সাংবাদিকদের ওপর হামলা ও হয়রানির ঘটনায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ-সাংবাদিক সুরক্ষা পরিষদ - Alokitobarta
আজ : শুক্রবার, ৬ই নভেম্বর, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ২১শে কার্তিক, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সর্বশেষ সংবাদঃ
সাংবাদিকদের ওপর হামলা ও হয়রানির ঘটনায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ-সাংবাদিক সুরক্ষা পরিষদ পোস্তগোলা ব্রিজের নিচে বালুর বস্তা রেখে ব্যবসার অভিযোগ, নীরব বিআইডব্লিউটিএ! ঔষধ প্রশাসনের মহাপরিচালক জনাব আলমগীর হোসেন কে জড়িয়ে মিথ্যা তথ্য ছড়িয়েছে তার প্রতিবাদ জানিয়েছে বা... মেহেন্দিগঞ্জের পর এবার বাকেরগঞ্জে জামায়াতকর্মী সাজিয়ে ইসলামী আন্দোলনে যোগদানের নাটক বিচার শেষ হবে কবে ? মাদকের ৯৫ শতাংশ মামলা ঝুলে আছে কোন দলের প্রস্তুতি কেমন,ইউপি নির্বাচনের প্রথম ধাপ শুরু ২১ জানুয়ারি ভারত থেকে আনা চালে ক্যানসারের বিষাক্ত উপাদান, বিতরণ স্থগিত বিরোধী দল সংলাপে এলে জুলাই সনদ নিয়ে নমনীয় হতে পারে সরকার জামায়াত জোটের ঢাকা-খুলনা কুষ্টিয়া লংমার্চ আজ স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও জ্বালানিমন্ত্রী ব্যর্থ, পদত্যাগ দাবি করলেন নাহিদ

সাংবাদিকদের ওপর হামলা ও হয়রানির ঘটনায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ-সাংবাদিক সুরক্ষা পরিষদ


নিজস্ব প্রতিবেদক:বর্তমান সময়ে সাংবাদিকদের পেশাগত দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে শারীরিক ও মানসিক নিরাপত্তা থেকে শুরু করে আইনি ও ডিজিটাল নানা ধরনের তীব্র ঝুঁকির মুখে পড়তে হচ্ছে।সাংবাদিক সুরক্ষা পরিষদ সাংবাদিকদের ওপর হামলা ও হয়রানির ঘটনায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে।

গত ৪ নভেম্বর ২০২৬ তারিখে ঢাকার সাভারের হেমায়েতপুরের পদ্মার মোড়ে পোশাক শ্রমিকদের আন্দোলন ও পুলিশের সাথে সংঘর্ষের সংবাদ সংগ্রহ করতে গিয়ে তিনজন সাংবাদিক শারীরিক হামলার শিকার হন।

আক্রান্ত সাংবাদিকরা হলেন:
• আহমদ সোহান সিরাজী (স্টার নিউজ ডিস্ট্রিক্ট করেসপন্ডেন্ট)
• রায়ান বিন আমিন (একাত্তর টিভির সাভার প্রতিনিধি)
• মোহাম্মদ উজ্জ্বল হোসেন (একাত্তর টিভির ক্যামেরা পারসন)

ঘটনার বিবরণ:
• সকালে শ্রমিক ও পুলিশের মধ্যে সংঘর্ষের সংবাদ পেয়ে তারা ঘটনাস্থলে যান এবং কিছু শ্রমিকের বক্তব্য নেন।
• পরে ফুটেজ নেওয়ার সময় আন্দোলনকারীদের মধ্য থেকে একদল মুখোশধারী ব্যক্তি তাদের ওপর লাঠিসোটা ও ইট নিয়ে হামলা চালায়।
• স্থানীয় কয়েকজন মানুষের হস্তক্ষেপে তারা রক্ষা পান। সাভার মডেল থানার পুলিশ এ বিষয়ে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে জানিয়েছে।

সাংবাদিক সুরক্ষা পরিষদের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৬ সালের প্রথম নয় মাসে (জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত) বাংলাদেশে মোট ২৮৮টি হামলার ঘটনা ঘটে। এসব হামলায় মোট ৫১৮ জন সাংবাদিক assaulted (আক্রান্ত) বা হয়রানির শিকার হন এবং ২৯৭ জন সাংবাদিক শারীরিক আঘাত বা হামলার শিকার হন।

এছাড়াও আলাদা মাসিক প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী:

• অক্টোবর মাসে শুধু শারীরিক হামলা ও আঘাতের শিকার হয়েছেন ১৮ জন সাংবাদিক (যাদের মধ্যে একজন প্রাণ হারিয়েছেন)।

• সংস্থাটির তথ্য অনুযায়ী বছরের প্রথম নয় মাস পর্যন্ত মোট ২৯৭ জন সাংবাদিক শারীরিক আঘাতের শিকার হয়েছেন।

গত অক্টোবর মাসে বাংলাদেশে অন্তত ২৮ জন সাংবাদিক বিভিন্ন ধরনের নিপীড়নের শিকার হয়েছেন। তাঁদের মধ্যে একজন হত্যার শিকার হয়েছেন। শারীরিক হামলা ও আঘাতের শিকার হয়েছেন ১৮ জন। এ ছাড়া আইনি হয়রানি ও হুমকির শিকার হয়েছেন ৯ জন।

সাংবাদিকদের অধিকার নিয়ে কাজ করা সংগঠন সাংবাদিক সুরক্ষা পরিষদ(জেপিসি)দের অক্টোবর মাসের প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে। সোমবার সংগঠনটি একটি সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ প্রতিবেদন প্রকাশ করে।

প্রতিবেদনে বলা হয়, সদ্য বিদায়ী অক্টোবর মাসে দেশের সাংবাদিকদের কর্মপরিবেশ ছিল অত্যন্ত উদ্বেগজনক ও ঝুঁকিপূর্ণ। পেশাগত দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে দেশের বিভিন্ন স্থানে সাংবাদিকেরা শারীরিক হামলা, গ্রেপ্তার, আইনি হয়রানি, হত্যা ও প্রাণনাশের হুমকির শিকার হয়েছেন। দেশের বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত সংবাদ এবং সংগঠনের নিজস্ব সূত্র থেকে এসব তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছে।

প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, নেত্রকোনার দুর্গাপুর উপজেলার তেলনজিয়া গ্রামে একটি চায়ের দোকানে অবস্থানকালে মোটরসাইকেলে আসা দুই অজ্ঞাতপরিচয় বন্দুকধারীর হামলায় সাংবাদিক লুৎফুজ্জামান আলিফ ফকির নিহত হন। সহকর্মীদের দাবি, বিভিন্ন সামাজিক ও রাজনৈতিক অনিয়ম-দুর্নীতি নিয়ে অনুসন্ধানী লেখালেখির কারণে তাঁকে খুব কাছ থেকে গুলি করে হত্যা করা হয়।

১৮ সাংবাদিকের ওপর শারীরিক হামলা:

প্রতিবেদনে বলা হয়, অক্টোবর মাসে রাজনৈতিক নেতা–কর্মী ও সন্ত্রাসীদের হাতে অন্তত ১৮ জন সাংবাদিক আহত হয়েছেন। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য ঘটনা ঘটেছে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে। সেখানে বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রদলের নেতা-কর্মীদের হামলায় চার সাংবাদিক আহত হন।

অভিযোগ অনুযায়ী, ছাত্রদল নেতার নেতৃত্বে রামদা,চাপাতি, হকিস্টিক ও ব্যাট হাতে মিছিল থেকে আসা নেতা-কর্মীরা অস্ত্রের ভিডিও ধারণ করতে যাওয়া সাংবাদিকদের মারধর করেন।এতে একজন সাংবাদিকের মাথা ফেটে যায়।এ সময় আহত সাংবাদিকদের উদ্ধারে এগিয়ে আসা অন্য সাংবাদিকদেরও হত্যার হুমকি দেওয়া হয়।

এ ছাড়া গাজীপুরের টঙ্গীতে এক সাংবাদিককে অপহরণের অভিযোগ ওঠে। ওই সাংবাদিকের দাবি, মোটরসাইকেলে আসা ৪০ থেকে ৫০ জন ব্যক্তি তাঁর চোখ-মুখ বেঁধে তুলে নিয়ে যান। পরে দেশীয় অস্ত্র দিয়ে মারধর করে এক কোটি টাকা চাঁদা দাবি করেন। এক নারীর সঙ্গে জোরপূর্বক বিয়ে দিয়ে নগ্ন ভিডিও ধারণ করা হয় বলেও অভিযোগ করেন তিনি। মাজার বস্তির মাদকের সংবাদ প্রকাশ করলে ওই ভিডিও ছড়িয়ে দেওয়ার হুমকি দেওয়া হয়। একপর্যায়ে জ্ঞান হারালে তাঁকে ফেলে যাওয়া হয়।

আইনি হয়রানি ও হুমকির শিকার ৯ সাংবাদিক:

প্রতিবেদনে বলা হয়, অক্টোবর মাসে অন্তত ৯ জন সাংবাদিক আইনি হয়রানি ও হুমকির শিকার হয়েছেন।এর মধ্যে ঝিনাইদহ কলেজের অনিয়মের সংবাদ সংগ্রহ করতে গিয়ে দুই সাংবাদিক হামলার শিকার হন।সাংবাদিকদের অভিযোগ,কলেজের ইট বিক্রির অনিয়ম আড়াল করতে অধ্যক্ষের মদদে বহিরাগত ব্যক্তিরা তাঁদের রড দিয়ে পেটান।পরে মিথ্যা মামলায় তাঁদের কারাগারে পাঠানো হয়।পরিবারের দাবি, ডিবি পুলিশের মাদক-সংশ্লিষ্টতার সংবাদ প্রকাশের জেরে পরিকল্পিতভাবে তাঁদের ফাঁসানো হয়েছে।

এ ছাড়া মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গল উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের এক চিকিৎসক সিলেট সাইবার নিরাপত্তা আদালতে দুই সাংবাদিকের বিরুদ্ধে সাইবার সুরক্ষা আইনে মামলা করেছেন।

প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজের মর্গে মৃত নারীদের সঙ্গে বিকৃত যৌনাচারের অভিযোগ নিয়ে অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশ করায় এক সাংবাদিক প্রাণনাশের হুমকি পেয়েছেন।ওই সাংবাদিকের করা জিডিতে মর্গের সাবেক এক সহকারীকে হুমকিদাতা হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।অভিযোগ অনুযায়ী,তিনি ফোন করে ভয় দেখান এবং ‘কোর্টে দেখে নেওয়ার’ বার্তা পাঠান।

সাংবাদিকদের ওপর হামলা ও আইনি হয়রানির এসব ঘটনাকে মুক্ত গণমাধ্যমের জন্য অশনিসংকেত বলে মনে করে সাংবাদিক সুরক্ষা পরিষদ(জেপিসি)।সংগঠনটির মতে, রাজনৈতিক ক্ষমতার প্রভাব খাটিয়ে কিংবা পেশিশক্তি ব্যবহার করে সাংবাদিকদের কণ্ঠরোধের চেষ্টা গণতান্ত্রিক পরিবেশকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে।

সাংবাদিক সুরক্ষা পরিষদের কেন্দ্রীয় সভাপতি মোহাম্মাদ আবুবকর সিদ্দীক ভূইঁয়া অবিলম্বে প্রতিটি ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত,দায়ী ব্যক্তিদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি এবং সাংবাদিকদের পেশাগত নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছে।

সাংবাদিকদের মুখোমুখি হওয়া প্রধান ও চলমান নিরাপত্তা ঝুঁকিগুলো নিচে তুলে ধরা হলো:

১. শারীরিক আক্রমণ ও সহিংসতা

• ভৌত হামলা: দুর্নীতি, অনিয়ম, পরিবেশদূষণ বা ক্ষমতার অপব্যবহারের সংবাদ প্রকাশ বা সংগ্রহ করতে গিয়ে সাংবাদিকরা নানা স্থানে হামলা ও মারধরের শিকার হচ্ছেন।

• প্রতিবাদস্থলে ঝুঁকি: রাজনৈতিক কর্মসূচি, আন্দোলন বা সংঘাতপূর্ণ পরিস্থিতিতে সংবাদ সংগ্রহ করতে গেলে নিরাপত্তা বাহিনী কিংবা বিক্ষোভকারী উভয় পক্ষ থেকেই অনেক সময় সাংবাদিকরা আক্রান্ত হন।

২. আইনি ও বিচারিক হয়রানি (Lawfare)

• আইনের অপব্যবহার: মানহানি বা সাইবার সুরক্ষা আইনসহ বিভিন্ন নিবর্তনমূলক আইন ব্যবহার করে সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে মামলা, হয়রানি ও গ্রেপতারের প্রবণতা দেখা যায়।

• বিচারহীনতা: অতীতে সাংবাদিকদের ওপর হওয়া বেশিরভাগ হামলার বিচার বা দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি না হওয়ায় অপরাধীরা আরও উৎসাহিত হচ্ছে।

৩. ডিজিটাল ও অনলাইন ঝুঁকি

• সাইবার আক্রমণ: স্পাইওয়্যার ব্যবহার করে নজরদারি, হ্যাকিং এবং যোগাযোগ মাধ্যম পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে।

• অনলাইন হেনস্থা: সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ট্রোলিং, সাইবার বুলিং, কুরুচিপূর্ণ মন্তব্য এবং বিশেষ করে নারী সাংবাদিকদের ক্ষেত্রে লিঙ্গভিত্তিক সহিংসতা ও অনলাইন হুমকি উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে।

৪. পেশাগত ও আর্থ-সামাজিক অনিশ্চয়তা

• ন্যায়সংগত পরিবেশের অভাব: অনেক সংবাদকর্মী বিশেষ করে মফস্বল বা জেলা-উপজেলায় পর্যাপ্ত প্রাতিষ্ঠানিক সুরক্ষা, বিমা ও ন্যায্য কর্মপরিবেশ ছাড়াই কাজ করতে বাধ্য হন।

• আত্মনিয়ন্ত্রণ (Self-censorship): লাগাতার হুমকি, নিরাপত্তা হীনতা ও আইনি চাপের কারণে অনেক সময় সত্য প্রকাশে সাংবাদিকদের মাঝে এক ধরণের আত্মনিয়ন্ত্রণ বা ভয় কাজ করে, যা স্বাধীন সাংবাদিকতাকে বাধাগ্রস্ত করে।

Top