বিশেষজ্ঞদের পরামর্শে তৈরি হচ্ছে প্রস্তাব
মোহাম্মাদ আবুবকর সিদ্দীক ভুঁইয়া :চলমান জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় জাতীয় সংসদে ১০ সদস্যের একটি বিশেষ কমিটি গঠন করা হয়েছে। রোববার গঠিত এই কমিটিকে পরবর্তী ৩০ দিনের মধ্যে করণীয় নির্ধারণ করে সুপারিশসহ প্রতিবেদন দিতে বলা হয়েছে।সংসদ সচিবালয় সূত্র জানিয়েছে, কার্যপ্রণালিবিধির ২৬৬ বিধি অনুসারে গঠিত বিশেষ কমিটির প্রথম বৈঠক আজ বেলা ১টায় ১নং স্থায়ী কমিটি কক্ষে অনুষ্ঠিত হবে। বৈঠকে জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় বিশেষজ্ঞদের মতামত সংবলিত একটি প্রস্তাবনা তুলে ধরবে জামায়াতে ইসলামী। এর আগে দলটির নির্বাহী পরিষদে আলোচনার পাশাপাশি ১১ দলীয় জোটেও এ বিষয়ে আলোচনা হবে। রোববার জাতীয় সংসদে চিফ হুইপ নূরুল ইসলামের প্রস্তাব অনুসারে স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ কমিটি গঠনের প্রস্তাবটি সংসদে অনুমোদন দেন।
সূত্র জানায়, বৈঠকে বিরোধী দলের পক্ষ থেকে জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় সরকারের বিরুদ্ধে অব্যবস্থাপনার অভিযোগসহ মজুতদারি, কালোবাজারি এবং সিন্ডিকেটের চিত্র তুলে ধরে এর অবসানে প্রয়োজনীয় সুপারিশ করা হবে। সেই সঙ্গে তারা ইরানের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক বৃদ্ধি এবং বিকল্প উৎস থেকে জ্বালানি সংগ্রহের পরামর্শ দিতে পারে। সংসদ কার্যপ্রণালিবিধির ২৬৬ বিধি অনুযায়ী রোববার চিফ হুইপ বিশেষ কমিটির সদস্যদের নাম প্রস্তাব করেন। এরপর সরকারি ও বিরোধী দলের ৫ জন করে সদস্যের সমন্বয়ে একটি ১০ সদস্যের কমিটি গঠন করা হয়। কমিটির সভাপতি সিরাজগঞ্জ-২ আসনের সদস্য এবং বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ। অন্য সদস্যরা হলেন যশোর-৩ আসনের সংসদ-সদস্য এবং বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত, লক্ষ্মীপুর-৪ আসনের সংসদ-সদস্য হুইপ এবিএম আশরাফ উদ্দিন নিজান, শরীয়তপুর-৩ আসনের সংসদ-সদস্য হুইপ মিয়া নুরুদ্দিন আহাম্মেদ অপু, মানিকগঞ্জ-২ আসনের মঈনুল ইসলাম খান, ঢাকা-১২ আসনের মো. সাইফুল আলম, চাঁপাইনবাবগঞ্জ-৩ আসনের মো. নুরুল ইসলাম, ঢাকা-১৬ আসনের মো. আব্দুল বাতেন, কুমিল্লা-৪ আসনের মো. আবুল হাসনাত এবং সিলেট-৫ আসনের সংসদ-সদস্য মোহাম্মদ আবুল হাসান।
বৈশ্বিক কারণে সৃষ্ট জ্বালানির মতো জাতীয় একটি সংকট সমাধানে সরকারি ও বিরোধী দলের সমানসংখ্যক সদস্য নিয়ে এ ধরনের কমিটি গঠন এবারই প্রথম। ২৩ এপ্রিল বৃহস্পতিবার বিকালে জাতীয় সংসদ অধিবেশনে বক্তব্যকালে এই প্রস্তাব দেন প্রধানমন্ত্রী ও সংসদনেতা তারেক রহমান। প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমরা সবাই একমত যে জ্বালানি সংকট একটি বৈশ্বিক সমস্যা। এ সংকট মোকাবিলায় বিরোধীদলীয় নেতা একটি প্রস্তাব করেছিলেন যে, তাদের কাছে কিছু পরামর্শ রয়েছে, যা নিয়ে সরকারি দল ও বিরোধী দল একসঙ্গে কাজ করতে পারে।
প্রধানমন্ত্রীর এমন প্রস্তাবকে সাধুবাদ জানান সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা ও জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান। বিরোধীদলীয় এমপিরা ইতঃপূর্বে সংসদে বোরো মৌসুমে সেচের জন্য জ্বালানি সংকট, পাম্পে লাইন এবং ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছিলেন বারবার।
সূত্র জানায়, প্রস্তাবনায় সরকারের ফুয়েল পাশ প্রদানের পদক্ষেপকে বিরোধী দল আরও বিস্তৃত আকারে দিতে এবং প্রযুক্তির সর্বোচ্চ ব্যবহারের মাধ্যমে বিশেষ অ্যাপ চালুর প্রস্তাব করা হতে পারে। একই ব্যক্তির বারবার তেল নেওয়া প্রতিরোধে তার ড্রাইভিং লাইসেন্স এবং এনআইডি (জাতীয় পরিচয়পত্র) ট্র্যাকিং-এর ব্যবস্থা থাকবে।
নির্ভরযোগ্য সূত্র আরও জানায়, ডিপো থেকে তেল সরবরাহ এবং তা গ্রাহক পর্যায়ে পৌঁছানো পর্যন্ত গোয়েন্দা নজরদারির ওপরও জোর দেবে বিরোধী দল। ইতোমধ্যে ভুয়া প্রতিষ্ঠানের নামে তেল উত্তোলন করে তা মজুতদারি ও কালোবাজারির কিছু তথ্য বিভিন্ন গণমাধ্যমে এসেছে। এ ধরনের কর্মকাণ্ডের সঙ্গে সরকারের প্রভাবশালীরা জড়িত থাকতে পারে বলে বিরোধী দল মনে করে। এজন্য তারা বিষয়টির ওপর গুরুত্ব দিতে চায়।
কৃষিক্ষেত্রে সেচের কাজ ব্যাহত যাতে না হয়, সেজন্য কৃষকের তেলপ্রাপ্তি সহজ করার ওপর জোর দেবে বিরোধী দল। ইতোমধ্যে বিরোধী দলের কয়েকজন সদস্য এ বিষয়ে সংসদে নানা অভিযোগ তুলে বক্তব্য দিয়েছেন।
দেশের ভেতরে তেল ব্যবস্থাপনার নানা অনিয়ম দূর করার পাশাপাশি বিরোধী দল সরকারকে কূটনৈতিক সহযোগিতাও দিতে চায়। মধ্যপ্রাচ্য ইস্যুতে বাংলাদেশের জনগণ ইরানের পক্ষে। তাই ইরানের সঙ্গে সম্পর্ক বৃদ্ধি এবং বিকল্প উৎস তথা এমন দেশ থেকে জ্বালানি সংগ্রহ করা যাতে হরমুজ প্রণালি ব্যবহার করতে না হয়। মধ্যপ্রাচ্য এবং এর বাইরে তেলসমৃদ্ধ বিভিন্ন মুসলিম দেশের সঙ্গে জামায়াতে ইসলামীসহ বিরোধী দলের সুসম্পর্ক রয়েছে। এ সম্পর্ক কাজে লাগানোর পরামর্শ দেবে বিরোধী দল।
বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল এবং প্রচার ও মিডিয়া বিভাগের প্রধান এহসানুল মাহবুব জোবায়ের বলেন, বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান স্পষ্টভাবেই বলেছেন,জ্বালানির মতো বৈশ্বিক সংকট সমাধানে সরকারি ও বিরোধী দল মিলে একসঙ্গে কাজ করতে হবে। আমরা সরকারকে সহযোগিতা করতে চাই। দেরিতে হলেও প্রধানমন্ত্রী সে প্রস্তাবে সাড়া দিয়েছেন। দেশটা আমাদের সবার। জনগণের কাছে আমাদের দায়বদ্ধতা আছে। সেজন্য যে সুযোগ এসেছে, তা কাজে লাগাতে আমরা সর্বাত্মক চেষ্টা করব।
বিরোধী দল থেকে মনোনীত সংসদীয় কমিটির সদস্য ঢাকা-১২ আসনের সংসদ-সদস্য সাইফুল আলম খান মিলন সোমবার বলেন,দেশ লাভবান হবে, সরকারকে আমরা এমন পরামর্শই দেব।
কমিটির আরেক সদস্য চাঁপাইনবাবগঞ্জ-৩ আসনের সংসদ-সদস্য নুরুল ইসলাম বুলবুল বলেন,আমরা নিজেদের মধ্যে আলাপ-আলোচনা করে প্রস্তাবনা তৈরি করে কমিটিতে পেশ করব। সরকার আমাদের প্রস্তাবনা গ্রহণ করলে দেশ এবং জনগণ লাভবান হবে।
১১ দলীয় ঐক্যের অন্যতম শীর্ষ নেতা লেবার পার্টির চেয়ারম্যান মোস্তাফিজুর রহমান ইরান বলেন,দু-একদিনের মধ্যেই লিয়াজোঁ কমিটির বৈঠক হবে। সেখানে এ বিষয়ে আলোচনা হতে পারে।