৫০ সংসদীয় কমিটি বিরোধী দল পেল মাত্র একটি
মোহাম্মাদ মুরাদ হোসেন:সংসদের সংখ্যানুপাতে বিরোধী দল সংসদীয় কমিটির ২৬ শতাংশ প্রতিনিধিত্ব দাবি করে আসছে। জবাবে সরকারি দল সংবিধান সংশোধনসংক্রান্ত বিশেষ কমিটিতে বিরোধী দলকে অংশ নেওয়ার আহ্বান জানায়। কিন্তু ওই আহ্বানে সাড়া না দেওয়ায় বিরোধী দলকে সভাপতির পদ দেয়নি সরকারি দল। এদিকে একাধিক কমিটিতে রাষ্ট্রীয় সুবিধাভোগীদের (প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা, হুইপ) কমিটির সভাপতি করায় আবারও উষ্মা প্রকাশ করেছেন স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ। ভবিষ্যতে কমিটি পুনর্গঠনের সময় বিষয়টি বিবেচনার জন্য রুলিং দিয়েছেন তিনি।বিরোধী দলকে সভাপতি পদ না দিয়ে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের সব সংসদীয় কমিটি গঠন করেছে সরকারি দল।বৃহস্পতিবার চারটি কমিটি গঠনের মাধ্যমে মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত ৩৯টি এবং বিষয়ভিত্তিক ১১টি কমিটি গঠন করার কাজ শেষ হয়েছে।অবশ্য গত কয়েকটি সংসদের ধারাবাহিকতায় সরকারি হিসাব সম্পর্কিত কমিটির সভাপতি করা হয়েছে বিরোধী দল থেকে।যদিও জুলাই সনদ অনুযায়ী সংখ্যানুপাতে সংসদীয় কমিটির সভাপতি পদ না দেওয়ায় ক্ষোভ প্রকাশ করে আসছে বিরোধী দল।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের তৃতীয় অধিবেশন বৃহস্পতিবার শেষ হয়েছে। এদিন প্রতিরক্ষা, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি, জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় এবং সরকারি প্রতিষ্ঠান সম্পর্কিত সংসদীয় কমিটি গঠন করা হয়েছে। এর মধ্যে প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটির সভাপতি করা হয়েছে নরসিংদী-৫ আসনের সংসদ-সদস্য আশরাফ উদ্দিনকে, বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় কমিটির সভাপতি করা হয়েছে সরকারদলীয় হুইপ মিয়া নুরুদ্দিন আহাম্মেদ অপুকে, জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় কমিটির সভাপতি করা হয়েছে শরীয়তপুর-১ আসনের সাঈদ আহমেদ এবং সরকারি প্রতিষ্ঠান সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটির সভাপতি করা হয়েছে চিফ হুইপ নূরুল ইসলাম মনিকে। এছাড়া ছয়টি কমিটি পুনর্গঠন করা হয়েছে। চিফ হুইপ পৃথক পৃথকভাবে কমিটি গঠনের প্রস্তাব করেন। পরে তা কণ্ঠভোটে পাশ হয়।
কমিটি গঠন শেষে সংসদীয় স্থায়ী কমিটিতে বিরোধী দলের সদস্য বণ্টন নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ নাহিদ ইসলাম ও হুইপ রফিকুল ইসলাম খান। তাদের অভিযোগ, বিরোধী দলের দেওয়া তালিকা অনুযায়ী সদস্যদের বিভিন্ন কমিটিতে রাখা হয়নি। গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি কমিটিতে দুজন করে সদস্য দেওয়া হলেও তুলনামূলক কম গুরুত্বপূর্ণ কমিটিতে চারজন পর্যন্ত রাখা হয়েছে। কোনো মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটির সভাপতির পদও বিরোধী দলকে দেওয়া হয়নি বলে অভিযোগ করেছেন তারা।
আলোচনার সূত্রপাত করেন রংপুর-১ আসনের জামায়াতে ইসলামীর সংসদ-সদস্য মো. রায়হান সিরাজী। তিনি বলেন, কমিটি পুনর্গঠনের সময় চিফ হুইপ নূরুল ইসলাম মনি বারবার বলেছেন, সদস্যদের কোনো পরিবর্তন হয়নি। অথচ আগে কৃষি মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটিতে থাকা আমাকে পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটিতে রাখা হয়েছে। তিনি আরও বলেন, এখানেও কোনো সদস্যের পরিবর্তন হয়নি, কিন্তু পার্বত্য চট্টগ্রাম মন্ত্রণালয়বিষয়ক এই কমিটিতে আমার নাম ছিল না। কৃষি মন্ত্রণালয়বিষয়ক কমিটিতে আমার নাম ছিল। যদি কোনো সদস্যের নাম পরিবর্তন না হয়, তাহলে আমি তিস্তা পার থেকে কীভাবে পাহাড়ে গেলাম? এটি ‘প্রিন্টিং মিসটেক’ কিনা, তা পরীক্ষা করার অনুরোধ করেন তিনি।
জবাবে চিফ হুইপ নূরুল ইসলাম মনি বলেন,বিষয়টি তিনি পরীক্ষা করবেন। তিনি বলেন,এটা প্রিন্টিং মিসটেক কিনা আমি দেখে জানাব।যদি সংশোধন লাগে,সংশোধন নিয়ে আসব।এরপর বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ নাহিদ ইসলাম বলেন,শুধু পার্বত্য চট্টগ্রাম নয়,মহিলা ও শিশুবিষয়ক এবং যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটিতেও সদস্য পরিবর্তন হয়েছে। তার অভিযোগ,বিরোধী দল আগে থেকে যে তালিকা দিয়েছিল,সেই অনুযায়ী সব সদস্যকে কমিটিতে রাখা হয়নি।
নাহিদ বলেন, ১০ সদস্যের প্রতিটি কমিটিতে বিরোধী দল প্রথমে তিনজন করে সদস্য চেয়েছিল। পরে সরকারি দলের পক্ষ থেকে জানানো হয়, বিরোধী দল মোট সদস্যের ২৬ শতাংশ প্রতিনিধিত্ব পাবে। সে হিসাবে কিছু কমিটিতে তিনজন এবং কিছু কমিটিতে দুজন করে বিরোধী দলের সদস্য রাখার কথা ছিল। কিন্তু তাদের দেওয়া তালিকায় কোনো কমিটিতে তিনজন এবং কোনোটিতে দুজন থাকবেন, সেটিও ঠিকমতো অনুসরণ করা হয়নি। তিনি বলেন, স্থায়ী কমিটিগুলোই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বা অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ। আমরা চাই স্থায়ী কমিটিগুলো কার্যকর হোক। বিরোধী দলের সংসদ-সদস্য হিসাবে আমরা জবাবদিহি নিশ্চিত করতে চাই। কমিটিগুলো ‘ইচ্ছামতো’ গঠন করা হলে বিরোধী দলের পক্ষে তাতে অংশ নেওয়া কঠিন হবে।
বিরোধী দলের অভিযোগের জবাবে চিফ হুইপ নূরুল ইসলাম মনি বলেন,মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত ৩৯টি স্থায়ী কমিটিতে বিরোধী দলের ২৬ শতাংশ প্রতিনিধিত্ব হিসাব করেই সদস্য দেওয়া হয়েছে। তার হিসাবে, ১৯টি কমিটিতে বিরোধী দলের তিনজন করে এবং বাকি কমিটিতে দুজন করে সদস্য থাকার কথা। তিনি বলেন,আমরা ২২টি কমিটিতে বিরোধী দলের তিনজন করে সদস্য রেখেছি।আমি হিসাব করে তাদের ২২টা কমিটিতে তিনজন করে দিয়েছি। এরপরও কোনো ত্রুটি-বিচ্যুতি থাকলে বিরোধী দলের চিফ হুইপ ও অন্য নেতাদের সঙ্গে আলোচনা করে তা সমাধান করা হবে।
জামায়াতের হুইপ রফিকুল ইসলাম খান বলেন,মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত কোনো স্থায়ী কমিটির সভাপতির পদ বিরোধী দলকে দেওয়া হয়নি।বিরোধী দলকে একটা জায়গায়ও মন্ত্রণালয়ের সভাপতি পদ দেওয়া হয়নি।
এদিকে সংসদীয় স্থায়ী কমিটিতে রাষ্ট্রীয় সুবিধাভোগীদের রাখায় উষ্মা প্রকাশ করেন স্পিকার।তিনি বলেন,সংসদীয় গণতন্ত্রের মূল বিষয় হচ্ছে নির্বাহী বিভাগকে আইনসভার কাছে জবাবদিহি করা। স্পিকার বলেন,নির্বাহী বিভাগ তো জবাবদিহি করবে আইনসভার কাছেই। কিন্তু নির্বাহী বিভাগ যদি নিজেই কমিটির সভাপতি হয়, তাহলে কার কাছে জবাবদিহি করবে? ভবিষ্যতে সংসদীয় কমিটি পুনর্গঠনের সময় বিষয়টি বিবেচনায় নিতে চিফ হুইপকে অনুরোধ করেন তিনি। হাফিজ উদ্দিন আহমদ বলেন, এটিকে সংসদীয় গণতন্ত্রের মূল চেতনার আলোকে দেখা উচিত।