১২ ফেব্রুয়ারি সংসদ ও গণভোট
মু . এবি সিদ্দীক ভুঁইয়া:জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোটের জন্য ১২ ফেব্রুয়ারি ভোটগ্রহণের দিন নির্ধারণ করে তফসিল ঘোষণা করেছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)।চূড়ান্ত প্রার্থী তালিকা প্রকাশ ও প্রতীক বরাদ্দ ২১ জানুয়ারি। এছাড়া প্রচারণা শুরু হবে ২২ জানুয়ারি। এ নির্বাচনে প্রার্থীরা ২০ দিন প্রচারের সময় পাচ্ছেন। ঘোষিত তারিখে সকাল সাড়ে ৭টা থেকে বিকাল সাড়ে ৪টা পর্যন্ত তিনশ আসনে একযোগে ভোটগ্রহণ হবে। প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) এএমএম নাসির উদ্দিন বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় জাতির উদ্দেশে দেওয়া ভাষণের মধ্য দিয়ে এ তফসিল ঘোষণা করেন। ঘোষিত তফসিল অনুযায়ী রিটার্নিং বা সহকারী রিটার্নিং কর্মকর্তার কাছে সম্ভাব্য প্রার্থীদের মনোনয়নপত্র দাখিলের শেষ তারিখ ২৯ ডিসেম্বর। রিটার্নিং কর্মকর্তা কর্তৃক মনোনয়নপত্র যাচাই-বাছাই ৩০ ডিসেম্বর থেকে ৪ জানুয়ারি। মনোনয়নপত্র বাছাই করে রিটার্নিং কর্মকর্তা যে সিদ্ধান্ত দেবেন, তার বিরুদ্ধে সংক্ষুব্ধরা আপিল করতে পারবেন ৫ থেকে ১১ জানুয়ারি। জমা হওয়া আপিল ১২ থেকে ১৮ জানুয়ারি নিষ্পত্তি করবে ইসি। প্রার্থিতা প্রত্যাহারের শেষ তারিখ ২০ জানুয়ারি।
সিইসি তার ভাষণে একটি ঐতিহাসিক গ্রহণযোগ্য নির্বাচন উপহার দেওয়ার ব্যাপারে দৃঢ় অঙ্গীকার ব্যক্ত করেন। তিনি বলেন, জনগণের প্রতিনিধিত্বশীল মালিকানা প্রতিষ্ঠার একমাত্র পথ হচ্ছে নির্বাচন। দুঃখজনক হলেও সত্য যে, মানসম্মত নির্বাচনের অনুপস্থিতি প্রায়শই আমাদের ঐতিহ্য ও সামষ্টিক প্রত্যাশাকে ম্লান করেছে। এমনই এক প্রেক্ষাপটে ২০২৪-এর গণ-অভ্যুত্থান সংঘটিত হয়েছে। আমাদের ভাই-বোন, সন্তানদের রক্তের ওপর দাঁড়িয়ে আমাদের অঙ্গীকার হচ্ছে-একটি সুষ্ঠু ও সুন্দর নির্বাচন অনুষ্ঠান, যা জাতি হিসাবে আমাদের প্রত্যাশা পূরণ করবে এবং বিশ্ব দরবারে আমাদের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করবে। আমার দৃঢ় বিশ্বাস, আপনারা একই প্রত্যাশা ধারণ করেন এবং একই অঙ্গীকারে অঙ্গীকারবদ্ধ।
তফসিল ঘোষণা করায় ইতোমধ্যে রাজনৈতিক দল ও প্রার্থীর আচরণ বিধিমালা কার্যকর হয়েছে বলে গণ্য হবে। আচরণ বিধিমালা প্রতিপালন দেখভালে প্রতিটি উপজেলা ও থানায় দুজন করে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট নিয়োগ করতে গতকালই জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়কে চিঠি দিয়েছে ইসি। এদিন আচরণ বিধিমালা সংশোধনীর গেজেটও প্রকাশিত হয়েছে।
এবারের নির্বাচনে ৬৯ জন রিটার্নিং কর্মকর্তা দায়িত্ব পালন করবেন। এর মধ্যে ৬৪ জন ডিসি, ঢাকা ও চট্টগ্রাম বিভাগের বিভাগীয় কমিশনার এবং বাকি ৩ জন ইসির নিজস্ব কর্মকর্তা। জাতীয় সংসদ নির্বাচনে এবারই প্রথম রিটার্নিং কর্মকর্তা হিসাবে এই ৩ জন নির্ধারিত চারটি আসনে দায়িত্ব পালন করবেন। আসনগুলো হলো ঢাকা-১৩ ও ১৫, চট্টগ্রাম-১১ ও খুলনা-৩। দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তারা ইসির আঞ্চলিক নির্বাচন কর্মকর্তা।
এদিকে বহুল প্রতীক্ষিত এ নির্বাচনে ৩০০ আসনের সংসদ-সদস্য নির্বাচিত করার সুযোগ পাবেন ১২ কোটি ৭৬ লাখ ৯৫ হাজার ভোটার। এর মধ্যে পুরুষ ভোটার ৬ কোটি ৪৮ লাখ ১৪ হাজার ৯০৭ এবং নারী ভোটার ৬ কোটি ২৮ লাখ ৭৯ হাজার ৪২ জন। প্রবাসীরা পোস্টাল ব্যালটে ভোট দেওয়ার সুযোগ পাচ্ছেন। গতকাল রাত ৮টা পর্যন্ত তিন লাখ ১৪ হাজারের বেশি প্রবাসী বাংলাদেশি পোস্টাল ভোট দিতে নিবন্ধন করেছেন। পাশাপাশি সরকারি কর্মকর্তা, কারা হেফাজতে থাকা ব্যক্তি ও ভোটগ্রহণের দায়িত্ব পালনকারী ব্যক্তিরাও পোস্টাল ব্যালটে ভোট দিতে পারবেন। তাদের নিবন্ধন আজ (শুক্রবার) শুরু হয়ে ২৫ ডিসেম্বর পর্যন্ত চলবে।
এ তফসিল ঘোষণার মধ্য দিয়ে কার্যত নির্বাচনি ট্রেন যাত্রা শুরু করল। এতদিন নির্বাচন নিয়ে বিভিন্ন মহলে নানা রকম উদ্বেগ-উৎকণ্ঠাসহ যেসব কানাঘুষা চলছিল তার অবসান হলো। যদিও বৃহস্পতিবার ফরিদপুর-৪ আসনের সীমানা নিয়ে হাইকোর্ট একটি রায় ঘোষণা করেছেন। এর আগের দিন বুধবার বাগেরহাট ও গাজীপুরের আসন নিয়ে আপিল বিভাগ আরেকটি রায় দিয়েছেন। এই রায়ের পরিপ্রেক্ষিতে নির্বাচন কমিশনের সিনিয়র সচিব আখতার আহমেদ বলেন, সংসদীয় আসনের সীমানা পুনর্নির্ধারণ নিয়ে আদালতের রায় নির্বাচন কমিশনকে (ইসি) প্রশ্নবিদ্ধ করেছে।
ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনের মধ্য দিয়ে দেশে একটি নির্বাচিত সরকার গঠন হতে যাচ্ছে। পাশাপাশি গণভোটের রায়ে নির্ধারিত হতে যাচ্ছে সংবিধানসহ রাষ্ট্রের মৌলিক সংস্কার প্রস্তাবের ভবিষ্যৎ। এর আগে ২০১৪, ২০১৮ ও ২০২৪ সালে অনুষ্ঠিত তিনটি জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অনিয়ম ও কারচুপির ব্যাপক অভিযোগ ছিল। দেশে একটি ফ্যাসিস্ট সরকার গড়ে ওঠার পেছনে কারচুপির ওই তিনটি নির্বাচনকে দায়ী করে আসছেন বেশির ভাগ রাজনৈতিক দলের পাশাপাশি পর্যবেক্ষকরা। তবে ফ্যাসিস্ট সরকারের পতন ঘটিয়ে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার নেতৃত্বে দেশে গণ-অভ্যুত্থান ঘটে। জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পর বাংলাদেশে এই প্রথম কোনো নির্বাচন হতে যাচ্ছে।
নিবন্ধন স্থগিত থাকায় এখন পর্যন্ত এ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ অংশ নিতে পারছে না। বিএনপি, জামায়াত, নতুন দল জাতীয় নাগরিক পার্টি-এনসিপিসহ নিবন্ধিত ৫৫টি রাজনৈতিক দল অংশ নিতে পারবে। ইতোমধ্যে বিএনপি, জামায়াত, এনসিপিসহ কয়েকটি দল তাদের প্রার্থীও ঘোষণা করেছে। এবার নির্বাচনের প্রধান আইন গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ (আরপিও) সংশোধন করা হয়। এতে জোটবদ্ধ হয়ে নির্বাচনে অংশ নিলেও প্রতিটি দলকে নিজের প্রতীকে ভোট করতে হবে। এক রাজনৈতিক দলের নেতা আরেক দলের প্রতীকে ভোট করার সুযোগ থাকছে না।
জাতির উদ্দেশে ভাষণে যা বললেন সিইসি : জাতির উদ্দেশে দেওয়া ভাষণে বিজয় দিবসের প্রাক্কালে সিইসি মহান মুক্তিযুদ্ধের শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানান ও তাদের আত্মার মাগফিরাত কামনা করেন। একই সঙ্গে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে শহীদদের স্মৃতির প্রতিও শ্রদ্ধা জানান। আহতদের দ্রুত আরোগ্য ও স্বাভাবিক জীবনের জন্য প্রার্থনা করেন। নির্বাচন আয়োজনে ভোটার তালিকা হালনাগাদ, রাজনৈতিক দলসহ বিভিন্ন অংশীজনদের সঙ্গে ধারাবাহিক সংলাপ ও আইন সংস্কারের বিভিন্ন দিক তুলে ধরেন। এরপর তিনি এ নির্বাচনের গুরুত্ব তুলে ধরে বলেন, বিভিন্ন কারণে এবারের নির্বাচন আমাদের জাতির ইতিহাসে অনন্য ও গুরুত্বপূর্ণ। প্রথমত, প্রকৃত গণতান্ত্রিক ধারা পুনঃপ্রতিষ্ঠার পাশাপাশি কাক্সিক্ষত সংস্কার প্রশ্নে সিদ্ধান্তের নির্বাচন এটি। এবার জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট একই দিনে অনুষ্ঠিত হবে, যা একটি নতুন অভিজ্ঞতা। দ্বিতীয়ত, সংশ্লিষ্ট সব রাষ্ট্রীয় ও গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানের জন্য এই নির্বাচন হচ্ছে সক্ষমতা প্রমাণ করে ভাবমূর্তি পুনরুদ্ধারের অনন্য সুযোগ। তৃতীয়ত, দীর্ঘ গণতান্ত্রিক আন্দোলন-সংগ্রামের পর দেশের স্বার্থে রাজনৈতিক দলগুলোর মাঝে সৌহার্দপূর্ণ গণতান্ত্রিক প্রতিযোগিতার ধারা প্রবর্তনের দাবি রাখে এই নির্বাচন। চতুর্থত, প্রায় অকার্যকর পোস্টাল ভোট ব্যবস্থাকে পরিমার্জন করে এ নির্বাচনে একটি কার্যকরী রূপ দেওয়া হচ্ছে।
ভোটারদের নির্বিঘ্নে ভোট দিতে আসার আহ্বান জানান সিইসি। তাদের উদ্দেশে তিনি বলেন, ভোট আপনার শুধু নাগরিক অধিকারই নয় বরং পবিত্র আমানত ও দায়িত্ব। এ দায়িত্ব সচেতনভাবে আপনারা পালন করবেন এ আমার বিশ্বাস। যে কোনো ভয়ভীতি, প্রলোভন, প্রবঞ্চনা এবং সীমাবদ্ধতার ঊর্ধ্বে উঠে নিঃসংকোচে আপনাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করুন। তিনি আরও বলেন, নিরাপদ ও উৎসবমুখর অংশগ্রহণ নিশ্চিতকল্পে সংশ্লিষ্ট সব প্রতিষ্ঠান ও বাহিনী কাজ করবে। ধর্ম, গোত্র, গোষ্ঠী, লিঙ্গ নির্বিশেষে সবাই এই আনন্দ আয়োজনে অংশগ্রহণ করুন। পরিবারের প্রতিবন্ধী, বয়স্ক ও সন্তানসম্ভবা মাসহ সবাইকে নিয়ে ভোট দিতে আসুন। আমি আশা করি, আপনাদের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণের মাধ্যমে ভোটের অনুষ্ঠান উৎসবে রূপ নেবে।
রাজনৈতিক দলগুলোর উদ্দেশে সিইসি বলেন, আসুন আমরা আচরণবিধি মেনে একটি শান্তিপূর্ণ ও উৎসবমুখর নির্বাচন নিশ্চিত করি। শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান এবং পারস্পরিক শ্রদ্ধা নিশ্চিত করে ভোটারদের বিশ্বাস ও আস্থা অর্জনই হোক আপনাদের লক্ষ্য। এ সময় তিনি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিভিন্ন বিভ্রান্তিমূলক তথ্য ছড়ানো থেকে সবাইকে সতর্ক করেন।
নির্বাচনে দায়িত্ব পালনকারীদের সতর্কতার সঙ্গে কাজ করার নির্দেশ দেন সিইসি। তাদের উদ্দেশে তিনি বলেন, নির্বাচন কমিশন স্বচ্ছতা, নিরপেক্ষতা এবং দৃঢ়তার সঙ্গে দায়িত্ব পালনে বদ্ধপরিকর। কমিশনের অংশ হিসাবে আপনারা নির্ভয়ে সততা ও নিরপেক্ষতার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করবেন। মনে রাখবেন, এ ব্যাপারে কোনো শিথিলতা বা গাফিলতি সহ্য করা হবে না।
৪৮ ঘণ্টার মধ্যে প্রচারসামগ্রী অপসারণ : তফসিল ঘোষণার পর সারা দেশে যেসব প্রচারসামগ্রী রয়েছে তা অপসারণ করতে স্থানীয় সরকার বিভাগকে চিঠি দিয়েছে ইসি। বুধবার পাঠানো ওই চিঠিতে বলা হয়েছে, তফসিল ঘোষণার পর সম্ভাব্য প্রার্থীদের পোস্টার, ব্যানার, দেওয়াল লিখন, বিলবোর্ড, গেট, তোরণ, ঘের, প্যান্ডেল, আলোকসজ্জা এবং সব ধরনের নির্বাচনি ক্যাম্প ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে নিজ দায়িত্বে অপসারণ করতে হবে। এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে সিটি করপোরেশন, পৌরসভা ও ইউনিয়ন পরিষদসহ স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোকে নির্দেশনা দিতে বলা হয়েছে।
প্রতি উপজেলায় দুজন ম্যাজিস্ট্রেট : আচরণবিধি প্রতিপালন দেখভালে দেশের প্রতিটি উপজেলা বা থানায় দুজন করে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট নিয়োগ দিতে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়কে চিঠি দিয়েছে ইসি। বৃহস্পতিবার পাঠানো চিঠিতে আচরণবিধি কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন ও ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনার জন্য এসব ম্যাজিস্ট্রেট নিয়োগের জন্য বলা হয়।
সীমানা নিয়ে আদালতের রায় ইসিকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে-সচিব : সংসদীয় আসনের সীমানা পুনর্নির্ধারণ নিয়ে আদালতের রায়ের বিষয়ে এক প্রশ্নের জবাবে ইসি সচিব আখতার আহমেদ বলেন, আদালতের রায় আমাদের প্রশ্নবিদ্ধ করে। বৃহস্পতিবার দুপুরে হঠাৎ করে সংবাদ সম্মেলনে এসে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি এ মন্তব্য করেন।
সীমানা নিয়ে কোনো আদালতে চ্যালেঞ্জ করা যাবে না-আইনে এমন বিধান থাকার বিষয়ে ইসি সচিব বলেন, আদালতে মামলা করা যায় না, এটা নিয়ে বলার এখতিয়ার বোধহয় আমার নেই। আদালত যদি কগনিজেন্সি নিয়ে থেকে থাকেন, আদালতে নিশ্চয় বলা হচ্ছে। তারপরও যদি আদালত বিবেচনায় না নেন …। এতে ইসির ক্ষমতা প্রশ্নবিদ্ধ হচ্ছে।
রাজনৈতিক দলগুলো নির্বাচনের পরিবেশ নিয়ে শঙ্কা প্রকাশ করছে, তফসিলের পর লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড কতটুকু হবে-এমন প্রশ্নে ইসি সচিব আখতার আহমেদ বলেন, ইসি আশা করে নিশ্চয়ই বাস্তবায়িত হবে। এইটুকুই আমি বলতে পারি। কেউ যদি না মানেন তাহলে তার জন্য আইনগতভাবে যে ব্যবস্থা নেওয়ার বিধান রয়েছে সেটা নেওয়া হবে। এ সময় তিনি জানান, আদালতের রায় অনুযায়ী গাজীপুরের একটি আসন কমিয়ে এবং বাগেরহাটের একটি আসন বাড়িয়ে গেজেট করা হয়েছে।