নতুন মেট্রোরেল প্রকল্প পাস, আগের দুটির ব্যয় দ্বিগুণ
রিপোর্ট আলোকিত বার্তা :মেট্রোরেলপথের দুই প্রকল্পের ব্যয় ১ লাখ ১০ হাজার ৪৪৩ কোটি টাকা বৃদ্ধিতে অনুমোদন দিয়েছে জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটি (একনেক)। জাপানের আন্তর্জাতিক সহযোগিতা সংস্থা-জাইকা ২০১৯ সালে নির্ধারিত ব্যয়ে রাজি না হওয়ায় গতকাল বুধবার প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সভাপতিত্বে সভায় এই অনুমোদন দেওয়া হয়।জাপানের নানা শর্তে ব্যয় বৃদ্ধির কারণে সাবেক অন্তর্বর্তী সরকার প্রকল্প দুটির অগ্রগতি স্থগিত করে বিকল্প অর্থায়ন সন্ধান করতে চেয়েছিল। বর্তমান বিএনপি সরকার জাপানের ঋণে কাজ এগিয়ে নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। এতে প্রকল্প দুটির ব্যয় ৯৩ হাজার ৭৯৯ কোটি টাকা থেকে বেড়ে হয়েছে ২ লাখ ৪ হাজার ২৪২ কোটি টাকা। পাতাল ও উড়ালপথের প্রকল্প দুটিতে প্রতি কিলোমিটার নির্মাণ ব্যয় হবে প্রায় ৪ হাজার কোটি টাকা। প্রকল্প দুটির মেয়াদও সাত বছর বাড়ানোর অনুমোদন দিয়েছে একনেক। গতকাল একনেকের একই সভায় রাজধানীর গাবতলী থেকে আসাদগেট, রাসেল স্কয়ার, কারওয়ান বাজার, আফতাবনগর হয়ে দাশেরকান্দি পর্যন্ত ১৭ দশমিক ২০ কিলোমিটার দীর্ঘ মেট্রোরেল (এমআরটি-৫ দক্ষিণ) প্রকল্পে অনুমোদন দেওয়া হয়। এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক এবং দক্ষিণ কোরিয়ার ঋণে ২০৩৩ সালের মধ্যে প্রকল্পটি বাস্তবায়নে ব্যয় হবে ৪৫ হাজার ৫০৩ কোটি টাকা। প্রতি কিলোমিটারে ব্যয় হবে ২ হাজার ৬৪৫ কোটি টাকা।
২০১৯ সালে অনুমোদনের সময় ৩১ দশমিক ২৪ কিলোমিটার দীর্ঘ বিমানবন্দর-পূর্বাচল-কমলাপুর মেট্রোর (এমআরটি-১) ব্যয় ধরা হয়েছিল ৫২ হাজার ৫৬১ কোটি টাকা। ৬১ হাজার ৮৩৩ কোটি টাকা বাড়ানোর পর প্রকল্পটির ব্যয় দাঁড়াল ১ লাখ ১৪ হাজার ৩৯৪ কোটি টাকা। ব্যয় রূপপুরের পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রকে ছাড়িয়ে যাওয়ায় এটি বাংলাদেশের সবচেয়ে ব্যয়বহুল প্রকল্পে পরিণত হয়েছে। ২০১৯ সালের সেপ্টেম্বর থেকে শুরু হয়ে চলতি বছরের ডিসেম্বরে এমআরটি-১ চালুর পরিকল্পনা ছিল। গতকাল প্রকল্পটির মেয়াদ সাত বছর বাড়িয়ে ২০৩৩ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত নির্ধারণ করা হয়েছে।
২০১৯ সালে অনুমোদনের সময় ২০ কিলোমিটার দীর্ঘ আমিনবাজার-গাবতলী-মিরপুর-ভাটারা মেট্রোর (এমআরটি-৫ উত্তর) ব্যয় ধরা হয়েছিল ৪১ হাজার ২৩৮ কোটি টাকা। একনেকে ৪৮ হাজার ৬১০ কোটি টাকা বৃদ্ধি করা হয়েছে। প্রকল্পটিতে ব্যয় হবে ৮৯ হাজার ৮৪৮ টাকা। এই প্রকল্পের মেয়াদ ছিল ২০১৯ সালের জুলাই থেকে ২০২৮ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত। সংশোধনীতে মেয়াদ ৬ বছর বাড়িয়ে ২০৩৪ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত নির্ধারণ করা হয়েছে।২০২০ সালে এমআরটি-১ এবং এমআরটি-৫ নর্থ প্রকল্পের ঋণচুক্তি শুরুর সময়ে জাইকার ঋণের সুদ ছিল দশমিক শূন্য ৭ শতাংশ। ২০২৩ সালে জাপান ঋণের সুদ হার নির্ধারণ করে ২ দশমিক ৩৬ শতাংশ। বর্তমানে এই হার ৩ দশমিক শূন্য ৬ শতাংশ। আগামী মাসে তা হতে পারে ৩ দশমিক ৫ শতাংশ।
সুদহার বৃদ্ধির আগেই জাপানের ঋণের প্রকল্প দুটি অনুমোদন করা হয়েছে বলে একনেক সভার পর জানিয়েছেন পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী জোনায়েদ আবদুর রহিম সাকি। লাইন-১ ও লাইন-৫ (উত্তর) প্রকল্প দুটি একনেক বৈঠকের কার্যতালিকায় না থাকার পরও কেন এবং কীভাবে অনুমোদন দেওয়া হলো– এ বিষয়ে তিনি বলেন, প্রকল্প দুটিতে কারিগরি ও ঋণ সহায়তা দিচ্ছে জাইকা। আগামী মাসে জাইকার ঋণের হার আবার বাড়বে। নতুন করে ঋণের সুদের হার বেড়ে যাওয়ার আগেই সংশোধন অনুমোদিত হলে বর্ধিত সুদ এড়ানো যাবে। এই চিন্তা থেকেই দেশের স্বার্থে দ্রুত প্রকল্প দুটি একনেকে তোলা হয়েছে। প্রকল্প দুটিতে অস্বাভাবিক বেশি ব্যয় কেন ধরা হলো– এমন প্রশ্নের জবাবে প্রতিমন্ত্রী বলেন, প্রকল্প দুটিতে অতিরিক্ত ব্যয় বরাদ্দের অভিযোগ আগে থেকেই ছিল। এ কারণে বর্তমান সরকার গঠনের পরই প্রকল্প দুটির ব্যয় মূল্যায়নে বিশেষজ্ঞ কমিটি গঠন করা হয়। কমিটি ব্যয়ের খাত পুঙ্খানুপুঙ্খ বিশ্লেষণ করেছে। তাদের সুপারিশের ভিত্তিতেই বাড়তি ব্যয়ে অনুমোদন দেওয়া হয়েছে।
তবে বিপুল ব্যয়ে মেট্রোরেল নির্মাণ লাভজনক হবে কিনা– প্রশ্ন রয়েছে। জাইকার ঋণে ৩৩ হাজার ৪৭২ কোটি টাকায় মিরপুর থেকে কমলাপুর পর্যন্ত ২১ দশমিক ২৬ কিলোমিটার দীর্ঘ মেট্রোরেল (এমআরটি-৬) নির্মাণ চলছে। এ প্রকল্পের শুরুতে ব্যয় নির্ধারিত হয়েছিল ২১ হাজার ৯৮৫ কোটি টাকা। ব্যয় বৃদ্ধির ফলে মেট্রোরেলের নির্মাণ ও পরিচালনার দায়িত্বে থাকা সরকারি কোম্পানি ডিএমটিসিএলকে বছরে ৭০০ কোটি টাকার মতো ঋণের কিস্তি পরিশোধ করতে হচ্ছে। অথচ অনিরীক্ষিত হিসাব অনুযায়ী এমআরটি-৬ লাইনে যাত্রী পরিবহন করে বছরে আয় হচ্ছে প্রায় ৪০০ কোটি টাকা। বেতন-ভাতা, রক্ষণাবেক্ষণ, বিদ্যুৎ খরচ দিতে হচ্ছে সরকারের ভর্তুকি থেকে।সরকার ভর্তুকি প্রত্যাহার করলে কয়েক গুণ হয়ে যাবে মেট্রোরেলের ভাড়া।
জাপানের ঋণের প্রকল্পে ব্যয় বেশি হলেও কাজের মান ভালো হয়– এমন ধারণা প্রচলিত। তবে মেট্রোরেল-৬ প্রকল্পের ৪৬টি পিলারে ফাটল ও ২৭টি বিয়ারিং প্যাডে ত্রুটি দেখা দিয়েছে। এগুলো নির্মাণ করেছে জাপানি প্রতিষ্ঠান।অতীতে ত্রুটিপূর্ণ কাজ করার পরও আবার কেন জাপানকে বেছে নেওয়া হয়েছে– এমন প্রশ্নে জোনায়েদ সাকি বলেন, মেট্রোরেল প্রকল্পের দুর্বলতা নিয়ে তদন্ত হচ্ছে। কারও অবহেলা পাওয়া গেলে তাদের জবাবদিহির আওতায় আনা হবে, যাতে প্রকল্পটির নিরাপত্তা নিশ্চিত করা যায়। সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানকে কমপ্লায়েন্সের (পরিপালনীয় শর্ত) আওতায় আনতে হবে। প্রয়োজনে ক্ষতিপূরণ আদায় ও সংস্কার ব্যয় তারা দেবে।নতুন প্রকল্পেও এসব শর্ত পরিপালন করা হবে।এতে নিরাপত্তা বাড়বে। এ-সংক্রান্ত প্রযুক্তি আয়ত্ত করতে নিজস্ব কারিগরি দক্ষতা অর্জনের ওপর জোর দিচ্ছে সরকার।
পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী জানান, রাজধানীতে নতুন নতুন আরও মেট্রোরেল প্রকল্প নেওয়া হবে। এ ছাড়া ঢাকার আশপাশের জেলা ও দেশের বড় শহরগুলোতে মেট্রোরেলপথ নির্মাণ করা হবে।উচ্চ ব্যয়ের কারণে এমআরটি-১ এবং এমআরটি-৫ নর্থ প্রকল্পে এমআরটি-৬ এর মতো ঋণের কিস্তির জন্য সরকারি ভর্তুকি লাগতে পারে বলে আশঙ্কা রয়েছে। তাই অন্তর্বর্তী সরকার প্রকল্প দুটি থেকে পিছিয়ে এসেছিল। ১২টি প্যাকেজে এমআরটি-১ প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হবে। নারায়ণগঞ্জের পিতলগঞ্জে গত বছরের আগস্টেই ডিপোর কাজ সম্পন্ন হয়েছে।যে তিনটি প্যাকেজের দরপত্র হয়েছে, তাতে ঠিকাদাররা সরকারের প্রাক্কলনের চেয়ে ৯৭ শতাংশ পর্যন্ত বেশি ব্যয় প্রস্তাব করেছিলেন। অন্তর্বর্তী সরকারের সময় এসব দরপত্র বাতিলে জাইকার অনুমোদন চাওয়া হয়েছিল। ঋণের শর্তের কারণে সংস্থাটির অনুমোদন নিতে হয়। তবে জাইকা পুনঃদরপত্রের অনুমোদন না দিয়ে বেশি দামেই ঠিকাদার নিয়োগের পরামর্শ দেয়।
ডিএমটিসিএলের কর্মকর্তারা বলেন, ঋণদাতা হিসেবে জাইকা দরপত্রের শর্ত ঠিক করে। এমন শর্ত ঠিক করা হয়, তাতে পরামর্শক এবং ঠিকাদার হিসেবে শুধু জাপানি প্রতিষ্ঠানগুলোর কনসোর্টিয়াম কাজ পায়। অন্যদের সুযোগ থাকে না। অতীতে দেখা গেছে, দরপত্রে অন্যান্য দেশের প্রতিষ্ঠান আগ্রহ দেখালেও শেষ পর্যন্ত অংশ নেয় না। ঘুরেফিরে দুই-তিনটি জাপানি কোম্পানি অংশ নেয়। তারা যে ব্যয় ধরে তা-ই মেনে নিতে হয়। ফলে প্রকল্পের খরচ অনেক বেড়ে যায়। ডিএমটিসিএলের শর্তে আন্তর্জাতিক এবং উন্মুক্ত দরপত্র হলে কম টাকায় ঠিকাদার পাওয়া যেত। যেমন– দক্ষিণ কোরিয়া এবং এডিবির ঋণে এমআরটি-৫ দক্ষিণের ব্যয় তুলনামূলক কম। তবে এই ব্যয়ও ভবিষ্যতে বাড়তে পারে, যদি তারা জাপানের নীতি অনুসরণ করে।
গতকাল বৈঠকে মেট্রোরেলের এই তিনটি প্রকল্প অনুমেদান, সংশোধনসহ মোট ১২টি প্রকল্পের অনুমোদন দেওয়া হয়। এসব প্রকল্পের ব্যয় ধরা হয় এক লাখ ৬৮ হাজার ৭৮০ কোটি টাকা। এর আগে একক একনেকে সর্বোচ্চ ব্যয় অনুমোদনের পরিমাণ ছিল এক লাখ ৫২ হাজার ৭১২ কোটি ৪১ লাখ টাকা। ২০১৬ সালের ৬ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত ওই বৈঠকে দেশের সবচেয়ে বড় ব্যয়ের প্রকল্প রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র অনুমোদন করা হয়েছিল। প্রকল্পটির ব্যয় ধরা হয়েছিল এক লাখ ১৩ হাজার ৯২ কোটি ৯১ লাখ টাকা। মোট ১২টি প্রকল্প অনুমোদন দেওয়া হয়েছিল সেই একনেক বৈঠকে।
গতকাল একনেক বৈঠকে মোট ১৮টি প্রকল্প অনুমোদনের জন্য উত্থাপন করা হয়। সময়স্বল্পতার কারণে ছয়টি প্রকল্প নিয়ে শেষ পর্যন্ত আলোচনা করা যায়নি। এসব প্রকল্প পরবর্তী একনেক বৈঠকে উত্থাপন করার নির্দেশ দেওয়া হয়। সবকটি প্রকল্প অনুমোদন দেওয়া হলে একক একনেকে অনুমোদিত প্রকল্পের ব্যয় দুই লাখ কোটি টাকা ছাড়িয়ে যেত, যা সমাপ্ত এক অর্থবছরের বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি-এডিপির সমান। সংশোধনে ৩০ হাজার কোটি টাকা কমানোর পর গত ২০২৫-২৬ অর্থছরের এডিপির আকার দুই লাখ কোটি টাকায় দাঁড়ায়।
সচিবালয়ের মন্ত্রিপরিষদ কক্ষে অনুষ্ঠিত এ সভায় অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী, স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায়মন্ত্রী ড.আব্দুল মঈন খান,পানিসম্পদমন্ত্রী মো.শহীদউদ্দীন চৌধুরী এ্যানি,আইনমন্ত্রী মো.আসাদুজ্জামান, সড়ক পরিবহন ও সেতু এবং রেলপথ প্রতিমন্ত্রী হাবিবুর রশিদ, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত, স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী এম এ মুহিত, পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী মো. জোনায়েদ আবদুর রহিম সাকিসহ সংশ্লিষ্ট ঊর্ধ্বতন সরকারি কর্মকর্তারা অংশ নেন।