিত এ মামলার প্রধান আইনজীবী সাখাওয়াত হোসেন খান মনে করেন, মামলাটির বিচারের রায় কার্যকর দেখতে শুধু নারায়ণগঞ্জবাসী নয়, সারাদেশের মানুষ অপেক্ষা করছে। সাখাওয়াত হোসেন বলেন, সাত খুনের মামলাটি একটি বীভৎস হত্যাকাণ্ড। এটি সারা বাংলাদেশের মানুষকে নাড়া দিয়েছিল। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কিছু বিপথগামী সদস্যের নেতৃত্বে, যেভাবে প্রকাশ্যে সাতজনকে ধরে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল এবং তাদের হত্যা করে গুম করা হয়েছিল, সেটার জন্য সারা বাংলাদেশে একটা প্রতিবাদের ঝড় উঠেছিল। আজকে নারায়ণগঞ্জসহ সারা বাংলাদেশের মানুষ সেই বিচারের রায়টা কার্যকর দেখতে চায়।

এদিকে যতদিন পর্যন্ত না এ মামলার রায় কার্যকর হয়, উদ্বেগ কাটছে না নিহতদের পরিবারগুলোর। প্রতিনিয়ত আসামিপক্ষের হুমকির শিকার হতে হচ্ছে তাদের। ভীতিকর পরিস্থিতিতে দিন কাটাচ্ছেন তারা। মামলার বাদী ও নিহত প্যানেল মেয়র নজরুল ইসলামের স্ত্রী সেলিনা ইসলাম বিউটি বলেন, আমি খুবই আতঙ্কে আছি রায়টার জন্য। আমরা সবাই আশায় বইসা রইছি, কবে এই সেভেন মার্ডারের বিচার হবে। আসল খুনিদের সর্বোচ্চ সাজা পামু আমরা। সারা দেশ দেখুক যে, নরপিশাচগো বিচার কী রকম বাংলাদেশের মাটিতে প্রধানমন্ত্রী করেছে। এটা মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর কাছেও আমার আশা, যাতে এই নরপিশাচদের এমন সাজা দেওয়া হোক যাতে এমন অপরাধ করার সাহস না পায় কেউ। আমি চাই, এই রায়টা দ্রুত কার্যকর করা হোক।

আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর জিজ্ঞাসাবাদে বেরিয়ে আসে পুরো ঘটনা। এ ঘটনার নেপথ্যে ছিলেন ৪ নং ওয়ার্ড কাউন্সিলর নূর হোসেন। ঘটনার পর নূর হোসেন পালিয়ে ভারত গেলে ওই বছরের ১৪ জুন কলকাতার দমদম বিমানবন্দর সংলগ্ন বাগুইআটি থানা পুলিশ তাকে গ্রেফতার করে। পরে ২০১৫ সালের ১৩ নভেম্বর বেনাপোল সীমান্ত দিয়ে তাকে বাংলাদেশের পুলিশের কাছে হস্তান্তর করা হয়। ১৪ নভেম্বর তাকে নারায়ণগঞ্জ আদালতে হাজির করা হলে বিচারক তাকে জেল হাজতে পাঠায়।এদিকে এ হত্যা মামলাটি তদন্ত করেন নারায়ণগঞ্জ জেলা গোয়েন্দা পুলিশ। হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকার অভিযোগে ৩৫ জনকে আসামি করে ২০১৬ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি অভিযোগ গঠন করে আদালত।

গত ২০১৭ সালের ১৬ জানুয়ারি নারায়ণগঞ্জ জেলা ও দায়রা জজ সৈয়দ এনায়েত হোসেন আদালতে চাঞ্চল্যকর সাত খুনের মামলায় সাবেক কাউন্সিলর নূর হোসেন ও সাবেক তিন র‌্যাব কর্মকর্তাসহ ২৬ আসামিকে মৃত্যুদণ্ড দেয়। দুই মামলায় ৩৫ আসামির মধ্যে বাকি নয়জনকে দেয়া হয়েছে বিভিন্ন মেয়াদের কারাদণ্ড।দণ্ডপ্রাপ্ত আসামিরা উচ্চ আদালতে আপিল করলে হাইকোর্ট নারায়ণগঞ্জের আলোচিত সাত খুন মামলার রায়ে কাউন্সিলর নুর হোসেন এবং সাবেক র‌্যাব অধিনায়ক তারেক সাঈদসহ ১৫ জনের মৃত্যুদণ্ডের আদেশ বহাল রাখেন। বাকি ১১ জনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেন। এছাড়া ৯জনকে বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ডের রায় হাইকোর্টেও বহাল রয়েছে।
গত ১৯ নভেম্বর ২০১৮ তারিখে নারায়ণগঞ্জের চাঞ্চল্যকর সাত খুনের ঘটনায় আনা দুই মামলায় ১ হাজার ৫৬৪ পৃষ্ঠার রায় প্রকাশ করা হয়। রায় প্রদানকারী বিচারপতি ভবানী প্রসাদ সিংহ ও বিচারপতি মোস্তফা জামান ইসলাম রায়ে স্বাক্ষর করেন। পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশের পর চলতি বছরের ৩ মার্চ মৃত্যুদণ্ডাদেশ থেকে খালাস চেয়ে হাই কোর্টের রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করেছেন দণ্ডপ্রাপ্তরা।

Top
%d bloggers like this: