ভোট উৎসবে অংশগ্রহণ বাস ট্রেন লঞ্চে ঘরমুখো মানুষের ভিড়
মোহাম্মাদ মুরাদ হোসেন:ঢাকার কোথাও চিরচেনা যানজট দেখা যায়নি। সড়ক ফাঁকা, গণপরিবহণের সংখ্যাও কম।ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ভোট দিতে ঢাকা ছেড়ে লোকজন নিজ নিজ এলাকায় যাচ্ছেন। সোমবার থেকে মানুষজন বাস, লঞ্চ ও ট্রেনে ঢাকা ছাড়তে শুরু করেছেন। মঙ্গলবার ভোর থেকে ঢাকা-টাঙ্গাইল ও ঢাকা-ময়মনসিংহ সড়কে যানবাহনের তীব্র চাপ পড়ে। এতে যাত্রীদের মারাত্মক ভোগান্তির শিকার হতে হয়। ঢাকা থেকে বিভিন্ন গন্তব্যের উদ্দেশে ছেড়ে যাওয়া ট্রেনেও মানুষের ভিড় লক্ষ্য দেখা গেছে। এছাড়া দক্ষিণাঞ্চলের ২১ জেলার প্রবেশদ্বার দৌলতদিয়া-পাটুরিয়া নৌরুটে বিপুলসংখ্যক মানুষ ও যানবাহনের বাড়তি চাপ পড়ে। তবে ঢাকা শহরে উলটো চিত্র দেখা যায়। বৃহস্পতিবার (১২ ফেব্রুয়ারি) অনুষ্ঠেয় নির্বাচন ঘিরে এমন অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে।জাতীয় সংসদ নির্বাচন উপলক্ষ্যে বুধ ও বৃহস্পতিবার (১১ ও ১২ ফেব্রুয়ারি) ছুটি ঘোষণা করেছে সরকার। শুক্র ও শনিবার (১৩ ও ১৪ ফেব্রুয়ারি) সাপ্তাহিক ছুটি হওয়ায় টানা ৪ দিনের ছুটি হয়েছে। এছাড়া রোববার (১৫ ফেব্রুয়ারি) শ্রীশ্রী শিবরাত্রি উপলক্ষ্যে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকবে। নির্বাচন উপলক্ষ্যে কারখানাও ছুটি ঘোষণা করা হয়েছে। নির্বাচন ও লম্বা ছুটি পাওয়ায় ঢাকার মানুষ গ্রামে ছুটছেন প্রিয়জনদের সঙ্গে দেখা করতে।
সরেজমিন ঘুরে দেখা গেছে, ঢাকা-আরিচা, ঢাকা-মাওয়া, ঢাকা-কুমিল্লা, ঢাকা-চট্টগ্রাম এবং ঢাকা-সিলেটের রুটে স্বাভাবিক সময়ের চেয়ে যানবাহনের বাড়তি চাপ। এক সঙ্গে হাজারো মানুষ বাড়ির পথে ছুটে চলায় গাজীপুরে ঢাকা-টাঙ্গাইল ও ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কে যানবাহনের চাপ কয়েক গুণ বেড়ে গেছে। থেমে থেমে যানজটের সৃষ্টি হচ্ছে। মঙ্গলবার সকাল থেকে গাজীপুরের চন্দ্রা, সফিপুর, মৌচাক ও কোনাবাড়ী এলাকায় বাস, ট্রাক, প্রাইভেট কারসহ বিভিন্ন যানবাহনকে দীর্ঘ সারিতে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা যায়। স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় কয়েক গুণ বেশি সময় লাগছে গন্তব্যে পৌঁছতে। ঢাকা থেকে পাবনার বেড়া যেতে সকালে বাসে উঠেন পোশাক শ্রমিক ইমরুল কায়েস। তিনি জানান, ভোট দেওয়ার জন্য কারখানা থেকে ছুটি পেয়েছেন। কিন্তু চন্দ্রা এলাকায় যানজটে প্রায় ১ ঘণ্টা ধরে তিনি আটকে আছেন। কখন বাড়ি পৌঁছাবেন তা নিয়ে তিনি সংশয় প্রকাশ করেন। ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়কের মির্জাপুর বাইপাস বাসস্ট্যান্ডের পশ্চিম পাশে বিপুলসংখ্যক যাত্রীবাহী বাস দেখা গেছে। উত্তরাঞ্চলগামী যাত্রীদের চাপ বাড়ায় ট্রাকে চেপে অনেককে গন্তব্যে যেতে দেখা যায়। দীর্ঘ সময় লাগা এবং অতিরিক্ত ভাড়া নেওয়ায় অনেকে ফেসবুকসহ বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ক্ষোভ প্রকাশ করতে দেখা গেছে।ময়মনসিংহগামী বাসের যাত্রী মনোয়ার হোসেন জানান, ভোট দিতে যাওয়ার আনন্দ বিষাদে পরিণত হয়েছে। পরিবহণগুলোর গলাকাটা ভাড়ায় বাধ্য হয়ে আমাদের যেতে হচ্ছে। সরকারের উচিত ছিল-বিকল্প ব্যবস্থা করার।
হাইওয়ে পুলিশের ট্রাফিক বিভাগের সদস্যরা জানান, শিল্পাঞ্চলের সব কারখানা একসঙ্গে ছুটি হওয়ায় মহাসড়কে পরিবহণের অতিরিক্ত চাপের সৃষ্টি হয়েছে। ঘর থেকে শ্রমিকরা একই সময়ে বের হওয়ায় মহাসড়কে চাপ পড়েছে। মানুষ যাতে নিরাপদ ও নির্বিঘ্নে গন্তব্যে পৌঁছতে পারে সেজন্য পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে হাইওয়ে পুলিশ ও থানা পুলিশ সার্বক্ষণিক কাজ করছে।গাজীপুর প্রতিনিধি জানান, একসঙ্গে হাজারো মানুষ গ্রামের বাড়ির পথে ছুটে চলায় ঢাকা-টাঙ্গাইল ও ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কে যানবাহনের চাপ কয়েকগুণ বেড়ে গেছে। ফলে কালিয়াকৈর উপজেলার চন্দ্রা মোড়সহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টে থেমে থেমে যানজটের সৃষ্টি হয়। এতে চরম দুর্ভোগে পড়েন ঘরমুখো যাত্রীরা। সকাল থেকে চন্দ্রা, সফিপুর, মৌচাক ও কোনাবাড়ী এলাকায় বাস, ট্রাক ও প্রাইভেটকারসহ বিভিন্ন যানবাহনকে দীর্ঘ সারিতে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা গেছে। সিরাজগঞ্জগামী পোশাক শ্রমিক রফিকুল ইসলাম বলেন, সকালে রওয়ানা হয়েছি। কিন্তু চন্দ্রা এলাকায় এসে প্রায় ১ ঘণ্টা ধরে যানজটে আটকে আছি। কখন বাড়ি পৌঁছাব বুঝতে পারছি না। গাজীপুরের কোনাবাড়ী থেকে বাসে করে রাজশাহী যাচ্ছিলেন গৃহকর্মী হাসিনা বেগম। তিনি বলেন, ভোট দেওয়ার জন্য এত কষ্ট করে বাড়ি যাচ্ছি। কিন্তু যানজটে ছোট বাচ্চা নিয়ে খুব ভোগান্তিতে পড়েছি। চালকরা জানান, একসঙ্গে বিপুলসংখ্যক যাত্রী বাড়ি ফেরায় সড়কে চাপ বেড়েছে। মাঝেমধ্যে যানবাহন থেমে যাচ্ছে বা ধীরগতিতে চলছে।
কোনাবাড়ী নাওজোর হাইওয়ে থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) সওগাতুল আলম বলেন, লম্বা সময় ছুটি থাকলে মহাসড়কের শত শত পুলিশ দায়িত্ব পালন করে। কিন্তু এবার পরিস্থিতিটা ভিন্ন রকম। পুলিশের সদস্যরা নির্বাচনে দায়িত্ব পালনে ব্যস্ত। পুলিশের সংখ্যা খুব কম হওয়ায় যানবাহন নিয়ন্ত্রণে বেগ পেতে হচ্ছে। তবে আমরা যানবাহন চলাচল স্বাভাবিক করার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি।অতিরিক্ত যাত্রীর চাপে ঢাকা-টাঙ্গাইল ও ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কের বিভিন্ন স্থানে যানজট দেখা দিয়েছে। সোমবার রাতে চন্দ্রা-সফিপুর ও বাড়ইপাড়ায় প্রায় ১০ কিমি. এলাকায় যানজট সৃষ্টি হয়। এদিকে, সুযোগ বুঝে যানবাহন সংশ্লিষ্টরা অতিরিক্ত ভাড়া নিচ্ছে। ৮০০ টাকার নিচে গাড়ি পাওয়া যাচ্ছে না। বগুড়াগামী রবিউল হাসান জানান, চন্দ্রা থেকে ৪০০ থেকে ৫০০ টাকা ভাড়ার ১ হাজার নিচে নেওয়া হচ্ছে না। এভাবে চললে অনেকেই ভোট দিতে যাবেন না। রিপা খাতুন বলেন, একে তো যানজট। আবার ভাড়া বেশি নিচ্ছে। এ ব্যাপারে পুলিশ ও সরকার কোনো ব্যবস্থা নিচ্ছে না।
টঙ্গী পূর্ব (গাজীপুর) প্রতিনিধি জানান, ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কে যাত্রীবাহী বাসের তীব্র সংকট দেওয়া দিয়েছে। দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করেও গাড়ি না পেয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন যাত্রীরা। এদিকে, গাড়ি সংকটের অজুহাতে অতিরিক্ত ভাড়া আদায় করা হচ্ছে বলে অভিযোগ করেছেন যাত্রীরা। সরেজমিন ঘুরে দেখা গেছে, ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কের স্টেশন রোড, টঙ্গী বাজার, মিলগেট, চেরাগ আলী, কলেজগেট, গাজীপুরা এলাকার প্রতিটি বাসস্ট্যান্ড ও টঙ্গী রেলওয়ে জংশনে যাত্রীদের উপচে পড়া ভিড়। জামালপুর যাওয়ার জন্য ভোর রাত থেকে টঙ্গী রেলওয়ে জংশনে অপেক্ষমাণ হাবিবুর রহমান ও আল-আমিন জানান, দেওয়ানগঞ্জ কমিউটার ট্রেনের জন্য দাঁড়িয়ে আছি। এখনো কোনো ট্রেনে উঠতে পারিনি। বাধ্য হয়ে বিকাল সোয়া ৪টার ট্রেনের জন্য অপেক্ষায় আছি।
দেওয়ানগঞ্জ (জামালপুর) প্রতিনিধি জানান, ট্রেন ও বাসসহ বিভিন্ন যানবাহনে কষ্ট করে দেওয়ানগঞ্জ আসছেন। তাদের মধ্যে নতুন ভোটারের সংখ্যা বেশি। আবদুল আলী বলেন-এবার প্রথম ভোট দেব। জায়গা না পেয়ে তাই ট্রেনের ছাদে উঠে এসেছি। আন্তঃনগর তিস্তা ও কমিউটার ট্রেনের ছাদেও তিল ধারণের জায়গা নেই।
দৌলতদিয়া ঘাটে যানবাহন ও ঘরমুখো মানুষের ভিড় : রাজবাড়ী ও গোয়ালন্দ প্রতিনিধি জানান, পছন্দের প্রার্থীকে ভোট দিতে নিজ নিজ নির্বাচনি এলাকায় যেতে শুরু করেছে দক্ষিণাঞ্চলের মানুষ। দক্ষিণাঞ্চলের ২১ জেলার প্রবেশদ্বার দৌলতদিয়া-পাটুরিয়া নৌরুটে ঘরমুখো অসংখ্য মানুষ ও যানবাহনের বাড়তি চাপ লক্ষ্য করা গেছে।
দুপুর ১২টার দিকে দৌলতদিয়া ৭নং ফেরিঘাট এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, মোটরসাইকেল, যাত্রীবাহী বাস, মাইক্রোবাসসহ বিভিন্ন যানবাহনে আসা মানুষজন গন্তব্যে যাচ্ছেন। পাটুরিয়া ঘাট থেকে ছেড়ে আসা প্রতিটি ফেরি ও লঞ্চে যানবাহন ও যাত্রীদের উপচে পড়া ভিড় দেখা যায়। ফেরিঘাটে কুষ্টিয়াগামী যাত্রী রুবেল হোসেন বলেন, পছন্দের প্রার্থীকে ভোট দিতে বাড়িতে যাচ্ছি। নিজে ভোট দেব এবং পরিবারের সবাইকে ভোট দিতে উৎসাহিত করব। বিআইডব্লিউটিসির দৌলতদিয়া ঘাটের সহকারী মহাব্যবস্থাপক মোহাম্মদ সালাহ উদ্দিন জানান, সোমবার রাত থেকে যাত্রীদের চাপ বেড়েছে। তবে ঘাটে কোনো জট নেই। এ নৌরুটে ছোট-বড় ১৪টি ফেরি দিয়ে যাত্রী ও যানবাহন পারাপার করা হচ্ছে।