নির্বাচন ঠেকাতে ফ্যাসিস্টদের সব অপচেষ্টা ব্যর্থ হবে - Alokitobarta
আজ : শনিবার, ৭ই নভেম্বর, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ২২শে কার্তিক, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

নির্বাচন ঠেকাতে ফ্যাসিস্টদের সব অপচেষ্টা ব্যর্থ হবে


মু.এ বি সিদ্দীক ভুঁইয়া:অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস বলেছেন, গণতান্ত্রিক উত্তরণের (নির্বাচন) পথে এগিয়ে যাচ্ছে দেশ। কেউ ভয় দেখিয়ে, সন্ত্রাস বা রক্ত ঝরিয়ে এই যাত্রা থামাতে পারবে না।পরাজিত ফ্যাসিস্ট শক্তি দেশের পবিত্র মাটিতে আর কোনোদিন ফিরে আসবে না। নির্বাচন হয়ে গেলে বন্ধুরাও তাদের প্রতি সমর্থন জোগাতে বেকায়দায় পড়বে। শেখ হাসিনা ও আসাদুজ্জামান খান কামালকে ফেরত পাঠাতে ভারতকে আনুষ্ঠানিকভাবে অনুরোধ জানানো হয়েছে। আগামী নির্বাচন নিয়ে তিনি বলেন, যারা ভোটের বাক্স ডাকাতি করবে, তারা মানুষের স্বাধীনতা হরণকারী এবং জাতির শত্রু। এ সময়ে গণভোটে অংশ নিয়ে রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ বিনির্মাণে জনগণের প্রতি আহ্বান জানান।নির্বাচন ঠেকাতে পরাজিত শক্তির কঠিনতর পরিকল্পনা ও প্রস্তুতি আছে। এক্ষেত্রে পরিষ্কারভাবে বলছি, পরাজিত শক্তি ফ্যাসিবাদী ও সন্ত্রাসীদের (ফ্যাসিস্ট টেরোরিস্ট) এই অপচেষ্টা সম্পূর্ণভাবে ব্যর্থ করে দেওয়া হবে। বিজয় দিবস উপলক্ষ্যে মঙ্গলবার জাতির উদ্দেশে দেওয়া ভাষণে তিনি এসব কথা বলেন। তার মতে, সাম্প্রতিক সময়ে ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র শরিফ ওসমান হাদির ওপর যে হামলা হয়েছে, তা বাংলাদেশের অস্তিত্বের ওপর আঘাত।

ড. ইউনূস বলেন, পরাজিত শক্তির লক্ষ্য হলো নির্বাচন ঠেকানো। বন্ধুরা যতদিন তাদের সঙ্গে আছে, ততদিন তারা এই স্বপ্ন দেখবে। নির্বাচন হয়ে গেলে বন্ধুরা তাদের প্রতি সমর্থন জোগাতে বেকায়দায় পড়বে। সেজন্যই তো তাদের এত তাড়াহুড়া। তারা নির্বাচনের আগেই তাদের ফিরে আসা নিশ্চিত করতে চায়। চোরাগোপ্তা খুন করার উদ্যোগ তার একটা রূপ। ওসমান হাদির কথা উল্লেখ করে ড. ইউনূস বলেন-অস্ত্রহীন, ভীতিহীন, ব্যক্তিগত স্বার্থ সম্বন্ধে সম্পূর্ণ উদাসীন দৈনন্দিন এই চেহারার ছেলেমেয়েদের নিয়ে ফ্যাসিস্টদের সাংঘাতিক ভীতি। তাদের লক্ষ্য হলো নির্বাচন আসার আগেই এসব বাধা সরিয়ে নিজেদের রাজত্ব আবার কায়েম করা। ড. ইউনূস বলেন, জুলাই অভ্যুত্থানের সম্মুখযোদ্ধা ওসমান হাদির ওপর সম্প্রতি যে হামলা হয়েছে, তা বাংলাদেশের অস্তিত্বের ওপরও আঘাত। গণতান্ত্রিক পথচলার ওপর আঘাত। ওসমান হাদি বর্তমানে সংকটাপন্ন অবস্থায় সিঙ্গাপুরে চিকিৎসাধীন। সরকার এই ঘটনাকে অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে দেখছে। এর সঙ্গে জড়িতদের প্রাথমিকভাবে চিহ্নিত করা গেছে। ‘দেশবাসীকে আশ্বস্ত করতে চাই, যারা এই ষড়যন্ত্রে জড়িত, তারা যেখানেই থাকুক, কাউকেই ছাড় দেওয়া হবে না। যারা অস্থিরতা সৃষ্টি করতে চায়, আমরা অবশ্যই ঐক্যবদ্ধ হয়ে তাদের মোকাবিলা করব। তাদের ফাঁদে পা দেব না। জনগণের উদ্দেশে তিনি বলেন, ‘আপনারা তরুণদের রক্ষা করুন। তাহলে প্রিয় মাতৃভূমি রক্ষা পাবে। যারা দেশ ছেড়ে পালিয়ে গেছে তারা বুঝে গেছে তরুণ যোদ্ধারা তাদের পুনরুত্থানের পক্ষে ভীষণ রকম বাধা। পুরোনো আমলের দাসত্ব মেনে যারা আছে, তাদের দাসত্ব থেকে বের হয়ে আসতে হবে।’

প্রধান উপদেষ্টা বলেন, দায়িত্ব নেওয়ার পর অন্তর্বর্তী সরকার তিনটি বিষয়কে সর্বাধিক গুরুত্ব দিয়েছে। জুলাই-আগস্ট হত্যাকাণ্ডের বিচার, একটি জবাবদিহিমূলক ও কার্যকর গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় উত্তরণের জন্য রাষ্ট্রকাঠামোর প্রয়োজনীয় মৌলিক সংস্কার এবং একটি সুষ্ঠু নির্বাচন। হত্যাকাণ্ডের বিচারকাজ যথাযথ আইনি প্রক্রিয়ায় এগিয়ে চলছে। ট্রাইব্যুনাল ইতোমধ্যে জুলাই হত্যাকাণ্ডের প্রধান নির্দেশদাতা পতিত ফ্যাসিস্ট সরকারের প্রধান শেখ হাসিনাকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছে। এরপর পলাতক শেখ হাসিনা এবং সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খানকে দেশে ফেরাতে আনুষ্ঠানিকভাবে ভারতকে অনুরোধ জানানো হয়েছে। এছাড়া বেশ কিছু সংস্কার হয়েছে। মৌলিক সাংবিধানিক সংস্কার নিশ্চিত করতে একটি আদেশ জারি করা হয়েছে। জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়নে এখন নাগরিকদের অনুমোদন নেওয়ার পালা। আগামী সংসদ নির্বাচনের সময় একই সঙ্গে জুলাই জাতীয় সনদের ওপর গণভোট অনুষ্ঠিত হবে। এই গণভোটে আপনারা হ্যাঁ/না ভোটের মাধ্যমে সংস্কারের পক্ষে বা বিপক্ষে মতামত দিন। আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি সাধারণ নির্বাচন ও গণভোট অনুষ্ঠিত হবে। এই লক্ষ্যে যাবতীয় প্রস্তুতি চূড়ান্ত করা হয়েছে।

ড. ইউনূস বলেন, এবারের নির্বাচন ও গণভোট দেশের ভবিষ্যৎ পথরেখা নির্ধারণে এক ঐতিহাসিক মুহূর্ত। আমরা কোন ধরনের রাষ্ট্র প্রত্যাশা করি তা নির্ভর করবে গণভোটের ফলাফলের ওপর। এই ভোটের মাধ্যমে ঠিক হবে নতুন বাংলাদেশের চরিত্র, কাঠামো ও অগ্রযাত্রার গতিপথ। ফলে এই নির্বাচন হবে সত্যিকার অর্থে উৎসবমুখর, অংশগ্রহণমূলক, শান্তিপূর্ণ এবং সর্বোপরি সুষ্ঠু। নির্বাচনকে ঘিরে নিরাপত্তা, প্রশাসনিক প্রস্তুতি, প্রযুক্তিগত সহায়তা এবং পর্যবেক্ষণের প্রতিটি ধাপকে আমরা অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করছি। একটি বিষয় বারবার মনে করিয়ে দিতে চাই, নতুন বাংলাদেশ গঠনের দায়িত্ব সবার। আপনাদের মূল্যবান ভোটই রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করবে। এই নির্বাচনের গ্রহণযোগ্যতা ও পবিত্রতা রক্ষার জন্য রাজনৈতিক নেতৃত্বের ভূমিকা অপরিসীম। তিনি বলেন, রাজনৈতিক দলের নেতাদের আহ্বান জানাচ্ছি আপনারা একে অপরকে শত্রু নয়, প্রতিযোগী হিসাবে দেখবেন। নির্বাচনের মাঠে এমন একটি সুষ্ঠু, গ্রহণযোগ্য ও শান্তিপূর্ণ পরিবেশ তৈরি করুন, যাতে দেশের মানুষ গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার প্রতি আরও আত্মবিশ্বাসী হয়ে ওঠেন। যারা ভোট বাক্স ডাকাতি করবে তারা দেশের মানুষের স্বাধীনতা হরণকারী। তারা নাগরিকদের দুশমন। তাদের থেকে নাগরিকদের রক্ষা করা আমাদের সবার অবশ্য কর্তব্য। ভোট জনগণের ভবিষ্যৎ রচনার অক্ষর। ভোট বাক্সে ভোট জমা দিতে না পারলে কাঙ্ক্ষিত ভবিষ্যৎ আর রচনা করা যাবে না। দেশকে রক্ষা করুন। ভোট দেশকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার গাড়ির চাকা। এই চাকা কাউকে চুরি করতে দেবেন না। তিনি বলেন, জুলাই সনদ জাতির ভবিষ্যৎ পথযাত্রার একটি ঐতিহাসিক দলিল। এই সনদে আমরা যে সংস্কারমালা প্রস্তাব করেছি রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা, বিশ্বাসযোগ্য নির্বাচন, প্রশাসনিক জবাবদিহিতা, দুর্নীতি হ্রাস, অর্থনৈতিক পুনর্গঠন এবং সমাজে সম-অধিকার প্রতিষ্ঠা এসব বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজন জনগণের সুস্পষ্ট মতামত। কারণ একটি জাতীয় রূপান্তর কখনোই একক নেতৃত্ব বা একটি প্রশাসনের মাধ্যমে টেকসই হয় না; জনগণকেই চূড়ান্ত সম্মতি দিতে হয়।

এই কারণেই আমরা গণভোটের আয়োজন করেছি, যাতে দেশের ভবিষ্যৎ সংস্কারদিশা নির্ধারণে জনগণ সরাসরি সিদ্ধান্ত দিতে পারেন। এই গণভোট হবে বাংলাদেশের ইতিহাসে নতুন মাইলফলক। প্রধান উপদেষ্টা বলেন, বহুদিন ধরে বিচার বিভাগ প্রশাসনের বিভিন্ন কাঠামোগত সীমাবদ্ধতার কারণে তার পূর্ণ সম্ভাবনা অনুযায়ী কাজ করতে পারেনি। তাই অন্তর্বর্তী সরকারের অন্যতম বড় পদক্ষেপ বিচার বিভাগের প্রশাসনিক স্বাধীনতা নিশ্চিত করা। ইতোমধ্যে বিচার বিভাগকে স্বতন্ত্র প্রশাসনিক কাঠামো দিয়ে পৃথক সচিবালয় গঠন করা হয়েছে। এই পদক্ষেপ বাংলাদেশের বিচারব্যবস্থা সংস্কারের ইতিহাসে একটি যুগান্তকারী মাইলফলক। এখন থেকে আর রাজনৈতিক কোনো চাপ বা প্রভাবের মাধ্যমে বিচারিক স্বাধীনতা যাতে ব্যাহত না হয়, সে নিশ্চয়তা আরও জোরদার হবে। প্রধান উপদেষ্টা বলেন, জাতীয় নেত্রী, দেশের তিনবারের সাবেক প্রধানমন্ত্রী, গণতান্ত্রিক রাজনীতির অন্যতম শীর্ষ ব্যক্তিত্ব এবং বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া বর্তমানে অসুস্থ অবস্থায় হাসপাতালে আছেন। বিষয়টি আমাদের সবার জন্যই উদ্বেগের বিষয়। অন্তর্বর্তীকালীন সরকার খালেদা জিয়ার অসুস্থতার বিষয়টি শুরু থেকেই সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে আসছে। খালেদা জিয়া বাংলাদেশের ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ের অবিচ্ছেদ্য অংশ। তিনি বলেন, মুক্তিযুদ্ধে বিজয়ের মধ্য দিয়ে স্বাধীনতার যে নতুন সূর্য উদিত হয়েছিল, বিগত বছরগুলোতে তা স্বৈরাচার ও ফ্যাসিবাদে ম্লান হয়েছে। জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে আমরা আবারও একটি বৈষম্যহীন, দুর্নীতিমুক্ত, স্বাধীন ও সার্বভৌম গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার সুযোগ পেয়েছি। অন্তর্বর্তীকালীন সরকার একটি উন্নত ও সুশাসিত বাংলাদেশের শক্তিশালী ভিত গড়ে তুলতে যে বিস্তৃত সংস্কার কর্মসূচি নিয়েছে। জনগণের সম্মিলিত অংশগ্রহণের মধ্য দিয়ে তা পরিসমাপ্তির পথে এগিয়ে যাচ্ছে।

Top