দুর্নীতিবাজদের দমনে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারছে না দুদক - Alokitobarta
আজ : রবিবার, ১৪ই এপ্রিল, ২০২৪ খ্রিস্টাব্দ | ১লা বৈশাখ, ১৪৩১ বঙ্গাব্দ

দুর্নীতিবাজদের দমনে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারছে না দুদক


মোহাম্মাদ আবুবকর সিদ্দীক ভুঁইয়া : দেশ ও মানুষকে চেপে ধরেছে দুর্নীতির দুষ্টচক্র-দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) জমা অভিযোগের পাহাড় এমন ইঙ্গিত করে।দুর্নীতিবাজদের দমনে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারছে না দুদক। গেল বছর সংস্থাটিতে দুর্নীতির অভিযোগ জমা পড়েছে ১৫ হাজার ৪৩৭টি। এরমধ্যে শতকরা প্রায় ৯৫ ভাগই অনুসন্ধানের জন্য আমলে নেয়নি যাচাই-বাছাই কমিটি। জমা অভিযোগের মাত্র সাড়ে ৫ ভাগ অনুসন্ধানের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। অনুসন্ধান শেষে মামলা করা হয়েছে ৪০৪টি।এই পরিসংখ্যানই স্পষ্ট করে তুলছে-দুর্নীতি দমনে সরকার জিরো টলারেন্স (শূন্য সহিষ্ণুতা) নীতির কথা বললেও তা কার্যকর হচ্ছে না। সংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্য-পরিসংখ্যান বিশ্লেষণে এ চিত্র পাওয়া গেছে।জানতে চাইলে দুদক কমিশনার (তদন্ত) জহুরুল হক বলেন,সংবিধিবদ্ধ সংস্থা হিসাবে দুদক দুর্নীতি প্রতিরোধে কাজ করে যাচ্ছে। প্রতিদিন নানা সোর্স থেকে দুদক কার্যালয়ে অভিযোগ জমা পড়ে।সেগুলো নিয়ম অনুযায়ী যথাযথ প্রক্রিয়ায় পর্যবেক্ষণ, যাচাই-বাছাই শেষে কমিশনের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হয়। তবে জমা অনেক অভিযোগ তফশিলভুক্ত না থাকায় অনুসন্ধানের জন্য আমলে নেওয়া যায় না।’

বিশ্বব্যাপী দুর্নীতি নিয়ে কাজ করা প্রতিষ্ঠান ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনালের (টিআই) সবশেষ প্রকাশিত ধারণা সূচকেও দুর্নীতিগ্রস্ত দেশের তালিকায় বাংলাদেশের অবস্থানের অবনতি হয়েছে। ২০২২ সালে বাংলাদেশের অবস্থান ১৩তম হলেও ২০২৩ সালে দশম অবস্থানে জায়গা করে নিয়েছে বাংলাদেশ।টিআইর তথ্য অনুযায়ী, যেসব দেশে গণতন্ত্র নেই এবং যেসব দেশে কর্তৃত্ববাদী শাসন রয়েছে সেসব দেশের চেয়েও বাংলাদেশে দুর্নীতির মাত্রা বেশি।বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, সরকারের উচিত দুর্নীতিবাজদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া। এটা সম্ভব হলেই দুর্নীতির মাধ্যমে হাতিয়ে নেওয়া অর্থ পাচার বন্ধ হবে। তাতে দেশের অর্থনীতির চাকা ঘুরবে দ্রুত।ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, ‘দুদকের প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতার চেয়ে অভিযোগ জমা পড়ে বেশি। আবার অনেক অভিযোগ জমা পড়ে যেগুলো দুদকের এখতিয়ারভুক্ত নয় এটা সত্য।কিন্তু কোন বিবেচনায়, কোন মাপকাঠিতে প্রাপ্ত অভিযোগের বিষয়ে তিন ক্যাটাগরিতে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে সেগুলো ওয়েবসাইটে প্রকাশ করে দিলে কোনো প্রশ্ন থাকবে না। সবার কাছে তা গ্রহণযোগ্য হবে।

অভিযোগকারীরা প্রতিকার না পেলে কিংবা কেন তার অভিযোগ আমলে নেওয়া হলো না তা জানতে না পারলে দুদকের কাজের স্বচ্ছতা সম্পর্কে মানুষের ধারণা নষ্ট হবে। আর যেসব অভিযোগ তদন্তের জন্য মন্ত্রণালয়, দপ্তর-অধিদপ্তরে পাঠানো হয় সেগুলো সম্পর্কে দুদকের গুরুত্ব সহকারে ফলোআপ করা উচিত। সংশ্লিষ্টরা জানান, দেশে দুর্নীতি দমনে কাজ করা একমাত্র আইনি প্রতিষ্ঠান দুদক। দুর্নীতির প্রতিকার চেয়ে বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ এই সংস্থার দ্বারস্থ হয়। ফলে এই প্রতিষ্ঠানের পরিসংখ্যানে দেশের দুর্নীতির একটি ধারণাচিত্র পাওয়া যায়।দুদক থেকে প্রাপ্ত পরিসংখ্যানে জানা গেছে, গেল বছর (২০২৩ সালে) দুর্নীতি দমন কমিশনে মোট অভিযোগ জমা পড়ে ১৫ হাজার ৪৩৭টি। এরমধ্য থেকে অনুসন্ধানের জন্য আমলে নেওয়া হয় ৮৪৫টি। আর প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ ও তদন্তপূর্বক প্রতিবেদন প্রেরণের জন্য বিভিন্ন মন্ত্রণালয়, দপ্তর, অধিদপ্তরে পাঠানো হয়েছে ৯১৩টি অভিযোগের নথি। বাকি ১৩ হাজার ৬৭৯টি অভিযোগ নথিভুক্ত করা হয়েছে।এ হিসাবে শতকরা ৯৫ দশমিক ৪৮ ভাগ অভিযোগ আমলে নেওয়া হয়নি। অনুসন্ধান শেষে মামলা করা হয়েছে মাত্র ৪০৪টি। মামলায় সাজার হার শতকরা ৬৭ দশমিক ১৩ ভাগ। উল্লিখিত কাজ করতে বর্তমানে দুদকে জনবল আছে ২ হাজার ৯৮ জন।

জানা গেছে, ২০২২ সালে দুদকে অভিযোগ জমা পড়েছিল ১৯ হাজার ৩৩৮টি। এরমধ্যে থেকে মাত্র ৯০১টি অনুসন্ধানের সিদ্ধান্ত হয়। নথিভুক্ত করা হয়েছে ১৫ হাজার ২৮৫টি। প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ ও তদন্তপূর্বক প্রতিবেদন প্রেরণের জন্য বিভিন্ন মন্ত্রণালয়, দপ্তর, অধিদপ্তরে পাঠানো হয়েছে ৩ হাজার ১৫২টি অভিযোগের নথি। এ হিসাবে শতকরা ৯৬ ভাগই অনুসন্ধানের জন্য আমলে নেয়নি দুদক। ২০২২ সালে দুদকে জনবল ছিল ১ হাজার ১৭৪ জন।দুদকের অভিযোগ পর্যবেক্ষণ, যাচাই-বাছাই, অনুসন্ধান ও তদন্তসংশ্লিষ্ট একাধিক কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, যেসব মানুষ অভিযোগ জমা দেন তারা সংস্থাটির তফশিলভুক্ত অপরাধের বিষয়ে সচেতন নন।অনেকে অভিযোগ লেখার ক্ষেত্রেও ভুল করেন। অনেক অভিযোগের কোনো ভিত্তি থাকে না।আবার অনেকেই তফশিলভুক্ত অপরাধের বিষয়ে জানালেও শুধু অভিযোগ লেখার ধরন ঠিক না হওয়ার কারণে তা আমলে নেওয়া যায় না। কমিশন আইনে তফশিলভুক্ত অপরাধের মধ্যে রয়েছে, সরকারি দায়িত্ব পালনকালে সরকারি কর্মচারী, ব্যাংকারসহ দায়িত্বপ্রাপ্ত যে কোনো ব্যক্তির উৎকোচ (ঘুস), উপঢৌকন নেওয়া।

এছাড়া সরকারি কর্মচারীদের নামে-বেনামে অবৈধভাবে সম্পদ অর্জন, সরকারি অর্থ-সম্পদ আত্মসাৎ ও ক্ষতিসাধন, সরকারি কর্মচারীর উপযুক্ত কর্তৃপক্ষের অনুমতি ব্যতিরেকে ব্যবসা-বাণিজ্য পরিচালনা করা।কোনো অপরাধীকে শাস্তি থেকে রক্ষার চেষ্টা, কোনো ব্যক্তির ক্ষতিসাধনকল্পে সরকারি কর্মচারী কর্তৃক আইন অমান্য করা, মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ আইন-২০১২ এর অধীন সংঘটিত অপরাধগুলো এবং সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী কর্তৃক জাল-জালিয়াতি এবং প্রতারণাও এর অন্তর্ভুক্ত।এসব অপরাধের বিষয়ে কমিশনের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজ, ই-মেইল, হটলাইন-১০৬ এ টোল ফ্রি টেলিফোনের মাধ্যমে যে কেউ অভিযোগ করতে পারেন।লিখিতভাবে কমিশনের চেয়ারম্যান ও কমিশনার বরাবর দুদক প্রধান কার্যালয়-১ ঢাকার ঠিকানায় অভিযোগ করা যায়। আট বিভাগীয় কার্যালয়ের পরিচালক বরাবর সংশ্লিষ্ট বিভাগের অধীন সংঘটিত অপরাধের অভিযোগ জমা দেওয়ার সুযোগ আছে।এছাড়া কমিশনের সমন্বিত জেলা কার্যালয়ের উপপরিচালক বরাবর সংশ্লিষ্ট সমন্বিত জেলা কার্যালয়ের অধীন সংঘটিত অপরাধের অভিযোগ জমা নেওয়া হয়।তবে কেউ কেউ বলেছেন, দুদকের অভিযোগ অনুসন্ধানের ক্ষেত্রে রাজনৈতিক ও আমলাতান্ত্রিক বিবেচনা বেশি প্রাধান্য পায়। দুর্নীতি অনুসন্ধানের ক্ষেত্রে দুদককে রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসাবেও ব্যবহারের অভিযোগ আছে। সংস্থাটি বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার তুলনামূলক কম ক্ষমতাশালীদের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ অনুসন্ধানের ক্ষেত্রে যতটা সরব, ততটাই নীরব প্রভাবশালীদের ব্যাপারে।

বিশেষ করে মন্ত্রী, এমপি ও আওয়ামী লীগের অসৎ নেতাদের বিরুদ্ধে দুর্নীতি, অর্থ পাচার ও বিদেশে বাড়ি-গাড়ি করার সচিত্র প্রতিবেদন বিভিন্ন সময়ে গণমাধ্যমে প্রচার-প্রকাশ হলেও দুদক এদের ব্যাপারে অনুসন্ধানে তেমন আগ্রহী নয়।
এছাড়া আমলাদের বিরুদ্ধেও অসংখ্য অভিযোগ জমা পড়ে। সংশ্লিষ্টরা জানান, এসব অভিযোগের বেশিরভাগই পরিকল্পিতভাবে আমলে নেওয়া হয় না।যেগুলো আমলে নেওয়া হয় সেগুলোরও বেশিরভাগ অনুসন্ধান পর্যায়েই নথিভুক্ত হয়। রেহাই পেয়ে যান দুর্নীতিবাজরা।এ ব্যাপারে সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদার বলেন, ‘সরকারের সঙ্গে ক্ষমতাধরদের দুর্নীতির অভিযোগ অনুসন্ধানে দুদকের আগ্রহ খুবই সীমিত। স্বাধীন প্রতিষ্ঠান হিসাবে দুদকের যে ভূমিকা রাখার কথা সেখানে কর্মরতদের নতজানু মানসিকতার কারণে সে ভূমিকা রাখতে পারছে না। এখানে ক্ষমতাসীনদের প্রভাবের চেয়ে দুদকের ঊর্ধ্বতনরাই নিজেদের ওপর নিয়ন্ত্রণ আরোপ করে বসে আছেন।

Top
%d bloggers like this: