অর্থনীতি পুনরুদ্ধারে আসছে উচ্চাভিলাষী বাজেট - Alokitobarta
আজ : শনিবার, ২০শে জুন, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ৬ই আষাঢ়, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

অর্থনীতি পুনরুদ্ধারে আসছে উচ্চাভিলাষী বাজেট


মোহাম্মাদ আবুবকর সিদ্দীক ভুঁইয়া:আগামী ১১ জুন জাতীয় সংসদে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেট উপস্থাপন করবেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। শুক্রবার রাতে জুম প্ল্যাটফর্মে অর্থমন্ত্রী বাজেট মনিটরিং ও কো-অর্ডিনেশন কাউন্সিলের বৈঠকে অংশগ্রহণ করেন। এর পরই তিনি বিশ্বব্যাংক-আইএমএফের বসন্তকালীন বৈঠকে অংশ নিতে ওয়াশিংটনের উদ্দেশে ঢাকা ত্যাগ করেন। অর্থনীতি পুনরুদ্ধার ও চলমান বৈশ্বিক সংকটের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় আগামী অর্থবছরের জন্য একটি উচ্চাভিলাষী বাজেট প্রণয়ন করা হচ্ছে। প্রাথমিকভাবে অর্থবিভাগ বাজেটের সম্ভাব্য আকার নির্ধারণ করেছে ৯ লাখ ২০ হাজার ৮০৩ কোটি টাকা, যা দেশের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় বাজেটের রেকর্ড হতে যাচ্ছে।

অর্থমন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, নতুন বাজেটের মূল লক্ষ্য হচ্ছে-বিএনপি সরকারের নির্বাচনি ইশতেহারের প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন, সামাজিক নিরাপত্তা জোরদার এবং চলমান বৈশ্বিক সংকটের প্রভাব মোকাবিলা করে অর্থনীতি পুনরুদ্ধার, দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ বাড়ানো ও কর্মসংস্থান তৈরি করা। বিশেষ করে চারটি নতুন কর্মসূচি-ফ্যামিলি কার্ড, কৃষক কার্ড, স্বাস্থ্য কার্ড এবং খালকাটা কর্মসূচি চালুর মাধ্যমে সরাসরি সাধারণ মানুষের কাছে সরকারি সহায়তা পৌঁছে দেওয়ার পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে।এছাড়া সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য নতুন পে-স্কেলের সুপারিশ আংশিক বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেওয়া হবে। এ প্রসঙ্গে অর্থমন্ত্রণালয়ের একজন দায়িত্বশীল কর্মকর্তা বলেন, বৈশ্বিক সংকট ও অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ থাকার পরও অর্থমন্ত্রীর কাছে একটি উচ্চাভিলাষী বাজেট প্রস্তাব উত্থাপন করা হয়েছে। কারণ নির্বাচনি ইশতেহার পূরণ এবং পে-স্কেলের সুপারিশ বাস্তবায়নে বিপুল অঙ্কের অর্থের প্রয়োজন হবে।এদিকে, সংশোধিত বাজেটে রাজস্বের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছিল ৫ লাখ ৮৮ হাজার কোটি টাকা, যার মধ্যে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড থেকে আসবে ৫ লাখ ৩ হাজার কোটি টাকা। ইতোমধ্যে রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) কর্মকর্তারা বলেছেন, এই লক্ষ্যমাত্রা পূরণ হবে না। আগামী অর্থবছরের জন্য রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা বাড়িয়ে ৬ লাখ ৫০ হাজার কোটি টাকা করা হতে পারে। যদিও সংশোধিত বাজেটে ঘাটতির লক্ষ্যমাত্রা জিডিপির ৩.৩ শতাংশ নির্ধারণ করা হয়েছিল, দুর্বল রাজস্ব আদায় এবং ক্রমবর্ধমান ব্যয়ের কারণে। আগামী অর্থবছরের ঘাটতি জিডিপির প্রায় ৫ শতাংশ নির্ধারণ করা হবে। এছাড়া সংশোধিত বাজেটে জিডিপি প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা ৫ শতাংশ ও মূল্যস্ফীতির লক্ষ্যমাত্রা ৭ শতাংশ নির্ধারণ করা হয়েছিল।

বিএনপি সরকার তাদের প্রথম বাজেটে জিডিপি প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা ৬.৫ শতাংশ উন্নীতকরণ এবং মূল্যস্ফীতি ৭ শতাংশে নামিয়ে আনার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করছে। সার্বিক মূল্যস্ফীতি ৭ শতাংশে নামিয়ে এনে দ্রব্যমূল্য সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে রাখাই মূল লক্ষ্য। এ প্রসঙ্গে পলিসি এক্সচেঞ্জের চেয়ারম্যান ড. এম মাসরুর রিয়াজ বলেন, জ্বালানি সংকট মূল্যস্ফীতির একটি ‘ট্রিগার ফ্যাক্টর’ হিসাবে কাজ করে। জ্বালানি খরচ বাড়লে শিল্প উৎপাদন ব্যয় বেড়ে যায়। এতে উৎপাদকরা বাধ্য হয়ে পণ্যের দাম বাড়ান। একই সঙ্গে পরিবহণ খরচ বাড়ার কারণে সরবরাহ চেইনেও চাপ পড়ে। এ কারণে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ করে সাধারণ মানুষকে স্বস্তি দেওয়ার পদক্ষেপ নিতে হবে বাজেটে।

অন্যদিকে নির্বাচনি ইশতেহার পূরণে সরকারের চলতি মেয়াদের প্রথম বাজেটে শুধু ফ্যামিলি কার্ড, কৃষক কার্ড, স্বাস্থ্য কার্ড ও খালকাটা কর্মসূচিতে নতুন বরাদ্দ থাকবে। এর বাইরে ধাপে ধাপে নবম পে-স্কেল বাস্তবায়নে সচিব কমিটির সুপারিশের ভিত্তিতে বাজেটে বিশেষ বরাদ্দ রাখা হতে পারে। এছাড়া বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে বিপুল অঙ্কের ভর্তুকি বাড়বে বলে ধারণা করা হচ্ছে। সম্প্রতি কয়েক দফায় জ্বালানি খাতে অতিরিক্ত ভর্তুকি দাবি করে অর্থবিভাগে চিঠি দিয়েছে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি বিভাগ। এসব কর্মসূচি বাস্তবায়নে অতিরিক্ত প্রয়োজন হবে ১ লাখ ৩০ হাজার কোটি টাকা। নতুন কর্মসূচি ‘ফ্যামিলি কার্ড’ ঘিরে প্রথম বছরেই ৪০ লাখ পরিবারকে লক্ষ্য করে ১৩ হাজার কোটি টাকা ব্যয় হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।কয়েক ধাপে এ কর্মসূচিতে ১ কোটি পরিবারকে অন্তর্ভুক্ত করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। তাই এ খাতেই ৩০ থেকে ৩৫ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া প্রয়োজন। ‘কৃষক কার্ড’ কর্মসূচিকে নতুনভাবে সাজানো হচ্ছে। এ খাতে সম্ভাব্য বরাদ্দ ধরা হচ্ছে ২০ থেকে ২৫ হাজার কোটি টাকা। ‘স্বাস্থ্য কার্ড’ চালুর মাধ্যমে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত জনগোষ্ঠীকে চিকিৎসা ব্যয়ের চাপ থেকে কিছুটা মুক্তি দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। এ খাতে প্রায় ১৫ থেকে ২০ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হতে পারে। খালকাটা কর্মসূচি, কর্মসংস্থান ও পানি ব্যবস্থাপনায় সম্ভাব্য বরাদ্দ ১০ থেকে ১৫ হাজার কোটি টাকা প্রয়োজন হবে।

নবম বেতন কমিশনের হিসাব অনুযায়ী, নতুন বেতন কাঠামো ধাপে ধাপে বাস্তবায়নের কাজ শুরু করলেও এ খাতে অতিরিক্ত ২৫ থেকে ৩০ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হতে পারে। তবে পুরোপুরি বাস্তবায়নে প্রয়োজন ১ লাখ ৬ হাজার কোটি টাকা। ভর্তুকির জন্য চলতি সংশোধিত বাজেটে ৮৮ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ করা হয়েছিল, কিন্তু চলমান সংকট মোকাবেলায় মন্ত্রণালয়গুলো এখন অতিরিক্ত বরাদ্দ চাইছে। ফলে ভর্তুকি ব্যয় ১ লাখ কোটি টাকা ছাড়িয়ে যেতে পারে।

সরকার চলতি বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিবি) পর্যালোচনার জন্য একটি কমিটি গঠন করেছে। পূর্ববর্তী সরকারগুলোর চালু করা অনেক প্রকল্প বাতিল করা হবে এবং ক্ষমতাসীন দলের নির্বাচনি ইশতেহারের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নতুন প্রকল্প যুক্ত করা হবে। সূত্র জানিয়েছে, এবার এডিপির আকার প্রায় ৩ লাখ ৫ হাজার কোটি টাকা নির্ধারণ করা হতে পারে। সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, বিএনপির নির্বাচনি ইশতেহার সামনে রেখে বাজেট প্রণয়নের নির্দেশনা রয়েছে। দ্রব্যমূল্য সহনীয় করে বাজার পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখা এবং পণ্যের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করা সরকারের নির্বাচনি অঙ্গীকার। এ কারণে নতুন বাজেটে সামাজিক নিরাপত্তা সম্প্রসারণ ও খালকাটা কর্মসূচির মতো অগ্রাধিকার প্রকল্পে বরাদ্দ রাখার বিষয়ে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।

Top